দেখানো ‘বৃদ্ধাঙ্গুলিই' আজ ভেঙে যাচ্ছে না তো!



সৈয়দ ইফতেখার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ব্যক্তিগত একটা অভিজ্ঞতা বলি। এপ্রিল, ২০২০। সেসময় কিছুটা অসুস্থ হই। দেশে করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকের কথা। টেস্ট করাই। কিন্তু উপসর্গের পরও নেতিবাচক কিছু আসেনি। আতঙ্ক ছিল চারিদিকে। এরপর দিন যতো গেছে কমেছে আতঙ্ক, দূর হয়েছে ভয়। ডিসেম্বরের শেষের দিকে অসুস্থতা তেমন একটা ছিল না। ছিল মাথা ব্যথা, মাথা ভার, বুকে ঠাণ্ডা, প্রচণ্ড শীত শীত অনুভূতি আর মুখে স্বাদ নেই এমন একটা অবস্থা। তিনদিন ওষুধ খাবার পরও কোনো কাজ হচ্ছিল না, পরে চিকিৎসকের পরামর্শে গেলাম করোনা টেস্ট করাতে। সেবার ভেবেছিলাম আমার করোনা হয়নি, টেস্ট করাতে যাচ্ছি আরও সাবধানে যাই। কারণ অন্যরা কোভিড রোগী, আমি নই! শেষে অন্যদের কথা জানি না, কিন্তু আমি ঠিকই পজিটিভ হলাম। খুদে বার্তায় পেলাম এই তথ্য।

মার্চের পর এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর-২০২০, ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ছিল দেশে। তবে বর্তমান সময়ের মতো এতোটা ভয়াবহ ছিল না। অক্টোবর থেকে ধীরে ধীরে কমতে থাকে। নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি- এমনকি তার আগের মাস সেপ্টেম্বর যোগ করলে হয় পাঁচ মাস। এই মাসগুলোতে আমরা হয়েছি বেপরোয়া। কারণ সেসময় থেকেই করোনাকে ভয় না পাওয়ার প্রবণতার শুরু। যার ফলাফল অসচেতনতা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া। অসচেতন হতে হতে আমরা এখন এমন পর্যায়ে যে আজ-কাল-পরশু রেকর্ড মৃত্যু দেখছে দেশ, আক্রান্তের ক্ষেত্রেও তাই। প্রতিদিনই ভাঙছে পুরাতন সর্বোচ্চ সংখ্যা।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলার কারণ হলো, ডিসেম্বরে আমি নিজেই দুইবার করোনা টেস্ট করাতে গিয়ে দেখেছি কত কম রোগী ছিল সেসময়। হাতে গোনা ৮-১০ জন মিলে একটি কেন্দ্রে আমরা টেস্ট করাই। দ্বিতীয়বার টেস্টের সময়ও তাই দেখি। অলস মধ্য দুপুরে কাক ডাকার আওয়াজ শুনতে শুনতে নমুনা দিয়েছিলাম সেসময়। টেস্ট করানোর ভিড় ছিল না, হাসপাতালে রোগী ছিল না, সব কিছুই ছিল খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আমি বলবো, ছিল অস্বাভাবিক। তার কারণটা হলো, আমাদের কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিক ছিল না। আর তাই লোকজনও ছিল না স্বাভাবিক। তারা অস্বাভাবিক রকমের বাঁধনহারা হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। যেন ভ্রমণ তাদের কাছে অভিযান হয়ে দাঁড়ায়, কেনাকাটা, উৎসব করা সৃষ্টি সুখের উল্লাসের মতো হয়ে ওঠে। বাড়ি বাড়িতে ছিল না নিয়ম মানার বিন্দুমাত্র বালাই। আর তাতেই বাড়তে থাকে সংক্রমণ। অভিজ্ঞতার কথা যখন বললামই তখন আরেকটি কথা বলি, ৩১শে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আমার মেজো চাচা সৈয়দ মমিনুল ইসলাম মারা যান। আমার কোভিড ধরা পড়ায় ঢাকা থেকে জেলা শহরে তাকে মাটি দিতে যেতে পারিনি। কেবল পরিবারের অন্যদের কথা ভেবে। আমি নিজে চাইলে আটকানোর কেউ ছিল না। উপস্থিত হতেই পারতাম, মাস্ক পরে থাকতাম, নিয়ম মানতাম। তবুও আমি চাইনি এমনটা করতে। আবেগ দিলেও, বিবেক সায় দেয়নি একবারও। কিন্তু যখন দেখি করোনা আক্রান্ত রোগী রাস্তা-ঘাটে, অফিস-আদালতে ঘুরে বেড়ায় তখন কষ্ট লাগে।

