চাকরির বয়স বাড়ানো সময়ের দাবি



সজীব ওয়াফি
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনা মহামারিকালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষাখাত। শিক্ষাখাতের সাথে জড়িত চাকরিহীন বেকার তরুণেরা দাঁড়িয়েছে হতাশার মুখোমুখি। নানান কারণে তারা বিভিন্ন সময়ে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর কথা বলে আসলেও নীরব ছিল সরকারপক্ষ। জাতীয় সংসদে একবার আলাপ উঠেও বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের দাবির যৌক্তিকতা আরো জোরালো হয়েছে।

বাংলাদেশ করোনাভাইরাসে আক্রান্তের পূর্বে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ। দেড় বছর ধরে আটকে থাকা অনার্স মাস্টার্সের পরীক্ষাগুলো একযোগে নিয়ে নিলে নতুন কয়েক লাখ যোগ হবে এর সাথে। করোনা সংকটে পড়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করেছিল। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্কুলারও ৮৭ থেকে ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে। পদের সংখ্যাও কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে। অর্থাৎ আগে যেখানে ১৬ জন নিয়েছে, এখন সেখানে ৭ জন নিচ্ছে। সব মিলিয়ে তুলনামূলক বেকার সমস্যাও বেড়েছে বহুগুণে।

প্রেসক্লাবের সামনে, শাহবাগ-সহ বেশকিছু জায়গাতে দীর্ঘদিন যাবৎ কর্মসূচি করে আসছিল চাকরিপ্রত্যাশী তরুণেরা। তাদের দাবি, চাকরির বয়স বাড়াতে হবে। করোনা মহামারির প্রভাবে চাকরির সার্কুলার শুরু থেকেই বন্ধ, আবেদনকৃত পূর্বেকার পরীক্ষাগুলোও এখনো নেওয়া সম্ভব হয়নি। ১৫ মাস ধরে সবকিছু স্থবির। অনাকাঙ্ক্ষিত এই পরিস্থিতিতে চাকরিপ্রত্যাশীদের কোনো দোষ নেই।

যাদের বয়স ২৭-২৮ এর কোঠায় ছিল, তাদের আবেদনের বয়সসীমা শেষ। উদ্বিগ্ন এসব শিক্ষার্থীদের জানানো হয়েছিল, তাদেরকে দেওয়া হবে ব্যাকডেটে আবেদনের সুযোগ। কিন্তু ২০২১ সালের শুরুর দিক থেকে এ পর্যন্ত হাতেগোনা দু-একটা সার্কুলার যা এসেছে, তাতে ব্যাকডেটের সুযোগ ছিল অনুপস্থিত। তাদের হয়েছে অপূরণীয় ক্ষতি। দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে গত দু-বছরে তাদের একটা চাকরির জোগাড় হয়ে যেত।

অন্যদিকে, ব্যাকডেট সুবিধায় সমন্বয় করে ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার সুযোগও কম। কারণ চাকরির বাজার হয়েছে মারাত্মক রকমের সংকুচিত। নতুনদের সংকুলান করতেই সেখানে কর্তৃপক্ষকে খেতে হবে হিমশিম। দ্বিতীয়ত বয়সসীমা শেষ বা শেষের কাছাকাছি হওয়ায় সময় নির্ধারণ না করে দিয়ে ব্যাকডেট সুবিধা হতাশাগ্রস্ত থেকে তরুণদের উত্তরণ করতে পারবে না। হতাশা নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় খাপ খাওয়ানোও মুশকিল।

সংকট পরবর্তী নিজস্ব উদ্যোগের বাস্তবায়ন করাটাও কঠিন। মাছ চাষ, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগির খামার করতে এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকার থেকে পরামর্শ দিলেও মুষ্টিমেয় সংখ্যক বাদে সকলের পক্ষে প্রায় তৈরি করবে প্রতিবন্ধকতা। কারণ আমাদের শিক্ষার্থীদের বড়ো অংশটাই মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের। তাদের পক্ষে মূলধন যোগানের পাশাপাশি আছে এসব সেক্টরের বাস্তব জ্ঞানের অভাব। সরকার থেকে অল্প সুদে তরুণদের ঋণ প্রদানের কথা বলা হলেও সকলের সেটা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। খামার করতে অনেকের নেই নিজস্ব জায়গা জমিও।

বর্তমানে চলমান শিক্ষার্থীদেরও চাকরির বয়স ভোগান্তি মুক্তি অবকাশের কারণ নেই। বয়স না বাড়লে তাদেরকেও এর রেষ পোহাতে হবে। কারণ তাদের শিক্ষাজীবনেও হারিয়ে যাচ্ছে ২ বছরের মূল্যবান সময়। ফলে চাকরি প্রস্তুতিতেও ২ বছর সময় কম পাবে। হাতছানি দিচ্ছে দিশেহারা ভবিষ্যৎ।

স্থায়ীভাবে বয়স না বাড়ানো গেলেও চাকরিতে প্রবেশ করেনি এমন তরুণদের ক্ষেত্রে প্রণোদনা হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে করোনাকালীন ২ বছরকে লুপ্ত বছরের হিসাব। মূলত সুযোগ পাবে যারা চাকরিতে প্রবেশ করেনি, সেই সকল বেকার এবং বর্তমান শিক্ষার্থীরা। তাহলে যারা চাকরিতে একবার প্রবেশ করেছে, তাদেরও সমস্যা হবে না। নতুবা বয়স বাড়ালে চাকরিতে প্রবেশ করেছে, এ-সকল প্রার্থীরাই আবার নতুন করে জট সৃষ্টি করবে।

জরুরি ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা না করলে বিপুল সংখ্যক এই শিক্ষার্থীরা যাবে কোথায়? আমাদের বেসরকারি খাতও এত পরিমাণে নাজুক যে, তাদেরকে সেখানে কাজে লাগানোর চিন্তা মাথায় নেওয়া অসম্ভব। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি প্রার্থীদের চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ সীমা ৩২-এ কোনো অসুবিধা সৃষ্টি না হলে সাধারণ প্রার্থীদেরও সমস্যা না হওয়ার কথা। বরং কোটার প্রার্থীদের বয়সও তুলনামূলকভাবে কিছুটা বাড়ানো যেতে পারে। এমতাবস্থায় উপর্যুপরি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে পরিবার এবং সমাজের কাছে বিদ্রুপের শিকার হতে হবে তরুণদের, বোঝা হয়ে দাঁড়াতে হবে; বেছে নিতে হবে আত্মহত্যার পথ। মানসিক অবস্থা ভেঙে গিয়ে জিডিপিতে অংশ নিতে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারবে না বিরাট সংখ্যক এই ভুক্তভোগীরা। জাতীয়ভাবে ঘটবে শ্রমশক্তির অপচয়।

করোনার চলমান ঢেউ আরও দীর্ঘতর হচ্ছে। তবে সচেতন থাকতে হবে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য কোটার সাথে যেন তুলনা করা না হয়। সকলকে মানতে হবে রুঢ় বাস্তবতা। খুঁজতে হবে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র। চিৎকার না দিলে মাও শিশুকে দুধ দেয় না, দাবি আদায়ে চিৎকার দিতে হয়। চাকরির বয়স স্থায়ীভাবে বাড়ানো এখন সময়ের দাবি হয়ে দাড়িয়েছে। কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে হাজারও বেকার তরুণ।

লেখক: সজীব ওয়াফি, রাজনৈতিক কর্মী বিশ্লেষক