হারুকি মুরাকামির নতুন গল্প : শীনাগাওয়ার এক বানরের স্বীকারোক্তি



অনুবাদ: আলমগীর মোহাম্মদ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

মুরাকামির উপন্যাস হট কেকের মতো বিক্রি হয়। বিশ্ব জুড়েই তাঁর পাঠক। এর প্রমাণ তাঁর সাহিত্যকর্ম ৫০টিরও বেশি ভাষায় অনুবাদ হওয়া। উপন্যাস ছাড়া তিনি অনেকগুলো ছোটগল্পও লিখেছেন। তাঁর গল্পের প্লট প্রায়শই বাস্তব আর পরাবাস্তবের যোগসাজশে গড়ে ওঠে। সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর ‘শীনাগাওয়ার এক বানরের স্বীকারোক্তি’ গল্পটিও তাই। মূল জাপানিজ থেকে ফিলিপ গাব্রিয়েল কর্তৃক ইংরেজিতে অনূদিত Confessions of a Shinagawa Monkey-র সূত্র ধরে বর্তমান এই বঙ্গানুবাদ। - বিভাগীয় সম্পাদক


গানমা অঞ্চলের এক উষ্ণ-প্রসবণ শহরে পাঁচ বছর আগে জাপানি আদলে নির্মিত ছোট একটা হোটেলে বুড়ো বানরটাকে প্রথম দেখেছিলাম। হোটেলটা ছিল অনেকটা জরাজীর্ণ, কোনোমতে টিকে আছে এমন, যেখানে আমি কোনোরকমে রাতটা কাটাতে উঠেছিলাম।

আমি যেদিকে খুশি ঘুরাঘুরি করছিলাম এবং শহরে পৌঁছে ট্রেন থেকে যখন নামলাম তখন সন্ধে সাতটার মতো বেজে গিয়েছিল। শরৎ প্রায় শেষের দিকে, সূর্য অনেক আগে ডুবে গিয়েছিল। পর্বতের আশেপাশের এলাকাটা নেভি-ব্লু রঙের অন্ধকারে ছেয়ে গিয়েছিল। হাড় কাঁপানো বাতাস বয়ে যাচ্ছিল এবং ঝুরঝুর করে পাতা ঝরে পড়ছিল রাস্তার ওপর।

রাত কাটানোর জন্য শহরে অনেক খোঁজাখুঁজি করেছিলাম কিন্তু ভালো কোনো হোটেলেই আমার জায়গা হলো না কারণ নৈশভোজের পর তারা নতুন কোনো অতিথি তোলে না। আমি পাঁচ-ছয়টা জায়গায় চেষ্টা করেছিলাম, তাঁদের সবাই আমাকে সরাসরি না করে দিয়েছিল। অবশেষে, শহরের পরিত্যক্ত এলাকার একটা হোটেলে আমার রাত কাটানোর সুযোগ হয়েছিল। জীর্ণশীর্ণ, ভগ্নপ্রায় এক ভুতুড়ে জায়গা। অনেক বছর আগে নির্মিত হলেও পুরনো হোটেলের কোনো ধরনের আকর্ষণ এর মধ্যে ছিল না। ছিরিছাঁদ দেখে মনে হলো হয়তো জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছিল এটি। আমার সন্দেহ আবার কখনো যদি ভূমিকম্প হয় তাহলে এটার সলিলসমাধি নিশ্চিত এবং মনে মনে আশা করছিলাম আমি থাকতে এরকম কিছু যেন না ঘটে।

এই হোটেলে নৈশভোজের কোনো বন্দোবস্ত ছিল না, তবে সকালের নাস্তার আয়োজন ছিল এবং একরাত থাকার বিল ছিল অবিশ্বাস্য রকমের কম। প্রবেশপথে একটা সাদামাটা অভ্যর্থনা ডেস্ক যেটার পেছনে চুলহীন এক বয়স্ক ভদ্রলোক বসা ছিলেন। ভদ্রলোকের এমনকি চোখের উপর কোনো কেশও ছিল না। তিনি আমার কাছ থেকে একরাত থাকার বিল অগ্রীম নিলেন। চোখের উপর কেশ না থাকায় ভদ্রলোকের বড় বড় চোখ দুটো অদ্ভুত রকমের দীপ্তি ছড়াচ্ছিল। উনার পাশে মেঝেতে একটা বালিশে, বড়সড়, খয়েরী রঙের একটা বিড়াল ঘুমাচ্ছিল। বিড়ালটার নাকে কোনো সমস্যা ছিল হয়তো কারণ এটার মতো তীব্রস্বরে আর কোনো বিড়ালকে নাক ডাকতে শুনিনি আমি। মাঝেমধ্যে এর নাক ডাকার শব্দে ছন্দপতন হচ্ছিল। হোটেলটার সবকিছুতে এক ধরনের জীর্ণতা ও ভঙ্গুরতার চিহ্ন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল।

আমাকে যে কক্ষটি দেখানো হয়েছিল সেটা ছিল দেখতে জরাজীর্ণ, স্বাভাবিকভাবে এ ধরনের ঘরে মানুষ অব্যবহৃত বিছানাপত্র জমা রাখে। ছাদের বাতিটা ছিল অনুজ্জ্বল এবং মেঝে দেখতে অনেকটা বিদঘুটে। কিন্তু বাছাবাছি করার সময় ছিল না এটা। নিজেকে এই বলে বুঝ দিলাম যে মাথা গোঁজার জন্য ছাদ ও ঘুমানোর জন্য কোনো রকম একটা বিছানা পেয়েছি এতেই শোকরিয়া।

আমি আমার লাগেজ ও বড় কাঁধব্যাগটা মেঝেতে রেখে শহরের দিকে রওনা দিলাম। (আসলে ঠিক এই ধরনের রুম আমি চাইনি।) কাছাকাছি একটা নুডলস শপে গিয়ে সাদামাটাভাবে রাতের খাবার সারলাম। আদতে ওটা না করে উপায় ছিল না কারণ কাছেভিতে আর কোনো রেস্তোরাঁ খোলা ছিল না। একটা বিয়ার, কিছু বার স্ন্যাকস এবং অল্প গরম সোবা খেয়েছিলাম আমি। সোবাটা ছিল মাঝারি মানের, স্যুপটা ছিল হালকা গরম, কিন্তু তারপরও আমি কোনো অভিযোগ করলাম না। খালি পেটে ঘুমাতে যাওয়াকেও হার মানিয়েছিল এটা। সোবাশপ থেকে বেরিয়ে ভাবছিলাম কিছু টুকটাক খাবার ও ছোট এক বোতল হুইস্কি কিনব। কিন্তু সুবিধামত কোনো দোকানের সন্ধান পেলাম না। আটটার পরের ঘটনা এটা এবং সে সময়ে শুধু শ্যুটিং গ্যালারি গেইম কেন্দ্রগুলো খোলা ছিল। শেষতক হোটেলে ফিরে এলাম এবং কাপড় বদলে গোসল সারতে নেমে পড়লাম নিচতলায়।

