নারী স্বাধীনতা মানেই যখন 'নতুন ছকে' নারী



সোহানা আক্তার মনি
ছবি: বার্তা ২৪.কম

ছবি: বার্তা ২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নারী স্বাধীনতা, নারী অধিকার সর্বোপরি নারীবাদী আন্দোলনের যাত্রা শুরুই হয়েছিল প্রচলিত বৈষম্যমূলক আইন ও রীতিনীতি ভেঙ্গে নারীকে মর্যাদাপূর্ণ জীবন প্রদানের লক্ষ্যে। স্রোতের বিপরীতে চলতে যেয়ে নারীবাদী আন্দোলন সবসময়ই নানাবিধ বাধাবিপত্তি ও সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও নারীবাদী আন্দোলন অনেক বেশি আলোচিত ও সমালোচিত।

তবে এক্ষেত্রে একটি দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, যদিও নারীবাদী আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট ফ্রেমে আবদ্ধ করে রাখার মত বিষয় নয়, তবুও বাংলাদেশের বহু মানুষই নারীবাদী আন্দোলন বলতেই বোঝে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও জীবনধারার চর্চা যা একইসাথে ইসলাম বিদ্বেষী। ফেসবুকের যেকোনো নারীবাদ, নারী স্বাধীনতা এমনকি নারী সম্পর্কিত আলোচনায় কিংবা ব্যক্তিগত আলাপেও এই বোঝাপড়ার বিষয়টি বহুবার লক্ষ্য করেছি।

নারীবাদী শব্দটিকেও ইদানীং অনেকে একটি গালি হিসেবে ব্যবহার করে বেশ পৈশাচিক আনন্দ পান। অবশ্যই কোনো নারী যদি 'পাশ্চাত্য' সংস্কৃতি কিংবা জীবনধারায় স্বাধীনতা খুঁজে পায়, সেটার বিরোধিতা করাকে আমি সমর্থন করছি না। তবে নারীবাদী আন্দোলনের যে বহুমাত্রিকতা সেটা ছাপিয়ে নারীবাদী আন্দোলন মানেই যখন পশ্চিমের কোনো অনভ্যর্থিত অতিথি, তখন সে আন্দোলনের ফলপ্রসূ হয়ে ওঠাটাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। একইসাথে এই আন্দোলন তখন আর সকল ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণীর নারীর আন্দোলনে পরিণতি পায় না।

এমতাবস্থায় নারীবাদী আন্দোলন সম্পর্কে 'জন সাধারণের' এরূপ ধারণাকে শুধুমাত্র স্রোতের বিপরীতে চলা আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলেই চলবে না বরং এ ধরনের ধারণার পেছনে নারী স্বাধীনতার পশ্চিমা নির্ভর প্রতিচ্ছবি নির্মাণের যে রাজনীতি সে রাজনীতিকেও বুঝতে হবে।

নারীবাদী আন্দোলনের পশ্চিমা নির্ভর চিন্তা ও রাজনীতিকে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের আলোচনা থেকেও বোঝা যেতে পারে । তিনি Can the subaltern speak (১৯৮৮) প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, নিপীড়িতের স্বর তুলে ধরার নামে পশ্চিমা একাডেমিক ও একটিভিস্টরা নিম্নবর্গীয়দের, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের নারীকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেনো মনে হয় অপশ্চিমার চেয়ে পশ্চিমা সমাজ উর্ধতর। যেমন, তৃতীয় বিশ্বের নারী মানেই অজ্ঞ, জ্ঞান বিবেচনাহীন, প্রথায় সীমাবদ্ধ, ঘরকুনো, পরিবার নির্ভর, ভিক্টিমাইজড এবং অন্যদিকে শ্বেতাঙ্গ নারীরা শিক্ষিত, আধুনিক, নিজের দেহ ও যৌনতায় আত্ম নিয়ন্ত্রণ সম্পন্ন, স্বাধীন। এ ধরনের পরিবেশনের রাজনীতিতে কখনই 'নিম্নবর্গীয় নারীর' নিজস্ব চেতনা, আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটেনি।

বিশেষ করে নাইন ইলেভেনের হামলার পর থেকে পশ্চিমা নারীবাদী আন্দোলনের বিশেষ টার্গেট গ্রুপ হয়ে ওঠে মুসলিম নারী। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধ ঘোষণা করার পাশাপাশি, এই যুদ্ধকে নারীর অধিকার ও মর্যাদার লড়াই হিসেবেও দাবি করে। সময়ের ধারাবাহিকতায় "মুসলিম নিপীড়িত নারীদের ধর্ম ও যাপিত জীবনের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার" প্রক্রিয়াটি একটি রাজনৈতিক ডিসকোর্সে পরিণত হয়েছে, যার সাথে আধিপত্য কায়েমের অভিসন্ধিও যুক্ত।

সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কিছু সামাজিক গবেষণায়ও একই চিত্র উঠে এসেছে। যেমন Sarah Brace (2012) নেদারল্যান্ডসের প্রেক্ষিতে দেখিয়েছেন, সেখানে নারীবাদী চেতনা গড়েই উঠেছে ইসলামী মূল্যবোধের বিপরীতে। নারীর বোরকা ও হিজাব পরিধানের বিষয়টিকে পশ্চাৎপদ সংস্কৃতি এবং নারী নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে, নেদারল্যান্ডসে মুসলিম নারীকে উদ্ধার করাই হয়ে উঠেছে নারীবাদী ও রাজনীতিবিদের প্রধান লক্ষ্য। একই কারণ দেখিয়ে আফগান নারীকে স্বাধীন করে তোলার দায়িত্ব তুলে নিয়েছে আমেরিকা।

নারী স্বাধীনতার এই ডিসকোর্স বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বেশ লক্ষনীয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে (২০২০ সালে) একজন বোরকা পরিহিতা নারী ও তার সন্তানের ক্রিকেট খেলার ছবি ভাইরাল হয়েছিল। এই ভাইরাল হওয়া ছবি নিয়ে বিভিন্ন জন বিভিন্ন রকম মন্তব্য করেছিলেন। এসকল মন্তব্যের মধ্য থেকে আমি দুটি মন্তব্য এখানে আলোচনা করব। একটি হচ্ছে, অনেকেই বোরকা পরে ক্রিকেট খেলাকে নারী স্বাধীনতা হিসেবে দেখেছিলেন। তাদের মন্তব্য অনেকটাই এমন ছিলো যে, অন্য পোশাক পরেও নারীরা যেমন ঘুরে বেড়াতে পারেন, তেমনই বোরকা পরেও একজন নারীর ক্রিকেট খেলার স্বাধীনতা রয়েছে। এ ধরনের মন্তব্যের বিপরীতে অনেকেই আবার প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাদের মতে, বোরকা কখনও স্বাধীনতার অংশ হতে পারে না; তারা বোরকা পোশাকটিকেই নারীর পরাধীনতার একটি বড় অংশ মনে করেন।

এমনকি একটি অনলাইন নারীবাদী পত্রিকায় একজন লেখক বোরকাকে নারী পুরুষের বৈষম্যের ভিত থেকে, ধর্মীয় বাধ্যবাধকতায়, নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া "নিষ্ঠুর পোশাক" হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। একই পত্রিকার একাধিক নারী স্বাধীনতা সম্পর্কিত লেখাগুলোতে, ওড়না, হিজাব এবং বোরকাকে কেবলমাত্র নারীর দেহকে প্রান্তিকীকরণের হাতিয়ার এবং নারীর পরাধীনতার একটি অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে। এ সকল লেখার লেখকদের কাছেও মুসলিম নারী মানেই নিয়ন্ত্রিত, অবুঝ এবং ইসলামিক আদর্শ দ্বারা হেজেমনাইজড। এ ধরনের চিন্তা ও বোঝাবুঝিও পরিণামে, এসকল নারীবাদী ও সাধারণ মুসলিম নারীর মাঝে একটি বিভেদ তৈরী করে; যেখানে মুসলিম নারীর অবস্থান প্রান্তিক। এক্ষেত্রে নারীর নিজস্ব পছন্দ, ভালো লাগার বিষয়গুলোও হয়ে পড়ে মূল্যহীন। একইসাথে ধর্মচর্চার বিষয়টিও যে ব্যক্তি স্বাধীনতারও অংশ সে প্রসঙ্গটিও এখানে উপেক্ষিত।

নারী স্বাধীনতার এ ধরনের একপেশে চিন্তাভাবনা লক্ষ্য করে, স্নাতক চতুর্থ বর্ষে একাডেমিক কোর্সের আওতায়, সামাজিক গবেষণার অংশ হিসেবে, আমি "ব্যক্তি পর্যায়ে নারীর স্বাধীনতার আকাঙ্খা" প্রসঙ্গে ২৮ জন নারীর বিশদ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। গবেষণার আলোকে দেখা যায়, নারীর ওপর মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি যেমন মিথ্যে নয়, তেমনিভাবে নারীর নিজস্ব চিন্তাভাবনা অকার্যকর এবং বোরকা, হিজাব কিংবা ওড়নাকে নারীর ওপর সবসময় চাপিয়ে দেওয়া হয় এরূপ ধারণাও আবশ্যিকভাবে সত্য নয়। অনেক নারীই শিশু থেকে নারী হয়ে ওঠার পরিক্রমায় নিজস্ব বিচার বিবেচনা থেকে বোরকা ও হিজাব পরেন।

