রিফাত হত্যা, মিন্নি ও কিশোর গ্যাং



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবিঃ বার্তা২৪.কম

ছবিঃ বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

২৬ জুন, ২০১৯ সাল। একটি হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর খবর ও ভিডিও আলোড়িত করে সমগ্র দেশ। বরগুনার কিশোর গ্যাং বন্ড বাহিনীর হাতে খুন হয় শাহনেওয়াজ রিফাত (রিফাত শরীফ)।

সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিতে দেখা যায় সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীসহ তাদের অনুসারীরা। সিসি টিভি ফুটেজে আরো দেখা যায়, রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি এ সময় প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন রিফাতকে বাঁচানোর। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে রিফাতকে বরগুনা সদর জেনারেল হাসপাতালে ও পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই দিন বিকালেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন রিফাত।

নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়, যাতে ৫-৬ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।  নিহত রিফাতের বাবা আ. হালিম দুলাল শরীফের করা হত্যা মামলায় পুত্রবধূ মিন্নিকে সাক্ষী করা হয়। 

এক কিশোরকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে পুলিশ এ ঘটনায় আসামিদের গ্রেফতার শুরু করে। পরে অন্য অধিকাংশ আসামীও গ্রেফতার হয়। তাছাড়া ২০১৯ সালের ২ জুলাই ভোরে বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের পূর্ব বুড়িরচর গ্রামে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড। 

ঘটনাক্রমে নাটকীয় পরিবর্তন আসে যখন রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে পুত্রবধূ আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি জড়িত মর্মে অভিযোগ এনে তাকে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানান রিফাতের বাবা আ. হালিম দুলাল শরীফ। তিনি মিন্নির জড়িত থাকার অভিযোগের পক্ষে ১০টি সুনির্দিষ্ট  কারণ জনসমক্ষে তুলে ধরেন: 

১. নয়নের সঙ্গে মিন্নির বিয়ের ঘটনা সে ও তার পরিবার কৌশলে গোপন করে গেছে।

২. বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় শরিয়া বহির্ভূতভাবে মিন্নি রিফাতকে বিয়ে করেছে।

৩. রিফাতের সঙ্গে বিয়ের পরও মিন্নি নয়নের বাসায় যাওয়া আসা করে এবং নিয়মিতভাবে তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে; নয়ন বন্ডের মা একাধিক সংবাদ মাধ্যমকে এ বিষয়সহ আরও অনেক তথ্য দিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।

৪. মিন্নি ঘটনার আগের দিন ২৫ জুন সকাল আনুমানিক ৯টায় এবং সন্ধ্যায় নয়নের বাসায় যায়। 

৫. মিন্নি অন্যান্য দিনে রিফাতকে ছাড়া কলেজে গেলেও ঘটনার দিন রিফাতকে কলেজে ডেকে নিয়ে যায়।

৬. রিফাত ঘটনার পূর্ব মুহূর্তে মোটরসাইকেলে কলেজ থেকে মিন্নিকে নিয়ে আসার জন্য গেলে মিন্নি মোটরসাইকেল পর্যন্ত এলেও চক্রান্তকারীদের উপস্থিতি না দেখে কালক্ষেপণের জন্য পুনরায় কলেজের দিকে ফিরে যাচ্ছিল এবং রিফাত মিন্নিকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেছিল; যা ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে দেখা গেছে।

৭. মিডিয়ায় প্রকাশিত আরেকটি নতুন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, যখন রিফাত ফরাজী, রিশান ফরাজী ও অন্যরা জাপটে ধরে মারপিট করতে করতে পূর্ব দিকে রিফাতকে নিয়ে যায়, তখন মিন্নি অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে পেছনে পেছনে হাঁটছিল, যা একজন স্ত্রীর ক্ষেত্রে কোনোভাবেই স্বাভাবিক আচরণ ছিল না।

৮. ভিডিও ফুটেজে আরো দেখা যায়, স্বামীকে কোপানোর সময় মিন্নি আসামিকে জাপটে ধরেছে, কিন্তু আসামি নয়নসহ অন্যান্য আসামিদের কেউই একটি বারের জন্যও মিন্নির ওপর চড়াও হয়নি এবং কোনোভাবেই মিন্নি সামান্যতম আক্রান্ত হয়নি।

৯. যখন তার স্বামী রিফাত আহত এবং রক্তাক্ত অবস্থায় একা একা রিকশায় হাসপাতালে যাচ্ছিল, তখন মিন্নি তার ব্যাগ ও স্যান্ডেল গোছানোর কাজেই ব্যস্ত ছিল এবং আসামিদের একজন রাস্তা থেকে ব্যাগ তুলে মিন্নির হাতে দিচ্ছিল।

১০. রিফাত শরীফকে অ্যাম্বুলেন্সে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার সময় মিন্নি রিফাতের সঙ্গে বরিশাল যায় নি।

শ্বশুরের অভিযোগ অস্বীকার করে সংবাদ সম্মেলনে আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি বলেন, ‘০০৭ গ্রুপ বরগুনায় যারা সৃষ্টি করেছেন তারা খুবই ক্ষমতাবান ও অর্থশালী। তাই তারা বিচারের আওতা থেকে দূরে থাকার জন্য আমার শ্বশুরকে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে রিফাত হত্যার বিচারকে অন্যদিকে প্রবাহিত করছে। আমি মনে করি, খুনিদের আড়াল করতেই আমার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’ 

রিফাত হত্যার চরম নাটকীয় পর্যায়ে ২০১৯ সালের ১৬ জুলাই সকালে মিন্নিকে পুলিশ লাইনে নিয়ে আসা হয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে রিফাত শরীফকে হত্যার ঘটনায় প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। 

২০১৯ সালের ২৯ আগস্ট বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির দুটি শর্তে জামিন মঞ্জুর করেন হাইকোর্ট। শর্ত দুটি হলো—মিন্নি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না ও তাকে তার বাবার জিম্মায় থাকতে হবে। 

রিফাত হত্যাকাণ্ডের দুই মাস ছয় দিন পর গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর বিকালে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে প্রাপ্তবয়স্ক এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই ভাগে বিভক্ত করে দুটি তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) দাখিল করেন পুলিশ। এদের মধ্যে ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক আসামি এবং ১৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। 

২০২০ সালের ১ জানুয়ারি রিফাত হত্যা মামলার প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত। অন্যদিকে গত ৮ জানুয়ারি রিফাত হত্যা মামলার অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন বরগুনার শিশু আদালত।

তারপর সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ইত্যাদি আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) স্ত্রী মিন্নিসহ ৬ জনের ফাঁসির আদেশ ঘোষিত হয়। সফেদ পোশাকে বাবার মোটর সাইকেলে আসা মিন্নিকেও অন্য সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের সঙ্গে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যা মামলায় শুধু বরগুনা নয়, বাংলাদেশের কিশোর অপরাধ গ্যাং-এর একটি ভয়ঙ্কর চিত্র ফুটে ওঠে। দেখা যায়, ব্যক্তিগত ও সামাজিক অবক্ষয়ের ঘৃণ্য নমুনা, যা বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় আরো অনেকদিন আলোচিত হবে।