নারীর গৃহশ্রমের মূল্যায়ন চাই



লতিফা নিলুফার পাপড়ি
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নারীরা, বিশেষ করে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, সমাজে পিছিয়ে পড়া শহর ও গ্রামাঞ্চলের ঘরের গিন্নিরা কি তাঁদের গৃহশ্রমের প্রাপ্য মর্যাদা কিংবা মূল্যায়ন পাচ্ছেন? পাচ্ছেন কি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা শিক্ষিত নারীরাও? জবাব নিশ্চয় না হবে। যদি তাদের কাজের মূল্যায়ন হতো তা হলে ক্রমশ এগিয়ে চলা আমাদের দেশের নারীরা আরো অনেক বেশি এগিয়ে যেতে পারতেন। নারীরা গৃহে যে কাজ করেন, তার কোনো অর্থমূল্য আমরা দেই না। কিন্তু কেনো দেই না? ঘরের কাজ কি কাজ না?

ঘরের কাজও শ্রম দিয়ে করা একটি কাজ। শারীর পরিশ্রম দিয়ে কাজগুলো করতে হয়। এই ঘরের কাজকে পরিশ্রমের কাজ হিসাবে মূল্যায়ন করার জন্য আমাদের মন মানুসিকতাকে সে পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। আমাদেরকে মেনে নিতে হবে একজন নারী তার গৃহে যে কাজ করেন তারও মূল্য আছে। এই মূল্যটা অর্থ দিয়ে পরিশোধ না করেও, কাজগুলো মূল্যায়ন করে আমরা শ্রম দেওয়া মানুষটাকে যদি একটু মান্য করি, সমীহ করি, তবে সেই মানুষটি সম্মানিত হবেন।

আমাদের ধনী-গরিব সকল পরিবারগুলোতে ঘরের গৃহিনী বেশি হোক, কম হোক, কাজ করেন। তারা যে কাজ করছেন, যদি সেটা না করতেন তা হলে তো অন্য কাউকে দিয়ে কাজগুলো করাতে হতো। তখন তাকে অবশ্যই একটা পারিশ্রমিক দিতে হতো। যেহেতু আমি স্ত্রী, উনি মা, সে বোন, তারা তাদের নিজের গৃহে কাজ করেন, তাই এটার কোনো মূল্য ধরা হয় না।

আমাদের রাষ্ট্রিয় বার্ষিক উন্নয়ন সূচকে অনেক শ্রমেরই মূল্য, মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু আমরা নারীদের গৃহশ্রমের মূল্য এখনো হিসাবে নেওয়া হচ্ছে না! রাষ্ট্র থেকে আমাদের শ্রম নিয়ে কিছু বলাও হচ্ছে না। রাষ্ট্র আমাদের শ্রম নিয়ে কিছু বলছে না বলেই, আমরা গৃহিনীরা প্রতিদিন ভোর থেকে রাত অবধি ঘরে ঘরে শ্রম দিয়েও একটু মূল্য কিংবা মূল্যায়ন এমন কি সম্মানটুকুও পাচ্ছি না! আসন্ন বাজেটে আমাদের এই গৃহশ্রমের মূল্য নির্ধারণ এবং ঘরের কাজও যে অর্থের বিনিময়ে দেওয়া শ্রমের মতো একটি কাজ, সেটার স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আমি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। চাইছি গৃহশ্রমের মূল্য ও মূল্যায়ন।

নারী শুধু গৃহে কাজ করেন না, সাংসারিক অনেক উৎপাদনশীল কাজও তারা করেন৷ কিন্তু সবগুলো কাজকেই ধরা হয় সংসারের কাজ৷সমাজও ঠিক সেইভাবেই দেখে। আমাদের সমাজ মনে করে; নারীর সংসার দেখা, সন্তান সামলানো, এটাই তাঁর কাজ৷ এর বাইরেও যে গ্রামের নারীরা গবাদি পশু দেখা, শাক সবজি ফলানো, বীজ সংরক্ষণ, ধান মাড়াই ঝাড়াই, গোলায় উঠানো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাঠে গিয়ে পুরুষ মানুষটি সহায়তার করা, এমন হাজারো কাজ তারা করেন৷

এতোসব কাজ করার পরও আমাদের সমাজও মনে করে যে, এগুলো মূল্যহীন কাজ৷আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত নারীর কাজ, বিশেষত গৃহ কাজকে মর্যাদার চোখে দেখা হবে না। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে আঘাত করার জন্য রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। হ্যাঁ, রাষ্ট্রই পরবে হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে। 

