আমাদের আবার অনলাইন!



আনিসুর বুলবুল
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

লাবিবার অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষার খাতা জমা দিতে যাবো। বাগানবাড়ি থেকে রিকশায় উঠেছি। মাটিকাটা এমপি চেকপোস্টে যথারীতি একজন তরুণ এমপি রিকশা থামালেন। হাতে থাকা খাতা দেখিয়ে বললাম, বাচ্চার স্কুলে যাচ্ছি, পরীক্ষার খাতা জমা দেবো। তরুণ এমপি হাতের ঈশারা দিয়ে যেতে বললেন।

এই সময় রিকশাচালক আমার দিকে ঘুরে তাকালেন একবার। এরপর প্যাডেলে পা চালালেন। বললেন, কোন স্কুলে যাবো? বললাম, ঢাকা ক্যান্ট গার্ল্সের প্রথম গেটে যান। তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, স্কুলের বেতন দিতে হয় নাকি? বললাম, হয়। তিনি ফের প্রশ্ন করলেন, ক্লাস হয় নাকি? বললাম, হয়। তাকে খুব বিচলিত মনে হলো আমার!

স্কুল গেটে পৌঁছার পর তাকে বললাম, একটু দাঁড়ান খাতাগুলো জমা দিয়ে আসছি।

স্কুল গেটের প্যারেন্টস শেডে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে আছেন কয়েকজন শিক্ষক-আয়া ও অফিস সহায়ক। দোলনচাঁপা শাখার খাতা যিনি নেন তার হাতে বুঝে দিলাম।

দেরি না করে ফের ওই রিকশায় গিয়ে উঠলাম। রিকশাচালক প্যাডেলে পা মেরেই জানতে চাইলেন, আমার বাচ্চা ক্লাস কিভাবে করে? বললাম, অনলাইনে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আমাদের আবার অনলাইন।

আমি জানতে চাইলাম, তার বাচ্চাদের খবর। তিনি জানালেন, তার এক ছেলে দুই মেয়ে। ছেলেকে ক্লাস ফাইভে ভর্তি করিয়েছেন। মেয়ে দুটোকে ক্লাস সিক্সে। করোনাকালে ওদের একদিনও ক্লাস হয়নি।

জাহিদুর। বয়স ৪৫ এর উপরে। বাড়ি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে। থাকেন বালুঘাট এলাকায়।

তিনি বললেন, স্কুলে ক্লাস হয় না দেখে মাদরাসাতে ভর্তি করিয়েছিলাম। এখন মাদরাসাও বন্ধ। ভাবছিলাম, ওরা লেখা-পড়া শিখে মানুষ হবে। কিন্তু এখন যে অবস্থা দাঁড়াইছে কবে স্কুল খুইলবে কবে ক্লাস হবে। কিচ্ছু বুঝবার পারতাছি না। বাচ্চারা তো বড় হইয়া যাইতেছে!

অনলাইনে ক্লাস প্রসঙ্গে জাহিদুর বললেন, আমরা অনলাইন কোথায় পাবো? বাচ্চাদের একবার ভালো-মন্দ খাবার দিতেই ঘাম ছুটে যায়। আবার অনলাইন!

আমার মেয়ে লাবিবা। সে এবার ক্লাস থ্রিতে উঠেছে। গতবছর বার্ষিক পরীক্ষা হয়নি। ক্লাস হয়েছে অনলাইনে। এবারও ক্লাস হচ্ছে অনলাইনে; বাসাতেই পরীক্ষা দিচ্ছে।

আমার মোবাইল ফোন কিংবা ল্যাপটপ দিয়ে ক্লাস করে লাবিবা। শুক্র-শনিবার ছাড়া প্রতিদিনই ক্লাস হয় ওদের। মাইক্রোসফটের টিমস্ ব্যবহার করে ক্লাস নেন শিক্ষকরা।

যেদিন ব্রডব্যান্ড লাইনে নেট স্লো থাকে কিংবা নেট থাকে না সেদিন মোবাইল ফোনের ইন্টারনেট ব্যবহার করেই ক্লাস করাতে হয় লাবিবাকে।

রিকশায় বসে বসে ভাবি; এই সুবিধা গ্রামের মানুষ কোথায় পাবে? আসলেই তো; তাদের বাচ্চাদের কিভাবে পড়াবে? ফের মনে পড়ে, টিভির মাধ্যমে স্কুলের পড়ার কথা।

জাহিদুরকে বললাম, টিভি দেখে তো অন্তত সিলেবাসের পড়াগুলো শেষ করতে পারতো! তিনি ফের দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আমরা টিভি পাবো কই? বাড়িতে তো কারেন্টই নাই!

করোনার প্রভাবে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ আছে। শহরাঞ্চলের স্কুলগুলোতে ইন্টারনেট বা অনলাইনভিত্তিক শিক্ষাদান সম্ভব হলেও গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলোতে তা সম্ভবপর হচ্ছে না।

গ্রামের অধিকাংশ পরিবারেরই স্মার্টফোন নেই, থাকলেও ইন্টারনেটের সুবিধা নেই। টিভি থাকলেও বিদ্যুৎ নেই। আছে নানান সমস্যাও।

জাহিদুরের মতো অসংখ বাবারা তাদের সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে না পেরে শুধু আফসোসই করছেন না তারা সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ভেঙে পড়ছেন। সন্তানের বয়স কিন্তু ঠিকই বেড়ে যাচ্ছে!