অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনিকার দ্বিতীয় ডোজের বিকল্প হতে পারে স্পুটনিক-ভি



ড. মো. একরামুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনিকা কোভিড ১৯ ভ্যাকসিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং ভারত-বাংলাদেশসহ একাত্তরটিরও বেশি দেশে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হয়েছে । তবে রক্তের জমাট বাঁধার মত বিরল পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার কারনে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মানুষের মাঝে উদ্বেগের সৃষ্টি করে।

কয়েক মিলিয়ন লোক রয়েছে যারা এই টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছেন কিন্তু এখন দ্বিতীয় ডোজ নিতে তারা শঙ্কিত । তাই একই ব্যক্তিকে দুটি ভিন্ন ভ্যাকসিন প্রদান এবং সেটা নিরাপদ কিনা তা বিবেচনা করছে ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞ কমিটি। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের ৩ কোটি ডোজের, প্রতি মাসে ৫০ লাখ করে টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭০ লাখ টিকা আাসার পর বাংলাদেশে আর কোনো টিকার চালান আসেনি।

যুক্তরাষ্ট্র টিকার কাঁচামালের রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো টিকা উৎপাদন করতে পারছে না বিদায় ভারত থেকে চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো করোনার টিকা পাচ্ছে না বাংলাদেশ। দেশের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের পর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ক্রমে রাশিয়ার তৈরি স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিন ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে। স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিনের ব্যতিক্রমী বিষয়টি হচ্ছে রাশিয়ান গবেষকরা প্রথম ডোজের জন্য স্পাইক প্রোটিন জীনের বাহক হিসাবে এক ধরণের অ্যাডেনোভাইরাস, অ্যাড ২৬ এবং দ্বিতীয়টির জন্য অ্যাড ৫ ব্যবহার করেছেন কিন্তু অক্সফোর্ড – অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনে, উভয় ডোজের জন্য একই উপাদান বা অ্যাডেনোভাইরাস ব্যবহার করা হয়েছে।

রাশিয়ান গবেষকদের মতে প্রথম ডোসের পর আমাদের ইমিউন সিস্টেম অ্যান্টিবডি তৈরি করে এডিনোভাইরাস ভ্যাকসিনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, যা দ্বিতীয় ডোজকে অকার্যকর করে তোলে। যে কারনে হয়ত স্পুটনিক ভি, অক্সফোর্ড–অ্যাস্ট্রাজেনেকার তুলনায় বেশি কার্যকর।

যুক্তরাষ্ট্রের টিকাদান সম্পর্কিত যৌথ কমিটির পরামর্শ হচ্ছে যারা অ্যাস্ট্রাজেনিকা ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ পেয়েছেন তাদের সকলের বয়স নির্বিশেষে অ্যাস্ট্রাজেনেকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া উচিত। করোনার বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষার জন্য দ্বিতীয় ডোজ গুরুত্বপূর্ণ, এমন কি ডাবল মিউট্যান্টের বিরুদ্ধেও এটা কার্যকর। যেহেতু আমাদের এখন অস্ট্রজেনেকা ভ্যাকসিন পাওয়া অনিশ্চিত, সুতরাং দ্বিতীয় ডোজের বিকল্প হিসাবে স্পুনিক ভ্যাকসিন ব্যবহার করতে পারি কিনা!

উল্লেখ্য, যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা এবং ফাইজার-বায়োএনটেকর মিশ্রিত ডোজ কার্যকর কিনা তা খতিয়ে দেখার জন্য পরীক্ষা শুরু করেছেন । তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সম্মত হন যে ভ্যাকসিনগুলির মিশ্রণ নিরাপদই হওয়া উচিত। তবে ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলছে। যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজ পেয়েছেন ফ্রান্সের স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক তাদের ১২ সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয় শটের জন্য ফাইজার বা মডার্নার টীকা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন রক্ত জমাট বাঁধার মত বিরল পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া এড়াতে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটার ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। জার্মানিও একই ধরণের পথ অনুসরণ করছে। জার্মান ভ্যাকসিন কমিটি সুপারিশ করেছে যে ষাট বছরের কম বয়সী ব্যক্তিরা যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার একটি ডোস পেয়েছেন তাদের দ্বিতীয় ডোসের জন্য একটি আলাদা ভ্যাকসিন বেছে নেওয়া উচিত। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ ইমিউনোলজির অধ্যাপক ড্যানি আল্টম্যান জানিয়েছেন, দুটি ডোজের একটি ডোজ ভিন্ন ভ্যাকসিন হলেও নিরাপদ না হওয়ার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এর মতে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে অর্থাৎ যেখানে একটি ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজের পর ঐ ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজের সংকটের কারনে mRNA টাইপের ভ্যাকসিন দেওয়া যেতে পারে।

কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ মেডিসিনের সংক্রামক রোগের বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু ফ্রেডম্যান বলেছেন: মিক্স অ্যান্ড ম্যাচিং-এর ধারণাটি দেখার জন্য অধ্যয়ন চলছে। আমি মনে করি না যে এস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের একটি ডোসের সাথে অন্য একটি ভ্যাকসিনের ডোস অনুসরণ করতে পারবেন না। এটি সম্ভব এবং নিরাপদ না হওয়ার কোন তাত্ত্বিক কারণ নেই। তবে এই অধ্যয়নের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ভ্যাকসিন মিশ্রণের প্রভাবগুলি দেখতে বেশ কয়েকটি পরীক্ষা চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেব্রুয়ারিতে অ্যাস্ট্রাজেনেকা-অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনকে ফাইজার-বায়োএনটেকের সাথে মিশ্রিত পরীক্ষা শুরু করেছিল। আগামী ২/১ মাসের মধ্যে ফলাফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। পৃথকভাবে, অ্যাস্ট্রাজেনেকা-অক্সফোর্ড এবং রাশিয়ান স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিনের সংমিশ্রণের গবেষণাও শুরু হয়েছে।

আমরা জানি, সবগুলো ভ্যাকসিনে করোনা ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন জীন ব্যবহার হয়েছে। আমাদের শরীরে ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর ঐ জীনটি ট্রানস্ক্রিপশন এবং ট্রান্সলেশন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে স্পাইক প্রোটিনে পরিনত হয়। সেটি এন্টিজেন হিসাবে আমাদের ইমিউন সিষ্টেমের সেলগুলোর সাথে প্রতিক্রিয়া ঘটিয়ে এন্টিবডি এবং মেমোরি বি-সেল তৈরি করে। সুতরাং কোভিড-১৯ এর সবগুলো ভ্যাকসিন কার্যকারিতা প্রকাশের একই মেকানিজম অনুসরণ করে বিধায় ভ্যাকসিন মিশ্রণের ক্ষেত্রে জটিলতা নাই।বাংলাদেশে অ্যাস্ট্রাজেনিকার ২য় ডোজের বিকল্প হিসাবে স্পুটনিক ভি ব্যহারের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটিকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। অ্যাস্ট্রাজেনিকার পাশাপশি স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিনের সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের ভ্যাকসিন প্রয়োগে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক এবং কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাক বাংলার কোটি মানুষ।

লেখক: ড. মো. একরামুল ইসলাম, প্রফেসর ফার্মেসি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।