পাপুলের পাপের পেয়ালা এবং রাজনীতির দেউলিয়াত্ব



প্রভাষ আমিন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎ সব চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ, 'কুয়েতের আদালতে এমপি পাপুলের চার বছরের কারাদন্ড'। সত্যিই ব্রেকিং নিউজ! কুয়েতের একটি আদালত বাংলাদেশের একজন আইন প্রণেতাকে ঘুষ দেয়ার অভিযোগে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন এবং ১০ লাখ দিনার জরিমানা করেছে, এরচেয়ে বড় নিউজ আর কী হতে পারে। তবে এই বড় নিউজটি জাতি হিসেবে আমাদের অনেক ছোট করেছে, লজ্জায় আমাদের মাথা হেঁট হয়ে গেছে। এই ব্রেকিং নিউজটি আমাদের জন্য হার্ট ব্রেকিং। বাংলাদেশের রাজনীতির দেউলিয়াত্বের এরচেয়ে বড় নজির আর নেই।

গত বছরের ৭ জুন কুয়েতে গ্রেফতার করা হয় লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাংসদ শহিদুল ইসলাম পাপুলকে। তার বিরুদ্ধে মানবপাচার, ঘুষ দেওয়া এবং অর্থপাচারের অভিযোগে তিনটি মামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ঘুষ দেওয়ার মামলার রায় হয়েছে। তার মানে সামনে আরো দুটি হার্ট ব্রেকিং নিউজ আসবে। পাপুল একজন প্রতারক আদম ব্যবসায়ী। প্রতারণা, মানবপাচার আর ভিসা জালিয়াতি করে অঢেল অর্থ কামিয়েছে। হঠাৎ তার শখ হলো এমপি হবে। বাংলাদেশে টাকা হলে নাকি বাঘের চোখ পাওয়া যায়। কারাগারে একান্তে নারীসঙ্গ বাঘের চোখের চেয়ে কম নয়। পাপুলও টাকা দিয়ে এমপি পদ কিনে নিয়েছে। এমপি হতে রাজনীতি করতে হয়, নির্বাচন করতে হয়। তাতে টাকা খরচ হয়। কিন্তু পাপুল অত ঝামেলায় যায়নি। জীবনে এক সেকেন্ডও রাজনীতি না করে স্রেফ টাকা দিয়ে এমপি পদ কিনে নেয়ার বিরল উদাহারণ তৈরি করেছিল।

যারা রাজনীতি করেন, তারা ভবিষ্যতে দলের মনোনয়নে নির্বাচন করতে চান; চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর, মেয়র, এমপি, মন্ত্রী হতে চান। এই চাওয়াটা দোষের কিছু নেই। ছাত্র রাজনীতি করেন, এমন অনেকের সাথে কথা বলে দেখেছি, তারা ভবিষ্যতে নির্বাচন করতে চান। তাই এখন থেকেই এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, তাদের জন্য কাজ করার চেষ্টা করছেন। দেখে আমার খুব ভালো লাগে। সবাই যদি এভাবে মানুষের হৃদয় জয় করে তাদের প্রতিনিধি হওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে দেশটাই বদলে যাবে। তবে চাইলেই তো আর মনোনয়ন পাওয়া যায় না, মনোনয়ন পেলেও নির্বাচিত হওয়া যায় না। দেশে জাতীয় সংসদে সরাসরি আসন ৩০০টি। বড় দলগুলোতে এমপি হওয়ার মত যোগ্য নেতা আছেন কয়েক হাজার। একজন মানুষ যদি ২০ বছর বয়সে ছাত্র রাজনীতি শুরু করে এবং এমপি হওয়ার লক্ষ্যের দিকে আগায়। তাহলে দেখা যায় ৬০ বছর বয়সে গিয়ে তিনি দলের মনোনয়ন পান। তার মানে ৪০ বছর ধরে তাকে লক্ষ্যের দিকে এগুতে হয়, সফল হতে কাজ করতে হয়। তবে মনোনয়ন পেলে বা নির্বাচন করলেই যে তিনি জিতে যাবেন, তারও কোনো গ্যারান্টি নেই। তবে সামরিক-বেসামরিক আমলা এবং ব্যবসায়ীরা এমপি হওয়ার কিছু শর্টকাট উপায় বের করে নিয়েছেন। যেসব আমলার মনে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা থাকে। তারা ক্ষমতায় থাকতে এলাকায় নানান উন্নয়ন কাজ করেন। জনগণকে সাহায্য করেন। এবং অবসর নিয়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করে এমপি হন, মন্ত্রীও হন কেউ কেউ। ব্যবসায়ীরাও চালাক হয়ে গেছেন। আগে তারা রাজনীতিবিদদের চাঁদা দিতেন, এমপি-মন্ত্রী বানাতেন। এখন তারা নিজেরাই এমপি-মন্ত্রী হতে চান, মনোনয়ন চান। প্রয়োজনে মনোনয়ন কিনে নিয়ে এমপি হন, মন্ত্রীও হন। যেভাবেই হোক, আপনাকে কিন্তু জনগণের জন্য কাজ করতে হবে, এলাকার উন্নয়ন করতে হবে।

