এক বিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দর্শন চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা



মো. মোকছেদ আলী
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের বিশ্ব নানা সংঘাতের মধ্যে দিয়ে এগুচ্ছে। সংঘাতের এই তীব্রতা দেখে আমরা হতাশ হই। মহা বিপর্যয় কখন যেন সর্বগ্ৰাসী রূপ নেয়। এ সুন্দর পৃথিবী ও মনুষ্যকূলের অস্তিত্বই না বিলীন হয়! এই অসহনীয় পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? দর্শন ও জীবন ব্যবস্থায় এই চরম অবক্ষয়ের দিকে বিশ্ব মোড়লদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে। পৃথিবী নামের এই গ্ৰহের অস্তিত্বই যদি না থাকে তবে বিশ্ব মোড়লরা হুংকার, খবরদারি কোথায় জারী রাখবেন? দার্শনিক, বিদগ্ধজন এ বিষয়ে ভাবেন এবং আমাদের চলার পথের সঠিক সন্ধান দেন।

প্রশ্ন উঠে দর্শন বলতে কি বুঝি? দার্শনিক কারা? সংস্কৃত শব্দ দর্শন, দৃশ্ ধাতুর সাথে অনট প্রত্যয় যোগে দর্শন শব্দ গঠিত, যার আক্ষরিক অর্থ দেখা। কিন্তু এখানে সব দেখাই দর্শন নয়। জীবন, জগৎ এবং সত্ত্বার রহস‌্যের অস্তিত্ব সন্বন্ধে সঠিক জ্ঞান ও উপলদ্ধিই দর্শন। যিনি এই শাশ্বত জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছেন এবং নিজের দৃষ্টি ভঙ্গি পরিবর্তন করে মানুষের শান্তি ও কল্যাণের উপায় উদ্ভাবন করে পথ নির্দেশনা দিয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন তিনিই দার্শনিক। তাই বলতে ইচ্ছা হয় বিশ্বের যা কিছু মহান তা দার্শনিকগণই দিয়ে গেছেন।

সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল জ্ঞান ভিত্তিক মানব সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা বাট্রান্ড রাসেল ও জন ডিউই তে এসে থেমে যাবে আমরা কোন ভাবেই বিশ্বাস করিনা। মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ কিন্তু দর্শনকে ঘিরে হয়েছিল। প্রাচীন যুগের ভারতীয়, গ্ৰীস, রোমান, চৈনিক (কনফুসিয়াস ও লাওজু) সভ‌্যতা, মধ্যযুগের দজলা, ফোরাত উপত‌্যকা কেন্দ্রিক সভ্যতা সর্বত্রই সমাদৃত। সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা মূলমন্ত্রে সংগঠিত ফরাসী বিপ্লবের পিছনে নেতৃত্বে ছিল দার্শনিক ভলটেয়ার ও রুশো। পাশ্চাত্য দর্শন ছিল মূলতঃ প্রকৃতি ও সৃষ্টিতত্ব বিষয়ে যুক্তিনির্ভর, মুক্তচিন্তা, বুদ্ধি ভিত্তিক, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও বিচার বিশ্লেষণ ধর্মী। সংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস, ধর্মীয় গোড়ামির কোন স্থান সেখানে ছিল না। জগৎ ও জীবনের প্রতিটি ব্যাখ্যায় ছিল বিচার বিশ্লেষণ ধর্মী, তেমনি পরমত সহিষ্ণু।

অপর পক্ষে প্রাচ্যে দর্শন মূলত ধর্ম ভিত্তিক, জীবন নির্ভর, মানবিক চরিত্র নিয়ে। একদিকে খ্রিস্টধর্ম, অপর দিকে ইসলাম ধর্ম বিকাশ লাভ করেছে। পাশাপাশি যে ধর্ম প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুগে যুগে লালিত হয়েছে তা হলো বৌদ্ধধর্ম। সমাজ ও মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণে এসব ধর্মের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ধর্মের প্রভাব এতটাই বিস্তার লাভ করেছিল, যেখানে প্রাচ্যের সীমানা পেরিয়ে সুদূর পাশ্চাতের ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সকল ধর্মের মূল মন্ত্র ছিল, সকল জীবে দয়া, সবার উপরে মানুষ সত্য, নারী-পুরুষ একই স্রষ্টার সৃষ্টি, ভোগে নয় ত্যাগেই মুক্তি এবং স্রষ্টার শ্রেষ্ট প্রতিনিধি ও প্রধান প্রকাশ মানুষ। ষড়রিপুর বন্ধন মুক্ত হয়ে কিভাবে জাতি উন্নত, সমৃদ্ধ এবং বলিষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী হবে তার পথ নির্দেশনা সকল ধর্মের প্রবাদ পুরুষগণ দিয়ে গেছেন। লুম্বিনী বনে জন্ম নিয়েছিলেন মহান গৌতম বুদ্ধ এবং বেথেলহেমে জন্ম নিয়েছিলেন যিশু খ্রিস্ট। এ দু'জন মনিষী এ পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ জীবন ধারার পরিবর্তন এনেছিলেন এবং তাঁদের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয় বৌদ্ধ ও খ্রীস্ট জীবন দর্শন। তাই মানব জীবনে দর্শন এক অপূর্ব সম্পদ।

