করোনাকালে নকশি কাঁথা শিল্পে নিয়োজিত নারীদের সমস্যা ও করণীয়



ড. এ এইচ এম মাহবুবুর রহমান ও ড. মতিউর রহমান
করোনা কালে নকশি কাঁথা শিল্পে নিয়োজিত নারীদের সমস্যা ও করণীয়

করোনা কালে নকশি কাঁথা শিল্পে নিয়োজিত নারীদের সমস্যা ও করণীয়

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনা ভাইরাস সারা বিশ্বকেই ওলটপালট করেছে। ২০১৯ এর ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে করোনা ভাইরাস রোগটি শনাক্ত হয়। বাংলাদেশে এটি শনাক্ত হয় ২০২০ সালের মার্চ মাসে। সে হিসেবে আজ পর্যন্ত অর্থাৎ ২০২১ সালের জুন মাস পর্যন্ত এক বছর তিন মাসের মত সময়ে এই রোগটি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বকে ব্যাপকভাবে পাল্টে দিয়েছে। এই রোগে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

কোভিড-১৯ আমাদের চিরচেনা জগৎটাকে সবদিক দিয়ে অপরিচিত করে দিয়েছে। মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এই রোগের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, স্বাস্থ্যগত ও মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাত নিয়ে ইতিমধ্যে অনেক গবেষণা হয়েছে। শুধু আর্থিক দিক থেকেই বিবেচনা করলে বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে এই রোগের অভিঘাত ব্যাপকতর। বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর এর প্রভাব নানা নেতিবাচক সমস্যা সৃষ্টি করেছে। নারীদের ওপর বিশেষ করে কর্মজীবি নারীদের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের বড় একটি অংশ নকশি কাঁথা শিল্পের সাথে জড়িত। করোনাকালে এইসব নারীদের ওপর কি ধরনের প্রভাব পড়েছে তা নিয়ে সম্প্রতি একটি সমীক্ষা চালানো হয়। উক্ত সমীক্ষা থেকে এই শিল্পের সাথে জড়িত নারীদের ওপর করোনার প্রভাব তুলে ধরা হয় এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও প্রদান করা হয়। গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নকশি কাঁথা-শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আবহমানকাল থেকে গ্রাম বাংলার মেয়েরা কাঁথা-বুননে পারদর্শী। বাংলাদেশের জামালপুর জেলার ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষা থেকে দেখা যায় যে, করোনাকালে নকশি কাঁথা সেলাই কাজে নিয়োজিত নারীরা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। যেমন, করোনা মহামারি শুরু হবার পর থেকে তাদের(৭৫.৫ শতাংশ) আয় অনেক কমে গেছে। প্রায় ১৬.৭ ভাগ উত্তর দাতা বলেছেন, করোনা শুরু হবার পর থেকে তারা কিছু কাজ করলেও মজুরি পাননি ফলে পরিবার পরিজন নিয়ে অতি কষ্টে সংসার চালাতে হয়েছে।

তাদের অনেকেই উল্লেখ করেছেন করোনাকালে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রয় করতে পারেনি। ফলে শ্রমিকদের মজুরি ও মহাজনদের টাকা দিতে পারেননি। অনেকেই বলেছেন তারা এনজিও থেকে গৃহীত ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। সমীক্ষাকৃত মোট উত্তরদাতার একটি বৃহৎ অংশ ৮২.২ শতাংশ) করোনাকালে নকশি পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের জন্য সরকারি সাহায্য ও সহযোগিতা না পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি (৬৯.৩ শতাংশ) উত্তরদাতা এই শিল্পে পুঁজি সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩১.৭ শতাংশ) উত্তরদাতা উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত মূল্য না পাওয়াকে দায়ী করেছেন।

অন্য সমস্যার মধ্যে রয়েছে যথা: ক্রেতা কম; উৎপাদিত পণ্যের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা না থাকা; এই পেশাতে নারীদের কষ্ট বেশি কিন্তু আয় কম; সুই ও ফ্রেম নিজ খরচে কিনতে হয়; সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও তদারকির অভাব; অসৎ ব্যবসায়ীরা নারীদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়ে টাকা দেয় না; বর্ষার সময় বসার জায়গার অভাব কারণ তখন সব জায়গায় পানি থাকে, ইত্যাদি।

নকশি কাঁথা পেশার অসুবিধার পাশাপাশি কিছু সম্ভাবনার কথাও তারা উল্লেখ করেছেন। যেমন: এক-চতুর্থাংশেরও বেশি উত্তরদাতা (২৬.৭ শতাংশ) মনে করেন যে, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ভবিষ্যতে সারাদেশে এই কাজ ছড়িয়ে পড়বে। প্রায় ১৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন যে, সরকারি উদ্যোগে জেলায় জেলায় নকশি পল্লী গড়ে উঠবে। প্রায় ১১ শতাংশ মনে করেন, ভবিষ্যতে তারা সরাসরি বিদেশে নকশি পণ্য রপ্তানি করতে পারবেন,ইত্যাদি।

সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী উত্তরদাতা গণ নকশি পণ্যের ব্যাপক প্রসারের জন্য নিম্নোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ করেছেন। যেমন: শ্রমিকের মজুরি বেশি হওয়া উচিৎ (৫০.৫ শতাংশ), কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা থাকা দরকার (২৯.৭ শতাংশ), বর্ষাকালে কাজের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন (২০.৮ শতাংশ), প্রশিক্ষণ দরকার (১৮.৮ শতাংশ), পরিবেশ বান্ধব পল্লী নকশি সেন্টার তৈরি করা (১৫.৮ শতাংশ), আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন (১১.৯ শতাংশ), করোনাকালে সরকারিভাবে সাহায্য প্রদান করা (৬.৯ শতাংশ), বেশি বেশি কাজ থাকা দরকার (৪ শতাংশ), নকশি কাজের সাথে সম্পৃক্ত নারীদেরকে সম্মানের সাথে দেখা (২ শতাংশ), ইত্যাদি।

সমীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ প্রণয়ন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সরকারি বা বেসরকরি কর্তৃপক্ষ, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রণীত সুপারিশসমূহ পর্যালোচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে করোনাকালে এই শিল্পে নিয়োজিত নারীদের বিদ্যমান সমস্যাসমূহ দূর হবে এবং তাদের জীবন-জীবিকা রক্ষা পাবে।

যেমন: করোনাকালে নকশি কাঁথা সেলাই কাজে নিয়োজিত নারীদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদান করা; নকশি শিল্প কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের মজুরী বাড়ানোর বা বাজার উপযোগি মজুরি নির্ধারণ করা; যে সকল বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ নারীদের দিয়ে নকশি পণ্য উৎপাদন করিয়ে দেশে বা বিদেশে চড়া দামে বিক্রয় করে থাকে এই বিষয়ে যথাযথ তদারকির মাধ্যমে তাদেরকে সুনির্দ্দিষ্ট নিয়ম নীতির আওয়াতায় নিয়ে আসা; সরকারিভাবে নকশি পণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি ক্রেতার সাথে যোগাযোগ করে নকশি পণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা;

যে সকল দরিদ্র নারী নকশি কাজের সাথে নিয়োজিত থাকবেন বা হবেন তাদের নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকায় দল বা সমিতি গঠন করা। এই দল বা সমিতির সদস্য হবেন ২০ থেকে ২৫ জন নারী। তাদের মধ্য থেকে একজন দলনেত্রী বা সভানেত্রী নির্বাচিত হবেন, একজন সম্পাদক ও একজন কোষাধ্যক্ষ দলীয় সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন। এসব সমিতি বা দল নিয়ে একটি নেটওয়ার্ক বা বৃহত্তর প্লাটফর্ম তৈরি হবে। সমিতি বা দলের সদস্যগণ নকশি পণ্যের উৎপাদন, বিক্রয় ও মূল্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখবেন। এই সব দল বা সমিতির সদস্যদের জন্য ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা থাকবে। তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার উদ্যোগ সরকারিভাবে নিতে হবে। প্রয়োজনে তাদের যথাযথ মোটিভেশন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে হবে। সরকারি উদ্যোগেই এই সকল ব্যবস্থা নিতে হবে;

নকশি পণ্য নিয়ে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় সরকারি উদ্যোগে মেলা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করতে হবে। আইটি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়া অর্থাৎ নকশি পণ্য সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য সম্বলিত ওয়েব সাইট তৈরি করা; এই শিল্পে বিরাজমান মধ্যসত্বভোগী ও একচেটিয়া ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কমানোর জন্য সরকারিভাবে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে; পর্যাপ্ত মোটিভেশন প্রদানের মাধ্যমে এই শিল্পের সাথে জড়িত নারী শ্রমিকদের সম্পর্কে সমাজের মানুষের নেতিবাচক মনোভাব দূর করতে হবে; নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

করোনাকালে সৃষ্ট এ শিল্পের সমস্যাগুলো দূর করা হলে শিল্পটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে এবং দেশের বেকার সমস্যা সমাধানেও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারবে। তাই শিল্পটির উন্নয়নের জন্য সরকারিভাবে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা,ব্যাংক ও অন্যান্য অর্থ দাতাদের এগিয়ে আসা, তথ্য কেন্দ্র স্থাপন এবং আইটি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়া, অন্যান্য ব্যবসার মত নির্ভরযোগ্য লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করা, চাহিদা বিশ্লেষণ করে পণ্য উৎপাদন করা, উৎপাদনকারীদের মধ্যে সমন্বয় সাধন নিশ্চিত করা, এসোসিয়েশন বা ফোরাম গড়ে তোলা, সরকারি বিধিবদ্ধের আওতায় নিয়ে আসা, চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগ ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা ও সরকারি সহায়তায় দেশের যে সকল জায়গায় বেশি বেশি নকশি পণ্য উৎপাদিত হয় সে সকল এলাকায় নকশি পল্লী গড়ে তোলা। এসব কিছু প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে এ শিল্পের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যাদি বিদেশে রপ্তানি করে গার্মেন্টস শিল্পের মত প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি।

ড. এ. এইচ. এম মাহবুবুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর
ড. মতিউর রহমান, গবেষণা পরামর্শক, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (এইচডিআরসি), ঢাকা