তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা



অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবে মিল্লাত
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সম্ভবত আর কোন দেশ এভাবে ঘোষণা দিয়ে তামাক নির্মূলের কথা বলেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জটা নিয়েছেন। আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি এমন একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে এই উদ্যোগ নিয়েছেন, যে দেশ পুরো বিশ্বের মধ্যে তামাক চাষে অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে। নিঃসন্দেহে একটি সুস্থ জাতি গঠনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ আমাদের উৎসাহিত করছে, অনুপ্রাণিতও করছে। তার ঘোষণার মধ্যে দিয়ে দেশে তামাকবিরোধী কর্মকাণ্ড গতিও পেয়েছে, যার ফলাফল ইতোমধ্যে পাওয়া শুরু করেছে।

সফলতার পাশাপাশি এমন কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে যা তামাকমুক্তকরণের পথে অন্তরায় হবে। যেহেতু তামাকবিরোধী কর্মকাণ্ডগুলো তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে কেন্দ্র করেই করা হয়, সে কারণেই কিনা বিদ্যমান আইনে থাকা অসঙ্গতিগুলোর কারণে অনেক উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে। সেক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত সময়ের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে, বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বেশকিছু দিক নতুন করে পর্যালোচনার সময় এসেছে। সে কারণেই নতুন করে এ বিষয়ক আইন সংশোধন জরুরী। 

বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (FCTC) তে স্বাক্ষরকারী প্রথম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এফসিটিসি’তে স্বাক্ষরের পর পুরনো তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের নানান ক্রুটিসমূহ দূর করে ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে যুগোপযোগী করে বর্তমান সরকার। এরপর ২০১৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা পাস করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতায় এসডিজি’র স্বাস্থ্য সংক্রান্ত লক্ষ্যমাত্রা পূরণের লক্ষ্যে এফটিসিটিকে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যার ধারাবাহিকতায় তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে মূলধারার উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ফলাফলটা আনন্দিত করার মতোই। ২০০৯ সালের চেয়ে ২০১৭ সাল নাগাদ তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারকারীর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ১৮.৫ শতাংশে।  অন্যদিকে, একই সময়ের মধ্যে ধূমপায়ীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

গত ২০১৬ সালের ৩০-৩১ জানুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন’; শীর্ষক দক্ষিণ এশীয় স্পিকারস সামিটের সমাপনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে সম্পূর্ণভাবে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণায় তিনি পরিকল্পনা হিসেবে তিনটি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। প্রথমটি দেশব্যাপী জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গ্রহণ করা। দ্বিতীয় ধাপে শক্তিশালী তামাক শুল্ক-নীতি গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বলা হয়। এবং সবশেষ, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের জন্য সবধরণের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা ও আইনগুলোকে এসডিজি বাস্তবায়নের অগ্রাধিকারের সাথে মিল রেখে আইনগুলোকে FCTC’র সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।

আমরা সর্বশেষ তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করেছি ২০১৩ সালে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ, প্রতি পাঁচ বছর পরপর আইনটির পর্যালোচনা করা। ইতোমধ্যে আমরা সেই সময়টুকু পার করে এসেছি। সময়ের সাথে সাথে বিদ্যমান আইনে নতুন কিছু অসঙ্গতির দেখা মিলেছে। বিশেষ করে গণপরিহনে ধূমপান করা; ফুটপাত ও রেস্টুরেন্টে ধূমপান; বিক্রয়স্থলে তামাকপণ্য প্রদর্শনী; সিগারেটের খুচরা শলাকা বিক্রি; ইত্যাদি বিষয়গুলো পর্যালোচনার সময় হয়েছে। নতুবা, সরকারের তামাকবিরোধী কর্মসূচিসমূহ আশাব্যাঞ্জক ফলাফল পেতে ব্যর্থ হবে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে আইন সংশোধনের পক্ষে উদ্যোগ গ্রহণ জরুরী।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে FCTC’র সামঞ্জস্যপূর্ণ করার কথা উল্লেখ করেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ অন্যান্য তামাকবিরোধী সংস্থাগুলো বিদ্যমান আইন সংশোধনের লক্ষ্যে ছয়টি প্রস্তাবনা দিয়েছে, যার সবগুলোই FCTC’র আলোকে। আমাদের ১৫২ জন মাননীয় সংসদ সদস্যগণ এ ব্যাপারে সুপারিশ করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, এর সবগুলো সংশোধনিতে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে বাংলাদেশ তামাকমুক্ত হওয়ার পথে অনেকটা এগিয়ে যাবে। এসব প্রস্তাবনাসমূহ হলো, ১. ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান বিলুপ্তসহ সকল পাবলিক প্লেস, কর্মক্ষেত্র ও গণপরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা; ২. তামাকজাত পণ্য বিক্রয়স্থলে দ্রব্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা; ৩. তামাক কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি বা সিএসআর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা; ৪. খুচরা সিগারেট বা বিড়ি বিক্রি বন্ধ করা; ৫. সি-সিগারেট এবং হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টস (এইচটিপি)-এর মতো ক্রমশ বিস্তার লাভ করা পণ্যসমূহের আমদানি ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা এবং ৬. সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার বৃদ্ধিসহ তামাকপণ্য মোড়কজাতকরণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা।

কেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তামাক নির্মূলের ঘোষণা দিলেন? কেনই বা দেশে তামাকবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধি পেলো? এর মূল কারণ তামাকের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭ এর তথ্যানুযায়ী, ১৫ বা তার বেশি বয়সের ৩৫.৩% মানুষ কোন না কোন ধরণের তামাক ব্যবহার করে। এর মধ্যে পুরুষ ৪৬% এবং নারী ২৫.২%। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৮% ব্যক্তি ধূমপান করে। ২০.৬% ব্যক্তি ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে (১৩-১৫ বছর বয়সী) ৬.৯% কোন না কোন ধরণের তামাক ব্যবহার করে। তামাক একটি প্রাণঘাতী পণ্য। বাংলাদেশে প্রতি বছর যত মানুষ মৃত্যুবরণ করেন, তার ৬৭% অসংক্রামক রোগ যেমন স্ট্রোক, হার্ট এটাক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিক, কিডনিজনিত রোগ ইত্যাদির কারণে হয়ে থাকে। আর এসব অসংক্রামক রোগের মূল কারণ তামাক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘টোব্যাকো: কীই ফ্যাক্ট (Tobacco: Key Fact)’ ২০১৮ অনুযায়ী, ধূমপায়ীদের মধ্যে ফুসফুসে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা ৫৭% এবং তামাকজনিত ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা ১০৯% বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের ‘হেলথ এন্ড হিউম্যান সার্ভিস’ ডিপার্টমেন্টের একটি গবেষণা জানাচ্ছে, ২০১৮ সালে তামাকের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে; যা মোট মৃত্যুর ১৩.৫%। এছাড়াও বাংলাদেশে এই মুহূর্তে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত। ৬১ হাজারেরও বেশি শিশু পরোক্ষ ধূমপানের কারণে তামাকজনিত রোগে ভুগছে। তামাকজনিত রোগ ও মৃত্যুর কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ জাতীয় জিডিপির ১.৪%। ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, টাকার হিসেবে এর পরিমাণে ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা।

জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে আমরা সকল নাগরিকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে কাজ করছি।  সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে গঠিত ‘বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফোরাম ফর হেলথ এন্ড ওয়েলবিং’; শীর্ষক সংসদীয় ফোরাম তামাকমুক্ত বাংলাদেশ বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায়, ইতোমধ্যে ফোরামের পক্ষ হতে বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের দাবিতে ১৫২ জন সংসদ সসদ্যের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে হস্তান্তর করা হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে জাতীয় সংসদের এতোগুলো সংসদ সদস্যের এগিয়ে আসা, উদ্যোগ নেওয়াকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাধুবাদ জানিয়েছেন। আশ্বাস দিয়েছেন, বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনে প্রয়োজনীয় সকল উদ্যোগে তিনি পাশে থাকবেন, সহায়তা করবেন। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের এই উদ্যোগ; কোটি মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে অবদান রাখবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।

লেখক: অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবে মিল্লাত, এমপি, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন।