সংরক্ষিত আসনের সাংসদগণ, ধর্ষণরোধে আপনাদের সহায়তা প্রয়োজন



ড. হেলাল মহিউদ্দীন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সরকারে থাকা দলের ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের একাংশ ছাত্র না হয়ে গুণ্ডা হয়, ধর্ষক হয়, ডাকাত হয়। কেন হয়? পেশির কারণে। পেশি বা ইংরেজি ‘মাসল’ মানে শুধুই কি গায়ের জোর? না,  মোটেই তা নয়। এই ‘মাসল’এর অর্থ ক্ষমতার জোর। দল ক্ষমতায়, ফলে ‘যা ইচ্ছে তাই করে পার পেয়ে যাওয়া যাবে’ বিশ্বাসের জোর। সিনিয়র নেতারা যাঁরা ছাত্রদের স্বীয় স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যবহার করেন, তাঁদের আস্কারা ও মদদের জোর। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরব থাকার জোর।

বেপরোয়াপনা ও ‘মাসল পাওয়ার’এর আরো নেপথ্য কারণ আছে। তালিকা লম্বা করে লাভ নেই। ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের ধর্ষণকাণ্ড লিখতে গেলে কয়েক খন্ড গ্রন্থ রচিত হয়ে যাবে। ধর্ষণকাণ্ডের অধিকাংশই খবরে আসে না। ধর্ষিতা ভয়েই ঘটনা প্রকাশ করে না। ছিঁটেফোটা যে দুয়েকটি খবর হয়, সেগুলোর কয়েকটির কথা বলা যাক।    

সিলেটের এমসি কলেজে গণধর্ষণের ঘটনায় এক-দুইজন নয়, নয়জন জড়িত। কতোটা সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধচক্র হএল এমনটি হওয়া সম্ভব? উল্লেখ্য পত্রিকায় খবর হয়েছে, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা ধর্ষকদের পক্ষ নিয়ে আপোস রফা করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কেন? সরাসরি পুলিশের হাতে ধর্ষকদের তুলে দেওয়াই কি তাদের নৈতিক দায়িত্ব ছিল না? অর্থাৎ, ধর্ষকদের মুরুব্বিদের পরোক্ষ ধর্ষক বা ধর্ষণে প্ররোচক বললে ভুল বলা হয় না।

১৯৯৩ সালের ঘটনা। ছাত্রদল নেতা সীমান্ত, মিতুল ও জাপানসহ কয়েকজন মিলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের এক ছাত্রীকে তুলে জঙ্গলে নিয়ে গণধর্ষণ করে। সেই সময়ের তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার লজ্জা বা গ্লানি হয়নি সম্ভবত। হলে কীভাবে ছাত্রীর বাবাকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ডেকে সমঝোতা করে দিতে পারলেন? ওই ছাত্রীর প্রথম হত্যাকাণ্ড সেখানেই ঘটে যায়নি কি? আর কোনোদিন ক্যাম্পাসে ফিরেনি ছাত্রীটি। ছাত্রীর বাবার কাঁদতে কাঁদতে ক্যাম্পাস চত্বর ছেড়ে যাবার ছবি দেখেই আমাদের দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে হয়েছিল।

সেই একই ধর্ষক আবারো ১৯৯৫ সালে আরেক ছাত্রীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে।ধর্ষকটির কিন্তু কোনো  বিচার হয়নি। ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন মানিক ধর্ষণের সেঞ্চুরির ঘোষণা দেয়।  সেই ঘটনায় দেশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিবাদ উত্তালও হয়ে ওঠে।  ২০০০ সালে থার্টি ফাস্ট নাইটে একদল ছাত্রনেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বাঁধন নামে এক ছাত্রীকে লাঞ্ছিত করে। সেবারও তাদের অপরাধে শাস্তি মেলে ছাত্রীদেরই। থার্টি ফাস্ট নাইটে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ২০১৭ সালে মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের  এক ছাত্রলীগ নেত্রী নিজ সংগঠনের সভাপতি দ্বারা ধর্ষিতা হবার ঘটনা প্রকাশ করে দেন।

এবার একটি দরকারি প্রসঙ্গে কথা বলা যাক।

বাংলাদেশের সংসদে সংরক্ষিত আসনের নারী কোটার উদ্দেশ্য তাঁদের সুখ-সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করা ছিল না। ধারণা করা হয়েছিল যে তাঁরা লাঞ্চিত-বঞ্চিত নারীদের মুখপত্র হয়ে ওঠবেন। সেই অর্থে প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনায় তাঁদের গর্জে ওঠার কথা। নিজ দলের কর্মীদের ধর্ষণ ঘটনায় দ্বিগুণ-বহুগুণ প্রতিবাদী হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু কারা সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন চাইছেন সেটি আমলে নেওয়া দরকার। পাপিয়া, লুপা তালুকদার, সাবরিনা ইত্যাদি নামের নারীদের কুকীর্তি জানার পাশাপাশি সংরক্ষিত আসন লাভের জন্য তাদের চেষ্টার খবর পত্রপত্রিকাতেই এসেছে। 

