ঔষধের নিরাপদ ও যোক্তিক ব্যবহারে হসপিটাল ফার্মাসিস্টের গুরুত্ব

প্রফেসর ড. মামুনুর রশীদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমান সময়ে চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে রোগীর সুরক্ষা (পেসেন্ট সেফটি) নিশ্চিত করা ও নিরাপদ ঔষধের ব্যবহারের (ড্রাগ সেফটি) ওর সুনির্দিষ্ট নিয়ম নীতির উল্লেখ করেছে। রোগীকে ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাপদ রেখে চিকিৎসা প্রদান করতে হলে নিরাপদ ও যোক্তিক ঔষধের ব্যবহার খুবই অপরিহার্য। অনিরাপদ ঔষধ ব্যবহারের ফলে রোগীর ভালো হওয়ার পরিবর্তে উল্টো রোগীর দেহে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরি হয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।

সঠিক পদ্ধতির নিয়মগুলো না মেনে ঔষধ সেবন করলে রোগীর দেহে এ ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। ঔষধের ডোজ সংখ্যা এবং ডোজের পরিমান এবং ঔষধের প্রকৃতির উপরও রোগীর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। এই ধরনের জটিলতা দূর করতে হলে ডাক্তারের কাছ থেকে ঔষধের ব্যবস্থাপত্রটি (প্রেসক্রিপশন) ফার্মাসিস্ট দ্বারা যথাযথভাবে যাচাই এবং পরামর্শ গ্রহণ করার পরে রোগীকে ঔষধ সেবন করানো উচিত। আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশনের (এফআইপি) প্রধান লক্ষ হচ্ছে বিশ্বজুড়ে যথাযথ, সাশ্রয়ী, মানসম্পন্ন ওষুধের আরও ভাল আবিষ্কার, বিকাশ এবং নিরাপদ ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করা এবং ফার্মেসি পেশার মান ও অনুশীলন এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতি ঘটিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নত করা। এফআইপি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্বারা গঠিত গুড ফার্মেসি প্রাকটিস গাইডলাইনস অনুযায়ী ফার্মাসিস্টের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে রোগীর সার্বিক কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখা, সেবা দান করা এবং নিরাপদ ঔষধের নিশ্চায়তা প্রদান করা।

অনিরাপদ ঔষধের অনুশীলন এবং ঔষধের ত্রুটি (মেডিকেশন এরর) বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতির অন্যতম এবং এড়ানো যায় না এমন ক্ষতির একটি প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ঔষধের ত্রুটির সাথে জড়িত বার্ষিক ব্যয় ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হিসাবে ধরা হয়েছে যা বিশ্বব্যাপী মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ১% হিসাবে ধরা হয়েছে। ত্রুটিগুলি ঔষধ ব্যবহারের প্রক্রিয়াটির বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটতে পারে। ঔষুধের ত্রুটিগুলি দেখা দেয় যখন সার্বিক ঔষুধ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি তৈরি করে এবং দক্ষ ও পর্যাপ্ত লোকবল যথা ফার্মাসিস্টের অভাবে ঔষধের ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন), নির্ধারণ, বিতরণ, এবং পর্যবেক্ষণের অনুশীলনগুলিকে প্রভাবিত করে, যার ফলে রোগীর গুরুতর ক্ষতি, অক্ষমতা এবং এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ওষুধের নিরাপদ সংরক্ষণ, ওষুধের অপব্যবহার রোধ ও যৌক্তিক ব্যবহার ও পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে রোগীকে সেবাদান করা ও সুরক্ষা রাখা ডাক্তারের পাশাপাশি একজন ফার্মাসিস্টেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

২০০৮ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী ঔষধের ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখিত সমস্ত ঔষধের অর্ধেক সরবরাহ বা বিক্রয় নির্ধারিত হয় অনুপযুক্তভাবে এবং শতকরা ৫০ ভাগ রোগী সঠিক নিয়মে ঔষধ সেবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। হাসপাতালে ঔষধের ব্যবস্থাপত্রের ত্রুটি (প্রেসক্রিপশন এরর) একটি দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা। হাসপাতালে অবস্থান কালীন সময়ের মধ্যে রোগীর প্রায় ৩০% সমস্যা ঔষুধের ত্রুটির সাথে সম্পর্কিত। ত্রুটিগুলি সাস্থ্যসেবা গ্রহণের যে কোন পর্যায়ে ঘটতে পারে, সেটা রোগীর জন্য ঔষধ নির্বাচন থেকে রোগীর দেহে ঔষধ প্রবেশ করানোর যে কোন সময়ে হতে পারে। অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে যে, হাসপাতালে চিকিৎসারত রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণ হচ্ছে ঔষুধের ত্রুটির ফলে, যার বেশিরভাগই ঔষধের ব্যবস্থাপত্রের ত্রুটির কারণে ঘটে থাকে। ২০০৯ সালে  ব্রিটিস জার্নাল অফ ফার্মাকোলজীতে প্রকাশিত এক গবেষনায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের ১-২% রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় ঔষধের ত্রুটি অথবা ভুল ঔষধ গ্রহণের ফলে যার অধিকাংশ ঘটে থাকে ঔষধের ব্যবস্থাপত্রের ত্রুটির বা ভুলের কারণে।

