করোনাকালীন অনলাইনে শিক্ষা নিয়ে বিডিইউ’র সমীক্ষা

ক্যাম্পাস ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিডিইউ) লোগো

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিডিইউ) লোগো

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে স্থবির দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রেখেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিডিইউ)। অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার সুযোগ এবং সম্ভাবনার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিডিইউ প্রতিষ্ঠা করেছে দেশের প্রথম ইনস্টিটিউট ফর অনলাইন এন্ড ডিজিটাল লার্নিং।

অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো জোরদার করতে বিডিইউ সম্প্রতি সোয়াট এনালাইসিস নামে এক সমীক্ষা চালিয়েছে। মান নির্ধারন এবং মান উন্নয়নের জন্য এটি বিশ্বব্যাপী বহুল প্রচলিত একটি মাধ্যম। এ পর্যালোচনা সমীক্ষার আওতায় শিক্ষক এবং ছাত্রদের মতামত গ্রহণের মাধ্যমে বিডিইউ অনলাইন শিক্ষার শক্তিশালী ও দুর্বল দিক, সুযোগ এবং ঝুঁকি চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষক এবং ছাত্র মনে করেন তাদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হচ্ছে কার্যকর অনলাইন শিক্ষা প্রণয়নে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের সর্বাত্মক সহযোগিতা। সঠিক কর্মসূচি গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নে উপাচার্যসহ উচ্চতর কতৃপক্ষের যথাযথ নির্দেশনা এবং উৎসাহ প্রদান হচ্ছে সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। শিক্ষকরা যদি প্রশিক্ষিত থাকে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনলাইন শিক্ষায় খরচ কম হয়। অনলাইনে শিক্ষা প্রদান এবং গ্রহণে শিক্ষক এবং ছাত্রদের ব্যাপক আগ্রহ এবং উদ্দীপনা বিডিইউ’র অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের সফলতার অন্যতম কারণ। সেই সাথে অনলাইন শিক্ষা প্রদানে যে প্রযুক্তি এবং সফটওয়্যার প্রয়োজন তা ব্যবহারে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের পারদর্শিতাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।

শিক্ষার্থীদের ৯০ শতাংশই নিয়মিত অনলাইন ক্লাসে অংশ নিয়েছে। গ্রুপ ওয়ার্ক, প্রেজেন্টেশন এবং অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেয়ার মত কাজগুলোও তারা সম্পন্ন করেছে। তাই শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণও প্রশংসিত হয়েছে।

অনলাইন শিক্ষার সুবিধা তুলে ধরে সমীক্ষায় বলা হয়, শিক্ষার্থীরা যেকোন জায়গা থেকে তাদের গ্যাজেটগুলি ব্যবহার করে ক্লাসে যোগ দিতে পারে। তার মানে তারা যেকোন জায়গা থেকে যেকোন সময় শিখতে পারে। এমনকি যদি কেউ ক্লাসে যোগ দিতে না পারে তবুও সে কোর্স শিক্ষকের দেয়া লেকচার রেকর্ড এবং শিক্ষার অন্যান্য উপকরণ থেকে শিখে নিতে পারে, যা মুখোমুখি ক্লাসে সম্ভব নয়। অনলাইন ক্লাস পরিচালনাও কম ব্যয়বহুল।

প্রযুক্তিগত এবং অবকাঠামোগত সম্পদও অনলাইন ক্লাস পরিচালনায় বিডিইউ’র সাফল্যের পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে বিডিইউ। বিশ্ববিদ্যালয়টি সকল শিক্ষার্থী এবং অনুষদের জন্য কাস্টমাইজড এবং সুগঠিত লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ভার্চুয়াল মেশিন (ভিএম) দিয়ে সজ্জিত। শিক্ষার্থীরা যেকোন জায়গা থেকে তাদের ভিএম অ্যাক্সেস করতে পারে। ক্যাম্পাস থেকে অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করার জন্য বিডিইউ’র অন্যতম সেরা হাতিয়ার স্মার্ট বোর্ড। সব ছাত্রকে দেয়া হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ইমেল।

বিডিইউর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর বলেন, 'কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে দীর্ঘ এই বন্ধে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারে। তাই অনলাইন ক্লাস তাদের যথাসময়ে কোর্স সম্পন্ন করতে এবং তাদেরকে সঠিক পথে রাখতে সহায়তা করতে পারে। এর ফলে তাদের সেশন জটে সময় হারাতে হবে না। যেহেতু বিডিইউ’র ক্লাসগুলি নিয়মিতভাবে পরিচালিত হয়, আমরা সময়মতো আমাদের সেমিস্টার শেষ করতে পারি। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এই মহামারী চলাকালীন সময়কে কাজে লাগিয়ে সঠিক পথে চলেছে।'

সমীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়টির অনলাইন শিক্ষার কিছু দুর্বল দিকও ফুটে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফুল টাইম সিনিয়র শিক্ষক বা অধ্যাপক, অপর্যাপ্ত লার্নিং ডিজাইনার এবং লার্নিং টেকনোলজিস্টের অভাব। তাছাড়া ভার্চুয়াল মেশিনের প্রায়শই সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ এবং ওয়েবক্যাম সুবিধার অভাব, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য পোর্টেবল ডিভাইসের অভাব (ল্যাপটপ, ট্যাব ইত্যাদি), রিয়েল-টাইম পরিবেশের অভাব, কার্যকর সফটওয়্যারের অভাব, ছোট ও ভাড়া নেওয়া ক্যাম্পাস এবং অপ্রতুল গ্রন্থাগারের সুবিধার মত বিষয়গুলোর জন্য শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংস্থার সাথে সহযোগিতার অভাবকেও দুর্বলতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাছাড়া উচ্চ ইন্টারনেট ব্যয়, কম ইন্টারনেটের গতি এবং ঘন ঘন ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নতার মতো কিছু বাহ্যিক দুর্বলতাও অনলাইন শিক্ষা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

নিত্যনতুন প্রযুক্তি এবং বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নেয়ার মানসিকতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিছু শিক্ষার্থী মুখোমুখি ক্লাস ভালো বলে মনে করে। তাই শিক্ষার্থীর মানসিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও অনলাইন শিক্ষার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। পর্যালোচনায় অনলাইন শিক্ষার অপার সম্ভাবনা এবং সুযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অনলাইন ডিগ্রি বা কোর্স চালু করা যেখানে বিডিইউ অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।

এক্ষেত্রে সরকার এবং ইউজিসির নানামুখী সমর্থন এবং সহযোগিতা আশা করা হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা (অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ক্রয় করে অনলাইনে ক্লাস করা কষ্টকর হয়ে পড়ছে), বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব, এবং অন্যান্য সরঞ্জাম সমৃদ্ধ করা, এবং অনলাইন ক্লাস বা দূরবর্তী শিক্ষন (বিনামূল্যে) পরিচালনায় সহায়তা। পাশাপাশি বিডিইউ অনলাইন শিক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়কে সহায়তা করতে পারে। যদিও এক্ষেত্রে গতানুগতিক মানসিকতাকে ঝুঁকি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখনও অনলাইন ক্লাস, কোর্স এবং সনদকে যাথাযথ গুরুত্ব দেয় না। তাই শিক্ষার্থী এবং অভিভাকদের মানসিকতা পরিবর্তন করা বিডিইউ’র জন্য বড় একটি চ্যালেজ্ঞ।

কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা রয়েছে যা কর্তৃপক্ষের অবহেলা করা উচিত নয়। যার মধ্যে রয়েছে অনেক শিক্ষার্থীর উচ্চতর ব্যান্ডউইথ বা শক্তিশালী ইন্টারনেট সুবিধা নেই যা অনলাইন ক্লাস পরিচালনার জন্য প্রয়োজন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। অনলাইন ক্লাসগুলি কিছু নির্দিষ্ট কোর্সের জন্য কিছু সমস্যা তৈরি করতে পারে যেমন ল্যাব কোর্সেও জন্য যেখান ব্যবহারিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

বিডিইউ’র উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর বলেন, 'সামগ্রিকভাবে, অনলাইনে ক্লাস পরিচালনার মাধ্যমে আমরা, অনুষদ সদস্যরা বর্তমান প্রযুক্তি বিভিন্ন দিক সম্পর্কে শিখেছি। কিছু চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, অনলাইন ক্লাস সত্যিই অসাধারণ সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। যারা আর্থিক অবস্থার কারণে বা সীমিত পরিমাণ আসনের কারণে স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে বা ডিগ্রি অর্জন করতে পারে না তারা এ সুযোগ নিতে পারে। আমাদের সীমিত আসন থাকলেও আমরা ভবিষ্যতে তাদের মতো আরও শিক্ষার্থীদের জড়িত করতে পারি।'

তিনি আরো বলেন, 'অনলাইন এবং ডিজিটাল শিক্ষার ক্ষেত্রে যেকোন অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে এবং উচ্চ শিক্ষা খাতকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ক্লাস পরিচালনার জন্য যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করছে আমরা যদি তা গ্রহণ করতে পারি তবে আমি আশা করি, বিডিইউ বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।'

আপনার মতামত লিখুন :