মানুষ আসলে খুব দ্রুতই স্মৃতি হয়ে যায়



ড. মহীবুল আজিজ
গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

'বোধন আবৃত্তি স্কুলে’র প্রতিষ্ঠাতা রণজিৎ রক্ষিত-এর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী শুক্রবার ৩০ অক্টোবর)। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন আইনজীবী। আমার পিতা একজন আইনজীবী ছিলেন। রণজিৎ দা’র সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের সূত্রে সেকথা জেনে হেসেছিলেন।

বললাম বাবা’র খুব ইচ্ছে ছিল, ডাক্তার হই, হলাম না। তারপর চাইলেন, আইনজীবী হই। আমাকে ভর্তিও করিয়ে দিয়েছিলেন, একটি আইন কলেজে যাতে রাত্রিকালীন শিফ্টে  ক্লাস করে ডিগ্রিটা নিয়ে নিতে পারি। শুনে রণজিৎ দা’ হাসতে হাসতে বলেছিলেন- আপনার বাবা ভুল ঘোড়ায় বাজি ধরেছিলেন।

বাবাকে তিনি খুব পছন্দ করতেন। আমার বাবা ছিলেন স্বভাবে সহজ-সরল এবং মিশুক ধরনের মানুষ। রণজিৎ দা’কে সেই গল্প বললাম। অনেক দিন আবহাওয়া খারাপ থাকলে কিংবা প্রচুর বৃষ্টিপাত হলে তাঁর মুহুরি আসতো না। কিন্তু তাঁর অনেক ড্রাফট কিংবা দরখাস্ত তৈরি করা বাকি। মুহুরি এলে সেগুলো তিনি শ্রুতলিপি’র মাধ্যমে তৈরি করতেন।

একদিন আমি বাবা’র প্রস্তাবে মুহুরির বিকল্প হিসেবে কাজ শুরু করলাম। তবে, চুক্তিভিত্তিতে। একেক পৃষ্ঠার জন্যে, এক টাকা। বাবা বলতেন, হাতের লেখা বেশি বড় করে লিখবে না। আমাকে ডিক্টেশন দেওয়ার ‍সুবিধে ছিল বাবার অনেকটাই। ইংরেজি ডিক্টেশনে কখনও থমকে যেতে হতো না। ক্লাস টেনে পড়বার সময় ইংরেজি ‘শিডিউল’ এবং ‘এসাসিনেশন’ বানান একটানে লিখে ফেলায় বাবা যে কী খুশি হয়েছিলেন!

এসব গল্প রণজিৎ দা’র সঙ্গে করি। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। দেখা হলে, গল্প হলে প্রায়শই যুদ্ধাভিজ্ঞতা, সাহিত্য-সংস্কৃতি এসব বিষয়েই গল্প করতে পছন্দ করতেন। একদিন আমাকে বললেন, একটা ক্লাস নিতে হবে। আমি বললাম, এত ব্যস্ত থাকি, সময় কী দিতে পারবো? বললেন, বন্ধের দিন মিউনিসিপ্যালিটি স্কুলে বোধন-এর ক্লাস।

পরে নিয়েছিলাম ক্লাস- ক’টা তা মনে নেই। খুবই খুশি হয়েছিলেন। বলতেন, আবৃত্তি একটা পারফরমিং আর্ট হলেও শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক বিষয়গুলো জানা দরকার। তাহলে মনটা প্রশস্ত হবে। তাছাড়া, সাহিত্যের স্পর্শ জীবনের মানবিক দিকগুলোতে ফেলবে প্রয়োজনীয় আলোক।

তিনি নিজেও কিন্তু অত্যন্ত মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। অমায়িক, মৃদুভাষী, সুস্মিত। তাঁর কণ্ঠে যখন ‍ওজস্বিতাময় রৌদ্ররসের কবিতাপাঠ শুনি তখন কিন্তু তাঁর কণ্ঠের তেজ ঠিকই অনুভব করতে পারা গিয়েছিল। আইনজীবিতা পেশার বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে জীবনের ইতিবাচক দিকে পরিচালিত করবার দুর্লভ বিশেষত্ব তাঁর ছিল। বোধন-এর সব বয়সী সদস্যদের দেখেছি তাঁদের এই অভিভাবকটির জন্যে তাদের অপরিসীম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।

মানুষ আসলে খুব দ্রুতই স্মৃতি হয়ে যায়। এসবই পুরনো কথা। তবু ভাবি, রণজিৎ রক্ষিতকে মনে পড়লে প্রথমেই আমার মনে পড়ে একজন শিল্পীর কথা। অনেকটা সময় ভাবলে মনে হয় যে হ্যাঁ, পেশাগত সূত্রে তিনি ছিলেন আইনজীবী। বৈষয়িক সংসর্গবিহীন একটা কাজ দিয়ে নিজের মূল পরিচয়টাকেই তিনি নতুন রপে বৃত করতে পেরেছিলেন, সেটা একটা লক্ষযোগ্য দিক নিঃসন্দেহে।

তিনি কখনও ক্রোধান্বিত বা প্রত্যক্ষ রুদ্রতা কারও সম্মুখে প্রকাশ করেছিলেন কিনা তা আমার জানা নেই। কেউ যদি বলে, করে থাকতে পারেন, আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে।

উইলিয়ম শেক্সপিয়রের -সংখ্যক সনেটটির প্রথম চার লাইন স্মরণ করি--

From fairest creatures we desire increase,

That thereby beauty's rose might never die,

But as the riper should by time decease,

His tender heir might bear his memory :

রণজিৎ রক্ষিতের উত্তরাধিকার নিশ্চয়ই প্রবাহিত হবে উত্তর প্রজন্মেও।

অধ্যাপক . মহীবুল আজিজ, কবি কথাশিল্পী; ডিন, কলা অনুষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়