বিল্ডিংয়ের জরাজীর্ণ অবস্থা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাদির দৈন্যতার তুলনায় হোটেলের উষ্ণ-প্রসবণ গোসলখানার অবস্থা আশ্চর্য রকমের ভালো। সবমিলিয়ে এ ধরনের গোসল আমার ভাগ্যে আগে খুব একটা জোটেনি বলা যায়। আমি খুব আয়েশ করে গোসল সারলাম। আর কেউ না থাকায় (অবশ্যই আমি নিশ্চিত না হোটেলে আর কোনো অতিথি ছিল কিনা) আমি সময় নিয়ে মনমতো গোসল সারলাম। কিছুক্ষণ পর মাথা একটু হালকা হলো এবং এক ধরনের প্রশান্তি শরীর মন ছুঁয়ে গেল। যাহোক এই হোটেলে ওঠার সিদ্ধান্ত মোটেই খারাপ ছিল না মনে হলো। বড় বড় হোটেলগুলোতে শোরগোলের মধ্যে গোসল সারার চেয়ে এখনো শতগুণ বেশি আরাম পাওয়া গেল।

তৃতীয়বারের মতো নিজেকে ভিজিয়ে নিচ্ছিলাম যখন ঠিক তখনই দরোজা ঠেলে খটাখট শব্দ করে একটা বানর ভিতরে ঢুকে পড়ল। “কিছু মনে করবেন না,” নিচু স্বরে ওটা বলল। ওটা যে একটা বানর সেটা বুঝে উঠতে আমার কিছুক্ষণ লেগে গিয়েছিল। গরম পানির ঝাপটা খেয়ে আমি কিছুক্ষণ মূঢ় ছিলাম, আমি কখনো কল্পনা করিনি যে একটা বানর কথা বলতে পারে। সুতরাং আমি দ্রুতই কোনো কিছু মেলাতে পারছিলাম না, কী দেখছি আর আমার সামনে আসলে কী ঘটছে। বানরটি তার পেছনের দরোজা বন্ধ করল, এদিক সেদিক ছড়িয়ে থাকা বালতিগুলো ঠিকঠাক করে থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা মাপতে শুরু করল। সে থার্মোমিটারের ডায়ালের দিকে স্থির দৃষ্টি ফেলে চেয়ে রইল, তার চোখ ছোট হয়ে এলো, যেন একজন দক্ষ ব্যাকটেরিয়া-বিশারদ পরীক্ষা করছেন।

“গোসলখানাটা কেমন?” বানরটি আমাকে জিজ্ঞেস করল।
“এটা খুব ভালো। ধন্যবাদ,” আমি বললাম। বাষ্পের মধ্যে আমার স্বর মৃদু ধাক্কা খাচ্ছিল। এটা অনেকটা পৌরাণিক শোনাচ্ছিল, আমার স্বরের মতো না, যেন গহিন বন থেকে কোনো প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। এবং সেই প্রতিধ্বনি...এক সেকেন্ড আটকা ছিল। এখানে বানরটা কী করছিল? এবং কেন এটা আমার ভাষায় কথা বলছিল?

“আমি কি আপনার পিঠ মেজে দিব?” বানরটি জিজ্ঞেস করল, তার স্বর এখনো নিচু। তার স্বর পরিষ্কার, স্নিগ্ধগম্ভীর পুরষের মুগ্ধকর স্বরের মতো। অবশ্যই পুরোপুরি আপনার মনমতো নয়। কিন্তু তার স্বরে কোনো আপত্তিকর কিছুই ছিল না। আপনি চোখ বন্ধ করে তার কথা শুনলে মনে হবে সাধারণ কোনো এক পুরুষের স্বর শুনছেন।

“হ্যাঁ, ধন্যবাদ,” উত্তরে আমি বললাম। এমন না যে আমি ওখানে অপেক্ষা করছিলাম যে কেউ এসে আমার পিঠ মেজে দিবে, কিন্তু তাকে না করতে পারিনি এই ভয়ে যে, সে বুঝে যাবে বানর বলে আমি না করছিলাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম এটা তার নিজস্ব প্রস্তাব এবং তার অনুভূতিতে আঘাত করতে চাইনি। সুতরাং আস্তে আস্তে পানি থেকে উঠে, কাঠের এক বেঞ্চিতে বসে বানরের উদ্দ্যেশ্যে আমার পিঠ সঁপে দিলাম।

বানরের গায়ে কোনো কাপড় ছিল না। অবশ্যই বানরের গায়ে তো স্বাভাবিকভাবে কোনো কাপড় থাকে না, তাই এ নিয়ে আমাকে বিব্রত হতে হয়নি। বানরটাকে অপেক্ষাকৃত বয়স্ক মনে হয়েছিল; অধিকাংশ কেশ শুভ্র রঙ ধারণ করেছিল তার। ছোট্ট একটা তোয়ালেতে সাবান মেখে অভিজ্ঞ হাতে আমার পিঠ মেজে দিল সে।

“আজকাল বেশ শীত পড়ছে, না?” বানরটি মন্তব্য করল।
“হ্যাঁ, ঠিক তাই।”
“শীঘ্রই এই জায়গাটা তুষারে ঢেকে যাবে। বিশ্বাস করুন তুষারপাতের আস্তর পড়ে গেলে শাবল দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। অবশ্যই কাজটা খুব একটা সহজ হবে না তাদের জন্য।”

দুজনের কথোপকথনের মাঝখানে ক্ষণিকের বিরতি ছিল, এবং আমি কথাবার্তা শুরু করলাম। “তাইলে তুমি কি মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারো?”
“আমি পারি বটে,” বানরটি সপ্রতিভভাবে জবাব দিল। সম্ভবত তাকে এ বিষয়ে অনেকেই প্রশ্ন করেছিল। “ছোটবেলা থেকে আমি মানুষের হাতে বড় হয়েছি। এটা জানার আগে থেকে আমি কথা বলতে পারতাম। আমি টোকিওর শীনাগাওয়ায় দীর্ঘদিন ছিলাম।”
“শীনাগাওয়ার কোন অঞ্চলে?”
“গোতেনয়ামার আশেপাশে।”
“জায়গাটা বেশ দেখতে।”
“হ্যাঁ, আপনি যেমনটা জানেন, জায়গাটা বসবাসের জন্য দারুণ। কাছাকাছি গোতেনয়ামা বাগানে গিয়ে আমি প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতাম।”

এই পর্যায়ে এসে আমাদের আলাপ থামল। বানর আমার পিঠ মাজা চালিয়ে যাচ্ছিল নিরলসভাবে (যা খুব আরামদায়ক লাগছিল), এবং সারাটা সময় আমি এই ঘটনার যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। শীনাগাওয়াতে একটা বানর বেড়ে উঠেছিল? গোতেনয়ামা বাগান? এবং এরকম স্বচ্ছন্দ বক্তা? এটা কিভাবে সম্ভব? ঈশ্বরের কী লীলা, তাও একটা বানর। একটা বানর, অন্য কিছু না।