রাজনীতিবিদ হোক, আমলা হোক, ব্যবসায়ী হোক, দুর্বৃত্ত হোক; সবাইকেই একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। মনোনয়ন পেতে হলে কিছুদিন হলেও দলীয় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হয়। কিন্তু শহীদুল ইসলাম পাপুল প্রমাণ করেছেন, এমপি হতে এসব কিছুই লাগে না। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করে এমপি হওয়ার পথটি দীর্ঘ ও বন্ধুর। আমলা বা ব্যবসায়ীদের এমপি হওয়ার পথটি সংক্ষিপ্ত। তবে শহীদুল ইসলাম পাপুল নামের এই দুর্বৃত্ত এমপি হওয়ার একটি সংক্ষিপ্ততম পথ আবিষ্কার করেছেন। এই দুর্বৃত্ত এতটাই চতুর, এমনকি সে মনোনয়নের জন্যও সময় নষ্ট করেনি। জীবনে কোনোদিন এক সেকেন্ডের জন্যও রাজনীতি না করা এবং কোনো দলের সাথে সম্পৃক্ত না খাকা শহীদ ইসলাম পাপুল জাতীয় সংসদের সদস্য হয়ে গিয়েছে। তার এমপি হওয়ার সহজ তরিকার ভূমিকাটা একটু জেনে আসি চলুন। ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-২ আসনটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মহাজোটের শরিক এরশাদের জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয়। এ আসনে জাপার মনোনয়ন পান আগের বারের সাংসদ মোহাম্মদ নোমান। কিন্তু হঠাৎ করে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে দাঁড়ান নোমান। এই আসনে আগে থেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে রেখেছিলেন শহীদুল ইসলাম পাপুল। নোমান সরে দাড়ানোর পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি থেকে লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে চিঠি দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদুল ইসলাম পাপুলের পক্ষে কাজ করার জন্য স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। চিঠিতে শহীদুল ইসলামকে আওয়ামী লীগের নিবেদিত নেতা ও সক্রিয় মাঠপর্যায়ের কর্মী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছেন বলে দাবি করা হয়। যদিও এই চিঠির প্রতিটি শব্দ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। শহীদ ইসলাম পাপুল কোনোদিন এক সেকেন্ডের জন্যও আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো দল করেননি। জাতীয় পার্টিকে ম্যানেজ করে, আওয়ামী লীগকে ম্যানেজ করে স্বতন্ত্র এমপি বনে যায় পাপুল। এরপর নামেন স্ত্রী সেলিনা ইসলামকে এমপি বানানোর মিশনে। শহীদ ইসলাম পাপুল এখানেও ম্যানেজ মাস্টার। স্বতন্ত্র এমপিদের ম্যানেজ করে অরাজনৈতিক স্ত্রীকেও এমপি বানিয়ে ফেলেন। শহীদুল ইসলাম পাপুল দুটি কারণে অমর হয়ে থাকতে পারেন। একটি ‘এমপি হওয়ার সহজ পাঠ’ নামে একটি বই লিখে। আরেকটি হলো প্রেমের জন্য। স্বামীর কাছে স্ত্রীদের নানারকম আবদার থাকে। শাড়ি, গয়না, গাড়ি, বেড়াতে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কোনোদিন কোনো স্ত্রী তার স্বামীর কাছে এমপি বানিয়ে দেয়ার আবদার করেছিলেন বলে শুনিনি। সেলিনা ইসলাম আবদার করেছেন এবং শহীদ ইসলাম পাপুল তার সে শখ পূরণও করেছেন। অনন্ত জলিল নাকি অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন। কিন্তু আমার ধারণা তিনিও তার সুন্দরী স্ত্রী বর্ষাকে এমপি বানাতে পারবেন না। অসম্ভবকে সম্ভব করার সত্যিকারের ক্ষমতা একমাত্র পাপুলেরই আছে।

