স্বাধীনতার ৫০ বছরেও ফরিদপুরে নেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়



আয়াতুল্লাহ মুমেন তাজকির
সন্ধ্যার পরে শহরের সবচেয়ে ব্যস্ততম জায়গা, ফরিদপুরের প্রাণকেন্দ্র, মুজিব সড়ক, ফরিদপুর। ছবি: আয়াতুল্লাহ মুমেন তাজকির

সন্ধ্যার পরে শহরের সবচেয়ে ব্যস্ততম জায়গা, ফরিদপুরের প্রাণকেন্দ্র, মুজিব সড়ক, ফরিদপুর। ছবি: আয়াতুল্লাহ মুমেন তাজকির

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে অবস্থিত ঢাকা বিভাগের একটি জেলা ফরিদপুর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে ফরিদপুর বাংলাদেশের বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে ফরিদপুরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে থাকলেও বাস্তবিক অর্থে সেটা কিছুটা ভিন্ন। ফরিদপুরে মেডিকেল কলেজ, মেরিন একাডেমি ও ফরিদপুর ইঞ্জিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি টাইমস ইউনিভার্সিটি নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু,একটি বৃহৎ জেলা হিসেবে ফরিদপুরে নেই একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। যা জেলাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি।

ফরিদপুরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে এমন কথা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় উত্থাপিত হলেও স্বাধীনতার ৫০ বছর হয়ে গেছে কিন্তু, এখনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ দেখতে পারেনি, এ জেলাসহ আশেপাশের অঞ্চলের লোকজন। আধুনিক ও উচ্চশিক্ষার চাহিদা থাকা সত্বেও দূরত্ব ও যোগাযোগের কারণে এ অঞ্চলের মানুষ উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

নতুন দালান ও ছাত্র হোস্টেল সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ (ডিগ্রি শাখা), ফরিদপুর। স্থাপিত- ১৯১৮ খ্রি.। ছবি: আয়াতুল্লাহ মুমেন তাজকির

ফরিদপুর জেলা প্রতিষ্ঠার পরেই জনসাধারণের শিক্ষার জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়, যেটি বর্তমানে ফরিদপুর জিলা স্কুল নামে বেশ সুপরিচিত। পরবর্তীতে ১৯১৮ সালে অম্বিকা চরণ মজুমদারের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ। সুতরাং বোঝা যায় যে, এ অঞ্চলের মানুষগুলো অনেক আগে থেকেই শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ স্বাধীনতার ৫০ বছরে পার হয়ে গেলেও ফরিদপুরে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়নি। যা এ জেলাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি।

ফরিদপুরের পাশের জেলা গোপালগঞ্জে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও উচ্চশিক্ষার জন্য সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা খুবই জরুরি ছিল। কিন্তু গোপালগঞ্জের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ফরিদপুরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিকল্প হতে পারে না। যাতায়াত বা যোগাযোগের দূরত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার একটি বড় কারণ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। ফরিদপুর থেকে গোপালগঞ্জের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। কুষ্টিয়াতেও একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যা রাজবাড়ী থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এমনকি ফরিদপুর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে বরিশালে রয়েছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রধান তোরণ ফরিদপুর জিলা স্কুল। স্থাপিত- ১৮৪০ খ্রিঃ। ছবি: আয়াতুল্লাহ মুমেন তাজকির

ফরিদপুরের আশেপাশের এলাকা যেমন, সদরপুর, নগরকান্দা, সালথা, বোয়ালমারী, মধুখালী, কামারখালী, গোয়ালন্দ, চরভদ্রাসন, ভাঙ্গা, বালিয়াকান্দা, পাংশা, রাজবাড়ী ইত্যাদি এলাকাসহ মাগুরার একটি বড় অংশের শিক্ষার্থী, যারা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী, তাদের অনেকেই কাছাকাছি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এইসব অঞ্চলের মানুষ ফরিদপুরেও আসে শিক্ষার জন্য। কিন্তু ফরিদপুরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় না থাকা ও দূরত্বের কারণে তারা উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে।