আবার বয়সে কনিষ্ঠ ধর্ম হিসেবে ইসলামের অভ্যূদয় বিশ্বে এক নতুন বিপ্লব সৃষ্টি করে। ইসলামের আবির্ভাবে যে জীবন দর্শনের সূত্রপাত হয় তা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধানের দর্শন প্রবর্তন করে বিশ্বে সার্বজনীনতা স্থাপন করেন। ইসলাম ধর্ম প্রথমে মানুষ মানুষে ভেদাভেদের প্রাচীর চিরতরে উৎখাত করে, মানুষ কে মুক্তি দিয়ে আরব-অনারব, বর্ন-গোত্রের মর্যাদার পাথর্ক্যের মূলোৎপাটন করে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ধর্মীয় প্রবর্তক হিসেবে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, গোড়ামি, ধনী-গরিবের পাথর্ক্য, পিতা মাতা গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান, নারীর সম্মান, গরীব, মিসকিন, এতিম, মুসাফির, দুস্থ অসহায় মানুষের প্রতি ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সামাজিক দায়বদ্ধতা, অসুস্থ ব্যক্তির সেবা শুশ্রূষা, শক্র হলেও দয়া, অনুকম্পা ও ক্ষমা করা, ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি না করে ধর্ম যার যার অর্থাৎ পরমত সহিষ্ণুতা, অন্যের ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল হতে জোড় তাগিদ দেন। তাঁর সংস্পর্শে এসে আরব বেদুইন, উশৃঙ্খল, বর্বর, অসভ্য জাতি অতি অল্প সময়ে শ্রেষ্ট জাতিতে পরিণত হন। আরবের সীমানা পেরিয়ে সুদূর পাশ্চাত্য ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকা, এশিয়া মহাদেশের সমুদ্র বধূ-ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ে। হানাহানি, মারামারি, মানুষে মানুষে সৃজিত ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে পরম করুণাময়, অনন্ত অসীম, রহিম-রহমান, দয়াময় আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভাবে আত্মসমর্পণ করে তাঁরই দেওয়া বিধান অনুযায়ী চলার পথ নির্দেশনার বানী জীবনে প্রতিটি ছন্দে বাস্তবায়নে জ্ঞান আহরণের জোড় তাগিদ প্রদান করেন। মহানবী (সাঃ) উপর নাযিলকৃত প্রথম বাণী ছিল ইকরা অর্থাৎ পড়! প্রভূর নামে। তাছাড়াও জ্ঞান আহরণের জন্য সূদুর চীন দেশে যাওয়ার নির্দেশনা প্রদান করেন। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ কর, জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়ে শ্রেয় ইত্যাদি নবী (সাঃ)’র বাণীর মাধ্যমে ইসলামে জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সার্বজনীনতা, বিশ্ব ভাতৃত্ব বোধ সৃষ্টির নজির স্থাপন করে ক্ষমা, দয়া, ইনসাফ ও ইহসান প্রদর্শন পূর্বকঃ আত্মত্যাগী, আত্মপ্রত্যয়ী, উন্নত ও সমৃদ্ধ এক অনন্য জাতি গঠন করেন। একথা বললে বেশি বলা হয় না, বিশ্বের যা কিছু মহৎ ও সুন্দর তার অনেকটাই এসেছে ইসলামী জীবন দর্শন থেকে।