মনোনয়ন কেনাবেচার বিষয়টি বাংলাদেশে একেবারে নতুন বা অভিনব নয়। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সংসদ সব নির্বাচনেই মনোনয়ন কেনাবেচার অভিযোগ আছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও। কিন্তু পাপুল যা করেছে, তা একেবারে পুকুরচুরি। গত দুটি নির্বাচনে জোটের হিসাব নিকাশ, হুট করে মূল প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে ভাগ্যগুণে অনেকে এমপি হয়ে গেছেন। কিন্তু পাপুল তেমনও নয়। নিজের ভাগ্য নিজে কিনে নিয়েছে সে। শোনা যাচ্ছে, নিজেকে এমপি বানাতে এবং স্ত্রীকে এমপিশিপ গিফট করতে পাপুলের মোট খরচ হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। মানতেই হবে বেশ সস্তায় সওদা করেছেন পাপুল। মাত্র ৫০ কোটি টাকা! হাজার কোটি টাকার মালিক অনেকেও এমপি হতে চেয়ে পারেননি। আসলে টাকা থাকলেই এমপি হওয়া যায় না। এজন্যই আপনাদের পাপুলের সম্ভাব্য বইটি পড়তে হবে। দুইটি বড় দলকে ম্যানেজ করে স্বতন্ত্র এমপি হওয়া অবশ্যই একটি বড় ধরনের শিল্প। প্রতারণাকে, রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নকে অন্য মাত্রায় উন্নীত করেছেন এইড পাপুল।

পাপুল বাংলাদেশের রাজনীতির দেউলিয়াত্বকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সে প্রমাণ করেছে, এমপি হতে হলে রাজনীতি করার দরকার নেই। যেনতেনভাবে টাকা কামাতে হবে। সেটা চুরি করে হোক, মাস্তানি করে হোক, ডাকাতি করে হোক, আদম ব্যবসা করে হোক, ব্যাংকের টাকা লুটে হোক, শেয়ার বাজারের টাকা মেরে দিয়ে হোক। কামাই করবেন এক হাজার কোটি টাকা। তার থেকে একশো কোটি টাকা খরচ করলেই নিজে এমপি হতে পারবেন, স্ত্রীকেও এমপি বানাতে পারবেন।

চারদিকে শতশত দুর্নীতিবাজ, টাউট, বাটপার, দুর্বৃত্তকে দেখি ঘুরে বেরাচ্ছে। তাদের বিচার হয় না। কিন্তু আমি সবসময় প্রকৃতির বিচারে বিশ্বাস করি। পাপের সীমা অতিক্রম করলে প্রকৃতি বিচার করে দেয়। পাপুলের পাপের পেয়ালা পূর্ণ হয়ে গেছে। তাই তো বাংলাদেশের সংসদ সদস্য এখন কুয়েতের কারাগারে দণ্ড ভোগ করছে। এমপি শহীদ ইসলাম এমপির ডাকনামটাও অদ্ভুত- পাপুল। আমার ধারণা তার পিতার দূরদৃষ্টি ছিল। সন্তান পাপ উসুল করে ছাড়বে বলেই হয়তো তিনি নাম রেখেছিলেন পাপুল। সত্যিই তার পাপের উসুল হচ্ছে।

পাপুল এখনও বাংলাদেশের পবিত্র জাতীয় সংসদের সদস্য। সংবিধানের ৬৬। (১) (ঘ) অনুযায়ী নৈতিক স্খলনজনিত কোন ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যুন দুই বৎসরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে কেউ সংসদ সদস্য অযোগ্য হন। পাপুলের সাজা হয়েছে চারবছর। অবিলম্বে এই বাটপারের সসদ্যপদ খারিজ করে পবিত্র জাতীয় সংসদকে কলঙ্কমুক্ত করা হোক। সাথে বহিষ্কার করা হোক তার স্ত্রীকেও। পাশাপাশি এই দুর্বৃত্ত কীভাবে সংসদ পর্যন্ত পৌঁছে গেল, আজ জাতির মুখে কালিমা লেপন করলো, তার একটা সুষ্ঠু তদন্ত দরকার। রাজনীতির স্বার্থেই এটা করতে হবে।

লেখক: প্রভাষ আমিন,হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