ময়মনসিংহে ভাষাসৈনিকের কান্না



ড. মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

একজন ভাষাসৈনিক কাঁদছেন। তিনি শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে পারেননি। পুষ্পাঞ্জলি নিয়ে আসা ভাষাসৈনিককে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। একুশে ফেব্রুয়ারিতে এমন ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ জেলায়, যে জেলা একজন ভাষাশহীদেরও জন্মস্থান।

ঘটনাস্থল ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা। অকুস্থল আঠারবাড়ি ডিগ্রি কলেজ। ফটকে প্রায় দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ৯০ বছর বয়সী একজন ভাষাসৈনিক। তাঁকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি কিংবা তিনি ঢুকতে পারেননি। এমন অসহায় ও অপমানজনক পরিস্থিতিতে তিনি প্রকাশ্যে কেঁদে ফেলেন। পরে শ্রদ্ধা না জানিয়েই সেখান থেকে ফিরে যান তিনি। অথচ প্রতিবছর তিনি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। শুধু বাদ পড়লো ২০২১ সাল।

নিরাপত্তা প্রহরী দাবি করেন, ‘আমি বুঝতে পারিনি। আমার কাছে ছাড়াও তো অনেকের কাছে চাবি আছে।’ এই অনেক বলতে অধ্যক্ষ বা দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকও হতে পারেন। কিংবা হতে পারেন অন্যকোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী।

কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, ‘আমি অসুস্থ থাকায় ছুটিতে আছি। জাতীয় দিবস পালনের জন্য যে কমিটি রয়েছে, তার আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল।’

আহ্বায়ক বলেন, ‘আমার এক আত্মীয় মারা গেছেন। তাই আমি হবিগঞ্জে আছি।’ তবে তাকে কলেজ থেকে দিবস পালনের কোনো দায়িত্ব দেয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

প্রকাশিত সংবাদ থেকে শুধু প্রাসঙ্গিক বক্তব্যগুলো তুলে ধরা হলো। একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবস সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতার চিত্র কথাগুলো থেকে সুস্পষ্ট হয়। ব্যক্তিগতভাবে যাতে কেউ আহত না হন, সেজন্য নামগুলো উহ্য রাখা হয়েছে। তবে, এতে ঘটনার স্পর্শকাতর-গভীরতা মোটেও কমে না।

ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর হতে যাওয়ার প্রাক্কালের ঘটনা এটি। ভাষা আন্দোলন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিষয়ে সমাজের মনোভাব কেমন, তা এতে অনুমান করা যায়। একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের ক্ষেত্রে এমন সমন্বয়হীনতা ও বিস্ময়-সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটলে সাধারণ মানুষ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা কেমন হবে, সে কথা বলাই বাহুল্য।

শুধু ময়মনসিংহে নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাষাসৈনিকরা যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। অনেকে মিডিয়ায় অবহেলা ও বেদনার কথা বলেন। শুনতে খারাপ লাগলেও এগুলোই বাস্তবতা। দেশের নানা স্থানে প্রায়ই বহু মুক্তিযোদ্ধার মতো ভাষাসৈনিকগণও চরম কষ্টকর পরিস্থিতির বর্ণনা দেন। একবার, কিশোরগঞ্জে যথাযথ সম্মান না দেওয়ায় ভাষাসৈনিকগণ অনুষ্ঠান বর্জন করেন। তথাপি সংশ্লিষ্টদের বোধোদয় হয়েছে বলা যাবেনা। হলে ময়মনসিংহে একজন ভাষাসৈনিককে কাঁদতে হতো না। এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনার কথা আমাদের জানতে হতো না।

শুধু ভাষাসৈনিকগণ নন, অবহেলার শিকার বাংলা ভাষাও। ৭০ বছরেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। মাতৃভাষা বাংলাকে কেন্দ্রে রেখে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো যায়নি। উচ্চতর শিক্ষার বহুক্ষেত্রে বাংলা প্রবেশাধিকার পায়নি। বাংলা ভাষায় প্রয়োজনীয় বই-পুস্তকও অনূদিত হয়নি। উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষার প্রয়োগ ও প্রসার এখনো সুদূরপরাহত।

সবচেয়ে মারাত্মক আরেকটি সমস্যা তীব্রভাবে সামনে চলে আসে কখনো কখনো। দেখা যায়, অমর একুশের শ্রদ্ধা জানাতে কেউ কেউ জুতা পায়ে বেদীতে আরোহণ করেন। কখনো শহীদ মিনারে কোন গ্রুপ, দল বা উপদলের শক্তি প্রদর্শনের তাণ্ডবে ভণ্ডুল হয় শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। এসব নিঃসন্দেহে অশুভ ইঙ্গিতবহ।

একুশের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে বছরের অন্যান্য দিনগুলোতে শহীদ মিনার ও পার্শ্ববর্তী প্রাঙ্গণে গরু, ছাগলের পাশাপাশি মাদকাসক্ত ও সমাজবিরোধী চক্র আসর জমায়। মিডিয়ায় প্রায়শ প্রকাশিত এমন খবরগুলো চরম অপমান ও অবমানকরই শুধু নয়, বিপজ্জনকও বটে। কারণ, জাতির রক্তস্নাত ঐতিহ্যের পবিত্র প্রতীকে বেআইনি, অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে কলঙ্কজনক, লজ্জার ও অনুতাপে।

যে ভাষা আন্দোলন জাতিসত্তার আর্থ, সামাজিক, রাজনৈতিক আন্দোলন ও অর্জনের প্রথম সোপান,  তাকে ঘিরে অবহেলা, উদাসীনতা, অশ্রদ্ধা মোটেই কাম্য হতে পারেনা। ভাষাসৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও শহীদ মিনারের মর্যাদা সমুন্নত রাখা প্রশাসনসহ সমগ্র জাতির প্রতিটি সদস্যের নৈতিক দায়িত্ব। এই সত্যটি আমরা যেন ভুলে না যাই।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদালয়, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম।