‘দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির দৃষ্টিতে শ্রুতি লেখক’



তালুকদার রিফাত পাশা
একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ছবি: বার্তা২৪.কম

একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বর্তমানে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শ্রুতি লেখক নিয়ে এক গভীর সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশ কর্মকমিশন সকল নিয়োগ পরীক্ষায় নিজেরা শ্রুতি লেখক দেবার কথা বলছে। বাংলাদেশ কর্ম কমিশন’এর এই সিদ্ধান্তের পক্ষে বিপক্ষে মতামত রয়েছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে।

বাংলাদেশ কর্মকমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদের যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আছে। সেটা যদি জনবান্ধব এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বান্ধব হবে তাই প্রত্যাশা। একজন সাধারণ মানুষ ভাবতে পারেন যে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শ্রুতি লেখকের সহায়তায় খুব সহজে পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে যাচ্ছে। আসলে কি তাই? একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে শ্রুতি লেখক নিয়ে আমার কিছু অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই।

আমি যখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী সেবার প্রথম শ্রুতি লেখক নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার শুরু। পরীক্ষা শুরুর ঠিক দুই দিন আগে কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাকে জানালেন যে প্রধান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আমার শ্রুতি লেখকের আবেদন পত্রে সাক্ষর করেননি এবং তিনি জানিয়েছেন যে এই শ্রুতি লেখকে তিনি অনুমতি দেবেন না। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের স্পষ্ট কোনো কারণ কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাকে জানাতে পারলেন না।। তাই কারণ জানতে এবং কোনো ভাবে যদি সমস্যার সমাধান করা যায় সে আশায় আমি পরের দিন অর্থাৎ পরিক্ষার আগের দিন ঢাকা বোর্ড অফিসে গেলাম আমার মাকে নিয়ে। কনট্রলার স্যারের সাথে দেখা করলাম।

তিনি আমাকে জানালেন, অনুমতি না দেবার কারণ হল শ্রুতি লেখক আমার আত্মীয়। শত অনুরোধ করার পরেও তিনি শুনলেন না। তার পরে সারাদিন খোঁজাখুঁজি করে একজন শ্রুতি লেখক হিসেবে রাজি করানো গেল, এবং আমি পরীক্ষা দিতে পারলাম।

এরকম ঘটনা আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেক বার ঘটেছে। পরীক্ষা জন্য বাসা থেকে রওনা দিয়েছি পথের মাঝে ফোন বেজে উঠল। আমার শ্রুতি লেখক বললো- ভাইয়া, আমি আপনার পরীক্ষা দিতে পারব না। দয়া করে কিছু মনে করবেননা, ভাল থাকবেন। এরকম পরিস্থিতিতে আমি বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষকদের অনেক সহায়তা পেয়েছি। কারণ শ্রুতি লেখকের বিষয় তারা খুব সচেতন, এবং সহানুভূতিশিল ছিলেন। শ্রুতি লেখক না পেলে ব্যবস্থা করে দেয়া অথবা বিকল্প দিনে পরীক্ষা দেবার ব্যবস্থা করতেন।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যেনো এরকম সমস্যায় না পরে সে কথা ভেবে যদি বাংলাদেশ কর্মকমিশন সিদ্ধান্ত নেন যে তারা শ্রুতি লেখক দেবেন সে ক্ষেত্রে আমার বিসিএস পরিক্ষার অভিজ্ঞতা একটু বলতে চাই। বিসিএস পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপ করেছিলাম। প্রতিটি পরীক্ষার এক দিন বা দুই দিন আগে আমি শ্রুতি লেখক খুঁজতে বের হয়েছি। প্রথমবারে আমার শ্রুতি লেখক ইংরেজি প্রশ্নগুলো ঠিক মতো আমাকে পরে শুনাতে পারছিলনা, আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় বারে যারা শ্রুতি লেখক হিসেবে আমাকে সহয়তা করেছিল তারা উভয়ই ছিল অত্যন্ত অধৈর্য এবং রাগি।

একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থী যখন পরীক্ষার জন্য শ্রুতিলেখক খোঁজেন তখন তারা অনেক গুলি বিষয় বিবেচনা করেন। সহায়তাকারী ব্যক্তিটি মানসিক অবস্থা কেমন। কারণ শ্রুতিলেখকের কাজটি একটি ধৈর্য্যের কাজ।

ব্যক্তিটি কতটা মানবিক, কতটা তার উপরে আস্থা রাখা যায় এ বিষয়গুলো খেয়াল রাখা প্রয়োজন। সর্বোপরি সহায়তাকারী ব্যক্তিটি ছাত্র হিসেবে কেমন। এই বিষয়টি উল্লেখ করার কারণ হল বানান ভুল বা হাতের লেখার গতি বিষয়টি পরীক্ষার সময়ে ও পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব ফেলে। তাই আমি মনে করি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীরা বাংলাদেশ কর্মকমিশনের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে তার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ আছে।

যেহেতু কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তিকে নিজেই কাজ করতে হবে। তাই আমি মনে করি, বাংলাদেশ কর্মকমিশন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শ্রুতি লেখক খুজে দেবার পরিবর্তে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীরা কি করে নিজেরাই শ্রুতি লেখক ছাড়া নিজেদের পরীক্ষা দিতে পারে সে বিষয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তির যুগ। বাংলাদেশ এবিষয় অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীরা যেন প্রাথমিক বাছাই পরীক্ষা কম্পিউটার দিয়ে দিতে পারে সে ব্যবস্থা করা খুব একটা কঠিন নয়।

এভাবে প্রযুক্তির সহায়তায় ধাপে ধাপে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যেন সকল পরীক্ষা নিজেরা দিতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কর্ম কমিশনই হতে পারে পথ প্রদর্শক। এছাড়া আরো কয়েকটি সমস্যা আছে যা একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থী জন্য বাধা হিসেবে কাজ করে। যেমন সময়ের সল্পতা আমাদের অন্যতম বাধা।

আধাঘন্টা অতিরিক্ত সময়ে পেয়ে থাকি লিখিত পরীক্ষায়। আমার জানামতে সকল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীরা শতভাগ অতিরিক্ত সময় পায়। বর্তমানে শ্রুতি লেখক নেবার কোনো স্পষ্ট নীতিমালা নেই। সে বিষয় বাংলাদেশ কর্মকমিশন সকলের সাথে আলোচনা করতে পারে।

আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে প্রত্যেকটি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী একজন যোদ্ধা। সমাজের শত বাঁধা উপেক্ষা করে তারা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করছে। আমি দেখেছি একজন ছাত্র তার নিজের হল খরচ, হাত খরচ এবং লেখা-পড়ার খরচ পুরোটা নিজে ব্যবস্থা করে। কারণ তাদের পরিবার অনেক গরিব। তার পরেও এই মানুষগুলো থেমে থাকে না।

আমাদের সংবিধান সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এসব কারণ দেখিয়ে আমাদের এই সামাজিক বীরদের পিছিয়ে দিলে জাতি হিসেবে আমরাই পিছিয়ে যাব। আমি একটা পরিবারকে চিনি যারা গত ১৯ বছর ধরে একটি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়েকে সহায়তা করে আসছে। মেটি ঢাকার একটি বস্তি এলাকায় বাস করত। ছোট্ট বেলায় মেয়েটি নোখ কাটতে চাইত না। গোসল করতে চাইত না। নাম জিজ্ঞাসা করলে অদ্ভুত ভাষায় উত্তর দিত। আজ সেই মেয়ে বিশ্ববিদ্যলয় গিয়েছে। শিক্ষার আলোয় নিজেকে আলোকিত করেছে। নতুন দিনের স্বপ্ন দেখতে শিখেছে।

একটি পরিবার যদি দায়িত্ব নিতে পারে তাহলে সমাজ, রাষ্ট্র, সংবিধান, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের আরো বড় দায়িত্ব হল দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানো। এক্ষেত্রে সংবিধান আইন কোনো কিছুই যেন প্রতিবন্ধকতা না হয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতিবন্ধকতা জয়ের পথে। কর্ম কমিশনের প্রতি অনুরোধ সকলের সাথে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধানের পথ খুঁজে বের করুন।

শুভ কামনা বাংলাদেশ।

 

তালুকদার রিফাত পাশা: সহকারী পলিসি অফিসার, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট