গ্রামীণ গণপরিবহণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন: প্রসঙ্গ ইজিবাইক



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশের উন্নয়নে গণপরিবহণ ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। গত কয়েক দশকে দেশের গণপরিবহণ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ পরিবহণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। দেশজুড়ে গ্রামের অধিকাংশ কাঁচা রাস্তা পাকা হওয়ায় বিভিন্ন প্রকার যানবাহন এই সব রাস্তায় চলাচল শুরু করে। সেসবের মধ্যে শ্যালো ইঞ্জিনযুক্ত নসিমন, করিমন, ভটভটি, মোটরযুক্ত রিকশা, ভ্যান, অটো রিকশা থেকে শুরু করে সিএনজি, বাস, মিনিবাস ইত্যাদি অন্যতম। গত কয়েক বছরে ইজিবাইক নামক ব্যাটারি চালিত তিন চাকার যানবাহন দেশের শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত সাধারণ মানুষের যাতায়াতের এক অন্যতম বাহন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এখন দেশের যে কোনো বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা শহর, পৌর এলাকা এমনকি গ্রাম পর্যায়ের বড় হাট বাজারেও এই যানবাহনটির সরব চলাচল লক্ষ্য করা যায়। শহর ও গ্রামে চলাচলকারী এই যানবাহনের পক্ষে ও বিপক্ষে রয়েছে নানা যুক্তি ও মত।

এক সময় দেশের গ্রামাঞ্চলে চলাচলের জন্য নৌপথে নৌকা ও কাঁচা সড়ক পথে গরুর গাড়ি বা ঘোড়ার গাড়িই ছিল একমাত্র মাধ্যম। ১৯৭০ এর দশকে গ্রামীণ রাস্তার ব্যাপক সংষ্কার ও পুনঃনির্মাণ শুরু হয়। ক্রমান্বয়ে কাঁচা রাস্তা পাকা হতে থাকে। শহরের সাথে গ্রামাঞ্চলের সংযোগ স্থাপিত হয়।সেইসাথে চালু হয় বিভিন্ন প্রকার যানবাহন। বিশেষজ্ঞরা বলেন ২০০০ সালের পরে ইজিবাইক নামক যানবাহনটি এদেশে চালু হয়। এখন দেশের যেকোনো জায়গায় এই যানবাহনটির আধিক্য চোখে পড়ে। বর্তমানে সারাদেশে এর সংখ্যা কত তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া দুষ্কর। কারণ, এগুলোর আমদানি, উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই।

এই পরিবহণের পক্ষে অনেকেই যুক্তি দেখান যে, এটি গ্রাম ও শহুরে জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। যেমন, হাটে বাজারে পণ্য পরিবহন, অসুস্থ হলে হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্রে যাওয়া, কর্মস্থলে যাওয়া, আত্মীয়-স্বজনের বাড়ীতে বেড়াতে যাওয়া, শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া ও আসা, প্রতিবন্ধী ও নিম্নআয়ের মানুষদের সহজ যাতায়াতে সহায়তা, ইত্যাদি। এই যানবাহনটি পরিবেশ বান্ধব বলেও অনেকে মনে করেন। সর্বোপরি, এই পরিবহনটি চালু হওয়ায় অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দেশের সার্বিক উন্নয়নে সাধারণ পরিবহণের মতই এটি ভূমিকা রাখছে।

আবার অনেকেই এর বিপক্ষে যুক্তি দেখান যে, এগুলোর ব্যাটারি রিচার্জ করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুত খরচ হয়। অনেকেই অবৈধ পন্থায় বিদ্যুত সংযোগ নিয়ে এগুলো রিচার্জ করে। ফলে অন্য সেক্টরে বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দেয় এবং সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। অনেকেই মনে করেন, ইজিবাইকের কারণে পরিবেশের ক্ষতি এবং সড়ক দুর্ঘটনার আশংকাও বাড়ছে। অনেক সময় এই যানবাহনটি কোনো নিয়ম নীতি না মানায় যানযটের সৃষ্টি হয়। ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বাড়ে। যেসব জায়গায় যানযট হওয়ার কথা না সেসব জায়গায়ও যানযট তৈরি হয় এটির কারণে। অনেক ক্ষেত্রে ঘটে দুর্ঘটনা। অনেকে আহত হন, পঙ্গুত্ব বরণ করেন। বিশেষ করে মহাসড়কগুলোতে এগুলোর চলাচল নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তা না মেনে চলার কারণে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অনেকের প্রাণহানির কারণ হয়। এই যানটির অধিকাংশ চালকই প্রশিক্ষিত নন। ফলে তারা যান চলাচলের নিয়ম কানুন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকেন এবং নিয়ম না মেনে চালানোর কারণে দুর্ঘটনায় পড়েন ও অন্য যানবাহনের জন্য দুর্ঘটনার কারণ হন।

