আর্থিক জগতে লুটপাট



এরশাদ মজুমদার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

অনেকদিন ধরেই ঘরে বন্দী। শুয়ে বসে দিন কাটাই আর মোবাইল ঘাটি। এ বছরের বই মেলার জন্যে কোন বই রেডি করি নাই। ভাবলাম আলমগীর সাহেবতো নিয়মিত অফিস করছেন লিখছেন। আমরাতো সমবয়সী। তাই শুরুর চেষ্টা করছি। প্রথমেই মনে পড়লো বাংলাদেশের আর্থিক খাতের কথা। এ খাতের তদারকি সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ব্যাংকের ভিতরেই ঢুকে বসে আছে বেশ কিছু চোর ডাকাত। পিকে হালদার নামক মহা ডাকাত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চোর ডাকাতদের পালতো। হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করতে হালদারকে একটা বিরাট সহযোগী বাহিনী তৈরি করতে হয়েছে। সমাজের সকল স্তরের মানুষেই আছেন। তাই সে বিনা বাধায় সীমান্ত পার হতে পেরেছেন। এমন কি হালদার দুজন সুন্দরী নারীও রেখেছিলেন। তারা হালদারের মনোরঞ্জনসহ তার মেহমানদেরও খেদমত করতো। এমন করেই হালদার সরকারি বেসরকারি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাতে রেখেই টাকা হাতাবার ও পাচার করার কাজ করতেন। এভাবেই সে চারটা লিজিং কোম্পানি নিজের দখলে নিয়েছেন এবং সেখান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিয়ে দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন।

শুধু লিজিং কোম্পানি নয় দুয়েকটা ব্যাংকেও দেউলিয়া বানাবার পথ পরিষ্কার করে দিয়েছেন হালদার সাহেব। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্তারা বিষয়টা খুব ভালো করে জানতেন। পিপলস লিজিংয়ের ক্ষুদ্র আমানতকারীরা রাস্তায় নামার পর বিষয়টা সরকার ও জন সাধারণের নজরে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংক চেয়েছিল চুপচাপ গোপনে বা আধা গোপনে পিপলস লিজিংকে বন্ধ করে দিতে। হাজার হাজার ক্ষুদ্র আমানতকারী ফকির হয়ে গেলে বা মরে গেলে গভর্নর সাহেবের কিছু আসে যায় না। তাঁর ব্যাংকের ভিতরেই চোর ডাকাতেরা বসে আছেন তার কোন খবর গভর্নর সাহেব রাখেন না।

না রাখলে কি তাঁর চাকরি যাবে? না যাবে না। এমন কি তিনি অর্থমন্ত্রীও হয়ে যেতে পারেন। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লুট হয়ে গিয়েছে। তাতে কারো কিছু হয়নি। বরং সে সময়ের গভর্নর আনন্দে দিল্লি চলে গিয়েছিলেন বেড়াতে। তখনকার রাবিশ অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, এটা তেমন কোন টাকা নয়। রিজার্ভ লুটকারীরা বিদেশে ডলার পাচার করে জুয়ার আসর বসিয়েছিল। কিন্তু লিজিং কোম্পানির হাজার হাজার কোটি টাকা যারা লুট করেছে তারা দেশেই আছে। হয়ত কয়েক জন আটক হয়েছে। মূল লুটেরা পিকে হালদার বিদেশে বসে কল কাঠি নাড়ছেন। দেশের রিজার্ভের ডলার যারা লুট করার ব্যাপারে যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের পরিচয় দেশবাসী আজও জানে না। তারা হয়ত এখনও বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করছেন। হয়ত বিদেশে চলে গেছেন। প্রখ্যাত চাষি সন্তান সাবেক গভর্নর দেশেই আছেন। তিনি হয়ত সবই জানেন। সাবেক রাবিশমন্ত্রীও সব জানেন। যদিও তিনি প্রথমে বলেছিলেন আটশ মিলিয়ন ডলার তেমন কোন অর্থ নয়। পরে প্রায়ই বলতেন টাকা ফেরত নিয়ে আসবেন।

