‘ভ্যাকসিন রোগ প্রতিরোধের জন্য, বিদেশ যাওয়ার জন্য না’



ডা. রাজীব দে সরকার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

হাসপাতালে গেলে এখন মনে হয় না, হাসপাতালে এসেছি।

সকাল থেকেই চিৎকার-চেঁচামেচি, স্লোগান, হৈ হৈ রৈ রৈ "অ্যাই... অ্যাই...ঐ ...ঐ" ডাক। প্রচণ্ড অসুস্থ একটা পরিবেশ তৈরি হয়।

অসুস্থ রোগী, অপারেশন থিয়েটারের বাইরে থাকা অপেক্ষমান রোগী, রাউন্ডে থাকা চিকিৎসকের টিম, হাসপাতাল অ্যাডমিশন রুমে নতুন রোগীদের শারীরিক পরীক্ষা করা চিকিৎসক, প্যাথলজি বিভাগে রক্ত পরীক্ষা করাতে যাওয়া রোগী কিংবা রোগীর স্বজন - সবাই বিরক্ত।

এই পরিবেশ আর যাই হোক, চিকিৎসার মতো সেন্সিটিভ কোন বিষয় সম্ভব না।

সকাল বেলা দেখলাম, একজন অসুস্থ রোগীকে রোগীর লোক হুইল চেয়ারে করে নিতে পারছেন না। রোগী নিজেও এই ভিড়ের মধ্যে হাঁপাচ্ছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতির চাপে সার্জারী বিভাগের ভর্তি রুমটা তো আজ বন্ধ করে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হলো চিকিৎসকেরা।

"অই... অই...অই অই অই" ... ... ওই যে আবার চিৎকার শোনা গেলো। একজন চিৎকার দিলো। পেছন থেকে আরো ১০-১২ জন কোন কারন বা উপলক্ষ্য ছাড়াই চিৎকার দিয়ে উঠলো।

কারা করছেন চিৎকার?

চিৎকার করছেন ভ্যাকসিন নিতে আসা আমাদের প্রবাসীরা। জ্বী, প্রবাসীরা।

চিৎকার করছেন দাবি আদায়ে বা অকারনে। একেক জনের একেক রকম দাবি। কারো দাবি -  মর্ডানা না, ফাইজার লাগবে (রেফারেন্সঃ দৈনিক প্রথম আলো, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১)। কারো দাবি - এসএমএস আসে নাই, ভ্যাকসিন দিতে হবে। কারো দাবি, বিদেশ যাওয়ার কোন কাগজপত্র নাই, কিন্তু ফাইজার/মর্ডানা ভ্যাকসিন দিতে হবে। কারো দাবি, সৌদি যাবেন, ভ্যাকসিন নিয়েছেন, এখন একটা বুস্টার ডোজ লাগবে। কারো দাবি, লাইনে দাঁড়াতে পারবেন না (যেহেতু তিনি রেমিট্যান্স পাঠান)(মজা করছি না, আমি নিজে একজনকে বলতে শুনেছি)।

যাই হোক, প্রবাসীদের দাবি নিয়ে আমার কোন দাবি নাই।

শুধু আমাদের হাসপাতালটার অবস্থা দেখেন। টানা ৪ বার জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার পাওয়া একটা পরিচ্ছন্ন হাসপাতাল। এটা হাসপাতালের বাগানের পাশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন দৃষ্টি নন্দন আউটডোরের ছবি। ডাবের খোসা, কলা খোসা, কেক-বিস্কুটের প্যাকেট, নাকে-মুখে পরে আসা মাস্ক, বিভিন্ন সাইজের পানির বোতল, খাবারের পলিথিন - সব কিছু হাসপাতালের মূল করিডোরে ফেলে গেছেন আমাদের ভ্যাকসিন প্রত্যাশী প্রবাসীরা।

এই প্রবাসীরা দু'দিন পরেই বিদেশ যাবেন। রেমিটান্স যোদ্ধা হয়ে যাবেন। আমরা ভুলে যাবো তাদের অকৃতজ্ঞতা আর অসভ্যতার ইতিহাস। বেসামরিক বিমান পরিবহনের সচিব একদিন বলেছিলেন কীভাবে আমাদের নতুন কেনা উড়োজাহাজটা ড্রীম লাইনারকে নোংরা করেছিলেন আমাদের প্রবাসীরা। এতোটাই নোংরা করেছিলেন যে অন্য দেশের ক্লিনিং সার্ভিসের লোকজন সেটা পরিষ্কার করতে চায়নি। বহুবার আমাদের এই অসভ্যতা বিদেশে আমাদের নাক কাটিয়েছে (রেফারেন্সঃ  রেফারেন্সঃ দৈনিক প্রথম আলো, ২৪ জুন, ২০১৯)।

