প্লেগ মহামারি থেকে করোনাকালের ব্যবসায়ীগণ!



ড. মাহফুজ পারভেজ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সাধারণত পেশাজীবী গোত্রের চরিত্র ও আচরণ সার্বজনীন। মোটের উপর পুরো বিশ্ব চষে তাদের মধ্যে এক ও অভিন্ন বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যাবে। আমলাদের কথা ধরা যেতে পারে। কিংবা শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী প্রভৃতি পেশার লোকজনে নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। বলতে গেলে এরা সবাই একই রকম। এটাই বিভিন্ন পেশাগোষ্ঠীর সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

তবে, বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কেউ পারবে না। সাদা, কালো, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, অঞ্চল নির্বিশেষে সকলেই এক ও একাকার। সকলের মূল লক্ষ্য লাভ বা মুনাফা। মাড়োয়াড়ি বা গুজরাতি দুর্দান্ত ব্যবসায়ী আর পাড়ার মোড়ের মুদি ব্যবসায়ীর মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকলেও লাভ বা মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবাই সমান উৎসাহী, তৎপর ও আগ্রহী।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীগণ সম্ভবত বিশ্বের মধ্যে রেকর্ড সৃষ্টিকারী, যারা বৈশ্বিক মহামারির দাপটে ক্রমবর্ধমান  মৃত্যু ও আক্রান্তের কারণে চলমান লকডাউন বাতিল বা প্রত্যাহারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন। জীবন নয়, ব্যবসা ও লাভ তাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এই ঘোরতর মানবিক বিপর্যয়ের সঙ্কটকালেও। এবং নিজেদের স্বার্থগত অধিকার আদায়ের জন্য কোনো লজ্জা-শরমের পরোয়া না করে জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও তারা পিছপা হয়নি।

অথচ বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আরও ৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় করোনা আক্রান্ত হিসেবে নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ৭ হাজার ২১৩ জন। একদিনে মৃত্যু ও শনাক্তের হিসেবে যা নতুন রেকর্ড। এ মারাত্মক রেকর্ড হলো মঙ্গলবার (৬ এপ্রিল) লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে আর সেদিনও ব্যবসায়ীরা ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় লকডাউন তুলে দেওয়ার ও অবাধে ব্যবসা করার দাবিতে লাগাতার আন্দোলন করেছে।

শুধু করোনাকালেই নয়, অতীতের মহামারিতে লাভ ও মুনাফালোভী মানুষের দেখা পাওয়া গেছে। ক্যামু রচিত বিশ্ববিখ্যাত 'দ্য প্লেগ' উপন্যাসে দেখা যায় 'ওরান’ নামক একটি শহরে মহামারি হয়েছে। শহরে সমুদ্র আছে কিন্তু গাছপালা, সবুজের স্পর্শ বিশেষ একটা নেই।শহরের মানুষগুলো কেমন? ক্যামুর নির্লিপ্ত, সংক্ষিপ্ত বিবরণ পড়ে মনে পড়বে গুজরাতিভাই আর মাড়োয়াড়িদের কথা। শহরের বাসিন্দারা সবাই বেশ পরিশ্রমী, তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হল বড়লোক হওয়া। লাভ ও মুনাফা হাতিয়ে নেওয়া এবং নিজের স্বার্থের বাইরে অন্য কোনো দিকে না তাকানো। উপন্যাসের পাতায় বিবরণটি রয়েছে এভাবে: 'Their chief interest is in commerce and their chief aim in life is, as they call it ‘doing business!'

অতিলোভী সম্প্রদায়ের তথা ব্যবসায়ী বরপুত্রদের শহরের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-বৈভবকে ফালাফালা করে দিয়ে অতর্কিতে হানা দিল প্লেগ। একজন দুইজন করে মানুষ মরলো। সবাই ব্যবসায় মন দিয়ে বললো, 'ও কিছু নয়। একদিন ঠিক হয়ে যাবে।'

বাস্তবে কিছুই ঠিক হয় না। কাতারে কাতারে মানুষ মরতে থাকে। সংখ্যাগুরু লোভী ও স্বার্থপর মানুষের মধ্যে সংখ্যালঘু কতিপয় মানুষ স্বাস্থ্যসেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। মহামারির পটভূমিতে দেখা যায় শুভ আর অশুভর লড়াই। ভালো ও মন্দের দ্বৈরথ।

