মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন একজন উপাচার্যের কথা



ড. মতিউর রহমান
উপাচার্য অধ্যাপক ড.এ.এইচ.এম মোস্তাফিজুর রহমান

উপাচার্য অধ্যাপক ড.এ.এইচ.এম মোস্তাফিজুর রহমান

  • Font increase
  • Font Decrease

সময়ের সাথে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, সমাজকাঠামো, সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ, প্রথা-প্রতিষ্ঠান নিয়ত পরিবর্তনশীল। পরিবর্তনশীলতা সমাজের ধর্ম। এই পরিবর্তনশীলতার সাথে লড়াই করে মানুষ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। এজন্য মানুষকে ব্যবহার করতে হয়েছে তার সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ বুদ্ধিবৃত্তি ও পরিশ্রম করার ক্ষমতা। মানব প্রজাতির আদিম অবস্থা থেকে সভ্যজগতে উত্তীর্ণ হতে বুদ্ধিবৃত্তি তথা মেধা, শিক্ষা ও পরিশ্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। শিক্ষা এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। এজন্য শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়। এই শিক্ষা প্রদান কাজে যারা নিয়োজিত থাকেন তারাই শিক্ষক এবং তারা সমাজের অন্যান্য মানুষের নিকট অতীব সম্মানীয় হয়ে থাকেন। কারণ, একজন শিক্ষক সমাজের দর্পণ, তার প্রতিচ্ছায়া সমাজে প্রতিফলিত হয়। একজন শিক্ষককে হতে হয় সব মানবিক গুণাবলীর অনন্য আঁধার। এজন্য বলা হয়, যে তার শিক্ষককে সম্মান দেখায় না সে কখনো ভালো মানুষ হতে পারে না।

আমাদের দেশের শিক্ষা কাঠামোর সবচেয়ে ওপরের দিকে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সমাজের মানুষ উঁচুমাত্রায় সম্মান দেখান। কারণ, তারা জাতির অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই শিক্ষকদের মধ্য থেকেই অধিকতর যোগ্যতম একজনকে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। উপাচার্য মানেই সবার শ্রদ্ধা-সম্মানের আলোয় বাস করা একজন মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন আদর্শ মানুষ। কিন্তুু গণমাধ্যমে কতিপয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সম্পর্কে যে সব খবর আমরা প্রতিনিয়ত দেখি, পড়ি ও শুনি তাতে আমাদের মাঝে হতাশা তৈরি হয়। সাধারণ মানুষের মাঝেও নেতিবাচক ধারনা জন্ম নেওয়ায় স্বাভাবিক। তবে এই সমস্যাটি অনেক পুরোনো। উপাচার্যদের নিয়ে লেখক আহমদ ছফা লিখেছিলেন ‘গাভী বিত্তান্ত’ ও শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল লিখেছেন ‘মহব্বত আলীর একদিন’। জাতীয় পত্রিকাগুলো অনেক সময় ধারাবাহিক প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে উপাচার্যদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি নিয়ে। তবে এসবের মধ্যে তাদের সম্পৃক্ততা কতটুকু কিংবা পরিবর্তনশীল জটিল রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রভাব কতটুকু সে সম্পর্কে আমরা খুব একটা অবগত হতে পারি না। তবে একটা বিষয় খুবই দৃঢ়ভাবে আমরা বিশ্বাস করি আর তা হলো একজন উপাচার্য প্রথমত একজন শিক্ষক অতঃপর উপাচার্য। শিক্ষকসুলভ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যদি তারা উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করতে না পারেন তখন হয়ত এই পদটি একজন অ-শিক্ষক ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত হতে পারে। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। তবে, এসব সত্ত্বেও আমরা আশান্বিত হই যখন দেখি তাদের মধ্যেও কয়েকজন ব্যতিক্রমধর্মী উপাচার্য রয়েছেন যারা তাদের স্বীয় মেধা, প্রজ্ঞা, স্বকীয়তা ও নেতৃত্ব দিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এমনই একজন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ.এইচ.এম মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য।