সে যা-ই হোক, সংরক্ষিত আসনে অনেক সুপরিচিত ও নামকরা নারীরাও আছেন। একটি দল আছে যাঁরা আসনগুলো পাবার আগে ধর্ষণবিরোধিতায়, নারী-নির্যাতনবিরোধিতায় উচ্চকন্ঠ থেকে এনজিও-নেতৃত্বে, অভিনয়, শিল্পকলা, শিক্ষা-সমাজ-সংস্কার ইত্যাদির নেতৃত্বে ছিলেন। তাঁদের দলের কর্মীদের এক্কেটি ধর্ষণকান্ডের পর তাঁদের ন্যুনতম নৈতিকতাটুকুর পরীক্ষা শুরু। আমরা এই আশায় বুক বেঁধে খবরের পাতায় চোখ রাখি যে তাঁরা অন্তত তাঁদের নৈতিক দায়টি মেটাবেন। এমসি কলেজের ধর্ষণ ঘটনায় তাঁদের প্রতিক্রিয়া কী? কর্মসূচি কী কী? এমনও আশা করা যায় যে তাঁদের কেউ কেউ প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিতে যাবেন। এইরকম অপরাধের প্রতিবাদে অন্তত দুই-একজন কি নৈতিক দায় হতে পদত্যাগের কথা ভেবেছেন? সম্ভবত ‘না’। তাঁদের দলের পুরুষ নেতারা ধর্ষকদের রক্ষায় আপ্রাণ আপোসের চেষ্টা করেছে। এই সুযোগে ধর্ষকেরা পগাড় পার! এই গ্লানিকর বোধই কি তাদের প্রতিবাদমূখর হবার জন্য, পদত্যাগের ঘোষণা দেবার জন্য যথেষ্ঠ নয়?

ন্যুনতম নৈতিকতাবোধ থাকলে তাঁরা নিজেদের সেই নারীটির জায়গায় ভাবতে বাধ্য হবেন। অনুভব করতে বাধ্য হবেন ধর্ষিতা নারীটির কষ্ট। ভাবতে বাধ্য হবেন যে তাঁদের দলের নেতারাই তাঁদের নির্যাতিত শরীরে ওপর দাঁড়িয়ে ধর্ষকদের রক্ষায় আপোস মীমাংসায় গলদঘর্ম হচ্ছেন!

তিন-চারদিন আগে ধর্ষণ সংক্রান্ত একটি ফেসবুক পোস্ট দিয়েছিলাম। একজন আমাকে বলেছিলেন—সহজে বলেন তো এই সমস্যার সমাধান কী আদৌ সম্ভব, কীভাবে সম্ভব?

বলেছিলাম—এক) ধর্ষকদের গায়ের রাজনীতির পোশাকটি (পরিচিতি) সরিয়ে ফেলুন, বা পরতে দিবেন না। ধর্ষণের সংখ্যা ৯০ভাগ কমে যাবে। ১০০টি হতে সোজা ১০-এ নেমে আসবে। দুই) ইম্পিউনিটি, “আমি ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকব, ক্ষমতাবলয়ের সঙ্গে আমার সংযোগ আছে” এই ভাবনা ভাবার সুযোগ বন্ধ করে দিন। আরো ৫টি ধর্ষণ বন্ধ হবে। তিন) নারীরা রাজনীতির সুবিধাভোগী হয়ে এই দুই শ্রেণির দুষ্কর্মে নিরব থাকবে না নিশ্চিত করুন, আরো ৪টি ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে। চার) বাকি যে ১ ভাগ ধর্ষক, ধরা যাক হ্যাবিচ্যুয়াল রেইপিস্ট বা স্বভাবগত যৌন অপরাধী, তারা দুষ্কর্মের সঙ্গেসঙ্গেই ধরা পড়বে। এমনকি আক্রান্ত নারীরাই তাদের কাবু করে ফেলতে পারবে [যদি তাঁদের আস্থা জন্মায় যে দেশের মানুষ রাজনীতিকে ব্যবহারকারী গুন্ডাদের আর ভয় পাচ্ছে না]।

দেশজুড়ে আম-জনগণ এই দম বন্ধ করা ভীতিকর পিশাচাক্রান্ত সময় হতে মুক্তি চাইছে। সরকারদলীয় এবং ক্ষমতাবলয়ের নারীদের নৈতিক দায় হতে শুরু করা যে কোনো প্রতিবাদ মানুষকে সাহসী করতে পারত। ধর্ষকের দলীয় পরিচয় ছাপিয়ে ধর্ষককে ধর্ষক হিসেবেই চিনত, এবং প্রতিরোধে এগিয়ে আসত। 

ড. হেলাল মহিউদ্দীন, অধ্যাপক, সেন্টার ফর পীস স্টাডিজ ও রাজনীতিবজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।