আসলে, মানুষ মরে কিন্তু প্লেগ বা মহামারি মরেনা। সে চুপ করে ঘাপটি মেরে বসে থেকে ধৈর্যের পরীক্ষা দেয়, সকলের অলক্ষ্যে সে বসে থাকে শোয়ার ঘরের তাকে, স্যুটকেসের ভিতরে, পকেটের রুমালে কিংবা পুরোনো কাগজপত্রের ভাঁজে। তারপর একদিন সে অতর্কিতে একইভাবে হানা দেয় অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে।

যেমনটি দিয়েছে চীনে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে।চীনের উহানের এক ডাক্তার প্রথম সন্ধান পেলেন করোনা ভাইরাসের, সহকর্মীদের সতর্ক করলেন, উপরমহলে জানিয়েও দিলেন নিজের দুশ্চিন্তার কথা। অচিরে সেই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল গোটা দুনিয়ায়। ফলটা কী হল? ডাক্তারকে সোজা জেলে দেওয়া হলো আর বাকি বিশ্ব স্থবির হয়ে বসে রইল দুর্যোগের আগাম বার্তা শুনেও। যে যার মতো করে ষড়যন্ত্রের কল্প-কাহিনী বাজারে ছাড়তে শুরু করলো এবং সদ্য-বিদায়ী মাথামোটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট মশা তাড়ানোর ভঙ্গিতে হোয়াইট হাউসের সবুজ গালচের ওপর দাঁড়িয়ে হাওয়ায় উড়তে থাকা গলার টাই-টা সামলাতে সামলাতে বললেন, ‘That is a Chinese virus, we need not bother about it’.

শেষ পর্যন্ত, কেমন প্রলয়ঙ্করী মহামারি চোখের সামনে সারা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়লো, তা সবারই দেখা। সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ মরে গেলো আর ১৩ কোটির চেয়েও বেশি মানুষ আক্রান্ত হলো। প্রথম, দ্বিতীয় হয়ে কোথাও কোথাও করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের তাণ্ডব চলছে। বাংলাদেশেও মৃত্যু ও আক্রান্তের হার প্রতিদিনই বাড়ছে রেকর্ড ভেঙে ভেঙে। যার ফলে জারি করা হয়েছে লকডাউন এবং আশ্চর্যজনক ঘটনা এই যে, ব্যবসায়ীরা লকডাউন তুলে দেওয়ার আন্দোলন করছে।

প্লেগ মহামারির আমল থেকে করোনাকালের চলতি সময়কালে ব্যবসায়ীগণের আচরণ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে কোনো মন্তব্য করা নিষ্প্রয়োজন। বিশেষ করে, বাংলাদেশে তারা যেসব দাবি করছে, তা জনস্বার্থে আদৌ গ্রহণযোগ্য বলে কেউ মনে করবেন না। প্রচণ্ড বেগে বর্ধিষ্ণু করোনা রুখতে যখন লকডাউন এবং আরো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়াই সঙ্গত, তখন লকডাউন তুলে দেওয়ার দাবি করে ব্যবসায়ী মহল আসলে নিজেদের মুনাফালোভী নগ্ন চরিত্রই প্রদর্শন করলো, যার নিন্দা ও ধিক্কার জানানোই সর্বসাধারণের কর্তব্য হওয়া উচিত।

অনেক বছর আগে এক সন্ধ্যায় জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেলে একজন বিশ্বনেতাকে সাক্ষাৎকারে শেষ প্রশ্ন করা হয়, ‘ভবিষ্যৎ আপনাকে কী ভাবে মনে রাখবে বলে আপনি আশা করেন’? ঘোর বাস্তববাদী নেতা চোখের পলক পড়ার আগেই জবাব দিয়েছিলেন, ‘ভবিষ্যৎ কাউকে মনে রাখে না, কাউকে নয়।

খুবই সত্যি কথা। ভবিষ্যৎ বা ইতিহাসের 'মনে রাখার' দায় খুবই কম। বিশেষত, মুনাফালোভী নগ্ন চরিত্রের কথা মনে রাখার তো প্রশ্নই উঠেনা। সমাজে, সংসারে, রাজনীতিতে, ব্যবসায় আত্মস্বার্থের আত্মরতির মৌতাতে যারা ভাসছে, তাদেরকে অবশ্যই একথা মনে রাখা দরকার যে,  'ভবিষ্যৎ কাউকে মনে রাখে না, কাউকে নয়।'

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর,  বার্তা২৪.কম এবং প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়