“আমি মিনাতো-কু তে থাকি,” আমি বললাম, বস্তুত একটা অর্থহীন তথ্য।
“তাহলে তো আমরা অনেকটা একে অপরের প্রতিবেশী,” বানর বন্ধুত্বপূর্ণ স্বরে বলল।
“তুমি কোন ধরনের ব্যক্তির হাতে বড় হয়েছিলে শীনাগাওয়াতে?” আমি জানতে চাইলাম।
“আমার প্রভু ছিলেন একজন কলেজ অধ্যাপক। তিনি পদার্থবিদ এবং টোকিওর গাকুগেই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন।”
“নিঃসন্দেহে একজন বুদ্ধিজীবী, তাহলে।”
“হ্যাঁ, তিনি তাই ছিলেন। তিনি সবকিছুর ওপর সংগীত ভালোবাসতেন। বিশেষ করে ব্রুকনার ও রিচার্ড স্ট্রসের গান। এটার ভালো দিক হলো সংগীতে আমারো আগ্রহ গড়ে উঠেছিল। আমি সবসময় শুনতাম। বলতে পারেন যে না বুঝেও সংগীত সম্পর্কে আমার কিছু জানাশোনা হয়েছিল।”
“তুমি ব্রুকনার উপভোগ করো?”
“হ্যাঁ। তাঁর সপ্তম সিম্ফনি। তৃতীয় ধাপকে আমার সবসময় উঁচু মানের মনে হয়।”
“আমি প্রায়সময় নবম সিম্ফনি শুনি,” আমি সুর মিলিয়ে বললাম। আরেকটা অর্থহীন তথ্য।
“হ্যাঁ, সেটা সত্যিকার অর্থে সুন্দর সংগীত,” বানর মন্তব্য করল।
“তাহলে ঐ অধ্যাপক তোমাকে ভাষা শিখিয়েছিল?”
“হ্যাঁ, তিনি শিখিয়েছিলেন। তার কোনো সন্তান-সন্ততি ছিল না। হয়তো সেই কারণে তিনি আমাকে যথেষ্ট আন্তরিকতা দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। তিনি খুব ধৈর্যশীল ছিলেন, এমন একজন ব্যক্তি যিনি সবকিছুর ওপর শৃঙ্খলা ও ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দেন। তিনি খুবই আন্তরিক একজন ব্যক্তি ছিলেন যার প্রিয় বাণী হলো : জ্ঞানের সত্যিকার পথ হলো ভালো কাজ বারবার করা। তাঁর স্ত্রী শান্তপ্রকৃতির ছিলেন মানুষ এবং আমার প্রতি বরাবরই সদয় ও সুবিবেচক ছিলেন। তারা দুজনের সম্পর্ক খুব ভালো যাচ্ছিল, কিন্তু আগন্তুক কারো কাছে এ কথা কিভাবে বলি, কিন্তু, বিশ্বাস করুন, তাঁদের রাত্রীকালীন কাজকর্ম আরো ঘনিষ্ঠ হতে পারত।”
“সত্যি,” আমি বললাম।

বানরটি শেষ পর্যন্ত আমার পিঠ মাজা শেষ করল। “আপনার ধৈর্যের জন্য ধন্যবাদ,” সে বলল, এবং মাথা নুইয়ে প্রণাম করল।
“ধন্যবাদ তোমাকে,” আমি বললাম। “খুব ভালো লেগেছে। আচ্ছা, তুমি কি এই হোটেলে চাকুরী করো?”
“হ্যাঁ। তারা আমাকে দয়া করে কাজ করতে দিয়েছে এখানে। উঁচু দরের হোটেলে বানরের কাজের সুযোগ হয় না। তবে তাদের প্রায়সময়ই লোকবলের অভাব পড়ে, এবং আপনি যদি নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন তাঁরা আপনাকে ডাকবেই, সে যেই হোন আপনি; বানর না মানুষ সেটা ধর্তব্য নয়। বানরের বেতন খুবই কম। এবং তারা আমাকে কাজ দেয় যেখানে আমাকে প্রায় দেখা যায় না। গোসলখানা অঞ্চল গোছানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, এই ধরনের কাজগুলো আরকি। অধিকাংশ অতিথিই বেজার হবেন যদি একটা বানর তাঁদেরকে চা ও অন্যান্য নাস্তা পরিবেশন করে। রান্নাঘরে কাজ করাও আমার জন্য জায়েজ না কারণ খাবারের ঘরে বানরের যাওয়া স্বাস্থ্যবিধিতে মানা।”
“তুমি কি অনেক দিন ধরে কাজ করছো এখানে?” আমি জানতে চাইলাম।
“তিন বছর ধরে।”
“এখানে থিতু হওয়ার আগে তোমাকে সবরকম কাজ করতে হয়েছে?”

বানরটি দ্রুত মাথা নেড়ে সায় দিল। “আসলেই সত্যি।”

আমি বিব্রত বোধ করছিলাম, কিন্তু এরপরেই এর থেকে বেরিয়ে এলাম এবং তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি যদি কিছু মনে না করো, তোমার ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে আরো কিছু জানতে পারি?”

বানরটি তাতে সায় দিল, এবং তারপর বলল, “হ্যাঁ, সেটা ভালো হবে। তবে আপনি যেরকম মজার হবে ভাবছেন ততটা হবে না হয়তো। দশটার দিকে আমার ছুটি হবে এবং তারপর আমি আপনার রুমের দিকে আসব। ওটা ভালো হবে না?”
“বিলকুল,” আমি জবাব দিলাম। “আমি কৃতজ্ঞ হব যদি তুমি কিছু বিয়ার নিয়ে আসো তখন।”
“বুঝছি। ঠান্ডা বিয়ার। স্যাপোরো চলবে?”
“সেটা দারুণ হবে। আচ্ছা, তুমি বিয়ার খাও?”
“হ্যাঁ, একটু আধটু।”
“তাহলে কষ্ট করে দুই বোতল এনো।”
“অবশ্যই। আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে, আপনি আরাইজো স্যুটের দুই তলায় থাকেন?”
“হ্যাঁ, ওখানেই,” আমি বললাম।
“এটা আশ্চর্যজনক না?” বানরটি বলল। “পর্বতের ওপর হোটেলের একটা কক্ষের নাম আরাইজো—‘অসমতল কূল’,” সে মৃদু হাসল। আমি জীবনে কোনো বানরের হাসি শুনিনি। তবে আমার আন্দাজ বানর হাসতে জানে, মাঝেমধ্যে কাঁদতেও। এই বানরটিকে কথা বলতে শুনে তাই আশ্চর্য হইনি আমি।
“আচ্ছা, তোমার নাম কী?” আমি জানতে চাইলাম।
“স্বাভাবিকভাবে কোনো নাম থাকে না বানরের। কিন্তু সবাই আমাকে শীনাগাওয়া বানর বলে ডাকে।”

বানরটি কাচের দরোজা টপকে বেরিয়ে গেল, ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রণাম জানাল, এবং তারপর আস্তে আস্তে দরোজা টেনে দিয়ে চলে গেল।

ট্রেতে করে বিয়ারের দুটো বড় বোতল নিয়ে দশটার একটু পরে আরাইজোতে এসে হাজির হলো বানরটি। বোতল দুটো ছাড়াও ট্রেতে আরো ছিল বোতলের ঢাকনা খোলার যন্ত্র, দুটো গ্লাস এবং হাল্কা স্ন্যাকস : শুকনো, মৌসুমি স্কুইড এবং এক প্যাকেট কাপিকি—বাদাম দিয়ে রাইস ক্র্যাকার্স। বারে সাধারণত এই স্ন্যাকসগুলোই পরিবেশন করে। এই বানরটা ছিল খুবই মনোযোগী।

বানরটি এখন পোশাক পরিহিত। ধূসর রঙের প্যান্ট ও ভারী লম্বাহাতা একটা শার্ট যার গায়ে লেখা—“♥NY.” হয়তো কোনো বাচ্চার আঁকাআঁকি এটা।

রুমে কোনো টেবিল ছিল না। আমরা দেয়ালে হেলান দিয়ে পাশাপাশি বসলাম। বোতল খুলে বানরটি দুই গ্লাস বিয়ার ঢালল। নীরবে আমরা গ্লাস দুটো জড়ো করে হালকা চালে ঠুংঠাং সেরে নিলাম।