করোনা যখন কম ছিল তখন সরকারও হাসপাতালের ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, অক্সিজেন সংকট দূর করা, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র-আইসিইউ প্রতিষ্ঠা কোনো কিছুইতেই জোর দেয়নি। উল্টো অনেক কোভিড হাসপাতাল হয়ে যায় আরও দুর্বল। কারণ মনেই করা হয়েছিল এর পরবর্তী কোনো প্রয়োজন নেই! তাছাড়া ২০২১-এর মার্চের রাষ্ট্রীয় কিছু অনুষ্ঠান তো ছিলই। যার সার্বিক খেসারত এখন দিতেই হচ্ছে।

নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি- এমনকি তার আগের মাস সেপ্টেম্বর যোগ করলে হয় পাঁচ মাস- এই মাসগুলোতে আমরা বসে না থেকে ভবিষ্যতের জন্য কাজ করলে মৃত্যুর রেকর্ড সৃষ্টি হতো না। ঘরে ঘরে বর্তমানে আক্রান্ত রোগী। নিঃশ্বাসের হাহাকার সর্বত্র। এ দায় কার! আমাদের সবাই মিলে দেখানো ‘বৃদ্ধাঙ্গুলিই’ আজ ভেঙে যাচ্ছে না তো?

কিছুদিন আগে মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা হলো। সব যখন বন্ধ সেখানে, মেডিকেলের পরীক্ষা হয় কী করে! মেডিকেল সংশ্লিষ্টরাই বোঝেন না সংক্রমণ কী, কীভাবে ছড়ায়- আশ্চর্য বিষয়!

করোনা রোগীদের প্রধান কিছু উপসর্গের মধ্যে অন্যতম শ্বাসকষ্ট। যেসব রোগীর শ্বাস সহনীয় মাত্রায় থাকে, তাদের আলাদা করে শ্বাস গ্রহণের জন্য অক্সিজেনের দরকার পড়ে না। কিন্তু যাদের শ্বাসকষ্টের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়, তাদের শ্বাসযন্ত্র সচল রাখতে বাইরে থেকে অক্সিজেন প্রয়োগ করতে হয়। সাধারণ রোগীদের জন্য আইসিইউতে যে অক্সিজেন দেয়া হয়, সেটি এক মিনিটে ৫/৬ লিটার। কিন্তু করোনা রোগীর জন্য যে অক্সিজেন প্রয়োজন সেটি মিনিটে ৭০/৮০ লিটারের মতো। এটি হলো হাই ফ্লো নেজাল অক্সিজেন ক্যানোলা। বেসরকারি দুই থেকে তিনটি হাসপাতাল ছাড়া কোথাও এই অক্সিজেন নেই। এক রকম পিএসএ জেনারেটর স্থাপনের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালে এই অক্সিজেন উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু সময় থাকতে তা করা হয়নি। এখানে অবহেলা যেমন আছে, তেমনি এক শ্রেণির কর্মকর্তা উৎপাদনের বিরুদ্ধে। তারা বিদেশ থেকে কিনে এনে সরবরাহ করতে পছন্দ করেন। এতে তাদের পকেট ফুলে ওঠে।

বর্তমানে আমরা দেখছি হাসপাতালগুলোতে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক নিজেই এ কথা স্বীকার করেছেন। হাসপাতালের সাধারণ বেডও এখন সোনার হরিণ। চাপ বাড়ছে চিকিৎসক-সেবিকাদের ওপর। তারাও ভাবেননি, হঠাৎই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। ঢাকার বাইরের অবস্থা আরও করুণ। সেখানে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা। এই মুহূর্তে করণীয় হলো ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করে সর্বস্তরের মানুষের সেবা নিশ্চিত করা। আইসিইউ-এর প্রয়োজন হলে সেখান থেকে আইসিইউ’তে নিয়ে যাওয়া।

এ অবস্থার মধ্যেই লকডাউন চলছে, তাও আবার সব কিছু খুলে দিয়ে। রাস্তায় নেমে আন্দোলনও করতে পারছেন মানুষজন! জীবনের থেকে ব্যবসা-দাবি দাওয়া বড় হতে পারে না। এটা ভুলে গেলে চলবে না এখন সংকটকাল। কিন্তু কে শোনে কার কথা। মাস্ক না পরা অচেতন জনগণ আর তাদের নিয়ে ব্যবসা করা প্রশাসনই যখন সুযোগ সন্ধানী, তখন বেঁচে থাকাটাই বিলাসিতার মতো মনে হয়!

সৈয়দ ইফতেখার, লেখক ও সাংবাদিক