অধ্যাপক ড. এ. এইচ. এম মোস্তাফিজুর রহমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম উপাচার্য হিসেবে ২০১৭ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে হিসেবে সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময়ে তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর এই দায়িত্ব পালনকালে তিনি সফলতার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পরিচালনা করছেন। এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো দুর্নীতির সাথে আপোস করেননি। তার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই। স্বজনপ্রীতির অভিযোগ নেই। কোন অনিয়ম নেই। বরং তার গতিশীল নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় টি এগিয়ে যাচ্ছে। তার সফলতা বা নেতৃত্ব সম্পর্কে বুঝতে হলে তার মূল কর্মক্ষেত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অবদান সম্পর্কে জানা প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৩৪ বছরের শিক্ষকতায় বিভিন্ন সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য, একাডেমিক কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য, প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য, বিভাগীয় প্রধান, হলের হাউজ টিউটর, শিক্ষক সমিতির ৩ বার নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। এছাড়া তিনি উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্প (হেকেপ) প্রজেক্ট-এর প্রধান এবং সাব প্রজেক্ট ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে অধ্যাপনা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষা সংক্রান্ত নেতৃত্ব প্রদানের এই অভিজ্ঞতা উপাচার্য হিসেবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা কার্যে সহায়ক হয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীদের নিকট তিনি ছিলেন একজন নিভর্রযোগ্য অভিভাবক, অনুপ্রেরণাদাতা, পথপ্রদর্শক এবং বিপদের ভরসা। ছাত্রছাত্রী ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছেও তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তিনি ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তা এমনি এমনি তৈরি হয়নি। তার ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা, নেতৃত্ব প্রদান ক্ষমতা এবং সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যদের প্রতি ভালোবাসা ও সহযোগিতা তাকে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। তার এই জনপ্রিয়তার দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুকে। ফেসবুকে তার শুভ্যানুধায়ী ও ফলোয়ারের সংখ্যা অসংখ্য। তার ফেসবুক পেজে কোন পোস্ট দিলে তাতে হাজার হাজার লাইক ও কমেন্টস দেওয়া হয় যা থেকে বুঝা যায় তিনি কতটা জনপ্রিয়।

তিনি একজন মানবপ্রেমী শিক্ষক। অসচ্ছল ছাত্রছাত্রীদের শুধু আর্থিকভাবেই নয় মানসিকভাবেও তিনি তাদের পাশে দাঁড়ান পিতৃসুলভ ভালোবাসায়। ছাত্রছাত্রীদের তিনি সন্তানতুল্য স্নেহ করেন। এসবের বাইরে সমাজের দরিদ্র মানুষের জন্য রয়েছে তার অকৃত্রিম মমত্ববোধ। দরিদ্র মানুষদেরও তিনি আর্থিক সহযোগিতাসহ নানাভাবে সাহায্য করেন। তার কাছে সাহায্য চেয়ে কেউ ফিরে এসেছে এমনটি জানা নেই।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান প্রকৃতই একজন সাদা মনের মানুষ। অতি সম্প্রতি একটি ঘটনা থেকে তার সহজ-সরল মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। করোনাকালে প্রায় এক বছরের অধিক সময় ধরে সরকারি সিদ্ধান্তে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এতে করে ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার চরম ক্ষতি হচ্ছে। এ বিষয়টি তাকে প্রচণ্ড আহত করে প্রতিনিয়ত। ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয় খোলার দাবি নিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি সরল বিশ্বাসে বলেন, করোনা মহামারির কারণে বহুদিন যাবৎ ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় মাস গেলে আমার বেতন তুলতে লজ্জা লাগে। আমি চিন্তা করি এই টাকাটা আমার জন্য কতটুকু হালাল হচ্ছে। তবে এই অবস্থার জন্য আমি বা আমরা কেউই দায়ি না। এ থেকেই বুঝা যায় তিনি কতটা সৎ, নিলোর্ভ এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন একজন উপাচার্য।

অধ্যাপক মোস্তাফিজের এই মানবিক গুণাবলী তার সহজাত। তার প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় তিনি জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলায় নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নানার বাড়িতে থাকতেন। কেননা, তাঁর বাবার বাড়ি নদীভাঙনে বিলীন হয়েছিল। ছেলেবেলায় তিনি দূরন্ত ছিলেন; কিন্তু তিনি সবসময় ক্লাসে প্রথম হতেন। মুক্তিযুদ্ধে তার বাবা শহীদ হন। তিনি বাবার লাশ পর্যন্ত দেখতে পাননি। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় সবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বর্তায় তার ওপর। তখন খুব কষ্টে তার দিন কেটেছে। তিনি সারাদিন টিউশনি ও সংসার দেখভালের জন্য পড়াশোনায় মন দিতে পারতেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার সময় তার সম্মানিত শিক্ষকরা তাকে প্রাইভেট পড়ানোর ব্যবস্থা করে দেন। তিনি নিজের খরচের জন্য কিছু টাকা রেখে বাকিটা গ্রামে পাঠিয়ে দিতেন। তিনি সমাজবিজ্ঞানে অনার্সে প্রথম হয়েছিলেন। ছাত্রজীবনে তার ভালো জামা-কাপড় ছিল না। জীবনটা ছিল অনেক সংগ্রামের। এই সংগ্রামের মাঝেই এমএতে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হন। এভাবেই তার ছাত্রজীবন কেটেছে। তার ভালো রেজাল্টের কারণে ওই বিভাগের শিক্ষকরা তাকে শিক্ষকতা পেশায় আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ১৯৮৩ সালে শিক্ষক হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, তার বাবাও ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে থেকে নিজ জীবন উৎসর্গ করেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেছেন তার জীবনে সফলতার পেছনে রয়েছে তার মায়ের দোয়া। তিনি আজ এত দূর আসতে পেরেছেন তার মায়ের দোয়ার কারণে। তিনি মনে করেন জীবনে সফলতা পেতে হলে নিজেকে মহৎ হতে হবে। আর কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, মানুষের ভালোবাসাটাই তার জীবনে সবচেয়ে বড় অর্জন। এই ভালোবাসা দিয়েই তিনি পেয়েছেন মানুষের সহযোগিতা। আর এই সহযোগিতার মধ্য দিয়েই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, অধ্যাপক ড. এ.এইচ.এম মোস্তাফিজুর রহমানের উপাচার্য হিসেবে সফলতার পিছনে রয়েছে মানুষের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা। মানুষকে ভালোবাসার এই শিক্ষা তিনি পেয়েছেন তার মায়ের নিকট থেকে। প্রসঙ্গক্রমে বলা প্রয়োজন যে, তার মা একজন ‘রত্নগর্ভা’ খেতাবধারী। যিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বামীকে হারিয়ে, সহায় সম্বলহীন হয়েও মনোবল হারাননি। তার পাঁচ ছেলেকে কঠোর সংগ্রাম করে লেখাপড়া শিখিয়েছেন এবং মানবিক গুণাবলী শিক্ষা দিয়েছেন। যাদের সবাই আজ স্বীয় যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং বলা যায়, মায়ের নিকট থেকে প্রাপ্ত এই মানবিক গুণাবলী ও ভালোবাসা দিয়েই তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। তিনি উঠে এসেছেন এক অতি সাধারণ পরিবার থেকে শুধু মেধার জোরে এবং অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা পেয়ে। এজন্য তিনি কখনো মানুষের এই ভালোবাসার অবমাননা করেননি। এই ভালোবাসায় তাকে সাহস যোগায় অন্যায় না করতে, অমানবিক না হতে। শত প্রতিকূল অবস্থাতেও তিনি দৃঢ় থাকেন সত্য ও ন্যায়ের পথে। কারণ তিনি এদেশটাকে, এদেশের মানুষকে ভালোবাসেন পরম মমতায়। তিনি হৃদয়ে ধারণ করে আছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা ও শিক্ষার মান উন্নয়নে তিনি উপাচার্য হিসেবে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। এই মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন উপাচার্যের নিরন্তর সফলতা ও সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করি।

ড. মতিউর রহমান, গবেষণা পরামর্শক, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (এইচডিআরসি), ঢাকা