পিকে হালদার তার লুটপাটের দলে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জড়ো করেছিল যাঁরা তাকে লুটপাটে সাহায্য করেছে অর্থের বিনিময়ে। লুটপাটের টাকা হালদার দুই হাতে বিলাতেন। তিনি তার তাবেদারদের ক্ষমতাবান করে তুলেছেন। তাদের কোটি কোটি টাকার মালিক বানিয়েছেন। যাকে ইচ্ছে তাকে এমডি চেয়ারম্যান বানিয়ে দিতেন। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমর্থন ছিলো। এমনকি হালদার নিজের মায়ের নামেও কয়েকশ কোটি টাকা জমা রেখেছিলেন কয়েকটি ব্যাংকও দেউলিয়া হতে চলেছে। সরকারেরও বেহালদশা। যাকেই পদ পদবি দেয় সেই লুটপাটে অংশ নেন। বেসিক ব্যাংককে লুটে খেয়েছে এক আত্মীয়। ব্যাংকের অনেকের চাকরি গিয়েছে। কিন্তু আত্মীয়ের কিছু হয়নি। হয়ত আগামীতে তিনি এমপি মন্ত্রীও হয়ে যেতে পারেন। এক সাবেক সচিব এক সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে পরে মন্ত্রী হয়ে যান। সরকার খুশি হয়ে সেই মন্ত্রীকে এক কৃষক ব্যাংক দান করেন। সেই কৃষক ব্যাংক শেষ পর্যন্ত কৃষকের মতো হাড্ডিসার হয়ে যায়। সেই ব্যাংক এখন পদ্মানদী। নাম পরিবর্তন করে এখন আমানত নিতে শুরু করেছে জনগণের কাছ থেকে।

আপনারা তো জানেন, ব্যাংকগুলোর কয়েক লাখ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। খেলাপিরা সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁরা এমপি মন্ত্রী হন। সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থায় আছে সরকারি মালিকানার ব্যাংকগুলো। এর আমানতের কোন হিসাব নিকাশ নাই। এমডি চেয়ারম্যান বা বোর্ড সবাই মিলে দলবেঁধে খেলাপিকে টাকা দেয়। কিছু হিস্যা এদিক সেদিক বণ্টন হয়। আর্থিক খাতে এমন লুটপাট আধা কলোনি আমলে ছিলনা। লুটপাট থাকলেও তা হয়ত পাঁচ দশ পার্সেন্ট এর সীমাবদ্ধ ছিল। পাকিস্তান আমলে বাঙালিদের দুটো ব্যাংক ছিল। একটা মার্কেন্টাইল( পুবালী), আরেকটা ইস্টার্ন ব্যাংকিং( উত্তরা)। এ দুটোর মালিক ছিলেন একে খান সাহেব ও জহিরুল ইসলাম সাহেব। উত্তরা ব্যাংকের মালিক এখনো জহিরুল ইসলাম সাহেবের পরিবার। একে খান সাহেব পাকিস্তান আমলে শিল্পমন্ত্রী ছিলেন। ব্যবসায়ী বা মন্ত্রী হিসাবে একে খান সাহেবের কোন বদনাম আমরা শুনিনি। জহিরুল ইসলাম সাহেবের পরিবার সম্পর্কেও তেমন বদলাম আমরা শুনি না। তবে গরিবের জমি দখলের ব্যাপারে ইস্টার্ন হাউজিং এর বদনাম আছে। ব্যাংকের আমানতের ব্যাপারে পাকিস্তান আমলে এই দুই পরিবারের কোন বদনাম শুনিনি। ১৯৮৩ সালে যখন বেসরকারি খাতে মাত্র তিনকোটি টাকা পেইডআপ ক্যাপিটেল নিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। এর উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মুজিবুল হায়দার চৌধুরী সাহেব। যাঁরা পাঁচ দশ লাখ পুঁজি দিয়ে অনেকেই পরিচালক হয়েছেন। এক পর্যায়ে পরিচালকরা বুঝতে পারলেন হায়দার চৌধুরী থাকলে তারা লুটপাট করতে পারবে না। তাই তাঁকে বের করে দেয়া হলো। এখনতো ন্যাশনাল ব্যাংক পুরোটাই শিকদার গ্রুপের কবজায়। এখন ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় চারশ কোটি টাকা মূলধন লাগে। যিনি রাজনৈতিক কারণে লাইসেন্স পান তিনি শেয়ার বিক্রি করে চার পাঁচশ কোটি টাকার মালিক হয়ে যান। পাকিস্তান আমলে বাইশ পরিবারের নাম শোনা যেতো। এখন বাইশ হাজার বাঙালি পরিবারের নাম শোনা যায়। বেশ কয়েক বছর আগে দ্বীপবন্ধু নামে পরিচিত এক সাবেক এমপি বাংলাদেশ কমার্স নামে একটি বিনিয়োগ কোম্পানি খুলেছিলেন। তিনি এমপি হয়ে সেই দেউলিয়া কোম্পানিকে ব্যাংকে রূপান্তরিত করে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক নাম দিয়েছিলেন। এখন গুজব শোনা যাচ্ছে এই ব্যাংকটাও দেউলিয়া হতে চলেছে।

