ঈদের আনন্দ ও করোনা বিপদের সন্ধিক্ষণে মানুষ



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের কোভিড পরিস্থিতি এ মুহূর্তে আপাত সহনীয় পর্যায়ে হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে তা 'বেশ ভয়াবহ'। বিদ্যমান ভয়াবহতা চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ভয়ঙ্কর পর্যায়ে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশে। করোনার প্রকোপে পার্শ্ববর্তী ভারতে মৃত্যুর আদিঅন্তহীন নগ্ন পদধ্বনিতে চলছে স্মরণকালে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়। আরেক প্রতিবেশী নেপালও করোনায় নাকাল। সেখানে অক্সিজেনের জন্য চলছে চরম হাহাকার।

সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল যখন বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে মহাবিপর্যয়ের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশও বিপদ আর ঝুঁকির বাইরে নেই। উপরন্তু, আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে গৃহযাত্রার সম্ভাব্য আনন্দের নামে যে বিশৃঙ্খলা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে,  তাতে সম্ভাব্য 'চরম করোনার বিপদ'-এর সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন নিপতিত হতে চলেছে বলেই সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

বিশেষত, সব ধরনের সাবধানবাণী ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পঙ্গপালের মতো মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছে ঈদযাত্রায়। মহাসড়ক, ফেরিঘাটে যানজট ও মানুষের সীমাহীন ভিড় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনি দিয়েও সামলানো যাচ্ছে না। ঘরে থাকার জন্য সরকারি-বেসরকারি ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আর্জি মোটেও গ্রাহ্য করছে না সাধারণ মানুষ। এমনকি, পাশের ভারতে মৃত্যুর মিছিল, লাশের সারি দেখেও ভ্রূক্ষেপ করছেনা লোকজন। অক্সিজেনের জন্য হাহাকার ও চরম দুর্ভোগের করুণ চিত্রও বিশেষ কোনও মনোবিকার তৈরি করছেনা ঈদযাত্রায় উন্মাদ-প্রায় লোকজনের মনে।

অথচ করোনাভাইরাসের ব্রাজিলিয়ান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মিউটেশনের সাথে বাংলাদেশে ধরা পড়ছে মারাত্মক ভারতীয় ধরন বি ১.৬১৭। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে মনে হলেও মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ঈদ-উল ফিতরকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে যে নিয়ন্ত্রণহীন ভ্রমণ-প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে অবস্থা যেকোন সময়েই উল্টে যেতে পারে।

এমন আশঙ্কা মোটেও অমূলক নয়। ভারতে মানুষের দুর্দশার কথা চিন্তা করুন। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় তারা বাংলাদেশের চেয়ে অনেকটাই অগ্রসর হলেও ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে তাদের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা সত্যিই দুঃখজনক। নির্বাচনকে 'গণতন্ত্রের উৎসব' বানিয়ে মিছিল-মিটিং, সমাবেশ করা হয় করোনার মধ্যে। লক্ষ লক্ষ ভক্ত ও নাগা সন্ন্যাসীর অংশগ্রহণে পালিত হয় কুম্ভমেলা। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কার্যক্রমের লাগামহীন বাড়াবাড়ি ও নিয়ন্ত্রণহীনতার প্রতিফল দেখা যাচ্ছে ভারতে মৃত্যু ও আক্রান্তের সীমাহীন প্লাবল্যে, যা নিয়ন্ত্রণে সে দেশে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে দায়ী করছে বিশেষজ্ঞর।

একই সমস্যা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। 'চীনা ভাইরাস' বলে অবজ্ঞা করার ফলে বৃদ্ধি পায় প্রকোপ। এবং নিকট-অতীতের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ব্যর্থতার চিত্র দেখা যায় সেখানে। মৃত্যু ও আক্রান্তের নিরিখে বিশ্বের শীর্ষ করোনা-ক্ষতিগ্রস্ত দেশে পরিণত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। 

আসলে, চরম মহামারি নেমে এলে বস্তুতপক্ষে কোনও স্বাস্থ্যব্যবস্থাই সেই বিপদের ঢল সামাল দিতে পারেনা। উন্নয়নশীল দেশে তো সেটা আরও অকল্পনীয় বিপদের মতো দেখা দিতে পারে। বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রায়-দেড় বছরের বিরূপ ও দুঃখজনক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই কঠিন সত্যটিই উপলব্ধি করেছে বিশ্ববাসী।

