শতাব্দীর গোধূলি-মুহূর্তে

আল ইমরান সিদ্দিকী
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

ডায়াসপোরা

তিনমাস পার হলো এসেছি এদেশে।
আবার গিয়েছি আজ ট্রেনে চেপে রাটগার্সে
বিকালবেলায়
চোখ রেখে নম্র আলো-ছায়ায়
আমি আর লীনা।
চিরচেনা
দৃশ্যগুলি নাই আর!—
পঁয়ত্রিশটা বছর পার করা এ জীবনে আমার
যা দেখেছি উঠেছি যখনই ট্রেনে!—
নুয়ে আসা জাগরণে
চিরদিন দেখে নেয়া ধানক্ষেত, ফিঙে আর শিয়ালকাঁটায়
ভরে নেই চারপাশ বিকালবেলায়।
শুধু সারে সারে ওক
চোখের রোগ
সারাবার মতো সবুজ তেমন নাই
শুধু দেখতে পাই
সুবিশাল পাতাহীন গাছ কালো কালো
বিকালের আলো
পড়ে আছে পথ-ঘাট বনানীর সুবিস্তীর্ণ নীরবতায়।—
তাকিয়ে এমন শূন্যতায়
ভাবি আমি
কী রকম হতে পারে আমার আগামী
এই দূর দেশে।
যে মূর্তি প্রথম দেখি রাটগার্সে এসে
সে যে হুইটম্যানের, বুঝতেই পারিনি!—
মাথা উঁচু, প্রত্যয়ী চাহনি—
সটান দাঁড়িয়ে আছে, প্রজাপতি হাতে
মরাপাতাভরা এক গাছের ছায়াতে।
মানবিক প্রত্যাশার মূর্তিমান ছবি
এক কবি।—
যাই হোক, হতে পারে কোনো এক দিন
আমার এ মন এই সব গাছপালা পথ-ঘাটের অধীন
হয়ে যাবে
প্রভাবে প্রভাবে
একে অপরকে নিজের মতন করে গড়ে নেবে
হয়তো কাল এই দেশটিকে আমার নিজের দেশ বলে মনে হবে।
মানুষগুলিও যতদূর দেখেছি, যথেষ্ট আন্তরিক;
জানি না এখনো ঠিক।
কিন্তু এ আমার অনাগত সন্তানের দেশ হবে
ফলে অন্যরকম মমতা আমার থাকবে
এই দেশটার প্রতি
থাকবে নির্মল আকুতি।
কিন্তু রাজনীতিজটিল এ পৃথিবীতে
শতাব্দীর গোধূলি-মুহূর্তে
স্নায়ুযুদ্ধ থেমে গেছে বলে
ধর্মান্ধতা ও বর্ণবাদের ভয়াল কবলে
পড়ে গেল দেশ-মহাদেশ;
অসহনীয় করে দিয়ে প্রত্যেকের প্রতিবেশ
ভয় বেড়ে চলেছে সতত!
রে আমার অনাগত,
আমি তো জানি না
পৃথিবীর কোথাও তোমার-আমার দেশ বলে কিছু আর থাকবে কিনা!

খোঁজ

ফোর ভিলা অ্যাভিনিউ আমার ঠিকানা।—
হতে পারে আজীবন থাকব এখানে;
নেমেই ভেবেছি আমি কোন কোন গাছ
খুঁজব টাউনশিপে, গাছের দোকানে।

মেপল গাছের প্রতি টান খুব বেশি।
বাগানবিলাস পেলে খুব ভালো হয়
অগোছালো থেকে থেকে দিন কেটে গেছে
গোছানোর ছলে শুরু হবে সঞ্চয়।

জানি নাতো আশেপাশে পাওয়া যায় কিনা;
যা-চাই টাউনশিপে নাই পাওয়া গেলে
অন্য কোথাও আমি খুঁজব তো বটে
ছোট এ টাউনশিপ পিছে ফেলে-টেলে।

‘দেশ’ আসলেই ভুল ধারণার নাম।
জন্ম নিয়েছি আমি মহাবিশ্বেই
বিশাল দুনিয়া ফেলে দেশের ভিতর
নিজেকে খুঁজতে গিয়ে হারিয়েছি খেই।

আপন অস্তিত্ববাদে

যদি তোমার কান্না তুমি নিয়ে আসো
আমি মমত্ববোধ দিয়ে তা ঢেকে দেব ভাই।

বিচ্ছিন্নতাবোধে যদি ভুগছে সারাটা স্বদেশ
তখন প্রবাসে এসে
কতটা অসহায় আমি
বোধ করতে পারি!

এই সব কিছুই সাময়িক এই শীতের দেশে—
এই লাউয়ের মাচা, শিম, মরিচ, ঢেঁড়শ;
হেমন্ত ফুরায় তবু তারা যেন ফুরাতে চায় না।–
মরে যায় কচি কচি শিম-লাউ-ঢেঁড়শসহ গাছগুলি।

তাও, প্রতি বছরই ক্ষেত করি; না-হয় হলো এ এক শৌখিনতাই!

অতি সহনশীলতা কিংবা অবিমিশ্র ক্ষোভ-দ্রোহ-ভয়
এর কোনো কিছুতেই আমার আস্থা নাই।

যা কিছু ফলাই, নিজে খাই
তাদেরকেও পাঠাই
আমার মতো যাদেরও জীবন একটাই।

আপনার মতামত লিখুন :