একজন দার্শনিক সব সময় উদার ও পরমত সহিষ্ণু হয়। মুক্তমন নিয়ে আত্মসমালোচনা, আত্মসংশোধন করে সব কিছুর, বিচার বিবেচনা, বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করে থাকেন। পরিশীলিত চিন্তা ধারা, নিরাসক্ত জ্ঞানের অধিকারী, পূর্বকল্পিত কোন ধারণায় সীমাবদ্ধ থেকে, সত্যে হতে লুকিয়ে রেখে দর্শন চিন্তা একেবারেই অসম্ভব। দর্শন চিন্তার মূল মন্ত্র হবে- মানুষের শান্তি ও কল্যাণের উপায় উদ্ভাবন। যে দর্শন বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের পথ নির্দেশনা দেয় এবং মানুষের মধ্যে মহৎ ও কল্যাণের মানসিকতা সৃষ্টি করে সেই দর্শনই শাশ্বত ও সার্বজনীন। সার্থক দর্শন সভ্য, উন্নত ও পরিপূর্ণ জীবনের ইঙ্গিত বহন করে। দার্শনিকের মূখ্য উদ্দেশ্য হবে- সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের সাধনা ও তা জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা। দর্শনের মূল লক্ষ্য হবে মানুষ ও মানবকল্যাণ এবং জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র বিষয়ক নানাবিধ সমস্যার সমাধান।

যখনই মানব জীবনে এসেছে অত্যাচার, নিপীড়ন, নৈতিকতার বিপর্যয়, দুষ্টের দৌরাত্ম্য, তখনই দার্শনিকগণ হয়েছেন প্রতিবাদ মুখর ও সোচ্চার। তাঁদের দ্বারা মানুষ প্রতিবাদী হতে শিখেছে এবং চিন্তা ধারার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে। দার্শনিকগণ দিয়েছেন মানুষকে কল্যাণকর পথের দিগদর্শন। শুনিয়েছেন সেবা, ত্যাগ ও মহত্বের বানী। দর্শন কেবলমাত্র সমস্যা ব্যাখ্যার সীমিত পরিসরে আবদ্ধ থাকলে তা বাস্তব জীবন  থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভাববাদ ও চিন্তার বিলাসিতায় পরিনত হয়ে পড়ে। প্রকৃত দর্শন সমস্যার সমাধানের জন্য সমকালীন পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার পরিবর্তন এবং পরিবর্ধনের পথ নির্দেশনা করে, প্রয়োজনীয় মানসিকতার জন্ম দেয়। দর্শন ভোগবিলাস, অবসর, কতক নিছক চিন্তার সমষ্টিমাত্র নয়। সমকালীন সমস‌্যা ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ক্ষেত্রে দৃষ্টি ভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন আনায়নে দর্শন সবসময় অগ্রগামী। দেশপ্রেম, জাতীয়তা বোধ, উদার দৃষ্টিভঙ্গি, মুক্তচিন্তা, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রগতিশীল, সুখী সমৃদ্ধশালী জীবন ও সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও কঠোর শ্রমসাধনা সৃষ্টি করে।  বাংলাদেশে জনস্বার্থ ও মানবকল্যানে শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্র প্রসার ও পরিধি বৃদ্ধি করে আমূল পরিবর্তন আনতে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের বাস্তব সম্মত জীবন ধর্মী, আত্মনির্ভর, কর্মমুখী, বৃত্তি মূলক শিক্ষা প্রণয়নে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিবার ভিত্তিক ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপন করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে দক্ষ, অভিজ্ঞ জনসম্পদ সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে তৃনমূল পর্যায়ে বাস্তব ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বিস্তৃত করতে শিক্ষা ক্যারিকুলাম প্রবর্তন করতে হবে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে শাণিত করতে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে সীমাবদ্ধ থাকলে বা অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটলেই একটি জাতি প্রকৃত অর্থে উন্নত-সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠে না । চারিত্রিক দৃঢ়তা, অহিংস মনোভাব, পরমত সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জ্ঞানী-গুণীদের মূল্যায়ন, সম্মান, সমাদর অর্থাৎ সংস্কৃতিগত ভাবে কোন জাতি সমৃদ্ধশালী না হলে, সকল লোকের, সকল মতের অংশগ্ৰহন ও সমন্বয় না ঘটলে কোনো জাতির উন্নয়ন টেকসই ও স্থায়ীত্ব লাভ করে না। দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার পরিবর্তনই মূল বিষয়। একই কারণে ঐতিহ্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধ মেসোপটেমিয়া, ইনকা, মিশরীয়সহ আরো নামি দামী সভ্যতা ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়েছিল। নৈতিক, মানবিক ও চারিত্রিক গুণাবলির উৎকর্ষ ও প্রতিফলনের মাধ্যমে ঐতিহ্যপূর্ণ, সমৃদ্ধশীল ও উন্নত সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব। তাই একবিংশ শতাব্দীর সত‌্যিকারের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ও সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য।

লেখক: অধ্যক্ষ, আক্কেলপুর মুজিবর রহমান সরকারি কলেজ, জয়পুরহাট