ফলে বিশাল জনসংখ্যার বাংলাদেশকে করোনার বৈশ্বিক ঢেউ সম্পর্কে থাকতে হচ্ছে অতি সচেতন সতর্ক। কারণ, সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা জনসংশ্লেষে দ্রুত ছড়ায়। এজন্যই বার বার সঙ্গরোধ ও সামাজিক দূরত্বের কথা বলা হচ্ছে। বিশেষণ, দ্বিতীয় বা তৃতীয় ঢেউয়ে এবং করোনার নতুন ধরণের বা প্রজাতির ভাইরাসের সংক্রমণের ও আক্রান্তের ক্ষমতা অনেক বেশি বলেই প্রয়োজন অধিকতর সতর্কতার। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে চরম উল্টাচিত্র দেখা গেলো সীমাহীন নাগরিক উদাসীনতায়, মার্কেটে, গণপরিবহণে, হাট-বাজারে এবং ঈদযাত্রার নৈরাজ্যজনক ভিড়ে, যা বিপদের ভয়কে বহুগুণে বাড়াতে ও  ভীতির জায়গা থেকে বাস্তবে পরিণত করতে পারে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন যে, কোনও ভারতীয় সংস্করণে (বি ১.৬১৭) আক্রান্ত একজন ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে ৪শ জন ব্যক্তিকে সংক্রামিত করতে পারে- এ অবস্থায় বাংলাদেশের সম্ভাব্য অবস্থাটি কী হতে পারে, তা কল্পনা করতেও ভয় হয়। অতি উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্বের বাংলাদেশে-যেখানে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা মূলতঃ শহরকেন্দ্রিক এবং রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় সংস্কারের তীব্র অভাব, সেখানে বি ১.৬১৭-এর যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ আমরা ভারতে দেখছি। সেই একই পরিস্থিতিতে যদি দেশ পড়ে, তবে কিছুতেই সংক্রমণের ব্যাপক বিস্তার এবং এর ফলে প্রাণহানির আধিক্য রোধ করা সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশে এই বিপর্যয় কমিয়ে আনার একটি উপায় হল গণটিকা গ্রহণ এবং ব্যাপক প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন। বাংলাদেশ সরকার অ্যাস্ট্রাজেনেকা (ভারতের সিরাম’র তৈরি) ভ্যাকসিন সংগ্রহের ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা দেখিয়েছে ঠিকই, তবে ভারত চুক্তি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা সরবরাহে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে, এখন প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশির দ্বিতীয় ডোজ টিকাগ্রহণ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, যদিও চীন থেকে কিছু টিকা এসেছে এবং রাশিয়া ও অন্য সূত্র থেকে টিকা সংগ্রহের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

ফলে আঞ্চলিকভাবে তীব্র করোনা বিস্তার ও ক্ষয়-ক্ষতির পটভূমিতে আপাত কম বিপদে থাকলেও বাংলাদেশ মোটেও বিপদমুক্ত নয়। বরং সার্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে বিরাজ করছে উচ্চ ঝুঁকি, যা টিকাকরণ ও সামাজিক স্বাস্থ্যবিধি পালনের মাধ্যমে কমানো যেতে পারে। টিকাকরণ সংক্রান্ত কার্যক্রম নানা বিঘ্ন পেরিয়ে চলছে। কিন্তু সামাজিক দূরত্ব মান্য করার বিষয়টি একেবারেই ভেঙে পড়েছে। গত বছরেও গার্মেন্টস খোলা-বন্ধের ঘোষণায় দোদুল্যমানতা থাকায় শ্রমজীবী মানুষের বিশাল সংখ্যক মুভমেন্ট হয়েছিল, যা করোনার বেগ বৃদ্ধি ও বিস্তারে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। 

এবার ঈদের আনন্দের নামে পথে পথে হাজার হাজার মানুষের উন্মাতাল ঈদযাত্রা নতুন করে করোনা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘোরতর বিপদের সন্ধিক্ষণে  মানুষের কাণ্ডজ্ঞানহীন চলাচলের ঘটনা সামনের দিনগুলোতে বড় কোনও বিপদের কারণ হলে কে সামলাবে?

বাড়ি থেকে একইভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন সবকিছু গুঁড়িয়ে-মাড়িয়ে ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরে ফিরে আসবে, তখনও 'ফিরতি-ঈদযাত্রা' বা 'প্রত্যাবর্তন'-এর নামে পথে, ঘাটে, ফেরিতে অকল্পনীয় ভিড় ও ঠেলাঠেলি হবে, যা হবে করোনা সংক্রমণের নতুন কারণ। চারদিক থেকে ধেয়ে আসা করোনার সুতীব্র বিপদের মুহূর্তে ঈদযাত্রা ও মানুষের মেলামেলার ফলে নতুন বিপদ তৈরি করা মোটেও কাজের কাজ নয় এবং এসব বিপদ সত্যি সত্যিই আপতিত হলে সামলানোর সক্ষমতাও আমাদের যথেষ্ট পরিমাণে নেই।

অতএব, বিপদ নেমে আসার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ঈদের আনন্দ ও করোনা বিপদের সন্ধিক্ষণে বিপন্ন মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। নতুন কোনও বিপদ তৈরি হতে না দেওয়া। টিকার ব্যবস্থা করা। করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা কাঠামোর সক্ষমতা দ্রুততার সঙ্গে বৃদ্ধি করা এবং মানুষকে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মান্য করানোর বিষয়ে চূড়ান্ত কঠোর পন্থা অবলম্বন করা।