“পানীয়ের জন্য ধন্যবাদ,” বানরটি বলল, এবং সন্তুষ্টচিত্তে ঠান্ডা বিয়ার গিলতে লাগল। আমিও হালকা পান করেছিলাম। সত্যি বলতে, এভাবে একটা বানরের পাশাপাশি বসে বিয়ার পান করতে আমার একটু অস্বস্তি লাগছিল কিন্তু আমি মনে করি এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বেন আপনি।

“কাজ শেষে একটা বিয়ার স্পন্দন হতে পারে না,” বানরটি রোমশ হাতের পেছনের অংশ দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল। “কিন্তু, একটা বানরের জন্য এ ধরনের বিয়ারপান কালেভদ্রে ঘটে।”
“তুমি কি এই হোটেলেই থাকো?”
“হ্যাঁ, এখানে একটা প্রায় পরিত্যক্ত রুম আছে। ওখানটাতেই তারা আমাকে থাকতে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর পর ইঁদুরের উৎপাতের জন্য ঠিকমতো বিশ্রাম করতে পারি না। মনে রাখতে হবে আমি মানুষ নই, একটা বানর। শোয়ার জন্য একটা বিছানা, তিনবেলা খাবার জুটছে এটা কম কী। এটা তো আর বেহেশত নয়।”

বানরটি প্রথম গ্লাস পান শেষ করলে তাকে আরেক গ্লাস দিলাম।

“অনেক কৃতজ্ঞতা,” সে ভদ্রতার স্বরে বলল।
“তুমি কি শুধু মানুষের সাথে বাস করে আসছো এতদিন নাকি বানরদের সাথেও? মানে অন্য বানরদের সাথে তোমার বসবাসের অভিজ্ঞতা আছে?” আমি জানতে চাইলাম। আসলে অনেক কিছু তাকে জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে ছিল।

“হ্যাঁ, বেশ কয়েকবার,” বানর জবাব দিল। তার চেহারায় খানিকটা গোমড়া ভাব চলে এলো এবার। তার চোখজোড়া ছলকে উঠল। “অনেক কারণে আমাকে, জোর করে, শীনাগাওয়া থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল এবং ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল তাকাসাকিয়ামাতে, বানরের পার্কের জন্য বিখ্যাত ছিল জায়গাটি। ভেবেছিলাম সেখানে শান্তিতে বাঁচতে পারব কিন্তু আমার সেই আশা ব্যর্থ হলো। অন্যান্য বানরগুলো আমার সাথে ভালো আচরণ করত, কিন্তু অধ্যাপক ও তাঁর স্ত্রীর কাছে বড় হওয়া আমি ঠিকঠাক মতো নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারছিলাম না। তাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন কোনোভাবেই সম্ভব হয়ে উঠছিল না। ‘তুমি হাস্যকর কথাবার্তা বলো,’ তারা আমাকে বলেছিল। আমার কথা বলার ধরন নিয়ে তারা সারাক্ষণ মজা করে আমাকে নাজেহাল করত। মেয়ে বানরগুলো আমাকে দেখলে তাচ্ছিল্যের সুরে হাসত। বানররা সামান্যতম পরিবর্তনও সহজে নিতে পারে না। আমার চালচলন, আচার আচরণ ওদের কাছে হাস্যকর মনে হলো, শেষতক ওরা বিরক্ত হয়ে পড়ল আমার ওপর। ওখানে টিকে থাকা আমার জন্য রীতিমতো অসম্ভব হয়ে পড়লে এক পর্যায়ে আমি নিজেই বেরিয়ে এলাম। বদমাশ বানরে পরিণত হলাম, অন্যভাবে বলতে গেলে।”
“তোমার খুব একা লাগত নিশ্চয়।”
“হ্যাঁ, সেটাই। কেউ আমাকে বাঁচাতে আসেনি এবং টিকে থাকার জন্য আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল এবং এভাবে কোনোমতে টিকে গেলাম। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কারো সাথে কথা বলতে পারছিলাম না। না মানুষ, না বানরের সাথে। এই ধরনের একাকিত্ব পীড়াদায়ক।

তাকাসিয়ামাতে অনেক মানুষ বেড়াতে আসেন। কিন্তু আমি কারো সাথে আলাপ জমাতে পারিনি। সেটা করতে গেলেও মুশকিল। আমার অবস্থা হলো এমন যে, আমি বানর সমাজেও অপাঙ্‌ক্তেয়, মনুষ্য সমাজের কথা আর নাই বা বললাম। এক ধরনের রোমহষর্ক অস্তিত্ব।
“তুমি আর ব্রুকনারও শুনতে পারোনি?”
“হ্যাঁ। ঐটা এখন আর আমার জীবনের অংশ নয়,” বলে সে আরেক চুমুক বিয়ার খেলো। তার মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইলাম, কিন্তু কিছুই উদ্ধার করতে পারলাম না। আমি বুঝতে পারলাম যে, এই বানর পান করেও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। অথবা এমনও হতে পারে যে বানরের মুখ দেখে আসলে কিছু বোঝা যায় না, বিশেষ করে যখন তারা আসক্ত থাকে।

“আরেকটা ব্যাপার আমাকে খুব পীড়া দিয়েছিল সেটা হলো মেয়েদের সাথে সম্পর্ক।”
“আচ্ছা,” আমি বললাম। “মেয়েদের সাথে সম্পর্ক বলতে কী বোঝাতে চাইছো তুমি?”
“সত্যিকার অর্থে স্ত্রী বানরের প্রতি বিন্দুমাত্র যৌন আবেদন নেই আমার। ওদের কাছে পাওয়ার অনেক সুযোগ এসেছিল কিন্তু কখনো প্রয়োজন মনে করিনি।”

“তাহলে বানর হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রী বানর তোমাকে নাড়া দিতে পারে না?”
“ঠিক তাই। এটা বিব্রতকর, তবে সত্যি বলতে গেলে, আমি শুধু মনুষ্য নারীকেই ভালোবাসতে পারি।”

আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বিয়ারের গ্লাস শেষ করলাম। মুড়মুড়ে স্ন্যাকসের প্যাকেট খুলে এক মুঠ মুখে পুরে নিলাম। “ওটার কারণে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে, তাই না?”
“হ্যাঁ, আসল সমস্যা এটাই। একটা বানর হয়ে নারীসঙ্গ প্রত্যাশা করা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। অধিকন্তু, এটা জেনেটিক্সের বিরুদ্ধে চলে যায়।”

তার চালিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম আমি। বানর তার কানের পাশটাতে জোরে ঘষা দিয়ে শেষে তার কথা চালিয়ে গেল।

“সুতরাং আমাকে অন্যভাবে চেষ্টা করতে হলো নিজের অতৃপ্ত বাসনা মেটাতে।”
“অন্য উপায়ে কীরকম?”

