কেন তৈরি হয় অপরাধের লাভজনক সিন্ডিকেট?

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

লাভের সামান্য গন্ধ পাওয়া গেলেই সিন্ডিকেট তৈরি করে লুটপাট করার প্রবণতা বাংলাদেশের এক অতি চেনা সাধারণ চিত্র। বাসস্ট্যান্ড, বাজার ব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিষেবা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই তলে তলে কাজ করছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যখন যে ব্যবসা চাঙ্গা হয়, সেখানেই তীব্র হয় সিন্ডিকেট।

রমজানের আগে কাঁচাবাজার আর কোরবানির আগে চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সিন্ডিকেট কত রকমের কারসাজি করে ও মানুষের টাকাপয়সা হাতিয়ে দুর্ভোগ সৃষ্টি করে, তা কারো অজানা নয়। পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ ইত্যাদিও রেহাই পায় না লোভী সিন্ডিকেটের লোলুপ-করাল গ্রাস থেকে।

অধুনা করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারি আকারে ছড়িয়ে গেলে সিন্ডিকেট প্রবলভাবে তৎপর হয়। শাহেদ-সাবরিনা ধরা পড়লেও অধরা বহু রাঘববোয়াল। করোনা চিকিৎসার নামে যথাযথ অনুমতি ও নিয়মনীতি না মেনে কাজ করছে বহু হাসপাতাল এবং মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে রোগীদের কাছ থেকে। মিথ্যা সার্টিফিকেট দিয়ে ব্যক্তিগত ও জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।

শাহেদ-সাবরিনা বিষয়ক চরম দুর্নীতির ঘটনা অনুসন্ধানকালে বহু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য এসেছে। এমনকি, এদের পাশে সমাজের ‘বিবেক নামে পরিচিত’ (!) অনেক গুণধরকেও দেখা গেছে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মতোই শিক্ষা, বিশেষত উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি। যোগ্য শিক্ষক, পরিকাঠামো, মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত না করেই সার্টিফিকেট বিক্রি করছে বহু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারের নির্দেশ ও পালনীয় নিয়ম মানতেও বাধ্য হচ্ছে না তারা।

বহু ভোগ্যপণ্য ও সেবা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, যারা পুরো বিষয়গুলো নিজেদের মতো নিয়ন্ত্রণ করে। সরকার ও ভোক্তা জনগণকে বাধ্য করে অধিক দামে মানহীন বা নিম্নমানের দ্রব্য কিনতে।

প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট, গোপন সিন্ডিকেট ইত্যাদি বিভিন্ন নামে ও অবয়বে অপরাধ ও লুটপাটের যে অপধারা বিভিন্ন সেক্টরে চলছে, তাতে হাজার কোটি টাকা পাবলিকের পকেট থেকে লোপাট করা হয়। কিন্তু সেই টাকা ট্যাক্স হিসেবে সরকারি খাতে জমা হয় না, চলে যায় কতিপয় মাফিয়ার পকেটে।

শুধু ঢাকা বা বড় বড় শহর নয়, জেলা শহর ও মফস্বলেও নানা ধরনের সিন্ডিকেট জাল বিস্তার করেছে। সরকার ও জনগণের মাঝখানে সিন্ডিকেট নামের এই মধ্যসত্ত্বভোগী মাফিয়ারা শাঁখের করাতের মতো দুইদিকে কাটছে। একদিকে, সরকারের জনবান্ধব নীতি ও কর্মসূচিকে কলঙ্কিত করছে আর অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অর্থ ছিনিয়ে নিয়ে শত দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে।

ফলে একটি-দুইটি শাহেদ-সাবরিনা ইস্যুকে নিয়ে চমকিত ও উচ্চকিত না হয়ে সমস্যাটির গভীরে গিয়ে ভাবনা-চিন্তা করা জরুরি। কেন তৈরি হয় অপরাধের লাভজনক সিন্ডিকেট, জানা দরকার এই সরল-সোজা প্রশ্নের উত্তর।

প্রশ্নটি আপাত সরল-সহজ ও সোজা হলেও সঠিক উত্তরটি এক কথায় দেওয়া যাবে না। বহুমাত্রিক ও বহু স্তর বিশিষ্ট সমস্যার উত্তর এক কথায় হয় না। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রের গলদ ও ফাঁকফোকর তলিয়ে তবেই উত্তর বের করতে হয়।

তবে, এর উত্তর সাধারণ মানুষের জানা যত জরুরি, তারচেয়ে বেশি জরুরি সরকারের জন্য। সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব এড়িয়ে কেমন করে অবাধে তৈরি হচ্ছে অপরাধের লাভজনক সিন্ডিকেট, তা নিজের স্বার্থেই সরকারকে খুঁজে বের করে জানতে হবে। নচেৎ ইত্যাকার সিন্ডিকেট অক্টোপাসের মতো দশ হাতে গলা টিপে সরকারের যাবতীয় জনমুখী-সুকীর্তি হত্যা করবে।

সুশাসন ও গণমুখী ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করতে এহেন সিন্ডিকেট নামের দুষ্টচক্রকে চিরতরে নির্মূল করতেই হবে। সিন্ডিকেট গড়ার পরিবেশকে এবং সহযোগীদেরও হটিয়ে দিতে হবে। এই কাজ যত তাড়াতাড়ি করা হবে, তত তাড়াতাড়ি জনদুর্ভোগ কমে সরকারের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হবে এবং সরকারের কার্যক্রম আরো গতিশীল ও জনবান্ধব হয়ে আপামর মানুষকে সিন্ডিকেট নামক উপদ্রবের কবল থেকে মুক্ত করে স্বস্তি ও শান্তি দেবে।

আপনার মতামত লিখুন :