বাঙালি জাতির স্বাধীনতা লাভ ও ভাষা-অধিকার আন্দোলনের বিস্মৃতি



অধ্যাপক ডক্টর এ.বি.এম. রেজাউল করিম ফকির
গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই আন্দোলনটি সাধারণ্যে ভাষা আন্দোলন নামে খ্যাত হলেও, এটি ছিলো মূলত ভাষা-অধিকার আন্দোলন। ভাষা-অধিকার আন্দোলন বাঙালি জাতির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিশেষ।

ভাষা-অধিকার আন্দোলনে বাঙালি জাতি বাংলা ভাষার অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছিলো। কারণ, ব্রিটিশ ইণ্ডিয়া ভেঙে পাকিস্তান প্রজাতন্ত্রের সৃষ্টি হলে, তৎকালীন রাজনৈতিক শক্তি ইসলাম ধর্ম ও উর্দু ভাষাকে ভিত্তি করে পাকিস্তানী জাতি গঠনে প্রয়াসী হয়। ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ভেঙে পাকিস্তান গঠনের উদ্যোগ ও প্রক্রিয়াটি ছিলো তাৎক্ষণিক ও স্বল্পস্থায়ী। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের আগে পাকিস্তানী জাতি নামক কোনো জাতির নামও কেউ শুনেনি। কিন্তু ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে শের-ই-বাংলা পাকিস্তান প্রস্তাব পেশ করার মাধ্যমে পাকিস্তানী জাতি কাগজে-কলমে অস্তিত্ব লাভ করে। কিন্তু বাস্তবে পাকিস্তানী জাতি বলতে কোনো জাতির অস্তিত্ব তখন ছিলো না এবং এখনও নেই। কিন্তু ব্রিটিশ বিরোধী অন্দোলনের উপজাত হিসাবে ব্রিটিশ ইণ্ডিয়া ভেঙ্গে পাকিস্তান সৃষ্টি হলে, তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতৃত্ব পাকিস্তান নামক জাতি গঠনের দিকে মনোনিবেশ করে। তাঁরা প্রতিসম জাতি গঠনের লক্ষ্যে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিকট থেকে লব্ধ ভূখণ্ডের জনগণের উপর ইসলাম ধর্ম ও উর্দুকে চাপিয়ে দিতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু সে আমলে পাকিস্তানের শতকরা ৫ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা ছিলো উর্দু। আর বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যা ছিলো শতকরা ৫৪ ভাগ। অথচ পাকিস্তানের নেতৃত্ব উর্দুকে পাকিস্তানের একক রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করে।কারণ, পাকিস্তানের রাজনৈতিক অভিজাতদের ভাষা ছিলো উর্দু। আর তাঁদের অধিকাংশ ছিলো ভারতের অধিবাসী।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক অভিজাতবর্গের এই উদ্যোগ উদ্দেশ্য ছিলো পাকিস্তান রাষ্ট্রব্যবস্থায় উর্দুকে একক রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা আর রাষ্ট্রভাষা উর্দু অর্থ হলো উর্দু ভাষাকে দাপ্তরিক কাজে, শিক্ষাক্ষেত্রে ও গণমাধ্যমের ভাষা হিসাবে ব্যবহারে বাধ্যতা আরোপ। উর্দু আরোপের এই বিষয়টি বাঙালি জাতিকে নাড়া দেয়। তারা বুঝতে পারে যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাঙালি জাতির জাতিসত্ত্বা অস্তিত্ত্ব সংকটে নিপতিত হয়েছে। তাই তারা বাংলা ভাষাকে দাপ্তরিক কাজে, শিক্ষাক্ষেত্রে ও গণমাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে ভাষা-অধিকার আন্দোলন শরু করে। এই আন্দোলন শুরু হয় ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে মার্চ আর পরিণতি লাভ করে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ শে ফেব্রুয়ারী। কিন্তু বাংলা ভাষার অধিকারের স্বীকৃতি মিলে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্রণীত পাকিস্তানের সংবিধানে। পাকিস্তানের সংবিধান (১৯৫৬) হলো ইসলামী প্রজাতন্ত্রী পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান যা ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্রণীত হয়। এই সংবিধানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দুর সাথে বাংলা ভাষা স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

কাজেই ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্রণীত সংবিধানে দাপ্তরিক কাজে, শিক্ষাক্ষেত্রে ও গণমাধ্যমে উর্দু ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষা ব্যবহারের অধিকার মিলে। এই অধিকার লাভের পর বাঙালি জাতি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দাপ্তরিক কাজে, শিক্ষাক্ষেত্রে ও গণমাধ্যমে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার ও প্রচলনের সচেষ্ট ছিলো। কিন্তু ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম-পাকিস্তানের সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও পরবর্তীতে যুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের পর দাপ্তরিক কাজে, শিক্ষাক্ষেত্রে ও গণমাধ্যমে বাংলা ভাষা ব্যবহারের অফুরন্ত অধিকার ও স্বাধীনতা লাভ করতে সমর্থ হয়। কিন্তু এখন বাঙালি জাতি দাপ্তরিক কাজে, শিক্ষাক্ষেত্রে ও গণমাধ্যমে বাংলা ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে সচেষ্ট রয়েছে। তারা ভুলে গেছে তাদের ভাষা-অধিকার আন্দোলনের কথা। তাদের নিজের ভাষা বাংলা ব্যবহারের অধিকার থাকলেও, তারা এখন তারা বিজাতীয় ইংরেজী ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা এবং তাদের কেউ কেউ এটিকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট রয়েছে।

বাঙালি জাতি এখন ভুলে গেছে তার অতীত; ভুলে গেছে ভাষা-অধিকার আন্দোলনের কথা। আর ভুলে গেছে স্বাধীনতা সংগ্রামের আত্মউৎসর্গকারীদের কথা।

অধ্যাপক ডক্টর এ.বি.এম. রেজাউল করিম ফকির, পরিচালক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ভূতপূর্ব অতিথি শিক্ষক, টোকিও বিদেশবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়।