থাইল্যান্ডে গণতন্ত্রকামীদের বিদ্রোহ

মো. হাসান তারেক
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিগত কয়েক মাস ধরে থাইল্যান্ডে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও গণতন্ত্রের দাবিতে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ জনগণ আন্দোলন করে আসছে। মাঝখানে করোনাভাইরাসের অত্যাধিক সংক্রমণের কারণে আন্দোলনে কিছুটা বিরতি দিয়েছিল তারা। তবে, আবার নতুন করে গণতন্ত্রকামীরা থাইল্যান্ডের রাজধানীতে একত্রিত হতে শুরু করেছে। গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন থাইল্যান্ডে নতুন কিছু নয়। নিয়ত সামরিক অভ্যুত্থানের দরুন থাইল্যান্ডে কার্যকর গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত থাইল্যান্ডে দ্বাদশ সামরিক অভ্যুত্থানের মত ঘটনা ঘটেছে।  ১৯৪৮ সাল থেকে গণতন্ত্রের জন্য শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছে। গণতন্ত্রের উত্থান-পতন এখানে যেন এক অতি সাধারণ ঘটনায় অবর্তীণ হয়েছে।

তবে, চোখে পড়ার মত যে পরিবর্তন এখন থাইল্যান্ডে দেখা যাচ্ছে তা হলো রাজা ভূমিবলের মৃত্যুর পর সাধারণ জনগণ বর্তমান রাজা মাহাভাজিরালংকনের বিরোধিতায় এখন সোচ্চার।

১৯৩২ সালে পরম রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল থাইল্যান্ডে। সেসময়, থেকে থাইল্যান্ডে রাজা হচ্ছেন জাতীয় পরিচয় ও ঐক্যের প্রতীক। রাজাকে নিয়ে কটুকথা বললে, থাইল্যান্ডে ১৫ বছরের কারাদণ্ডের মত বিধান রয়েছে। কিন্তু, ২০১৬ সালে রাজা ভূমিবলের মৃত্যুর পর থেকে জনগণের মনে রাজার জন্য শ্রদ্ধায় কমতি দেখা যাচ্ছে। পিছনে কিছু যৌক্তিক কারণও রয়েছে, প্রচলিত আছে যে বর্তমান রাজা বিদেশে সব সময় থাকেন এবং তার সম্পদের বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাছাড়া, রাজা ভূমিবল যেভাবে জনগণের সাথে শাসনবিভাগের নানা বিরোধ মিটিয়ে শান্তি আনয়ন করতে পারতেন, বর্তমান রাজা সেরুপ সম্মোহনী শক্তির অধিকারী নন। বর্তমান সামরিক শাসক প্রায়ুতের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা বরং হতাশ করেছে সাধারণ জনগণকে। জনগণের  আস্হা হারিয়েছে রাজা ও বর্তমান সামরিক শাসক। যার ফলে, গত আগষ্ট মাস থেকে থাম্মাসাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থার সংস্কারের দাবি নিয়ে আন্দোলনের ডাক দেয়। থাম্মাসাত বিশ্ববিদ্যালয় যা ঐতিহাসিক সিয়ামীয় বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আধুনিক থাইল্যান্ডের প্রত্যাশায় সেই বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক পরিবর্তন আন্দোলনের বাতিঘরে পরিণত হয়েছে।

১৯৭০ সালের পর থেকে গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন জোরালো হয়েছে। ১৯৮০ সালে এসে গণতন্ত্র কিছুটা আলোর মুখ দেখেছিল। এ সময়ে থাইল্যান্ডের শাসক প্রেমটিন সুলানন্দা সংসদীয় রাজনীতির পুনরুদ্ধার করেছিলেন। কিন্তু,১৯৯১-১৯৯৯ সালে এসে থাইল্যান্ডে আবার সামরিক শাসন জারি করা হয়। গণতন্ত্র আবার পথ হারায়।

২০০১ সালে থাকসিন সিনায়াত্রার থাই রাক থাই পার্টি ক্ষমতা আসলে গণতন্ত্র দিশা পায়। থাকসিন সিনায়াত্রা ও তার বোন ইংলাক সিনায়াত্রার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতায় আসে সামরিক শাসক প্রায়ুত চান- ও-চা। সামরিক শাসক প্রায়ুত চান-ও-চা ক্ষমতায় আসার পর জনগণের দাবি-দাওয়াগুলো গুরুত্বহীন হয়ে যায়। একারণে, থাম্মাসাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ বিদ্রোহীগণ গণতন্ত্রের দাবিতে নতুন এই আন্দোলন শুরু করেছে।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশায় বিদ্রোহীকারীগণ তিনটি দাবি তুলেছে,  প্রথমত, পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিতে হবে। কেননা, এই সংসদের ২৫০ জন সদস্য প্রায়ুত - চান-ও-চায়ের সামরিক বাহিনীর দ্বারা নির্ধারিত।

দ্বিতীয়ত, সামরিক বাহিনীর দ্বারা সংশোধিত সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে।

তৃতীয়ত, ভিন্নমতাবলম্বীদের ভীতি প্রদর্শন বদ্ধ করতে হবে।

এই সকল দাবি আদায়ের উদ্দেশ্য নতুন করে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছে। বিদ্রোহীকারীগণ আশা করছেন, এই সকল দাবি আদায়ের মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক পরিবর্তন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে শ্যামদেশ থাইল্যান্ডে।  তবে, আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে না প্রায়ুত- চান-ও -চায়ের সরকার এত সহজে মেনে নিবে। এশিয়ান রিভিউয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে থাইল্যান্ড সরকার এই আন্দোলনের গতিরোধের জন্য দুই হাজারের মত ওয়েবসাইট বন্ধের চেষ্টা করছে।  এখন দেখার বিষয়, গণতন্ত্রকামীগণ কত বেশি সুসংগঠিত হয়ে এই আন্দোলন পরিচালনা করে বিজয় নিশ্চিত করতে পারে কি না? তবে, গণতন্ত্রের যে টেউ থাইল্যান্ডে লেগেছে তার জয় একদিন এই তরুণ সমাজ সুনিশ্চিত করবেই।

লেখক: মো. হাসান তারেক, প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,  ডক্টর মালিকা কলেজ, ঢাকা।