সাধারণ যে কোনো কাজের একটা পারিশ্রমিক থাকে৷কিন্তু ঘরের গৃহিনীর কাজের কোনো মূল্য নির্ধারণ করা নেই। নারীর গৃহশ্রমের মূল্য নির্ধারণে একটি কমিশন হতে পারে। বিষেজ্ঞরা সেই কমিশনে থাকবেন। তারা পর্যালোচনা করে শ্রমের মূল্য নির্ধারণ করবেন। গৃহ কর্মের নিজ ঘরের নারীদের পারিশ্রমিক না দেওয়া হোক, তারপরও তাদের পরিশ্রমেরও যে একটি মূল্য আছে, এটা যদি নির্ধারিত হয়, তবে ঘরে ঘরে বঞ্চিত, অবহেলিত, নির্যাতিত নারীরা তাদের শ্রমেরও মূল্য হিসাব করে ক্ষমতাবান হবেন। এর ফলে ঘরে ঘরে নারী বঞ্চনা, তাদের প্রতি অবহেলা এবং নির্যাতন অনেকটাই কমে আসবে। প্রতিটি নারী যখন বুঝতে পারবে তাদের শ্রমের মূল্য আছে, সেও উপার্জন সক্ষম ক্ষমতাবান, তারও সম্মান আছে, তার কাজ পরিবারের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। তখন এই নারীকে পরিবারের পুরুষরা সমীহ করবে, পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাকে মূল্যায়িত করা হবে। 

শহরের অনেক নারী বাইরে চাকরি করেন, আবার গৃহস্থালির কাজও সামলান৷ পরিবারে এমন নারীদেরও মূল্যায়ন হয় না। তবে এটা একেক পরিবারের একেক রকম নিয়ম। যারা বাইরে চাকরি করেন আবার ঘরের গৃহস্থালির কাজ করেন, তাঁদের জন্য এটা তো অধিক বোঝা৷ কারণ আমাদের দেশে গৃহস্থালির কাজকে এখনও নারীর কাজ হিসেবেই দেখা হয়৷ ফলে চাকরিজীবী নারীকে বাইরে কাজ করে এসে আবার ঘরের কাজও সামলাতে হয়৷পরিবারের অন্য কোনো সদস্য যদি ঘরের কোনো কাজ করেন, তখন ওই নারীকে বলা হয়, তোমার কাজ আমার করতে হলো। নারীকে কথা শুনানো হয়। আমি মনে করি, নারীকে মর্যাদা দিলে তার প্রতি সহিংসতা কমবে। আপনি যাঁকে সম্মান দিবেন, নিশ্চয়ই তাঁকে আপনি নির্যাতন করবেন না। তাঁকে আপনি সমান সমান দেখবেন৷ আমরা মনে করি, নারীর সম্মান আমাদের সমাজে, রাষ্ট্রে বাড়াতে হবে৷ কীভাবে বাড়াতে হবে? সমাজে যে নারীর বহুমুখী অবদান, তার স্বীকৃতি দিতে হবে, সম্মান করতে হবে, মূল্যায়ন করতে হবে৷

বাড়ি কিংবা বাসাতে থাকা কাজের বুয়া হিসাবে সাহায্যকারী মানুষটিকে আমরা যদি পরিবারের সদস্য বলে মনে করি, তাহলে সেও হয়তো নিজেকে সেইভাবেই তৈরি করবে। আমি এর প্রমাণ বহুবার পেয়েছি। আমার বাসায় যারা আমার সাহায্যকারী ছিলো, তারা এখনো আমার খোঁজখবর নেয়। কোনো টাকা পয়সার জন্য নয়, শুধু আমি ভালো আছি কি-না? কারণ সংসারে তো তারা আমার অবস্থা দেখে গেছে। সংসার সামলাতে গিয়ে আমার উপর দিয়ে কেমন ঝড় বয়, কতভাবে কতজনের কাছে অপমানিত হতে হয়, সেটা তারা দেখে গেছে, তাই তারা আমার খোঁজখবর রাখে। আমি যেনো ভালো থাকি। আমার মতো অবস্থা অন্যান্য পরিবারগুলোর চাকুরিজীবী সকল গিন্নিদেরই। কারো বেশি, কারো কম। এই যে গৃহকর্মী, এরা কেউ থাকে পেটে-ভাতে, কেউ থাকে খুবই অল্প টাকার বিনিময়ে।

গৃহকর্মীদের প্রসঙ্গ যখন এই লেখায় এসেই গেলো, তখন তাদেরও না বলা কিছু কথা এখানে বলে নিচ্ছি। গৃহকমীরা বাসা-বাড়িতে যে শ্রম দেন, এটাও গৃহশ্রম। মনে করার কোনো কারণ নেই যে, মানুষ শুধু ধনী হলে বা শিক্ষিত হলেই তার অধীনস্থ মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করবে। টাকাওয়ালা আত্মীয়ের বাসাতেও দেখেছি কাজের লোকদের জন্য কমদামি খাবার, আলাদা চাল, আলাদা রান্না। উচ্চশিক্ষিত ও ধনী পরিবারের মানুষ কেনো সামান্য চুরি করে ( না বলে লুকিয়ে) খাওয়ার দায়ে শিশু গৃহকর্মীকে পিটিয়ে মেরে ফেলে? অনেক সময় গৃহকর্তা কিংবা দেবর-ভাই এদের যৌন অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচার জন্য ঢাকার কত কত বনেদি এলাকার ভবনের ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় গৃহকর্মীকে। আবার অনেক মহিলা নিজের লম্পট স্বামী, দেবর কিংবা নিজের ভাইকে সংশোধন করতে না পেরে গৃহশ্রমিককে নির্মম নির্যাতন করে। আর সেই নির্যাতন থেকে বাঁচতে তারা এমন ভাবেই মরণকে বরণ করে।