এখন বাঙালিরা বাংলাদেশে আয় করে মানে ব্যাংক লুট করে আর সে টাকা ক্যানাডা ও মালয়েশিয়ায় নিয়ে যান। সেখানে বাড়িঘর বানান। ছেলেমেয়েদের বিয়েশাদী করায় পাকিস্তান ও ভারতে। এর ভিতরে হালদারের নাম খুব বেশী প্রচারিত হয়ে গেছে। যেমন, আল আমিন গ্রুপ পিপলস লিজিং থেকে লুট করেছে প্রায় চারশ কোটি টাকা। আবার তারাই পিপলস লিজিংএর মালিকানা নেয়ার জন্য দরবেশ সাহেবের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন। দরবেশ সাহেবের সহযোগিতায় ভদ্রলোক পিপলস লিজিং এর দায়িত্ব নিতে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি নিজেই আলামিন গ্রুপের নামে পিপলস লিজিং এর চারশ কোটি টাকা মেরে দিয়েছেন। এখন ধরে পড়ে বলছেন, তিনি একশ বছরের মধ্যে সব টাকা শোধ করে দিবেন। শুধু তাঁকে বা তাঁদের বিদেশ যেতে দেয়া হোক। ব্যাংকের একাউন্ট খুলে দেয়া হোক। পিকে হালদারও একই কথা বলছে। তাকে ব্যবসা করার সুযোগ দিলে সে টাকা ফেরত দিবে এবং নিয়মিত ব্যবসা করবে। তাকে গ্রেফতার করা যাবে না। হালদারের পক্ষে দালালি করার জন্যে এখনও বহু দালাল আছে। আগেও বলেছি, পিকে হালদার বহু দালালকে টাকা দিয়ে রেখেছেন তার পক্ষে কাজ করার জন্যে। মনোরঞ্জনকারী মহিলার মধ্যে একজন এখনও বাইরে আছেন এবং নিয়মিত অফিস করছেন আর পিকের জন্যে তদবির করছেন।?

পিকের লুটপাটের মতো এতো বড় কেলেঙ্কারি আর্থিক জগতে এর আগে আর কখনও হয়নি। অনেকেই দশ পনেরো বিশ হাজার কোটি ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েও দেশে আছে এবং ব্যবসা করার চেষ্টা করছে। আলামিন গ্রুপের আরেফিন এখনও দেশে আছে। ব্যাংক ব্যবাস্থাপনায় কার্যকরি শক্ত সুপারভিশন থাকলে এতো ঋণ খেলাপি হয়না। ধনীরা বুঝতে পেরেছে একবার টাকা আটকিয়ে দিলে আবার টাক না দিয়ে ব্যাংক যাবে কোথায়? তার উপরে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব। এর জলন্ত উদাহরণ হলেন সম্মানিত দরবেশ সাহেব। তিনি নানাভাবে ব্যাংক থেকে টাকা নেন, রিশিডিউল করেন। তিনি ব্যাংক বীমার মালিকও হন। শেয়ার বাজারে তাঁর খেলাধুলাতো আছেই। পিপলস লিজিং দখলে নেয়ার জন্যে তিনি আলামিন গ্রুপের আলামিনের জন্যে তদবির করেছেন। আমানতকারীরা কিছুদিন আরেফিনের পিছে ঘুরাঘুরি করেছেন। পরে দেখা গেল আরেফিন নিজেই পিপলস লিজিং এর টাকা মেরে বসে আছেন।

