ইভ্যালি সংক্রমণ, আক্রান্ত আমরা!!



ডা. রাজীব দে সরকার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ই-কমার্সের দুনিয়াদারির হিসেবে বাংলাদেশ এখনো শিশু। বাংলাদেশের জনগণ ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে ই-কমার্সের একটা দারুণ সুফল ভোগ করলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ এখনো 'ই-কমার্সের শৈশব' পার হয় নি।

ঠিক এমনই একটা সময়ে "ইভ্যালি"র আবির্ভাব। ইভ্যালির কনসেপ্ট বাংলাদেশে নতুন হলেও বিশ্বে নতুন না। আর এই কনসেপ্ট এর ব্যবসা অনেক দূর এগিয়েছে এ ধরনের নজির পৃথিবীতে খুব কম।

আড়াই লাখ টাকার একটা বাইক এক লাখ টাকায় পাওয়ার লোভ কার নাই? আমারও আছে। এই লোভটাই কিন্তু আমাদের ইনভেস্টমেন্টকে ট্রিগার করে। এতো বিশাল অফারের কারণে আমরা ব্যবসার পেছনের হিসাবটা বে-মালুম ভুলে যাই। কোন ইনভেস্টমেন্ট ছাড়া ১০ টাকার জিনিস ৩/৪ টাকায় দেওয়া যায় না। পুরো গণিত শাস্ত্রকে উল্টে দিয়ে চলছে যে ব্যবসা, সেই ব্যবসার সাথী হচ্ছে আমাদের লোভী বিনিয়োগ।

মজা হচ্ছে, এই লোভে পড়েও কিছু মানুষ লাভবান হচ্ছেন। যারা হচ্ছেন, তারাও এক ধরণের ব্যবসা করছেন। একটা জিনিস ৫ টাকায় কিনে ১০ টাকায় বিক্রি করার মধ্যে অথবা ২ লাখ টাকার একটা বাইক ক্রেতা হয়ে এক লাক টাকায় কিনে আবার বিক্রেতা হয়ে ২ লাখ টাকায় বিক্রি করার মধ্যে আপাতত দৃষ্টিতে কোন "ভুল" পাওয়া না গেলেও এর পেছনের গোজামিলটা আপনি আড়াল করে যাচ্ছেন নিজের স্বার্থেই। আপনার বিনিয়োগ অন্য আরেক ক্রেতা/গ্রাহকের লোভী বিনিয়োগের ফসল।

এই মজারও একটা 'সাজা' আছে। এই ধরনের 'দ্বিতীয় পক্ষ বাণিজ্যে'র একটা "এক্সিট পয়েন্ট" আছে। অর্থাৎ একবার বা দুইবার লাভ করলেও আপনি যদি এই ব্যবসায় বার বার বিনিয়োগ করেন, তবে এক সময় মূল উদ্যোক্তা নিজেকে 'দেউলিয়া'/অসমর্থ্য ঘোষণা করলে আপনার ক্ষতিপূরণ পাবার সম্ভাবনা "শূন্য"। আইনের বিধানও আপনাকে এক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে না। ইতিপূর্বে ডেসটিনি-হলমার্ক সহ অন্যান্য এমএলএম ব্যবসার ক্ষতিগ্রস্তরা এখনো একটি টাকাও পান নি। এমনকি মূল উদ্যোক্তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করা হলেও উঠে আসেনি ক্ষতিপূরণের অর্থ। সেখানে ইভ্যালির নিজস্ব সম্পদের তুলনায় বাজারে চলমান দেনার পরিমাণ প্রায় ৬ গুণ বেশী (ইভ্যালির নিজস্ব সম্পদ ৬৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, আর জনসাধারণের ও মার্চেন্টদের কাছে দেনা ৪০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা, সূত্রঃ ঢাকা ট্রিবিউন)।

একদিক থেকে সহজে লাভ করতে আগ্রহী একটি জনপদের মানুষের কাছে ই-কমার্স এর কাছ থেকে দারুণ এক চপটাঘাতের নাম ইভ্যালি। ইভ্যালি-কে অবশ্য ধন্যবাদ দেওয়াই যায় জাতিগত এই গণিত শিক্ষা প্রদানের জন্য।

