শিক্ষাদানে মাদ্রাসাগুলো প্রযুক্তি বান্ধব হওয়া চাই



আহমাদ আল-গাজী
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনায় প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ, মারা যাচ্ছে অর্ধশতকের বেশী। ১৪ই এপ্রিল থেকে কঠোর লকডাউন দেয়া হয়েছিল। যদিও সবদিক চিন্তা করে লকডাউন অচিরেই প্রত্যাহার করা হবে, কিন্তু মৃত্যু ও সংক্রমণের এই ভয়াবহ হার বজায় থাকলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়াটা আরও বিলম্বিত হতে পারে।

আর এতে সবচে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কাওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। এজন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমগণের সনির্বন্ধ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গত কুরবানীর ঈদের পর কাওমী মাদ্রাসাগুলো খুলে দেয়া হয়েছিল, যদিও দেশের আর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে সকলে যা ভয় করেছিল তা ঘটেনি। অর্থাৎ প্রায় বিগত আট/নয় মাস মাদ্রাসাগুলোতে আবাসিক/অনাবাসিক ছাত্র একত্রে থাকা সত্ত্বেও করোনার প্রভাব মাদ্রাসায় তেমন একটা পরেনি। কিন্তু এখন যে কোন কারণেই হোক অনির্দিষ্টকালের জন্য মাদ্রাসাগুলো আবার বন্ধ হয়ে গেছে।

তাহলে এখন করণীয় কী?

প্রশ্নের জবাব খোঁজার আগে ১টি মৌলিক বিষয় ভাল করে বুঝে নেয়া দরকার। মাদ্রাসা শিক্ষার উদ্দেশ্য কি? কোন কাজের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। উদ্দেশ্য মূলত: ১টি হয় কিন্তু পদ্ধতি হতে পারে একাধিক। আবার উদ্দেশ্য অপরিবর্তনীয়, পদ্ধতি স্থান-কাল-পাত্র ভেদে পালটানো যায়। কিন্তু উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক হলে, পদ্ধতিকে বাদ দেয়া হয়।

এজন্যই বলা হয়, মাদ্রাসার শিক্ষা তো আর ১০টা দুনিয়াবী শিক্ষার মত নয়, কোনভাবে শেষ করতে পারলেই হল ! কারণ এই শিক্ষার উদ্দেশ্য হল: পয়গামে-মুহাম্মদীকে মানুষের ঘরে ঘরে অবিকৃত অবস্থায় পৌঁছে দেয়া। সেহেতু প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে নানা পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে ; কিন্তু থেমে থাকেনি শিক্ষা কার্যক্রম। এমন কী রাহবার হিসেবে যারা ছিলেন, তারা কারো অনুকুল্যের জন্য অপেক্ষাও করেননি। ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যায় মাদ্রাসা শিক্ষা এগিয়ে চলেছে। কখনো মসজিদের বারান্দায়। কখনো মাদ্রাসায়-নিযামিয়ার সুরম্য অট্টালিকায় ; কখনো দেওবন্দের ডালিম গাছের তলে ; আবার কখনো বাংলার গ্রামে গ্রামে টিনের ঘরে আর ছনের কুটীরে ।

বস্তুতঃ এই সকল পদ্ধতি সম্ভবপর হয়েছিল যুগসচেতন আলেমগণের ইজতিহাদের কারণে। আজ আবার সময় এসেছে দৃঢ়ভাবে তেমন কোন পদক্ষেপ নেওয়ার; মাদ্রাসা শিক্ষাকে সুষ্ঠুভাবে চালিয়ে নেওয়ার জন্য কার্যকরী বিকল্প পদ্ধতি বের করার! করোনার সংক্রমণ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন যখন মাদ্রাসাগুলো খুলে দেয়, তখনই মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল তাদের পাঠদানের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে কাজ করা। স্পষ্টতই তারা সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এক্ষেত্রে অনেক ওস্তাদ বলবেন, আমরা তো গত বছর অনলাইন-দরস করেছি, এ বছরও করবো!

বেশ! বাস্তবে তারা কী করেছেন? আসলে তারা (কেউ কেউ, তাও সকলে নয়) ‘ফেসবুকে লাইভে’ এসে দরস দিয়েছেন। কিন্তু এটাকে কি অনলাইন-দরস বলে? এক কথায়, ‘না’। কারণ, এই প্রযুক্তি যারা বানিয়েছেন তারা অনলাইন শিক্ষাদানের এর জন্য এটি তৈরি করেননি।

বাস্তব দুনিয়ায় ডাক্তারি-ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য যেমন আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান আছে, ভার্চুয়াল জগতেও তেমনি ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অ্যাপস আছে। ভিডিও কনফারেন্সের জন্য সবচে উপযোগী দুটো অ্যাপস হচ্ছে জুম এবং গুগল মিট। এই কারণে বিশ্বের প্রায় সকল উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ এই দুটোর কোন একটি ব্যবহার করছেন। অনুরূপভাবে এদেশের শ্রদ্ধেয় আলেমগণ যদি এগুলোর ব্যবহার শুরু করেন তবে অনলাইন-দরস হবে মানসম্মত, ছাত্র-শিক্ষক উভয়ে উপকৃত হবে। এগুলোর ব্যবহার শিখন কঠিন কিছু নয়, তবে প্রয়োজন অদম্য আকাঙ্খা আর মেহনত।

প্রসঙ্গত আর একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়। এদেশের ৯৫ শতাংশেরও বেশী কাওমী মাদ্রাসার কোন মানসম্মত ওয়েবসাইট নেই। অথচ যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য ইন্টারনেটের দুনিয়ায় একটি মানসম্মত ওয়েবসাইট অতটুকু দরকার, বাস্তব জগতে প্রতিষ্ঠানটির জন্য জমি এবং ঘর যতটুকু দরকার। কিন্তু এই বিষয়টি খুব করে উপেক্ষা করা হচ্ছে। দায়সারাভাবে তৈরি ফেসবুক পেইজ কখনো একটি মানসম্মত ওয়েবসাইটের বিকল্প হতে পারে না।

মাদ্রাসার নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে এখনো প্রায় এক মাস বাকি আছে। সুতরাং অযথা দেরি না করে প্রফেশনাল ওয়েব ডিজাইনারের দ্বারা যার যার মাদ্রাসার জন্য একটি মানসম্মত ওয়েবসাইট তৈরী এবং উহাকে নিয়মিত হালনাগাদ করতে সকল মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ যত্নবান হবেন। এটা সময়ের, বাস্তবতার দাবী।

লেখক: শিক্ষার্থী, জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া আরজাবাদ