অনেকের কাছেই বোরকার পরিবর্তে অন্য পোশাক পরতে বলাটাই পরাধীনতা। যেমন আমার গবেষণার তথ্যদাতা নাহার আক্তার (৩৫) ব্যক্তিগতভাবে বোরকা পরতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তার কাছে বোরকা একটি ধর্মীয় পোশাক, শিষ্টাচারের প্রতীক এবং তিনি এই পোশাক পরতে পারাকে নিজস্ব স্বাধীনতা মনে করেন। কিন্তু বৈবাহিক সম্পর্কের শুরুতে, বাইরে বেড়াতে যাওয়ার সময় তার স্বামী তাকে শাড়ি পরে সাজগোজ করতে বলতেন। প্রথম প্রথম তিনি তার স্বামীর পছন্দ মেনে নিতেন। কিন্তু একসময় তিনি তার স্বামীকে নিজস্ব পছন্দের কথা বলেন এবং তার স্বামীও তাকে আর কখনও অন্য পোশাক পরতে জোর করেন নি।

অন্যদিকে অনেক নারীর মতেই নারী পুরুষের আকর্ষণ সহজাত; কিন্তু জৈবিক ও সামাজিক কারণে পুরুষরা সর্বত্রই নারীর প্রতি আধিপত্য খাটানোর সুযোগ গ্রহণ করে। একইসাথে রাষ্ট্রও নারীর জন্য যথাযথ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। এমতাবস্থায় জনপরিসরে চলাচলের বিষয়টিকে কিছুটা সহজ করতেও কেউ কেউ হিজাব কিংবা বোরকাকে একটি কৌশলী ধর্মীয় পোশাক মনে করেন। এছাড়াও সমসাময়িককালে হিজাব অনেক নারীর কাছেই ধর্মীয় চর্চার পাশাপাশি, ফ্যাশন ও নিজস্ব রুচিবোধেরও ধারক।

ছোট থেকে আমিও দেখেছি বোরকা বা হিজাব পরেন না এমন নারী নিজ ইচ্ছেতে কোথাও যেতে পারছেন না শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে। অপরদিকে বোরকা পরেও অনেক নারীই একা একা দূরে কাজের জন্য যাচ্ছেন, বাজার করছেন, পারিবারিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এমনকি উচ্চশিক্ষা গ্রহনে দেশের বাইরেও যাচ্ছেন।

সুতরাং নারীর পরাধীনতা কিংবা নিপীড়নের জন্য আবশ্যিকভাবে বোরকা কিংবা হিজাব দায়ী নয়। অন্যভাবে বলতে গেলে বোরকা/হিজাব/ওড়না পরা নারী মাত্রই নিজস্ব বিবেচনাহীন, নির্বোধ কিংবা পরাধীন নয়। বরং অনেক সময়ই নারী নিজের স্বাচ্ছন্দ্যবোধ থেকে, জনপরিসরে চলাচলকে সহজ করতে কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে স্ব-জ্ঞানেও বোরকা ও হিজাব পরে থাকেন।

পরিশেষে আমি এটাই বলতে চাই যে, বোরকা কিংবা হিজাব কে নারীর একমাত্র পোশাক হিসেবে দেখাটা যেমন সমস্যাজনক, তেমনই বোরকা বা হিজাবকে নারীর প্রতি বৈষম্যের একটি বিষয় হিসেবে দেখে, সেটাকে খারিজ করে দেওয়াটাও সমস্যাজনক। এমনকি হিজাব বা বোরকাকে শুধুমাত্র নিপীড়নের উৎস হিসেবে দেখা হলে ফ্রান্স কিংবা কানাডার মত দেশগুলোতে মুসলিম নারীর হিজাব পরায় যে নিষেধাজ্ঞা, সেটাকেও এক অর্থে সমর্থন করা হবে। নারীবাদ ও নারী স্বাধীনতা তখন শুধু নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক চর্চায় পরিণতি পাবে। সকল ধর্মের, শ্রেণীর নারীর স্বাধীনতা নিশ্চিতের বিষয়টি তখন খোদ নারীবাদীদের দ্বারাই বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়বে।

শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়