আমরা ভালো নেই



আনিসুর বুলবুল
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

বছর দশেক আগে একটি ব্যাংকের সাভার ব্রাঞ্চে একটি মিলিয়নিয়ার স্কিম করেছিলাম। কয়েক বছর চালানোর পর আর চালানো হয়নি। সম্প্রতি ওই ব্রাঞ্চ থেকে আমাকে ফোন দিয়ে জানায়, কিস্তি না দিতে দিতে স্কিমটি বন্ধ হয়ে গেছে; যা জমেছে নিয়ে যান।

এই করোনা সঙ্কটের মধ্যে নগদে যা-ই পাই তা-ই লাভ ভেবে বাইক নিয়ে রওয়ানা দিই। সাভার গিয়ে বন্ধু সাইফুলকে ফোন দিই। ওকে নিয়ে ব্যাংকের সেই ব্রাঞ্চে যাই।

ব্যাংকের ভেতর খুব বেশি লোকজন নেই। যারাই এসেছেন সবাই টাকা তুলতে এসেছেন। সবার হাতে চেক। সবাই সামাজিক দূরত্ব মেনেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।

আমার পূর্বে যে লোকটি হিসেব ক্লোজ করছেন তিনি এই ব্রাঞ্চে ডিপিএস করেছিলেন। সেটির মেয়াদ শেষ হয়নি; তারপরও জমা টাকা তুলে নিচ্ছেন। তারপর আমাকে ডাকলেন। বললেন হোম ডিস্ট্রিক কোথায়? বললাম মানিকগঞ্জ।

কাস্টমার কেয়ারের লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তার কৌতুহল দেখে বললাম, ভাই ওই সময়ে এই ব্যাংকের কোনো শাখাই মানিকগঞ্জে ছিলো না। আর এই স্কিমটিও মানিকগঞ্জের কোনো ব্যাংকে ছিলো না। তিনি আমাকে একাউন্ট পেয়ি চেক দিবেন বলে জানান।

আমাদের কথার মধ্যেই দেখলাম একজন নারী এসেছেন জমার স্লিপ নিয়ে। তিনি বললেন, তার বোনের ডিপিএস ভাঙাবেন। ব্যাংক থেকে জানানো হলো তার সেই বোনকেই আসতে হবে। ওই নারীর কোনো কথাই তারা শুনলেন না।

চেক পেতে একটু দেরি হচ্ছিলো; লোকটি প্রিন্ট করতে পারছিলেন না। আমি আর সাইফুল দাঁড়িয়ে কথা বলছি। খেয়াল করলাম আরো দুজন লোক এসেছেন ডিপিএস ভাঙাতে। একজন আমাদের সম বয়েসি হবে; আরেকজন পঞ্চাশোর্ধ। তাদের চোখে-মুখে ক্লান্তি আর অবসাদ!

ব্যাংকটি দোতালায়। নিচে রাস্তার পাশে বাইক রেখে এসেছি। ভাবলাম একটু গিয়ে দেখে আসি। সাইফুল তখন ফোনে ব্যস্ত; ওর অফিসের ফোন। আমি নিচে নামতে যাবো; সিঁড়িতে দেখি সেই নারীকে। ফোনে কান্না করছেন; যিনি তার বোনের ডিপিএস ভাঙাতে এসেছিলেন। শুধু শুনলাম 'এখন কি করবো আসমা?'

বাইক দেখে উপরে উঠার সময় তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কোনো সমস্যা? তিনি জানালেন তার বোনের বাচ্চা হবে; হাসপাতালে। বোনকে এই সময় কেমনে নিয়ে আসবে। তিনি ওড়না দিয়ে চোখ মুছলেন।

আমি চেকটি পকেটে ঢুকিয়ে সাইফুলকে নিয়ে রওয়ানা হই। আসার সময় খেয়াল করি পুরাতন জমার স্লিপ হাতে আরো কয়েকজন সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছেন। তারা কি টাকা তুলতে নাকি জমা দিতে উঠছেন!

মানুষ কতোটা ক্রাইসিসে পড়লে ভবিষ্যতের জন্য জমানো টাকা তুলতে যায়? কতোটা সমস্যা ফেস করলে মেয়াদ শেষ না হতেই ডিপিএস ভাঙাতে যায়? ওই নারীর কান্না আর ব্যাংকে ডিপিএস ভাঙাতে আসা লোকদের চেহারাই বলে দিচ্ছিলো আমরা ভালো নেই।

লেগুনা, রিকশা আর প্রাইভেট কারের ভিড় ঠেলে আমার বাইক মেইন রোডের দিকে এগিয়ে যায়!