কোভিড-১৯ বনাম ফ্লু



প্রফেসর ড. মু. আলী আসগর
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সিস্টেমস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলমান মারাত্মক সংক্রমক সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের কারণে বিশ্বে ইতোমধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ কোটি ৪৪ লক্ষ ১৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং মৃতের সংখ্যা ১৩ লক্ষ ১৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

অন্যদিকে, সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, গত সিজনে ফ্লু (ইনফ্লুয়েঞ্জা) এর কারণে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ৩ কোটি ৮০ লক্ষ (৩৮ মিলিয়ন) মানুষ অসুস্থ হয়েছে, ৩ লক্ষ ৯০ হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ২৩ হাজার মানুষ মারা গেছে।

বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক সিজনাল ফ্লু সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। তাই ফ্লু মারাত্মক হওয়া সত্ত্বেও, এ সম্পর্কে মানুষ অনেক জানেন। পক্ষান্তরে, কোভিড-১৯ রোগের ভাইরাস SARS-COV-2, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে নতুন আবির্ভূত হয়ে বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্টি করার কারণে মানুষ এই নভেল করোনাভাইরাস সম্পর্কে এখনও অনেক কিছুই অজানা। অর্থাৎ, মানুষ জানেনা যে নভেল করোনাভাইরাস কত ক্ষতি করতে পারে ও কতদিন থাকতে পারে এবং কিভাবে দ্রুত এ করোনাভাইরাসের কবল থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এলার্জি অ্যান্ড ইনফেকশন ডিজিজের পরিচালক ডক্টর অ্যান্থনি ফসি জানান, ইনফ্লুয়েঞ্জার ব্যপক রোগহার ও মৃত্যুহার থাকা সত্ত্বেও, গতিবিধি জানা আছে (তথ্য সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা বিষয়ক ওয়েব সাইট ‘লাইফ সায়েন্সৎ)। অধিকাংশ মানুষ ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার পর দুই সপ্তাহের মধ্যে আরোগ্য লাভ করে।

সিজনাল ফ্লু ভাইরাস (যার অন্তর্ভূক্ত ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ও ইনফ্লুয়েঞ্জা বি) এবং কোভিড-১৯ রোগের ভাইরাস SARS-COV-2 উভয়ে ছোঁয়াচে; যাদের কারণে শ্বসনতন্ত্রের অসুস্থতা হয়। উভয় ক্ষেত্রে, আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি/কাশির ড্রপলেট বা কোন পৃষ্টে (সারফেস) থাকা ভাইরাসের সংস্পর্শে রোগ ছড়ায়।

সিডিসি এর তথ্য অনুযায়ী, ফ্লু’র লক্ষণগুলো হচ্ছে- জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা, মাথা/শরীরে ব্যথা, সর্দি, ক্লান্তি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তির সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণগুলো হচ্ছে, জ্বর, ক্লান্তি ও খুসখুসে শুষ্ক কাশি। কোভিড-১৯ আক্রান্ত কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে সর্দি, গলা ব্যথা, নাক কনজেশন, শ্বাস কষ্ট এবং শরীরে ব্যথা বা ডায়রিয়া দেখা যায়। উভয়ক্ষেত্রে (কোভিড-১৯ ও ফ্লু) নিউমোনিয়া (ফুসফুসের প্রদাহ) হতে পারে।

কোভিড-১৯ আক্রান্ত কারও স্বাদ ও ঘ্রাণ পাওয়ার অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যেতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা কোভিড-১৯ রোগের সকল লক্ষণ খুঁজছেন। স্পেনের হাসপাতালে অনেক কোভিড-১৯ রোগীর দেহে জমাট রক্ত (ব্লাড ক্লট) পাওয়া গেছে (তথ্য সূত্রঃ যুক্তরাষ্ট্রের নিউজ সাইট এবিসি সেভেন)।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস সংবাদ মাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে সিজনাল ফ্লু রোগে মৃত্যু হার প্রায় ০.১%। অন্যদিকে, কোভিড-১৯ রোগে মৃত্যু হার এখনও পরিস্কার নয়। এখন পর্যন্ত নভেল করোনাভাইরাসে মৃত্যু হার বয়স, অঞ্চল বা অন্য ফ্যাক্টরস এর উপর নির্ভরশীল। চায়না সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এর স্ট্যাডিজ অনুযায়ী, চীনে কোভিড-১৯ রোগে ৮০ বছর ও অধিক বয়স্কদের ক্ষেত্রে মৃত্যু হার ১৪.৮% ছিল এবং ১০ থেকে ৩৯ বছর বয়স্কদের ক্ষেত্রে মৃত্যু হার ০.২% ছিল। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সিস্টেমস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর সর্বশেষ প্রদত্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্বে কোভিড-১৯ আক্রান্তের মৃত্যু হার ৬.৯%।

কত সহজে ভাইরাস বিস্তার লাভ করে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে পরিমাপ করার নাম ‘‘বেসিক রিপ্রোডাকশন নম্বর’’ বা R0 (উচ্চারণ ‘‘আর-নট’’)। R0 হচ্ছে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে গড়ে কত জন মানুষ আক্রান্ত হয় (তথ্য সূত্রঃ যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা বিষয়ক ওয়েব সাইট 'লাইফ সায়েন্স')। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস সংবাদ মাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, ফ্লুর ক্ষেত্রে R0 হচ্ছে ১.৩।.

