ক্যাপিটল হিলে হামলা, পশ্চিমা গণতন্ত্রের উপর আঘাত



হাফিজুর রহমান
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ফ্রান্সিস ফুকোয়ামার ইতিহাসের সমাপ্তি তত্ত্ব অনুযায়ী, বিশ্ব রাজনীতিতে শাসনব্যবস্থা হিসেবে পশ্চিমের উদার গণতন্ত্র একক ভাবে বিজয়ী হয়েছিল। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, গণতন্ত্র ব্যতীত  অন্যান্য শাসন ব্যবস্থাগুলো কোনো না কোনো ভাবে গণতন্ত্রের কাছে পরাজিত হয়েছে। সমাজতন্ত্র ধীরে ধীরে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে জায়গা করে নিচ্ছে ও ইসলামপন্থী রাজনীতিও  তার জায়গা হারাচ্ছে। এভাবে পশ্চিমা গণতন্ত্র বিশ্বের শাসনব্যবস্থা হিসেবে এককভাবে জায়গা করে নিবে বলে মনে করেছিলেন ফুকুয়ামা।

এরই ধারাবাহিকতায় বিগত দশকগুলিতে  যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে মোড়লিপনা করে গেছে। সন্ত্রাস, সহিংসতার তকমা দিয়ে অন্য রাষ্ট্রের উপর মার্কিন হস্তক্ষেপের ইতিহাস দীর্ঘ। তৃতীয় বিশ্ব ও হাইব্রিড রেজিমে থাকা রাষ্ট্রগুলোকে গণতন্ত্রের  বয়ানে রেজিম পর্যন্ত পরিবর্তন করেছে বহু সময়। অবশ্য, এটি নিয়ে কোনো কোনো রাষ্ট্র আওয়াজ তুললেও মার্কিন বিশুদ্ধ গণতন্ত্রের তকমা তা খারিজ করে দিয়েছে।

৬ জানুয়ারি ২০২০, আমেরিকার বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের পেশীশক্তির প্রদর্শন  দ্বারা রণক্ষেত্র হয়ে ওঠলো আমেরিকা। ক্যাপিটল হিলের সহিংসতা ও দাঙ্গা এইবার সেই বিশুদ্ধ গণতন্ত্রের উপর আক্রমণ করেছে। সহিংসতায় ৪ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন ঘটনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাইন-ইলেভেনের পর আমেরিকায় এমন ঘটনা বিরল। ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটলে আজকের দিনটি একটি কালো দিন হিসেবে উল্লেখ থাকবে।"

কেন এই  হামলা?

এবারের আমেরিকার  নির্বাচনে ট্রাম্পের ভাগ্যে জুটেছে ২৩২ টি ভোট আর জো বাইডেন পেয়েছেন ৩০৬টি ভোট। অথচ যেদিন থেকে ভোটগণনা এবং নির্বাচনী ফলাফল সামনে এসেছে, ট্রাম্প নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলে এসেছেন এবং করেছেন একাধিক মামলা। বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় মামলা করেও খুব একটা সুবিধা করে ওঠতে পারেননি ট্রাম্প। শেষ পর্যন্ত তিনি আওয়াজ  তোলেন, আমরা কিছুতেই পিছু হটব না। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলির বয়ানে ট্রাম্পের  উগ্রবাদী আচরণেই রাস্তায় নেমে আসেন ট্রাম্প সমর্থকরা। অবশেষে, পার্লামেন্টে হামলার মাধ্যমে এর পরিণতি হয়।

কোন পথে পশ্চিমা গণতন্ত্র?

ক্যাপিটল হিলের হামলা বৈশ্বিক গণতন্ত্রের উল্টো স্রোত বা হাইব্রিড রেজিমের ধাক্কার সাথে তুলনা করা যায়। রাশিয়ায় পুতিনের নতুন জার হিসেবে অধিষ্ঠিত হওয়া, ব্রাজিলের কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট  জাইর বলসোনারোর উথান বিশ্ব রাজনীতিতে হাইব্রিড রেজিমকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়।

সাম্প্রতিক ক্যাপিটল হিলে হামলা আমেরিকার গণতন্ত্রের ওপর বড়ো সরো আঘাত নিয়ে আসবে।এই দাঙ্গার মাধ্যমে  আমেরিকার বিশুদ্ধ গণতন্ত্র প্রশ্নের মুখে পড়বে। এরই ধারাবাহিকতায়

বৈশ্বিক হাইব্রিড শাসনব্যবস্থা এখন লাগামহীন ভাবে এগিয়ে যাবে।

পশ্চিমা বিশুদ্ধ গণতন্ত্রের মূলকথায় ছিলো একটা অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন এবং নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী সরকার পরিবর্তন। অর্থাৎ  জনগণের  মতামত ও রায় মেনে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচনকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং তিনি ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ ছিলেন।শেষমেশ  তার সমর্থকরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উগ্রতাকে সায় দিয়ে মার্কিন পার্লামেন্টে ভবন দখল নেয় এবং গোটা আমেরিকাকে দাঙ্গার মাধ্যমে খন্ডিত করে।এটা নিঃসন্দেহে আমেরিকার গণতন্ত্রের উপর আঘাত।

আমেরিকার গণতন্ত্রের উপর এই আঘাতের ফল হবে সুদূরপ্রসারী।

১। ক্যাপিটল হিলে হামলার মাধ্যমে পশ্চিমা গণতন্ত্রের রপ্তানি ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে।কেননা তৃতীয় বিশ্ব ও অন্যান্য হাইব্রিড রেজিমের সরকার গুলো তাদের ক্ষমতা দীর্ঘ করার ছাড়পত্র  তৈরি করে নিবে।এতে করে বিশ্বে হাইব্রিড রেজিম দীর্ঘ হবে।

২। আমেরিকার বিশুদ্ধ গণতন্ত্রের উপর এই ক্ষত  পরবর্তী প্রেসিডেন্টকে বিশ্ব রাজনীতিতে মনোস্তাতিক ভাবে দুর্বল করে রাখবে।যা তার শাসনব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলবে।ফলে বিশ্বে আমেরিকার একাধিপত্য হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করবে।

৩।বিশ্ব নেতৃত্বে রাশিয়া ও চীন আর ও একধাপ এগিয়ে আসবে। ক্যাপিটল ভবনের হামলাকে তারা পশ্চিমা গণতন্ত্রের ত্রুটি হিসেবে প্রচারণা চালানোর চেষ্টা করবে। ফলশ্রুতিতে বিশ্বের অন্যান্য হাইব্রিড শাসনব্যবস্থার সরকার গুলোর সমর্থন ও আদায় করতে পারবে কেননা হাইব্রিড শাসনব্যবস্থার সরকার গুলোর ভিত্তি দুর্বল। যা দীর্ঘমেয়াদী পশ্চিমা গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

সার্বিক বিবেচনায় বলা যায়, ট্রাম্পের উগ্রবাদী আচরণ ও ক্যাপিটল হিলে হামলা পশ্চিমা বিশুদ্ধ  গণতন্ত্রের উপর নিঃসন্দেহে একটা বড়ো আঘাত।

হাফিজুর রহমান , কলাম লেখক, [email protected]