এখন সরকার আর্থিক সংকটে আছে। চারিদিক থেকে টাকা সংগ্রহের চেষ্টা করছে। কোথায় কোন সংস্থার কাছে উদ্বৃত্ত তা খুঁজে বেড়াচ্ছে। উন্নয়নের জন্য সরকারের কাছে এই মুহূর্তে প্রয়োজনীয় অর্থ নেই। এ বছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য আদায় হচ্ছে না। এমন কি ব্যক্তি আয়করদাতা যাদের তেমন কোন আয় নেই আদের কাছেও অগ্রিম আয়কর চেয়ে চিঠি দিচ্ছেন । এমন কি আইনের ভয়ও দেখানো হচ্ছে। আয়কর বিভাগ এমন নোটিশকে তাদের রুটিন কাজ মনে করেন। আগে গাড়ি বীমায় ফার্স্ট পার্টি ও থার্ড পাটি ব্যবস্থা ছিল। এখন ফার্স্ট পার্টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সরকারি বেসরকারি, কোম্পানির ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা ঠিক আছে। কিন্তু একজন মধ্যবিত্ত যিনি ঢাকা শহরের যান ব্যবস্থার কথা মনে করেন তার পরিবারের জন্য একটা ছোটখাট পুরনো গাড়ি হলেও চলবে তারজন্য বাধ্যতামূলক ফার্স্ট পার্টি বীমা এক ধরণের অত্যাচার। একটি গাড়ির জন্য সরকার আয়কর, রোডট্যাক্স, ফিটনেস ও ইত্যাদি খাতে বছরে ৩০/৪০ হাজার টাকা আদায় করেন। এছাড়াও রয়েছে বার্ষিক আয়কর।

অপরদিকে সরকারের আত্মীয় স্বজনরা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নানা কৌশলে টাকা তুলে নিচ্ছে। সে টাকা ফেরত দেয়ার বিষয়টা গৌণ। কারো কিছু বলারও নেই। ব্যাংক নিয়মিত চিঠি লিখে আইনি দায়িত্ব পালন করে। খুব বেশী হলে একটা মামলা করে রাখে। পিকে হালদারের বিষয়টা নতুন ধরণের এবং নতুন কৌশলের। সে বাংলাদেশ ব্যাংককে হাত করেছে। ফলে ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালক পিকের কাছ থেকে মাসিক বেতন নিতেন। বড় কোন দাও মারলে এদেরকে থোক বরাদ্দ দিতো। সে নিজেই ব্যাংকার, জানে কি কাগজ বানালে টাকা মারা যাবে। চারটা লিজিং কোম্পানিকে সে ফতুর করে ছেড়েছে। হালদারের এ লুটপাটের কথা যেই জানতো সেই ভাগ পেতো। তার জমির দলিলের গুদাম ছিল। সে গ্রামে গঞ্জে জমি কিনতো অতি সস্তায়। একটাকার জমিকে পঞ্চাশ টাকা দেখিয়ে ব্যাংকে মর্টগেজ করতো। এমন করেই সে দশ হাজার কোটি টাকা লুট করেছে। অথচ আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেয়ার জন্যে সরকার তেমন কোন মানবীয় কর্মসূচি গ্রহণ করেনি। বরং বাংলাদেশ ব্যাংক তড়িঘড়ি করে পিপলস লিজিংএর ক্ষুদ্র আমানতকারীদের ফকির বানিয়ে অবসায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। লিজিং কোম্পানিকে আমানত সংগ্রহ করার জন্য লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমানতকারীদের রক্ষা করা সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক: এরশাদ মজুমদার, কবিও ঐতিহ্য গবেষক, ই-মেল- [email protected]