হাসপাতালের ২০ গজ দূরে দূরে ওয়েস্ট ডিজপোজাল বিন দেওয়া আছে। একেকটা একেক রঙের। কোনটায় কি ফেলা যাবে, সেটাও বিন গুলোর গায়ে লেখা আছে। কিন্তু না আমাদের প্রবাসীরা যেখানে ইচ্ছা সেখানে ফেলবেন ময়লা। কারন এটা তাদের দেশ। রেমিট্যান্স পাঠিয়ে ধন্য করে দেওয়া দেশ। অথচ এরাই দেশের বাইরে গেলে, বিদেশের রাস্তায় একটা ছোট্ট নখের টুকরাও ফেলেন না। কী ভদ্র, সভ্য, লক্ষ্মী বাবুটি বনে যান।

সকাল থেকে আনসার ও হাসপাতালের কর্মচারীরা হিমশিম খান এদেরকে সুশৃঙ্খল করতে। পুরোবারান্দা জুড়ে এমনভাবে সবাই দাঁড়িয়ে থাকেন যে রোগী, রোগীও স্বজন, চিকিৎসক, নার্স কেউ ভিড় ঠেকে হাসপাতালে চলাচল করতে পারেন না। অথচ দেশীয় ইমিগ্রেশন পার হবার পরে তাদের লাইন আর একটুও বাঁকা হয় না।

যারা হাসপাতালে আসেন, তাদের কি একটু বোঝা উচিৎ ছিলো না, এটা হাসপাতাল। এটা বাজার বা খেলার মাঠ না। একজন শ্বাসকষ্টের ভোগা করোনা রোগী কিংবা একটু পরে যে রোগীর ক্যান্সারের জন্য অপারেশন হবে, তাদের কেমন লাগছে এই চিৎকার চেঁচামেচির অস্থির পরিবেশে? আপনি হলে আপনার কেমন লাগতো?

যারা হাসপাতালে আসেন, তাদের কি একটু বোঝা উচিৎ ছিলো না, এটা আমার ঘর, আমার অফিস। আপনার ঘরে গিয়ে আমি এমনটা করে এলে কেমন লাগতো?

প্রায় প্রতিদিনই হাসপাতালে শ্রদ্ধেয় গণমাধ্যম কর্মীরা আসেন। তারা প্রবাসীদের দুঃখ দুর্দশা ভোগান্তি নিয়ে লেখেন। সরকারের কাছে প্রবাসীদের আর্জি পৌছে দেন। খুব কষ্টের সাথেই বলছি, প্রবাসীদের দুর্দশা নিয়ে লিখতে গিয়ে হাসপাতালের দুর্দশাটা কিভাবে তাদের চোখ/ক্যামেরা এড়িয়ে যায়। সেবাগ্রহীতারা শুধু নন, সেবাপ্রদানকারীদেরও দুঃখ-কষ্ট-ক্ষোভ-ক্লান্তি আছে।

সরকারি ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্টে ত্রুটি থাকতে পারে। এই বৈশ্বিক মহামারীতে প্রায় সব দেশই, এমনকি উন্নত দেশেও নাগরিকদের এই দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। ভ্যাকসিন আপনার রোগ প্রতিরোধের জন্য। আপনাকে বিদেশ পাঠানোর জন্য না। অন্য একজন সাধারণ নাগরিক যিনিও ট্যাক্স দেন, তার থেকে বেশী প্রায়োরিটি দিয়েই প্রবাসীদের ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে।

আর সব আলাপের শেষ কথা, আপনার ভ্যাকসিন নিয়ে যাই বলার থাকুক, রোগাক্রান্ত অসুস্থ রোগী দিয়ে ভরা ওয়ার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করাটাও এক ধরনের জঘন্য "অসুস্থতা"। এর কোন ভ্যাকসিন নাই।

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক কলামিস্ট, ইমেইলঃ [email protected]