তবে পক্ষে বা বিপক্ষে যে যুক্তিই দেখানো হোকনা কেনো ইজিবাইক আমাদের মত দেশে কোনো টেকসই যানবাহন নয়। একথা সত্য যে, গত এক দশকে দেশে গ্রামীণ সড়ক ব্যবস্থার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। সেই সাথে অনেক ধরনের পরিবহনের আর্বিভাব হয়েছে। এসব পরিবহণে অনেকেরই কর্মসংস্থান হয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতেও এসব পরিবহণের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। তা সত্ত্বেও এসব পরিবহনের কারণে সড়কে বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশে একই সড়কে, একইসাথে, একই সময়ে যত প্রকার যানবাহন চলাচল করে তা দেখে উন্নত দেশ থেকে আগত যে কেউ বিস্ময়বোধ করে। এখানে একই রাস্তায়, একই সাথে, একই সময়ে বাস, ট্রাক, লরি, মিনিবাস, মাইক্রোবাস, ক্যাভার্ড ভ্যান, এ্যাম্বুলেন্স, সিএনজি, অটো রিকশা, শ্যালো ইঞ্জিনযুক্ত তিন চাকার নসিমন, করিমন, ভটভটি, রিকশা, মোটর সাইকেল, ইজিবাইকসহ হরেক রকমের যানবাহন চলাচল করে। মানুষ ও পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি রড, সিমেন্ট, বালু, গরু, আর্বজনাবাহী যানবাহনও একই সাথে চলে। গ্রামের রাস্তায় এগুলো একটু কম হলেও শহর এলাকায় অনেক বেশি। সুতরাং সড়ক ও মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এ বিষয়ে আশু নজর দেওয়ার সময় হয়েছে বলে প্রতীয়মাণ হয়।

আমরা জানি আমাদের দেশের অধিকাংশ রাস্তা তৈরি করা হয় নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লাভ ও বিভিন্ন পর্যায়ের সুবিধাভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে রাস্তার নির্মাণকাজে ত্রুটি রয়েই যায়। ফলে এইসব রাস্তা দুই তিন বছরের মধ্যেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণের  ক্ষেত্রে একথা বেশি করে প্রযোজ্য। ভাঙা ও এবড়ো থেবড়ো রাস্তায় ইজিবাইকসহ অন্যান্য যানবাহনের চলাচলের ফলে দুর্ঘটনার আশংকা বাড়ে এবং সেইসাথে বাড়ে জন দুর্ভোগ। সুতরাং  টেকসই সড়ক নির্মাণ ও বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যসত্ত্বভোগীদের দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন।

ইজি বাইক নামক এই পরিবহণটির বিষয়ে সরকারকে এখন যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই পরিবহণের বিকল্প ও সহজলভ্য যানবাহন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যায় কিনা সেবিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে। এই পরিবহণ খাতে যাদের কর্মসংস্থান হয়েছে ও যারা বিনিয়োগ করেছেন তাদেরকে বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। যদি এই ধরনের পরিবহণ চালু রাখতেই হয় সেক্ষেত্রে এর চালকদের যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। ইজি বাইক নামক এই যানবাহনটির আমদানি, উৎপাদন, বিপণন, লাইসেন্স প্রদান ও চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি রেগুলেটরি অথরিটি গড়ে তুলতে হবে।

কোন দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য উন্নত পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অপরিহার্য। আর্থ- সামাজিক অগ্রগতির পূর্বশর্ত উন্নত পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং উন্নত পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এ দুটি বিষয় অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এছাড়াও, উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থা সভ্যতার পরিচয় বহন করে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং উন্নত দেশের উপযোগী পরিবহণ ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা ও কাজ এখনই শুরু করতে হবে। যদিও দেশের সড়ক যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থায় অনেক সাফল্য অর্জিত হয়েছে তদুপরি এ সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরানো ও উন্নয়নের জন্য আরো উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ গণপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়ার সময় এসেছে বলে প্রতীয়মাণ হয়। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞের সহায়তায় কর্তৃপক্ষ এবিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিবেন বলে আশা করা যায়।

ড. মতিউর রহমান, গবেষণা পরামর্শক, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (এইচডিআরসি), ঢাকা