ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণে করোনা ও ঢিলেঢালা লকডাউন



প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান মিয়া
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বব্যাপী করোনার তান্ডব এখনো চলমান। দেখতে দেখতে ২য় বছর হয়ে গেলো অথচ করোনার তান্ডব যেনো শেষই হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের সমস্ত প্রচেষ্টাকে ম্লান করে দিয়ে করোনা এগিয়ে চলেছে নতুন শক্তি নিয়ে। সারাবিশ্বে এই পযর্ন্ত (৮ই এপ্রিল ২০২১ ইং) করোনায় আক্রান্ত হয়েছে সর্বমোট ১৩,৪০,৬৮,৩৭২ জন এবং মৃত্যুবরন করেছে মোট ২৯,০৬,৫৬২ জন। বাংলাদেশে করোনার ভয়াল ছোবলে মোট আক্রান্ত ৬,৬৬,১৩২ জন এবং মৃত্যু হয়েছে মোট ৯,৫২১ জনের।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া করোনা ভাইরাস ২০২১ সালে এসে এর ধরণ পাল্টেছে। করোনার মিউটেশন হয়েছে অর্থাৎ জিনোম সিকোয়েন্স পরিবর্তন হয়েছে। মূলত ভাইরাসের (স-জঘঅ ভাইরাস) চরিত্রই হলো সময়ের সাথে পরিবর্তিত হওয়া। সাধারণত ভাইরাস হোস্টের দেহে টিকে থাকার জন্য এই পরিবর্তন করে থাকে। এটা ভাইরাসের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট (নতুন স্ট্রেইন) যুক্তারাজ্য, আফ্রিকা, ব্রাজিল, ভারতে শনাক্তের পর বাংলাদেশেও এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে করোনার যুক্তারাজ্য ও দ. আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি ধরা পড়েছে।

করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট এর আক্রমণের ধরণ, বিস্তারের প্রকৃতি, উপসর্গ অনেকটা ভিন্ন। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন করোনার নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট আরো বেশী বিপদজনক হতে পারে। এটি খুব দ্রুত ছড়াচ্ছে। এক এক জনের দেহে এক এক রকম উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। সময়ের সাথে করোনা তার আজব আজব চরিত্র প্রকাশ করছে। করোনাকে নির্মূল করার জন্য ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। তবে অতি সল্প সময়ে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে বিভিন্ন দেশের প্রথিতযশা বিজ্ঞানীরা বিরাট চমক দেখিয়েছেন। বিভিন্ন দেশে এর সফল প্রয়োগও শুরু হয়েছে।

সরকারের বিশেষ উদ্যোগে বাংলাদেশের মানুষ প্রথমদিকেই করোনার ভ্যাকসিন নেয়ার সুযোগ পেয়েছে। অনেকেই ভ্যাকসিনের ১ম ডোজ নিয়ে ২য় ডোজের অপেক্ষায় আছেন। এরই মধ্যে করোনার ২য় ঢেউ শুরু হয়ে গেছে। করোনার নতুন স্ট্রেইন বিশেষজ্ঞদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। কারণ করোনার নতুন স্ট্রেইনদের মধ্যেও রয়েছে ভিন্নতা। এক এক দেশের নতুন স্ট্রেইন এক এক রকম। কোন স্ট্রেইন কি আচরণ করে তা আগাম বলা যাচ্ছে না। নতুন স্ট্রেইনগুলোর ভ্যাকসিন প্রতিরোধী হওয়ার আশংকা একদম উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। আজব চরিত্রের এই করোনার তান্ডব কবে শেষ হবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। সবাই সেই অপেক্ষাতেই আছে। করোনা মহামারী থেকে বাচঁতে মোক্ষম ও শেষ অস্ত্র হিসেবে বাংলাদেশে আবারও লকডাউন দেয়া হয়েছে। এপ্রিল ২০২১ এর ৫ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত, ৭ দিনের জন্য।

সর্বপ্রথম ২০২০ সালের মার্চের শেষের দিকে লকডাউনের কবলে পরেছিল বাংলাদেশ। তখনকার লকডাউনের দিনগুলি ছিল সত্যি অন্যরকম ও বিচিত্র। মানুষকে ঘরে রাখার জন্য সরকার সাধারন ছুটি ঘোষনা করেছিল। অকারনে বাইরে বের হওয়া মানা ছিল। পাড়া মহল্লায় অলি গলিতে ছিল বাশেঁর বেড়া যাতে অবাধে কেউ চলাফেরা করতে না পারে। লকডাউন পালনে প্রশাসন ছিল খুবই কঠোর। দীর্ঘদিনের লকডাউনে গোটাদেশ কার্যত অচল হয়ে পরেছিল। পরিবহন ব্যাবস্থা বন্ধ থাকায় মানুষ বাধ্য হয়েছিল ঘরে থাকতে। নিস্তব্ধ ছিল জনপদ। সাধারণ মানুষ কাজ কর্ম ফেলে ঘরে শুয়ে বসে থেকে অধৈর্য হয়ে গিয়েছিল।

২০২১ এ এসে আবার সেই লকডাউন। তবে এখনকার লকডাউন গতবছরের লকডাউন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেউ কিচ্ছু মানছে না বরং লকডাউনের বিরুদ্ধে মানুষ ভাংচুর করছে, করছে আন্দোলন। রাস্তাঘাটে মানুষ ও গাড়ির ব্যাপক সমাগম। মানুষ করোনাকে এখন আগেরমতো আর ভয় পাচ্ছে না। মাস্ক পড়ায় রয়েছে অনীহা। সামাজিক দূরত্ব মোটেও মানা হচ্ছে না। যদিও সংক্রমন আগের চেয়ে অনেক বেশী। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে হু হু করে। সরকার চাইলেও মানুষের অনীচ্ছার কারনে কঠোর হতে পারছে না। সার্বিক অব্যবস্থাপনার কারনে লকডাউন এখন অর্ধলকডাউনে পরিণত হয়েছে যা উপকারের চেয়ে ক্ষতি করছে বেশী। মনে রাখা প্রয়োজন, আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে। আমরা নিজেরা স্বাস্থ্যবিধি না মানলে করোনা থেকে বাঁচার সুযোগ খুব কম।

লেখক: পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক ফেলো শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি সায়েন্স মালেয়শিয়া, মালেয়শিয়া