ই-কমার্সের বেশ ক্ষুদ্র একটি অঙ্গ "এফ-কমার্স" বা ফেসবুক ইকোনমিও এখন ফুলে ফেঁপে কলাগাছ। তেলাপোকা মারার ঔষধ থেকে অপারেশন থিয়েটারের জটিল অস্ত্রোপচার ও পরীক্ষণ সামগ্রী এখন ফেসবুকে অহরহ বিক্রি হচ্ছে। এই "এফ-কমার্স" আমাদের অর্থনীতির একটি বড় অংশ হলেও জাতীয় রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় এখনো শতভাগ সংযুক্ত না। তাই এখানে বিক্রেতারা চাইলে কিছুটা "ভূত" সেজে ব্যবসা করতে পারেন এবং কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহককে "বেকুব" হতেও দেখা যায়। কারন মেসেঞ্জারে ব্লক করে দিলে জবাবদিহিতার খাতাও ব্লক হয়ে যায়।

এই মুহুর্তে ইভ্যালি যদি মনে করে আর ব্যবসা করবে না বাংলাদেশে, তাও প্রতিষ্ঠানটিকে ২১৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকার পণ্য সরবরাহ করতে হবে (সূত্রঃ দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)। আমি মনে প্রাণে চাই না, এই ২১৩ কোটি টাকার মধ্যে কোন ঘর-বেঁচা, জমি-বেঁচা, ক্ষুদ্র মূলধন ব্যবসায়ীর টাকা থাকুক। কিন্তু একটা জিনিস ভাবুন, যে আইফোন ১২ প্রো-ম্যাক্স এর দাম প্রায় দেড় লাখ টাকা, আপনি অফারে পেলেন ৩০ হাজার টাকায় এবং আপনি অর্ডার করলেন ২০ পিস; আপনার কি একবারও মনে হলো না, এর মধ্যে আর যাই থাকুক, "ব্যবসা" নেই? আছে হঠকারিতা। আছে লোক ঠকানো? এতোটা কম দামে, অথবা এতোটা প্রোফিট মার্জিনের ব্যবসা, সেটা কি আদৌ ব্যবসা?

এটা যদি ব্যবসা হয়ও, তবে কোনভাবেই সেটা সাসটেইনেবল হতে পারে না। এতোটা ভঙ্গুর একটা চেইন এক সময় ভেঙে পড়বেই। শুভঙ্কর বাবু মানুক বা না মানুক এই অমূলক অফারভিত্তিক ব্যবসার পরিণতি ই-কমার্সের প্রতি অনাস্থা তৈরী করে দিতে যথেষ্ট। সেদিক থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাবে আমরা অনলাইন বিজনেস অরবিট থেকে ছিটকে পড়বো।

আমাজনের ব্ল্যাক ফ্রাইডের সাথে ইভ্যালির তুলনা দিলে তা হবে বোকামি। আমাজন বছরের বিশেষ বিশেষ কিছু দিনে ক্রেতা আকর্ষণের জন্য যে অফার দেয়, তা তাদের বহু জটিল গণিতের ফল। বছরের প্রতিদিন এক নাগাড়ে এই অফার চলে না।

করোনা পরিস্থিতি আমাদের অনেকখানি ই-কমার্সমুখী করেছিলো। এক অর্থে এই সামাজিক দূরত্ব আর ঘরে থাকার উপদেশ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য আশীর্বাদ ছিলো। ইভ্যালিসহ অন্যান্য ঠগবাজ ও তাদের সহকারীদের জন্য ভুক্তভোগীর সংখ্যা আজ হাজার হাজার। কাল হবে লাখ লাখ। এটাও এক ধরণের সংক্রমণ। এই সংক্রমণের কোন ভ্যাকসিন নেই। কারন ভাইরাসের চরিত্রের বদল হলেও আমাদের লোভী চরিত্রের বদল হয় নি বহু বছরেও।

করোনা অতিমারীর পাশাপাশি অতি নিভৃতে ই-কমার্সের নামে যে ভাইরাস আমরা চাষ করে চলেছি, এর থেকে মুক্তি মেলার আমি দৃশ্যত কোন পথ দেখি না। কারন আমরা চোর পালালে দরজা বন্ধ করি। চোর আসার আগেই ব্যবস্থা নেই না। আমরা বরাবরই রি-অ্যাকটিভ, কখনোই প্রো-অ্যাকটিভ না। কেন আমরা এরকম, সেই আলোচনা আরেকদিন করা যাবে।

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক ও কলামিস্ট, ইমেইলঃ [email protected]