গবেষকগণ এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ রোগের R0 নির্ধারণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখের জার্নাল অফ আমেরিকান মেডিক্যাল এসোসিয়েশন জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধ অনুযায়ী, প্রিলিমিনারি স্ট্যাডিজে কোভিড-১৯ রোগের R0 ২ ও ৩ এর মধ্যে হিসাব করা হয়েছে। অর্থাৎ, একজন কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ২ থেকে ৩ জন মানুষকে সংক্রমিত করেছে। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, R0-- স্থির বা ধ্রুব নয়; এটি অঞ্চল, মানুষের একে অপরের সাথে সংস্পর্শের সংখ্যা এবং সংক্রমণের সময় প্রতিরোধের প্রচেষ্টার উপর নির্ভরশীল।

সিজনাল ফ্লু প্রতিবছর প্রাদুর্ভাব হলেও, শুধুমাত্র ২০০৯ সালে এইচওয়ানএনওয়ান (H1N1) ভাইরাস - যেটি সোয়াইন ফ্লু ভাইরাস হিসেবে পরিচিত-বৈশ্বিক মহামারি হয়েছিল। সোয়াইন ফ্লু সাধারণত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এর হিসেব অনুযায়ী, বিশ্বে ১ লক্ষ ৫১ হাজার ৭ শত থেকে ৫ লক্ষ ৭৫ হাজার ৪ শত মানুষ সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল।

কোভিড-১৯ ও ফ্লু ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ার কারণে এন্টিবায়োটিক দ্বারা চিকিৎসা সম্ভব নয়, যেহেতু এন্টিবায়োটিক শুধুমাত্র ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে কার্যকর। এন্টিভাইরাল মেডিসিন কোভিড-১৯ ও ফ্লু এর সংক্রমণের মাত্রা ও কাল হ্রাস করতে পারে।

মানুষভেদে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভিন্ন হয়। সেকারণে ভাইরাসে কেউ কেউ আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়, আবার অনেকে হয় না। এটি মানবদেহের এন্টিবডি নামক রোগ ধ্বংসকারী প্রোটিন তৈরির সক্ষমতার উপর নির্ভরশীল। খাদ্যাভাস সহ জীবনযাত্রার সঙ্গে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। সুষম খাদ্য গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পরিমাণ ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, শিম বা ডাল জাতীয় প্রোটিনসহ ভিন্ন জাতীয় (Diversity) শাকসবজি ও ফলমূল খাদ্য হিসেবে গ্রহণ নিশ্চয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি সহ স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। Diversity অর্থাৎ ‘‘ভিন্নতা’’; এটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে একই জাতীয় খাদ্যে উপকারী সকল উপাদান থাকে না।

দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক উপায়ে (সূর্যের আলো, মিল্ক ও দুগ্ধ জাতীয় খাবার) বা সংযোজিত মেডিসিন হিসেবে ভিটামিন ডি এবং অন্যান্ন ভিটামিনগুলো প্রাকৃতিক খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। নিয়মিত পরিমিত ঘুম ও পর্যাপ্ত ব্যায়াম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। কারণ দুর্বল শরীর দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করে। যেহেতু ধুমপান শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি করে এবং নভেল করোনা ও ফ্লু উভয়ের ভাইরাসগুলো শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়; সেকারণে সংক্রমণ প্রতিরোধে ধুমপান বর্জন করতে হবে। অধিকিন্তু, ধুমপান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে বাধার সৃষ্টি করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, দেহের রোগ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে সুস্থ জীবনযাত্রার (অর্থাৎ সুষম খাদ্যাভ্যাসসহ পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক চাপ পরিহার, ধুমপান ত্যাগ ইত্যাদি) গুরুত্ব রয়েছে।

সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) ও জনস হপকিন্স মেডিসিন, শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণের উভয় ভাইরাস, করোনাভাইরাস ও ফ্লু ভাইরাস প্রতিরোধে নিন্মোক্ত সুপারিশগুলো করেছে:

১. সাবান ও পানি দিয়ে ঘনঘন প্রতিবার অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়া।
২. হাত পরিস্কার না করে মুখ, চোখ ও নাক স্পর্শ না করা।
৩. নিরাপদ শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা।
৪. বাড়ির বাহিরে মুখে ও নাকে মাস্ক ব্যবহার করে শ্বসন স্বাস্থ্যবিধি পালন।
৫. কনুই বক্র করে সেখানে কাশি দেওয়া (coughing into the crook of your elbow)।
৬. অসুস্থ অবস্থায় গৃহে থাকা।

 

ড. মু. আলী আসগর: প্রফেসর, ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়