বানরটি গভীরভাবে চিন্তা করল। তার লাল মুখে খানিকটা অন্ধকার নেমে এলো।

“আপনি হয়তো আমাকে বিশ্বাস করবেন না,” বানরটি বলল। “আপনার হয়তো বিশ্বাস হবে না, বলা উচিত। কিন্তু, এক পর্যায়ে আমি যেসব মেয়েদের প্রেম কামনা করতাম তাদের নাম চুরি করতে শুরু করলাম।”
“নাম চুরি?”
“ঠিক তাই। কেন জানি না তবে আমি মনে হয় জন্মগতভাবে এই ধরনের কাজে পারদর্শিতা পেয়েছিলাম। একজনের নাম চুরি করে সেটা আমার নিজের করে নেওয়াতে আমি আনন্দ পাই।”

আমি একটু দ্বিধাবোধ করলাম।

“আমি এটা বুঝছি বলে মনে হচ্ছে না,” আমি বললাম। “তুমি যখন মানুষের নাম চুরি করো তারা কি নামটা চিরতরে হারিয়ে ফেলে?”
“নাহ। তারা নিজেদের নাম হারায় না আমি তাদের নামের একটা অংশ চুরি করি। তবে আমি যখন একটা অংশ নিয়ে ফেলি তখন নামটা আংশিক গুরুত্ব হারায়। যেমন সূর্য যখন মেঘে ঢাকা পড়ে তখন জমিনে তোমার ছায়া কিছুটা কম দৃশ্যমান হয়। নামের অংশ হারানো ব্যক্তিরা হয়তো ক্ষতিটা বুঝতে পারে না, তবে এটা বুঝতে পারে যে তাদের মধ্যে কিছু একটার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।”
“কিন্তু কেউ কেউ ঠিকই বুঝতে পারত, ঠিক না? এই যে তাদের নামের একটা অংশ চুরি হয়েছে?”
“হ্যাঁ, অবশ্যই। মাঝেমধ্যে এদের কেউ কেউ নিজেদের নাম মনে করতে পারত না। চিন্তা করতে পারেন কী একটা বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। এবং তারা নিজেদের নামের যৌক্তিকতা খুঁজে পেত না। মাঝেমধ্যে তারা আত্মপরিচয়হীনতায়ও ভুগত। এবং এর সব দায় আমার, যেহেতু আমিই তাদের নামের অংশসমূহ চুরি করেছি। এজন্য আমি খুবই লজ্জিত। মাঝেমধ্যে বিবেকের দংশনে ক্ষতবিক্ষত হই। এই কাজটা ভুল জেনেও আমি নিজেকে বিরত রাখতে পারি না। আমি আমার দুষ্কর্মকে জায়েজ করতে চাইছি না তবে আমার ভেতর কী যেন একটা কিছু আমাকে কাজটার দিকে তাড়িত করত। ভিতর থেকে কে যেন বলত, ‘যাও, নামটা চুরি করে আনো। এতে অন্যায়ের কিছু নেই’।”


বার্তা২৪.কম-এর শিল্প-সাহিত্য বিভাগে লেখা পাঠানোর ঠিকানা
[email protected]


বানরটাকে বুঝতে চেষ্টা করলাম। ডোপামিন? অবশেষে আমি কথা শুরু করলাম। “তুমি শুধু সেসব নারীদের নাম চুরি করতে যাদের পাওয়ার জন্য তোমার মধ্যে কামনা উদ্রেক হতো। আচ্ছা আমিও কি নাম চুরি করতে পারব?”
“অবশ্যই। আমি যে সে কারো নাম চুরি করি না।”
“তুমি কয়টা নাম চুরি করেছো?”

গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে বানরটি আঙুলের ফাঁকে হিসেব কষল। গোনার সময় সে কিছু একটা আওড়াচ্ছিল। মাথা তুলে তাকিয়ে বলল, “মোট সাতটা। আমি সাতজন নারীর নাম চুরি করেছিলাম।”

এগুলো বেশি না কম ছিল? কে জানে?

“এটা তুমি কিভাবে করো?” আমি জানতে চাইলাম। “তুমি কি আমাকে বলবে?”
“এটা সম্ভব হয় আমার ইচ্ছেশক্তির কারণে। মনোযোগিতার কারণে। কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির নামের সাথে কিছু একটা লেখা থাকা লাগে আমার। একটা আইডিই যথেষ্ট। ড্রাইভিং লাইসেন্স, স্টুডেন্ট আইডি, ইন্সুইরেন্স কার্ড, অথবা পাসপোর্ট। ঐ জাতীয় কিছু। একটা নামট্যাগ হলেও হয়। এ ধরনের একটা প্রকৃত জিনিসের সন্ধান আমার লাগেই। আসলে চুরিই তো একমাত্র লক্ষ্য। আর কেউ একজন ঘরের বাইরে থাকলে আমি তার ঘরে যেকোনোভাবে পিছলে ঢুকে যেতে পারি। তাদের নামাঙ্কিত কোনো কিছু খুঁজে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি।”
“তাহলে তুমি কাঙ্ক্ষিত মহিলার নামাঙ্কিত বস্তুটি ব্যবহার করো, সাথে তোমার ইচ্ছেশক্তি, তার নাম চুরি করার জন্য, তাই না?”
“হ্যাঁ, ঠিক সেটাই করি। আমার সমস্ত আবেগ দিয়ে লেখা নামটার দিকে অনেকক্ষণ ধরে চেয়ে থাকি এবং আমার ভালোবাসার মানুষটাকে নিঙড়ে নিই। এটা সময়সাপেক্ষ এবং এই কাজে শারীরিক ও মানসিক কসরত হয় অনেক বেশি। ব্যাপারটাতে আমি মগ্ন হয়ে যাই এবং যে-কোনোভাবে সেই নারীর একটা অংশ আমার মাঝে মিশে যায়। আমার কামনা, বাসনা, যা অতৃপ্ত রয়ে যেত, তুষ্ট হয় এবং আমি শান্ত হই।”
“তাহলে এখানে শারীরিক কিছু নেই?”

বানর না সূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। “আমি সামান্য একটা বানর, তবে অযাচিত কোনো কিছু আমি করি না। আমি নারীদের নামটা নিজের একটা অংশ হিসেবে নিই—সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট। আমি মানি যে ব্যাপারটা কিছুটা বিকৃত রুচির, কিন্তু এটা অন্যভাবে দেখলে সম্পূর্ণ রুচিসম্মত ও মানবিক প্রেমের অংশ। আমি সেই নামটার প্রতি শুধু ভালোবাসা অনুভব করি নিজের মধ্যে, তাও গোপনে। বাতাস যেভাবে ঘাসের গায়ে দোলা দিয়ে যায়।”
“হুম,” খুশি হয়ে আমি বললাম। “আমার মনে হয় তুমি এটাকে সর্বোত্তম রোমান্টিক ভালোবাসা বলতে পারো।”
“একমত। আবার এটাকে সবচেয়ে মারাত্মক একাকিত্বও বলা যায়। মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ আরকি। দুই তীর কখনো এক হবার নয়।”

এই পর্যায়ে এসে আমার আলাপ থামল, এবং আমি ও বানর দুইজনই নীরবে বিয়ার খেলাম, সাথে কাকিপি আর স্কুইড।

“সম্প্রতি কারো নাম চুরি করেছো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

বানর মাথা নেড়ে জবাব দিল। “নাহ, সম্প্রতি কারো নাম চুরি করিনি। এই শহরে আসার পর থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার যত দোষ আছে পরিহার করার। অবশেষে এই বানরের ছোট আত্মা কিছুটা শান্তির সন্ধান পেয়েছে। ঐ সাত নারীর নাম অন্তরে গেঁথে এখন একটা প্রশান্তির জীবন কাটাচ্ছি।”
“এটা জেনে খুশি হলাম,” আমি বললাম।
“আমার সম্পর্কে এতটুকু জানার পর আপনি কি ভালোবাসা সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চাইবেন?”
“সে অবশ্যই,” আমি বললাম।

বানরটি বেশ কয়েকবার চোখ পিটপিট করে তাকাল। তার চোখের পাতাজোড়া, যা বেশ পুরু, তালপাতার মতো দুলে উঠল। সে গভীর একটা নিঃশ্বাস নিল, যেমনটা একজন দৌড়বিদ লম্বা দৌড়ের আগে নেয়।

“আমি মনে করি বেঁচে থাকার জন্য ভালোবাসার বিকল্প নেই। কোনোদিন সে ভালোবাসা হয়তো ফুরিয়ে যাবে। অথবা এটা অন্যকিছুতে রূপান্তরিত হবে। কিন্তু ভালোবাসা যদিও ফিকে হয়ে আসে, অব্যক্ত রয়ে যায়, তারপরেও কাউকে ভালোবাসার বা কারো প্রেমে পড়ার স্মৃতি নিয়ে আপনি জীবন পার করে দিতে পারবেন। এবং এটা নিজেকে চাঙ্গা রাখার অন্যতম উৎস। সেই উষ্ণতার উৎস ছাড়া একজন ব্যক্তির আত্মা, বা সেটা একটা বানরেরও হতে পারে, পোড়ো ভূমিতে পরিণত হয়। যেখানে একটা আলোকরশ্মি, সুখের বুনোফুল, ও আশার গাছ জন্মানোর সামান্যতম সম্ভাবনা নেই। আমার হৃদয়ে সেই সাত রমণীর স্মৃতি জমা করে রেখেছি।” বানরটি তার বুকের ওপর হাতের তালু রাখল। “এই স্মৃতিটুকু আমি দুঃখদিনে নিজেকে চাঙ্গা রাখার জন্য জমিয়ে রেখেছি।”

বানরটি আবারও মৃদু হাসল এবং হালকা চালে মাথা নাড়ল কয়েকবার।

“এটা এক ধরনের আশ্চর্যজনক ব্যাপার, তাই না?” সে বলল। “ব্যক্তিগত জীবন। তার ওপর আমি একটা বানর, মানুষ না। হে হে!”

রাত এগারোটা তিরিশ মতো বাজল যখন আমরা দুই বোতল বিয়ার পান শেষ করলাম। “আমার এবার ওঠা উচিত,” বানরটি বলল। “আমার এতই ভালো লাগছিল যে আমি মুখের কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। ক্ষমা করবেন।”

“নাহ, গল্পটা আমার বেশ ভালো লেগেছে,” আমি বললাম। ‘বেশ ভালো’ হয়তো যথাযথ মন্তব্য নয় যদিও। আসলে, একটা বানরের সাথে গল্প করা ও একসাথে বসে বিয়ার পান করা ব্যাপারটা অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা। আরো মজার ব্যাপার হলো এই বানর ব্রুকনার পছন্দ করে, মেয়েদের নাম চুরি করে যাদের সে প্রেমে পড়ে বা যাদের দেখলে সে কাম অনুভব করে। আমার জীবনের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ঘটনা এটা। বানরটার আবেগ উসকে দিতে চাইনি তাই আমি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেছি।

বিদায় নেওয়ার সময় বানরটার হাতে এক হাজার ইয়েনের একটা বিল দিলাম বকশিস হিসেবে। “এটা যথেষ্ট নয়,” আমি বললাম। “ভালোমন্দ কিছু কিনে খেয়ো।”

বানরটা প্রথমে অপারগতা প্রকাশ করছিল, তবে আমি জোর করাতে শেষমেশ সে এটা নিতে সম্মত হয়েছিল। সে বিলটা যত্ন করে ভাঁজ করে তার সোয়েটপ্যান্টের পকেটে ভরে নিল।

“আপনি অনেক ভালো,” সে বলল। “আপনি আমার ভুতুড়ে গল্প শুনেছেন, বিয়ার খাইয়েছেন, এবং এখন ভালো আচরণ করলেন। আপনাকে বোঝাতে পারব না আমি কত খুশি হয়েছি।”

বিয়ারের খালি বোতল ও গ্লাসগুলো ট্রেতে তুলে রুমের বাইরে নিয়ে গেল।

পরেরদিন সকালে হোটেল ছেড়ে দিয়ে টোকিওতে ফিরে এলাম। সামনের ডেস্কের রোমাঞ্চকর বুড়ো মানুষটাকে কোথাও দেখা গেল না, নাকের সমস্যাওয়ালা বিড়ালটাকেও না। ডেস্কে বসা ছিল মোটাসোটা মাঝবয়েসী একজন মহিলা। আগের রাতের বিয়ারের বিল দিতে চাইলে মহিলা জানালেন এ ধরনের কোনো দাম বিলের সাথে যুক্ত হয়নি। তিনি জোর দিয়ে বললেন, “আমাদের এখানে বড়জোর বিয়ারের ক্যান পাওয়া যায়। আমরা কখনো বোতলজাত বিয়ার পরিবেশন করি না।”

আমি আবারও দ্বিধান্বিত হলাম। আমার মনে হলো বাস্তবতা ও অবাস্তবতার মাঝামাঝি দোলাচালে দুলছিলাম। কিন্তু আমি এটা নিশ্চিত যে গতরাতে দুই বোতল স্যাপোরো বিয়ার খেয়েছিলাম বানরটার সাথে বসে এবং তার জীবনের গল্প শুনেছিলাম।

মাঝবয়েসী মহিলাকে নিয়ে বানরটাকে খুঁজে আনার সিদ্ধান্ত নিয়ে এবং মত বদলে তা করলাম না। হয়তো বানরটার আসলে কোনো অস্তিত্ব নেই, এবং এটা ভ্রম ছিল, উষ্ণ প্রসবণে বেশিক্ষণ ভেজার কারণে এমনটা হয়েছিল। অথবা আমি হয়তো অদ্ভুত বাস্তবিক স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমি যদি বলতাম যে, “আপনাদের এখানে একটা বয়স্ক বানর চাকরি করে, না?” তাহলে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিতে পারত, আবার এমনও হতে পারত যে ভদ্রমহিলা আমাকে পাগল মনে করতেন। এমনও হতে পারে যে বানরটা তাদের তালিকাভুক্ত কর্মী নয়, এবং হোটেল কতৃপক্ষ তাকে জনসম্মুখে আনতে চাইত না স্বাস্থ্য বিভাগের নিষেধাজ্ঞা বা কর অফিসের বিধিনিষেধের কারণে।

ট্রেনে বাড়ি ফেরার পথে বানর যা যা বলেছিল সেগুলো পুনরায় মনে করার চেষ্টা করলাম। আমি আমার নোট বইয়ে সবিস্তারে লিখে রাখলাম এটা ভেবে যে, টোকিও ফিরে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যাপারটা লিখতে বসব।

বানরটার অস্তিত্ব যদি সত্য হয়ে থাকে—তবে আমি নিশ্চিত না বিয়ারে আসক্ত হয়ে সে যা যা বলেছিল তার কতটুকু আমি বিশ্বাস করব। তার গল্পটার প্রতি ন্যায়বিচার করা আসলেই কঠিন। মেয়েদের নাম চুরি করে নিজের করা নেওয়া ব্যাপারটা কি আদৌ সম্ভব? শীনাগাওয়ার বানরকেই কি ব্যতিক্রমী ক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টিকর্তা তৈরি করেছেন? হতে পারে বানরটা প্যাথোলজিক্যাল মিথ্যুক ছিল। কে জানে? ব্যক্তিগতভাবে আমি এটা কখনো শুনিনি যে, একটা বানর মিথ্যের বেসাতি নিয়ে বেড়ায়। তবে যে বানরটা মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে তার পক্ষে মিথ্যে বলা, তাও আবার শৈল্পিক উপায়ে, খুব সম্ভব।

চাকুরির অংশ হিসেবে আমি অনেক মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম এবং একটা ব্যাপারে ভালোই দক্ষতা অর্জন করেছিলাম। সেটা হলো কাকে বিশ্বাস করা যায়, কাকে যায় না। একজনকে কিছুক্ষণ টানা কথা বলতে শুনে, কিছু সূক্ষ্ম বিষয় বিবেচনা করলে সিদ্ধান্তে আসা যায় লোকটা বিশ্বাসযোগ্য কিনা। বানরের গল্পটা একবারের জন্যেও আমার কাছে বানানো মনে হয়নি। তার বলার ভঙ্গি, চাহনি এবং চোখ দেখে কখনো মনে হয়নি যে, সে কিছু বানিয়ে বলছে বা দু নম্বরি করছে। সর্বোপরি, তার স্বীকারোক্তিতে সে বিন্দুমাত্র অসততা করেনি।

আমার আয়েশের একক যাত্রা শেষে, শহুরে রুটিন জীবনে ফিরে এলাম। বড়সড় কোনো কর্মসূচি না থাকলেও আজকাল কাজকর্ম গুছিয়ে উঠতে আমাকে খানিকটা ব্যাতিব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়। অবশ্যই বয়স হওয়ার কারণেও হতে পারে। মাঝেমধ্যে খুব তাড়াহুড়োয় পড়তে হয়। শীনাগাওয়ার বানরটার কথা কাউকে বলাও হয়নি বা তার সম্পর্কে একটা লাইনও লেখা হয়ে ওঠেনি। আর চেষ্টাই বা কেন করব যদি কেউ বিশ্বাস না করে? আর আমি যদি বানরটার অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রমাণাদি হাজির করতে যাই তাহলে লোকে বলবে এ আবারও পাগলামো শুরু করেছে। এবং আমি যদি বানরটা সম্পর্কে গল্প-উপন্যাস লিখতে যাই সেক্ষেত্রে মূল বিষয়টা ঢাকা পড়ে যাবে।

আমি ভালোমতো কল্পনা করতে পারি সম্পাদক আমার দিকে আঙুল তুলে বলবেন, “আমি জিজ্ঞেস করতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছি যেহেতু আপনি একজন লেখক, কিন্তু লেখাটার থিম কী হতে পারে?”

থিম? বলতে পারছি না আসলে। এটা আসলে একটা বুড়ো বানরের গল্প যে কিনা মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে, যে একটা হোটেলে পিঠ মাজার কাজ কিরে, ঠান্ডা বিয়ার খেতে পছন্দ করে, মনুষ্য নারীদের প্রেমে পড়ে, এবং তাদের নাম চুরি করে। এখানে থিম কী? এই গল্পের শিক্ষণীয় দিক কী?

সময় গড়াতেই সেই উষ্ণ-প্রসবণ শহরের স্মৃতিতে ধুলোর আস্তর পড়তে লাগল। স্মৃতি সে যতই শক্তিশালী হোক না, সময়ের কাছে হারবেই।

কিন্তু, এখন পাঁচ বছর পর, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি সে সম্পর্কে লিখব, তখন নেওয়া নোটগুলো ঘেঁটেঘুটে। কারণ সম্প্রতি এমন কিছু ঘটেছে যা আমাকে সেই পাঁচ বছর আগের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবিত করেছে। ঘটনাটি না ঘটলে এই গল্পটা আর লেখা হতো না।

হোটেল আকাসাকার কফি লাউঞ্জে চাকুরির সাথে জড়িত একটা এপয়েন্টমেন্ট ছিল আমার। যার সাথে মিটিং করেছিলাম তিনি ছিলেন একটা ট্রাভেল ম্যাগাজিনের সম্পাদক। ভদ্রমহিলার বয়স বড়জোর তিরিশ, সুন্দরী, সুন্দর চেহারা ও লম্বা চুল, টানাটানা চোখ ছিল তাঁর। তিনি একজন দক্ষ সম্পাদক। এবং এখনো অবিবাহিতা। আমরা বেশ কয়েকবার একসাথে কাজ করেছিলাম এবং তাঁর কাছাকাছি যাবার সুযোগ হয়েছিল আমার। কাজকর্ম গুছিয়ে আমরা কফি খেতে খেতে কিছুক্ষণ আড্ডা দিতাম।

তাঁর ফোন বেজে উঠল এবং তিনি আমার দিকে অনুনয়ের দৃষ্টিতে তাকালেন। আমি তাঁকে ফোনটা ধরতে বললাম। তিনি ইনকামিং নাম্বার চেক করে কল রিসিভ করলেন। মনে হলো তিনি কোথাও বুকিং দিতে চাইলেন। কোনো হোটেলে, রেস্তোরাঁয় অথবা বিমানে। ঐ জাতীয় কিছু। তিনি কিছুক্ষণ কথা বলার পর, পকেটের প্ল্যান চেকারের দিকে একবার দেখলেন এবং আমার দিকে একবার দ্বিধাগ্রস্ত বা বিপদগ্রস্তের ন্যায় তাকালেন।

হাত দিয়ে ফোন ঢেকে নিচু স্বরে তিনি আমাকে বললেন, “আমি দুঃখিত। এটা একটা অদ্ভুত প্রশ্ন আমি জানি, কিন্তু, আমার নাম কী বলতে পারেন?”

আমি অবাক হলেও যতদূর সম্ভব নিজের স্বাভাবিকতা ধরে রেখে তাঁর পুরো নাম বললাম। তিনি আশ্বস্ত হলেন এবং ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিকে তাঁর নাম জানালেন। কল কেটে দিয়ে তিনি আবারও ক্ষমা চাইলেন।

“বিষয়টা নিয়ে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। হঠাৎ করে আমি আমার নাম মনে করতে পারছিলাম না। আমি খুবই বিব্রত।”
“এটা কি মাঝেমাঝে হয়?” আমি জানতে চাইলাম।

তাঁকে বিব্রত মনে হলো, কিন্তু শেষতক তিনি মাথা নেড়ে সায় দিলেন। “হ্যাঁ, এই কদিনে এটা বারবার হচ্ছে। আমি কোনোভাবেই আমার নাম মনে রাখতে পারছি না, মনে হচ্ছে আমার স্মৃতিভ্রম হচ্ছে অথবা অন্যকিছু।”
“আপনি কি আরো কিছু ভুলে যান? যেমন আপনার জন্মদিন, ফোন নাম্বার বা কার্ডের পিন নাম্বার?”

তিনি মাথা নাড়লেন। “না। না। আমার স্মৃতিশক্তি সবসময় ভালো ছিল। আমার বন্ধুদের সবার জন্মদিনও মুখস্থ বলতে পারি। একবারের জন্যেও কারো নাম ভুলিনি আমি। আর এখন, মাঝেমধ্যে নিজের নাম ভুলে যাই। বুঝতে পারি না দুয়েক মিনিট পর স্মৃতি ফিরে পাই কিন্তু সেই দুই মিনিট খুবই বিব্রতকর এবং আমি ভয় পাই। আমি যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলি। তুমি কি মনে করো এটা আলজেইমারের প্রাথমিক লক্ষণ?”

আমি হাই তুললাম। “চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে বলতে পারব না৷ কিন্তু কবে থেকে নাম ভুলে যেতে শুরু করেছেন?”

তিনি আড়চোখে তাকালেন এবং ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে লাগলেন, “আমার মনে হয় গত পাঁচ বছর আগে থেকে। আমার মনে পড়ছে এটা শুরু হয়েছিল আমি যখন চেরি ব্লজম খেতে গিয়েছিলাম। সেবারই ছিল প্রথম।”
“এটা জিজ্ঞেস করা হয়তো অশোভন হবে, কিন্তু আপনি তখন কিছু হারিয়েছিলেন?” এই ধরেন আইডি কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট বা কোনো ইন্সুইরেন্স কার্ড?”

তিনি ঠোঁট কামড়ে চিন্তা করলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন। “আপনি বলাতে মনে পড়েছে। আমি তখন ড্রাইভিং লাইসেন্স হারিয়ে ফেলেছিলাম। দুপুরের খাওয়ার সময় আমি হ্যান্ডব্যাগ পাশে রেখে পার্ক বেঞ্চে বিশ্রাম করছিলাম। আমি লিপ্সটিক ঠিক করছিলাম। কাজ সেরে দেখলাম আমার ব্যাগ আর নেই। ব্যাপারটা ঘটেছিল আমি কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই। চারপাশে তাকিয়ে কারো পদচিহ্ন দেখিনি। চারিদিকে তাকালাম কিন্তু দেখি আমি একা। পার্কের চারপাশ কোলাহলমুক্ত ছিল এবং চুরি করার জন্য কেউ ঢুকলে আমি নির্ঘাত টের পেতাম।

আমি আরো শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

“কিন্তু ব্যাপারটা পুরোপুরি অদ্ভুত ছিল না। সেই দিন বিকেলে পুলিশ থেকে একটা কল পেলাম, তাঁরা বললেন আমার হাতব্যাগ পাওয়া গেছে। পার্কের পাশে ছোট্ট পুলিশ ফাঁড়ির বাইরে কেউ একজন রেখে গিয়েছিল। নগদ টাকা ও ক্রেডিট কার্ড, এটিএম কার্ড, সেল ফোনসহ সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। শুধু আমার ড্রাইভিং লাইসেন্সটা খোয়া গিয়েছিল। পুলিশ ভদ্রলোক পুরোপুরি বিস্মিত হয়েছিলেন। কে এমন আজগুবি কাজ করতে পারে, নগদ টাকা না নিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্সটা নিয়ে ব্যাগটা পুলিশ স্টেশনের পাশে রেখে যাওয়া?”

আমি নীরবে হাই তুললাম, কিন্তু কিছুই বললাম না।

“এটা ছিল মার্চের শেষের দিককার ঘটনা। ঠিক তখনই সামেজু মোটর যান অফিসে গিয়ে নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করেছিলাম। পুরো ঘটনাটা ছিল ভুতুড়ে, তবে বড় কোনো ক্ষতি সাধিত হয়নি।”
“সামেজু কি শীনাগাওয়াতে?”
“হ্যাঁ, ওখানেই। এটা হিগাশিওতে। আমার কোম্পানি টাকানাওয়াতে, সুতরাং টেক্সি নিয়ে দ্রুতই পৌঁছে যাওয়া যায়,” তিনি বললেন। তিনি আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন। “আপনি কি এসবের কোনো সূত্র খুঁজে পান? আমার নাম ভুলে যাওয়া ও ড্রাইভিং লাইসেন্স হারানোর মধ্যে?”

আমি দ্রুত মাথা নেড়ে সায় দিলাম। আমি শীনাগাওয়ার বানরের গল্পটা পুরোপুরি মনে করতে পারলাম না।

“না, আমি কোনো যোগসূত্র দেখছি না,” আমি বললাম। “আপনার নাম জড়িত থাকায় ব্যাপারটা আমার কেমন যেন লাগছিল।”

তাঁকে খোশ মনে হলো না। হ্যাঁ, আমি জানতাম যে ব্যাপারটা ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু সেই মুহূর্তে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আর ছিল না। “আচ্ছা, সম্প্রতি কোনো বানর দেখেছেন আপনি?”
“বানর?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন। “আপনি প্রাণীর কথা বলছেন?”
“হ্যাঁ, জীবিত বানর,” আমি বললাম।

তিনি মাথা নাড়লেন। “আমার মনে পড়ছে না সর্বশেষ কয় বছর আগে বানর দেখেছি। চিড়িয়াখানায় বা অন্য কোথাও না।”

শীনাগাওয়ার বানরটা কি তার পুরনো কৌশলে ফিরে এসেছিল? অন্য কোনো বানর কি এম.ও. ব্যবহার করে একই অপরাধ করছিল? (কোনো নকল বানর?) নাকি বানর বা অন্যকিছু এই কাজ করছে?

আমি মনে করতে চাই না যে শীনাগাওয়ার সেই বানর তার পুরনো দুষ্কর্ম্মে ফিরে এসেছে। সে বলেছিল সাতজন রমণীর নাম হৃদয়ে গেঁথে সে ভালোই আছে সেই ছোট্ট শহরটাতে। সে-ই আসলেই এটা বলেছিল। তবে এমনও হতে পারে যে, বানরটার কোনো মানসিক সমস্যা আছে যার কারণে সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না। হয়তো তার অসুস্থতা, তার ডোপামিন তাকে বাধ্য করছে সেই কাজটি করতে। এবং হয়তো, সবমিলিয়ে সে তার পুরনো বাজে স্বভাবে আবার ফিরে এসেছিল।

হয়তো আমিও একদিন চেষ্টা করব ব্যাপারটা। নিদ্রাহীন রাতে মাঝেমধ্যে এই চিন্তা আমাকে হানা দেয়। আমি যাদের ভালোবাসি সেই মেয়েদের নাম বসিয়ে, তাদেরকে আমার অংশ হিসেবে ভাবার চেষ্টা করব। কেমন হবে ব্যাপারটা?

না। সেটা কখনো হবে না। আমার হাতের দক্ষতা নেই, এবং চুরি করতে যাওয়া আমার পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব হবে না যদিও এই চুরিটা আইনত অপরাধ হিসেবে গণ্য নয়।

চরম ভালোবাসা, চরম একাকিত্ব। সেই থেকে যখনই ব্রুকনার শুনি তখনই শীনাগাওয়ার বানরটার ব্যক্তিগত জীবন আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বানরটার সাথে দেখা হওয়া, আমার পিঠ মেজে দেওয়া, দেয়ালে হেলান দিয়ে স্ন্যাকস সমেত বিয়ার পান সবকিছু মনে পড়ে।

ট্রাভেল ম্যাগাজিনের সুন্দরী সম্পাদককে আর দেখিনি তখন থেকে, সুতরাং তার ভাগ্যে কী ঘটেছে সেটা আর জানার সুযোগ হয়নি। আশা করি তার বড় কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি নির্দোষ, শেষকথা। তাঁর ব্যাপারটার জন্য আমার আজও মন খারাপ হয়, কিন্তু আমি তাঁকে শীনাগাওয়ার সেই বানরের কথা আজও বলতে পারি না।


পড়ুন  আর্নেস্ট হেমিংওয়ের অগ্রন্থিত গল্প : অনুসৃতিই আনন্দ

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;