বিভিন্ন কারণে ঔষধের ব্যবস্থাপত্রের ত্রুটি হয়ে থাকতে পারে, এর মধ্যে কয়েকটি কারণ উল্লেখযোগ্য, সেগুলো হচ্ছেঃ (১) সঠিক ঔষধ এবং ঔষধের তথ্যের অনুপস্থিতি (২) ঔষধের সঠিক মাত্রা বা পরিমাণ (৩) ভুল সংক্ষিপ্তসার ব্যবহার (৩) অদক্ষ বা অপষ্ট হাতের লেখা (৪) সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া / সিদ্ধান্তের ত্রুটি (৫) ঔষধের মিথস্ক্রিয়া এবং (৬) ঔষধের ডুপ্লিকেশন। বাংলাদেশে ঔষধের ব্যবস্থাপনা ত্রুটির উপর আমরা সর্বপ্রথম গবেষণা পরিচালিত করি যা ২০১৪ এবং ২০১৫ তে বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য যে, উক্ত হাসপাতালগুলোতে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টের কোন অন্তর্ভুক্তি ছিল না এবং গবেষণায় দেখা গেছে ব্যবস্থাপত্রে ৫০% এর বেশী ঔষধ মিথস্ক্রিয়া, ৩০% এর বেশী ঔষধের মাত্রা বা পরিমানের অনুপস্থিতি, ৫% এর বেশী অপষ্ট হাতের লেখা এবং একই ধরনের বা অনুরূপ ঔষধের প্রয়োগ প্রায় ২% এর কাছাকাছি পরিলক্ষিত হয়। এই গুরুতর ব্যবস্থাপত্রের ত্রুটিগুলি হচ্ছে রোগীর অসুস্থতা এবং মৃত্যু, হাসপাতালে দীর্ঘদিন অবস্থান এবং চিকিৎসার অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রধান কারণ। ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে এক বছর সময়কাল ধরে যে সব রোগী প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন তাদের মধ্যে ১২% রোগী প্রেসক্রিপশন বা পর্যবেক্ষণের ত্রুটির দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন, ৭৫ বছরের বেশি বয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ৩৮% পর্যন্ত দেখা যায় এবং ১২ মাস সময়কাল ধরে যে সব রোগী পাঁচ বা ততোধিক ঔষধ গ্রহণ করেছেন এর পরিমাণ ৩০% পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়। সামগ্রিকভাবে, ৫% প্রেসক্রিপশনগুলোর মধ্যে প্রেসক্রিপশন এরর বা ব্যবস্থাপত্র ত্রুটি দেখা দেয়। ১৯৯৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ ফার্মেসি প্রাক্টিসে প্রকাশিত একটি সুইডিশ গবেষণায় ওষুধের ত্রুটির হার ৪২% পাওয়া গেছে। এই গবেষনায় দেখা যায়, দুই তৃতীয়াংশ প্রেসক্রিপশনগুলোতে চিকিৎসার উদ্দেশ্যটি উল্লেখ করতে ব্যর্থতার সাথে স¤পর্কিত ছিল এবং মাত্র ১% ত্রুটি একটি ভুল ডোজের ফলে তৈরি হয়েছিল। হাসপাতালগুলোতে ঔষধের ব্যবস্থাপত্রের ত্রুটি কমিয়ে আনতে হলে এবং নিরাপদ ঔষধের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে পর্যাপ্ত হসপিটাল ফার্মাসিস্টের তদারকি এবং অন্তর্ভুক্তি ঘটাতে হবে।

হসপিটাল ফার্মাসিস্টগণের দায়িত্ব হচ্ছে হাসপাতালের আবাসিক রোগীদের দোরগোড়ায় ক্লিনিকাল ফার্মেসি পরিষেবাগুলি পৌঁছে দেওয়া এবং পাশাপাশি হাসপাতালের অন্যান্য জায়গায় যেমন জরুরি বিভাগ এবং বহির্বিভাগের রোগীদেরকে ডাক্তার এবং নার্সদের পাশাপাশি ক্লিনিকাল সেবা সরবরাহ করা।