স্বাধীনতার ৫০ বছর অর্থাৎ স্বাধীনতার সুবর্নজয়ন্তী হয়ে গেলো অথচ ফরিদপুরে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো না।

এ বিষয়ে জানতে ফরিদপুরের প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ, প্রফেসর আলতাফ হোসেন সাক্ষাৎকারে বলেন, আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার গৌরবজনক ৫০ বছর পার করছি। সারাদেশ এই স্বাধীনতার জন্য যে উচ্ছ্বাস সেটা উদযাপন করলেও তাতে কিছুটা বাধা সৃষ্টি করছে করোনা মহামারি । স্মৃতিচারণের মাধ্যমে,  মুক্তিযোদ্ধাদের গল্পগাথার মাধ্যমে, বিভিন্ন সাহিত্যে, কবিতায় ও নাটকের মাধ্যমে স্বাধীনতা আনতে গিয়ে আমাদের দেশের লক্ষ প্রাণের যে ত্যাগ সে ত্যাগের কাহিনীগুলো আবার আমাদের সৃতিতে পুনর্জাগরিত হয়েছে। এটি আমাদের সাহসের, অহংকারের এবং গৌরবের একটি অর্জন।

প্রধান তোরণ সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, (ডিগ্রি শাখা) ফরিদপুর। স্থাপিত- ১৯১৮ খ্রি.। ছবি- আয়াতুল্লাহ মুমেন তাজকির

ফরিদপুর শহরে বিভিন্নভাবে স্বাধীনতার সুবর্নজয়ন্তী পালন করা হয়েছে কিন্তু সত্যিকারপক্ষে যে ধরণের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন প্রয়োজন সে দিকে মনোযোগের ঘাটতি ছিলো। যার কারণে প্রত্যাশিত সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত প্রসারতা তিনি দেখতে পাচ্ছেন না বলে জানান।

তিনি আরো বলেন, বহুদিন যাবত ফরিদপুরবাসীর অনেকগুলো প্রত্যাশার মধ্যে একটি ছিলো একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া রাজেন্দ্র কলেজে উচ্চতর শিক্ষা সংযোজিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু যে সমস্ত আধুনিক বিষয়গুলো রয়েছে সেগুলো নিয়মের কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকার কারণে এই বিষয়গুলো পড়ার সুযোগ শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হলে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মি্লিয়ে তার পাঠ্যক্রম প্রয়োগ করা যায় বলে তিনি জানান, যেটি একটি পুরাতন কলেজে সম্ভব হয় না। ফরিদপুরসহ আশেপাশের অঞ্চলগুলোর কথা উল্লেখ করে তিনি জানান এখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যথার্ত যুক্তি রয়েছে।

একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি দাবি করেন, ফরিদপুরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, যাতে করে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, অভিভাবকরা তাদের সন্তানদেরকে উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারেন।

পুরাতন দালান সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, (ডিগ্রি শাখা) ফরিদপুর। স্থাপিত- ১৯১৮ খ্রিঃ। ছবি: আয়াতুল্লাহ মুমেন তাজকির

প্রবীণ শিক্ষাবিদ ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের সাবেক শিক্ষক, অধ্যাপক এম এ সামাদ সাক্ষাৎকারে বলেন, সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিভিন্ন ফোরামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী উত্থাপন করেছেন। স্থানীয় ব্যক্তিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরাও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছেন এবং তারা আশা করছেন ফরিদপুরে দ্রুত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি অবগত আছেন যে, প্রধানমন্ত্রী ফরিদপুরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে সম্মত আছেন।

এ বিষয়ে কথা হয় যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর এ বি এম আব্দুস সাত্তার এর সাথে । তিনি বলেন, ফরিদপুর একটি বিভাগিয় শহর ঘোষণা না হলেও যে কাজ হয়েছে তাতে ফরিদপুর বিভাগিয় শহরের ঘোষনার অপেক্ষায় আছে মাত্র, এবং ফরিদপুরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়াটা সময়ের দাবি ও সকলের দাবি বলে জানান প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ।

আয়াতুল্লাহ মুমেন তাজকির, শিক্ষার্থী মিডিয়া স্টাডিজ এন্ড জার্নালিজম, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)।