একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের সন্ধানে



রণেশ মৈত্র
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এ কথা সবারই জানা, গণতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে বিকশিত করতে হলে গণ মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলি নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হলে এমন কি, দেশের সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সমূহ অক্ষুণ্ন রাখতে হলে, দেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল অপরিহার্য্য। কিন্তু কাগজে কলমে অনেক দলের অস্তিত্ব থাকলেও কোন দলেরই, সরকারি দল ব্যতিরেকে আদৌ গণভিত্তি নেই। সহসা শক্তিশালী গণভিত্তি গড়ে উঠবে এমন কোন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বও এখন পর্য্যন্ত দৃশ্যমান নয়।

আমাদের দেশে তবুও আমরা বলে থাকি যে বিরোধীদল অবশ্যই আছে। যেমন বি.এন.পি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, হালে হেফাজতে ইসলাম প্রভৃতি।

এছাড়াও রয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদের দুই অংশ, ন্যাপ (মোজাফ্ফর) গণতন্ত্রী পার্টি প্রমুখ।

তাছাড়াও রয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাম জোটের অপরাপর দল (দুঃখিত, নামটি স্মরণে আনতে না পারায় উল্লেখ করা গেল না), ঐক্য ন্যাপ প্রভৃতি।

বি.এন.পি থেকে শুরু করে বাদবাকী সকল দলই বিরোধী দল তবে প্রশ্ন আছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের অপরাপর দলগুলি সম্পর্কে। দলগুলির বক্তব্য ছিল তারা বিরোধী দল-তবে নিম্নতম কর্মসূচী ভিত্তিতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলিতে সরকারকে সহযোগিতা করা এবং সাম্প্রদায়িক অপশক্তি সমূহকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করা। বাস্তবে কিন্তু দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ ব্যতীত ২৪ দলের অপরাপর দলগুলি সরকারের অংশীভূত হয়ে পড়েছে। সরকারকে সমর্থন তাঁরা ঠিকই দিয়ে চলেছেন (দিতেই পারেন কারণ নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিটি দলেরই পরিপূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে) কিন্তু কোন যৌক্তিক কারণেও তাঁরা কেউ কদাপি ক্ষীণকণ্ঠেও সরকারের সমালোচনা করছেন না। এমন কি, দীর্ঘদিন যাবত করোনা সংক্রমণ জনিত কারণে বন্ধ থাকলেও তার আগেও দীর্ঘকাল যাবত নিজেদের সাংগঠনিক কাজেও দেখা যায় নি। এঁরা নিজেদের কার্যক্রমের দ্বারা জনমনে যে ধারণার সৃষ্টি করেছেন যে ধীরে ধীরে তাঁরা আওয়ামী লীগে বিলীন হয়ে যাবেন। তবে এ ধারণা সত্য কি না তা হয়তো আগামী নির্বাচনকালে বুঝা যাবে। তবে এ কথা ঠিক, বিরোধী অঙ্গনে না থেকে তাঁরা নীতিনিষ্ঠ বাম প্রগতিশীল ধারার সরকার বিরোধী রাজনীতিকে দুর্বল করে দিতে সক্ষম হয়েছেন।

এবারে আসি বি.এন.পি, জাতীয় পার্টি প্রসঙ্গে। এঁরা নিজেদেরকে বিরোধী দল বলে দাবী করেন। সাধারণভাবে মানুষও তাই মনে করে। তবে জাতীয় পার্টিকে কেউ তা মনে করে না। তারা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের বশংবদ অংশ। বিরোধীতা দূরের কথা বিশেষ কোন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ফোঁস করার শক্তি বা সাহস কোনটাই তাদের নেই। এরা “গৃহ পালিত বিরোধীদল” বলে অভিহিত হলেও জাতীয় পার্টি সম্পূর্ণত:ই সরকারের অংশ।

জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম যে বাংলাদেশ বিরোধী দুটি রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন তা নিয়ে জনমনে বিন্দুমাত্র সংশয় না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতাসীন থেকেও এদেরকে বে-আইনী ঘোষণা করছে না দেখে বিস্মিতই হতে হয়। ২০১৮ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগ পর্য্যন্ত আইনমন্ত্রী হাজার বার সকলকে বলেছিলেন, শীঘ্রই জামায়াতে ইসলামীকে বে-আইনী ঘোষণা করা হবে এবং সেই লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করা হেয়ছে। মন্ত্রীসভা ও সংসদের অনুমোদন পেলেই ঐ আইনে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হবে। কিন্তু এমন কথা তিনি তো দূরের কথা, সরকারি দলের কাউকেই আর ভুলেও উচ্চারণ করেন না। বুঝতে কারও অসুবিধা হয় না যে সরকার মাঝে মাঝে জামায়াতে ইসলামী ও  হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে টোটাকা কিছু পদক্ষেপ নিলেও তাদেরকে নিষিদ্ধ করার মত চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে নারাজ। বরং প্রকাশ্য গোপনে সময় সময় যে হেফাজতে ইসলামের সাথে সমঝোতা ও আপোষ করে তাদের কথামত কিছু কিছু কাজ করে তাদেরকে হাতে রাখতে চান তা বুঝতে কষ্ট হয় না। অথচ হেফাজত জামায়াত-উভয়েই ইসলামের কথা বললেও তারা যে বাংলাদেশ-রাষ্ট্রের চার মূলনীতি বিরোধী, গণতন্ত্র-বিরোধী, সমাজতন্ত্র ও প্রগতি বিরোধী উগ্র ধর্মান্ধ দুটি সংবিধান বিরোধী জঙ্গী উৎপাদনকারী সংগঠন, তারা বিএনপি ছাড়া আওয়ামী লীগসহ বাদ-বাকী সকল দলেরই বিরোধী তা তাদের প্রকাশ্য জমায়েত মার্চের শেষে মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ জয়ন্তী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে রাষ্ট্র আয়োজি উৎসব প- করতে ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাটহাজারীসহ নানাস্থানে যে উগ্র তা-ব চালিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

তাই বলে এদেরকে কি বিরোধী দল বলা যাবে? প্রকৃত বিরোধী দল হতে হলে সেই দলকে সুস্পষ্টভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে দৃড়তার সাথে থাকতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, রাষ্ট্রের বাহাত্তরের সংবিধান ও চার মৌলিক নীতিমালা ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শ মেনে চলতে হবে। জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম এই ফর্মূলার আওতায় কোন বিবেচনাতেই পড়ে না। তাই তারা রাষ্ট্র বিরোীধ দল। সাংবিধানিক বিরোধী দল তারা কোনক্রমেই হতে পারে না।

জনসমর্থন ও তাদের নেই। জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপকভঅবে জনমত যাচাই করলে বা তারা যদি নির্বাচনে অংশ নেয়-তা হলে তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হবে। বি.এন.পি সাথে জোট বাধার কল্যাণে জামায়াতে অতীতে কিছু আসনে জিতেছে বটে, কিন্তু বিএনপির সমর্থন ব্যতিরেকে সংসদে প্রতিনিধিত্বকরা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না বিগত সংসদ নির্বাচনে তা অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে।

আগেই বলেছি, রাজনীতির ময়দানে বা সংসদে যে গভীর সংকট চলছে তা মূলত এ কারণেই যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে নিষ্ঠাশীল হয়ে সরকারের সকল কাজে ঐ নিরিখে বিরোধিতা বা সমর্থন দেওয়া এবং সে অনুযায়ী রাজপথের আন্দোলনে নামতে প্রত্যয়ী না হলে তাকে আদৌ বিরোধী দল বলে কোন স্বাধীন দেশে স্বীকৃতি পেতে পারে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশী গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে ধর্মান্ধতাসহ সকল প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শের লালনকারী পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ববাংলার বাঙালী সমাজ ২৩টি বছর ধরে ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রাম করে এবং অবশেষে একাত্তরে এসে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার ও তার লালিত সাম্প্রদায়িক ও পশ্চাৎপদ প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শ সমূহকে পরাজতি করে সমুদ্র-সম রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন। আজ তার পর দীর্ঘ ৫০ বছর চলাকালে নিশ্চিতভাবেই এদেশের সংসদীয় ও মাঠের রাজনীতি পাকিস্তানী ভাবাদর্শে বিশ্বাসী কোন দলকে সরকারি বা বিরোধী দল হিসেবে মেনে নেওয়ার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।

উপরোক্ত (অর্থাৎ জামায়াত ও হেফাজতের উগ্র ধর্মান্ধ ও জঙ্গীপনায় লিপ্ত না হলেও বিএনপি আর্দশগতভাবে তাদেরই সাথী। তবে তারা মুক্তিযুদ্ধকে , স্বাধীনতা, জাতীয় পতাকাও  জাতীয় সঙ্গীতকে স্বীকৃতি দেয়-যা আজও জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলাম করে না। ফলে, বি.এন.পি কিছু সংখ্যক মানুষের কাঝে গ্রহসযোগ্যতা পেয়েছে এভং সরকার বিরোধী নেতিবাচক ভোটগুলির অধিকাংশ তারা পেয়ে থাকে। কিন্তু বিএনপি যদি সুস্পষ্টভাবে জামায়াত বিরোধী এবং সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী, বাহাত্তর সংবিধানকে অবিকল পুনঃস্থাপনের প্রত্যয় ঘোষাণা করে একটি ইতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতো-তবে তার গ্রহণ যোগ্যতা অনেকটাই বাড়তো।

কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, বিএনপি প্রগতিমুখীন নয়, প্রতিক্রিয়ার দোসর হয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকাই পালন করে যেতে চায়।

এবারে আসাযাক, ছোট চোট দলগুলির প্রশ্নে। এই দলগুলি যেমন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, ঐক্যন্যাপ, বাসদ, জাসদ, ন্যাপ ( মোজাফ্ফর), গণতন্ত্রী পার্টি প্রশ্নে। এর এক অংশ ১৪ দল ভূক্ত হয়ে সরকারের নানা আপোষকামী নীতির প্রশ্নেরও বিরোধীতা করার সাহস হারিয়ে ফেলেছে। এই অবস্থান থেকে সরে এসে যদি তারা প্রকৃতই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিরোধী দলীয় ভূমিকা পালন করতো এবং ক্ষমতার বাইরে এসে একজোট হতো এবং একই সাথে যদি সি.পি.বি, বাসদ, ঐক্য ন্যাপ প্রভৃতি মিলে ঐক্যবদ্ধ মোর্চা গঠন করে সংসদে ও রাজপথে মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক দাবী-দাওয়া, জঙ্গীবাদ-সাম্প্রদায়িকতা, তাবৎ সামাজিক প্রতিক্রিয়াীলতা, শিক্ষাব্যবস্থার অসাম্প্রদায়িকীকরণ, নারী নির্য্যাতন, শ্রমিকের নিয়মিত ন্যায্য মজুরি প্রাপ্তি, বেকারত্বের অবসান প্রভৃতি দাবীতে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলতো-নি:সন্দেহে তাদের গণভিত্তিক প্রতিষ্ঠিত হতো।

কিন্তু এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেই কি একটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাশ্রয়ী গণভিত্তি সম্পন্ন বিরোধী দলের ভূমিকা কি তাদের পক্ষে পালন করা সম্ভব হতো? বা তাতেই কি প্রকৃত একটি বিরোধী দলের ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল ধরে বিরাজমান শূন্যতা কি দূরীভূত হতো? মনে হয় না।

 দেশের অকমিউনিষ্ট অসাম্প্রদায়িক উদার গণতান্ত্রিক শক্তির আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে যথেষ্ট ভূমিকা রাখার প্রয়োজন রয়েছে। এই শক্তি এখনও সুষ্পষ্টভাবে দৃশ্যমান না হলে সমাজে সুপ্ত অবস্থার হলেও তাদের বিশাল অস্তিত্ব রয়েছে। রাজনৈতিক অ্গনের সন্ত্রাস, দুর্নীতি, আদর্শহীনতা ব্যাপক হওয়ার কারণেই তাঁরা প্রকাশ্যে এগিয়ে আসার সাহস পাচ্ছেন না। ধৈর্য্যরে সাথে উপরোক্ত দাবী সমূহ নিরন্তর সংবিধান সম্মত পন্থায় আন্দোলনের মাধ্যমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঐ উদার গণতান্ত্রিক শক্তি, দেশের ছাত্র যুব সমাজ, নারী সমাজকে ধৈর্য্যরে সথে আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করে যদি ১৯৫৭ সালের মত দেশের সকল প্রগতিশীল, বাম ও উদার গণতন্ত্রীদের সমবায়ে একটি দল গড়ে তোলা হয় সহজেই তা গণভিত্তি পেতে পারে এবং অল্পকালের মধ্যেই একটি গণ প্রত্যাশা পূরণ উপযোগী বড় একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে জনতার মধ্যে তা প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।

এ কথাগুলি বলা গেল যত সহজে এর বাস্তব রূপ দেওয়া তত সহজ নয়। আমরা কি দলপ্রীতি, দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধে উঠে জাতীয় ঐক্যের কার্য্যকর অবস্থানে যেতে প্রস্তুত হয়েছি? আমরা কি মানুষের মনের ভাব সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারছি? যেমন পারতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও কমরেড মনি সিংহ তত্ত্বের কচকচাসি দিয়ে বিভক্তিকে বিপ্লবী কর্মকা- বলে অভিহিত করে অনেকে মানসিক শান্তি পেতে পারেন কিন্তু তাতে তাঁরও জীবনভর লালিত চড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত হবে না।

তবুও সকলে মিলে ভাবতে হবে এবং একটি কার্য্যকর ও শক্তিশালী, জনসম্পৃক্ত প্রগতিশীল বিরোধী দল গঠন করতে হবে একমাত্র এভাবেই দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সকট মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে।

লেখক: রণেশ মৈত্র, সভাপতি ম-লীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