ইদানীং গৃহকর্মীদের ওপর, বিশেষ করে শিশু গৃহকর্মীদের ওপর অত্যাচার অনেক বেড়েছে। ঘন ঘন গৃহকর্মী নির্যাতনের সংবাদ আসছে, কিন্তু বাস্তবে এর চেয়েও বেশি গৃহকর্মী নির্যাতিত হচ্ছে। অধিকাংশ নির্যাতনের ঘটনার কোনো মামলা ও বিচার হয় না। যেহেতু গৃহকর্তারা পয়সাওয়ালা ও ক্ষমতাশালী, তাই চাপ দিয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করে।

অভাবী ঘরের বাবা-মায়েরা তাদের ছেলে কিংবা মেয়ে শিশুদের কাজে পাঠায় এজন্য যে, তাদের সন্তান অন্তত তিন বেলা খাবার পাবে। কিন্তু, এর বদলে কপালে জোটে মারধর ও সহিংসতা। গৃহকর্মী নামের মানুষগুলো সারাদিন কাজ করার পরও শ্রমিক হিসেবে গণ্য হয়নি।

বাসাবাড়িতে যারা স্থায়ীভাবে কাজ করেন, তাদের নিজেদের সময় বলে সাধারণত কিছু থাকে না। যারা ছুটা বা অস্থায়ী কাজ করেন, তাদেরও সারাদিনে অন্তত ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিভিন্ন বাসা-বাড়ির সহজ-কঠিন সকল কাজ করতে হয়। এরপরেও এদের বেতন ও অধিকার রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কোনো রকম অধিকার ছাড়া তারা শ্রম দিয়ে যায়। গৃহশ্রমিকের জীবনটাকে দাসত্বের অন্ধকার জীবন বলা যায়। অনেক গৃহকর্মী মার খেয়ে পালাতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, পাচারকারী বা খারাপ মানুষের হাতে পড়ে যৌন ব্যবসায় চলে যায়। অন্যদিকে অনেক গৃহকর্মীর বিরুদ্ধেও বেয়াদবি, চুরি, খারাপ আচরণ ইত্যাদি নানারকম অভিযোগ করা হয়। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো শ্রম দেওয়ার পরও তারা শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। অথচ যেটা হয়া উচিত ছিলো; সেটা হচ্ছে; গৃহকর্মীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার, তাদের বেতন-ভাতা ঠিকমতো পরিশোধ, নির্যাতন না করা, শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা বিধান করা।

গৃহকর্তারা তো এসব করবেন না। তাই রাষ্ট্রকে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আর এসবের জন্য রাষ্ট্রের উদ্যোগে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। কোনো গৃহকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে বা তার কাজ পছন্দ না হলে তাকে স্বসম্মানে তাকে বিদায় দিয়ে দেয়া উচিত। গৃহকর্মীদের প্রতি ভালো ব্যবহার করা, ঠিকমতো খাওয়া, কাপড়, চিকিৎসা, বিশ্রাম এবং সর্বোপরি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যৌন হয়রানির হাত থেকে রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারো দয়া বা কৃপা নয়। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে সংবিধান অনুযায়ী নিরাপত্তা পওয়া তাদের অধিকার।

উপরে বলা এতো কথার পরও আমি সকল ঘরের সকল পুরুষদের উদ্দেশ্যে এই কথাটা বলতে চাই; আপনাদেরকে মনে রাখতে হবে বিয়ে করে আনা স্ত্রী সে আপনার জীবনসঙ্গী, কোনো অবস্থাতেই দাসী বা চাকরানী নয়। আপনার ঘরের সবার জন্য সে যে শ্রম দেয় তার মূল্য আছে। যেমন মূল্য আছে অফিস, আদালত, ব্যাংক, বীমা, কর্পোরেট হাউস কিংবা গ্রামের হাটে মাঠে ঘাটে দেওয়া আপনাদের (পুরুষদের) শ্রমের। তাই তার গৃহশ্রমের মূল্যায়ন করতে হবে। আর আমারা যারা ঘরে গৃহিনী নারী; সেই নারীদের মনে রাখতে হবে, আমার সহায়তা করা জন্য যে গৃহকর্মী রেখেছি, সে আমার দাস নয়। আমি অফিস আদালত, ব্যাংক-বীমা কিংবা কর্পোরেট হাউসে আমার নিয়োগকর্তার কাছ থেকে যেরকম ব্যবহার প্রত্যাশা করি, আমারও উচিত সেই ব্যবহারই আমার অধীনস্থদের প্রতি করা। হোক সে সামান্য গৃহকর্মীই।

লেখক: লতিফা নিলুফার পাপড়ি, শিক্ষক, কবি, গল্পকার ও কলামিস্ট।