হসপিটাল ফার্মাসিস্টরা যেসব উপায়ে ঔষধের নিরাপদ এবং কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে, সেগুলো হচ্ছে: (১) হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীর চিকিৎসা স্তরের পরিবর্তনের সময় ঔষধের সমন্বয়সাধন করা। অনেক হাসপাতালের রোগীদের জটিল এবং বিশেষায়িত ঔষধের প্রয়োজন হয় যা প্রায়শই হাসপাতালের বাইরে দেখা যায় না। এই রোগীরা তাদের ঔষধগুলি কীভাবে ব্যবহার করবেন তা নিশ্চিত করার জন্য হাসপাতালের ফার্মাসিস্টের উপর নির্ভর করে। এটি স্বাস্থ্যসেবার বিধানের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দিক, কারণ এটি ঔষধের ত্রুটি এবং হাসপাতালে পুনঃভর্তি হ্রাস করতে পারে যার ফলে রোগীর সন্তুষ্টির সামগ্রিক উন্নতি ঘটে। (২) ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখিত ঔষধ-সম্পর্কিত সমস্যাগুলি নির্ধারণ এবং সমাধান করার বিষয়ে ডাক্তার এবং নার্সদের পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবার অন্যান্য পেশাদারদের সাথে একাধিক শাখার দলে কাজ করা। (৩) ঔষধ বিতরণ করা। (৪) ঔষধের উপাদানগুলো একত্রে মিশ্রণ ঘটিয়ে ঔষধ প্রস্তুত করা যখন বাণিজ্যিকভাবে সেই ঔষধের কোনো প্রস্তুতি থাকে না। (৫) প্রয়োজনীয় ঔষধের কাজ নিশ্চিত করার জন্য ঔষধের তালিকা নিয়মিত পর্যালোচনা করা, চিকিৎসায় ব্যবহৃত ঔষধের তদারকি করা এবং ঔষধের পার্শ-প্রতিক্রিয়া যাতে না ঘটে সেটার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। (৬) রোগী হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার সময় ঔষধাদি সাথে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা, হালনাগাদ ঔষধের তালিকা এবং নিয়ম মাফিক ঔষধ গ্রহণের পরিকল্পনার বিষয়ে বিস্তৃত পরামর্শ প্রদান করা।  (৭) নিরাপদ ও গুনগত মানসম্পন্ন ঔষধ ব্যবহারের কার্যক্রমের মাধ্যমে, যেমন- ঔষধের ব্যবহারের মূল্যায়ন এবং উচ্চ-ঝুঁকির ঔষধের জন্য স্টুয়ার্ডশিপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে হাসপাতাল-জুড়ে প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং অবদান রাখা।

ফার্মেসি এবং ফার্মেসি পরিষেবাগুলি স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ পদ্ধতি। আমাদের দেশে রোগীর সেবা প্রদান এবং আরোগ্য লাভ এবং সর্বোপরি স্বাস্থ্যসেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সমতুল্য করে তুলতে হলে হসপিটাল ফার্মেসি চালু করা উচিত। আদর্শ স্বাস্থ্যসেবা অর্জনের জন্য ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের অবশ্যই এক সাথে কাজ করা আবশ্যক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, একটি ৫০ শয্যার হাসপাতালে কমপক্ষে তিনজন, ১০০ শয্যার হাসপাতালে কমপক্ষে পাঁচজন, ২০০ শয্যার হাসপাতালে কমপক্ষে আট জন গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট থাকা উচিত। ঔষধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে “জাতীয় ঔষধ নীতি, ২০১৬” তে দেশে পর্যায়ক্রমে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে হসপিটাল ফার্মেসির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। 

অতি সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ উন্নততর বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণার্থে সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ ফার্মেসিতে একজন ও  প্রতি ৫০ শয্যার বিপরীতে একজন গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগের লক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পদ সৃষ্টির জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন এবং এরই প্রেক্ষিতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ফার্মাসিস্ট (গ্রাজুয়েট) পদে জরুরি ভিত্তিতে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ প্রদান করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা আশা করি হাসপাতালগুলোতে অতি দ্রুত ফার্মাসিস্ট নিয়োগের ফলে ঔষধের নিরাপদ ও সুষ্ঠ ব্যবহারের বিকাশ ঘটবে এবং দেশে স্বাস্থ্যসেবার মানের ব্যাপক উন্নতি সাধন হবে।

প্রফেসর . মামুনুর রশীদ, ফার্মেসি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

E-mail: [email protected], মোবাইল: ০১৭২৭১৪৪৫৮২