ঈদুল আজহায় অসহায়দের পাশে দাঁড়াই



মাহমুদ আহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মহামারি করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবায় সমগ্র বিশ্ব বিপর্যস্ত এবং ওলট-পালট করে দিয়েছে সব পরিকল্পনা। বিশ্বময় বিরাজ করছে ভয়াবহ এক অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতেও আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে মুসলিম উম্মাহ বিশেষ ইবাদতে রত থেকে ঈদুল আজহা উদযাপন করবে।

এ বছরও করোনা পরিস্থিতির কারণে হজ পালনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। শুধু নির্ধারিত সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরাই এবার হজ করছেন।

অনেকেই হজ পালনের নিয়ত করেও হজ পালন করতে পারছেন না। যারা হজের নিয়ত করেছিলেন তারা এর প্রতিদান অবশ্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে পাবেন।

মহান আল্লাহপাক যাদেরকে হজ পালনের সামর্থ্য দান করেছেন এবং হজ পালনের নিয়তও করেছিলেন তাদেরকে বলব, যেহেতু করোনার কারণে হজ পালন সম্ভব হয়নি, তাই আপনারা ইচ্ছে করলে সহজেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেন। হজ করার জন্য যে অর্থ জমিয়েছিলেন তা দিয়ে গরিব-অসহায়দের সেবা করুন। বর্তমান অনেক খেঁটে খাওয়া মানুষ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। গরীব অসহায়দের সেবা করে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি, কেননা আল্লাহ মানুষের অন্তর দেখেন।

ইসলামের ইতিহাস থেকে জানা যায়, মহানবী (সা.) বায়তুল্লাহর জিয়ারত না করা সত্তেও আল্লাহতায়ালা একবার তার হজ কবুল করেছিলেন। ঘটনাটি ছিল এমন- হিজরতের ষষ্ঠ বছরে এক স্বপ্নের ভিত্তিতে, যেখানে তিনি (সা.) দেখেছিলেন, তিনি কাবা গৃহ প্রদক্ষিণ করছেন এর ফলে মহানবী (সা.) হজের উদ্দেশ্যে পনেরশত সাহাবীকে নিয়ে মদিনা হতে মক্কার দিকে রওনা হন এবং মদিনা হতে ছয় মাইল দূরবর্তী মক্কার পথের প্রথম ধাপে জুল হালিফা নামক স্থানে যাত্রা বিরতি করলেন এবং মহানবী (সা.) সকলকে হজের পোশাক পড়তে নির্দেশ দিলেন এবং উচ্চস্বরে তালবিয়া অর্থাৎ লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, পড়তে লাগলেন। হজের সব প্রস্তুতি থাকা সত্বেও কোরইশরা মহানবী (সা.) এবং সাহাবীদের হজ করতে দিলেন না। মহানবী (সা.) সেবছর হজে না গিয়েও তার সঙ্গীদেরকে হজের উদ্দেশ্যে নেয়া কুরবানীর পশুগুলোকে হুদায়বিয়ার ময়দানেই জবেহ করতে নির্দেশ দিলেন এবং তাদের মস্তকের কেশ মুন্ডন করতে এবং মদিনায় ফিরে যেতে নির্দেশ দিলেন এবং তিনি নিজেও কোরবানির পশু জবেহ করলেন।

মহানবী (সা.)-এর এই হজকে আল্লাহপাক কবুল করেছিলেন এবং তার প্রতি খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটেই পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে ‘নিশ্চয় আল্লাহ তার রাসুলের স্বপ্নটি যথাযথভাবে পূর্ণ করে দেখালেন। আল্লাহ চাইলে তোমরা তোমাদের মাথা কামানো ও চুল ছাটানো অবস্থায় অবশ্যই নিরাপদে ও নির্ভয়ে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে। আর এছাড়া তিনি আরো একটি আসন্ন বিজয় তোমাদের জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছেন’ (সুরা ফাতাহ: ২৭)। সে বছর হজ না করেও মহানবীর (সা.) স্বপ্ন আল্লাহপাক পূর্ণ করেছেন অর্থাৎ তার হজ গ্রহণ করেছেন। এছাড়া পরের বছরই তিনি সাহাবীদেরকে নিয়ে হজ পালন করেছিলেন।

তাহলে ভেবে দেখুন, আল্লাহ মানুষের হৃদয় দেখে থাকেন। কে কোন নিয়তে হজ করতে আসেন, তা আল্লাহ ভাল জানেন। কারো ইচ্ছা যদি থাকে হজ করার, আর সে মানবতার সেবায় সব বিলিয়ে দেয়, এমন ব্যক্তিকে আল্লাহপাক হজের প্রতিদান দিতে পারেন।

তাজকেরাতুল আউলিয়াতে একজন আল্লাহ প্রেমিকের ঘটনা এভাবে বর্ণিত হয়েছে, একবার কারো হজ গৃহীত হয়নি আর কেবল একজনের হজ আল্লাহর দরবারে গৃহিত হয়েছিল। যে ব্যক্তির হজ গ্রহণ করা হয়েছিল, তিনি হজের সব প্রস্তুতি নেয়া সত্তেও হজে যেতে পারেন নি। তিনি তার হজের জন্য জমানো অর্থ তার অসহায় প্রতিবেশীকে দান করেছিলেন। তার হৃদয়ে যেহেতু আল্লাহ প্রেম ছিল, তাই তার মাধ্যমেই সে বছরের হজ পূর্ণ হয়। তাই আসুন, এবছর আমরা গরীব-অসহায়দের সেবা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার চেষ্টা করি।

হজের পাশাপাশি ইসলামে কোরবানির গুরুত্ব অতি ব্যাপক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কোন মহামারির সময় একজন মুমিন তার ইবাদতে দুর্বলতা দেখায় না বরং আরো গতির সাথে ইবাদতে রত হয়। করোনা পরিস্থিতি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পশু কোরবানি থেকে বিরত থাকার কোন বিধান ইসলামে পাওয়া যায় না। তাই করোনার অজুহাতে কোরবানির বিধান কোনো অবস্থাতেই শিথিল হতে পারে না। সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের অবশ্যই কোরবানি আদায় করতে হবে।

কেবল গোশত খাওয়াই এ কোরবানির উদ্দেশ্য নয় বরং কোরবানির পশুর মত নিজেদের পশুত্বকে বলি দেয়ার শিক্ষাও আমরা এ থেকেই পেয়ে থাকি। আল্লাহপাক বলেছেন, ‘এগুলোর মাংস বা এদের রক্ত কখনো আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, বরং তার কাছে তোমাদের পক্ষ থেকে তাকওয়া পৌঁছে।’ (সুরা হাজ, আয়াত: ৩৭)

হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সুন্নত অনুযায়ী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে কোরবানি পালনের মাধ্যমে প্রতি বছর একজন মুসলমান নিজের মাঝে তাকওয়াকে আর একবার ঝালিয়ে নেন যেন প্রয়োজনের দিনে আল্লাহর পথে কোরবানির পশুর ন্যায় নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন।

হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের কোরবানির অনুসরণে মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর ১০ই যিলহাজ তারিখে পশু কোরবানি করে থাকে। ইসলামে এই যে কোরবানির শিক্ষা তা কি কেবল একটি পশু কোরবানির মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়ে যায়? আসলে পশু কোরবানি করাটা হচ্ছে একটা প্রতীকীমাত্র। আল্লাহতায়ালা চান মানুষ যেন তার পশুসূলভ হৃদয়কে কোরবানি করে, তার আমিত্বকে কোরবানি করে আর সেই সাথে তার নিজের সমস্ত চাওয়া-পাওয়াকে আল্লাহর খাতিরে কোরবানি করে দেয়। হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামও ও তার পুরো পরিবারের  কোরবানি এমনই ছিল। তারা ব্যক্তি স্বার্থকে কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করেছিলেন। আল্লাহর সাথে প্রেমবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য তিনি কোরবানি চান আর এ কোরবানির অর্থ কেবল পশু জবেহ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ কোরবানি কারো জন্য নিজ প্রাণের কোরবানিও হতে পারে আবার কারো নিজ পশুত্বের কোরবানিও হতে পারে। আমরা যদি মনের পশুকে কোরবানি করতে পারি তাহলেই আমরা আল্লাহতায়ালার প্রিয়দের অন্তর্ভূক্ত হতে পারব।

তাই কেউ যদি মনে করে, করোনা পরিস্থিতে এ বছর কোরবানি না দিলে কি এমন ক্ষতি তা মোটেও ঠিক হবে না। এমনটি মনে করা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শের বিরুদ্ধে হবে।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবিরা কত কষ্টই না সহ্য করেছেন, কিন্তু কখনই তার পবিত্র সাহাবি রাদিয়াল্লাহু আনহুগণ একবারের জন্যও বলেন নি যে, হে আল্লাহর রাসুল! এ বছর আমাদের জন্য কোরবানি করাকে মাফ করে দিন। এমন প্রশ্ন কখনো উত্থাপনই করা হয় নি। তাহলে কীভাবে আমরা এ প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারি যে, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে কোরবানিতে অংশ না নিলে হয় না। তাই করোনার জন্য কোরবানি করা থেকে বিরত থাকার কোন অনুমতি যে ইসলাম দেয় না তা আমাদেরকে ভালোভাবে বুঝতে হবে।

কোরআন-হাদিস এবং বুযুর্গানে দ্বীনের ভাষ্য থেকে যতটুকু জানা যায়, কোরবানির পেছনে যে উদ্দেশ্যটি কাজ করা আবশ্যক তা হলো তাকওয়া বা আল্লাহর সন্তুষ্টি। হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম তার একমাত্র পুত্র হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালামকে কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জবাহ করতে উদ্যত হয়েছিলেন। যে কোরবানির পেছনে আল্লাহর সন্তুষ্টি কাজ করে না সে কোরবানি, কোরবানির আওতায় পড়ে না।

পরিশেষে এটাই বলব, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য থাকলে অবশ্যই কোরবানি দিতে হবে। এছাড়া যাদেরকে আল্লাহ স্বচ্ছলতা দান করেছেন তারা বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গরিব এলাকায় নিজেদের পক্ষ থেকে কোরবানির ব্যবস্থা করে অশেষ কল্যাণের ভাগি হতে পারেন। এতে আল্লাহর হক এবং বান্দার হক উভয় আদায় হবে।

করোনা পরিস্থিতিতে আমাদেরকে কোরবানির পশু ক্রয় করা থেকে নিয়ে অন্যান্য সব কাজে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে অংশ নিতে হবে। আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমাদের এ কোরবানি তিনি গ্রহণ করে নিন, আমিন।

সবাইকে ঈদুল আজহার অগ্রিম শুভেচ্ছা ও ঈদ মোবারক।

লেখক: ইসলামী গবেষক ও কলামিস্ট, ই-মেইল- [email protected]