পরিচয় ও শক্তি আমরা বাঙালি



কবির য়াহমদ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ছোটবেলায় দেখেছি বনজঙ্গলে ভরা ছিল আমাদের বাড়ি। এরপর আস্তে আস্তে পরিবর্তন এসেছে, সবখানে। এ বাড়িতেও একাত্তর এসেছিল। পাকিস্তানি আর রাজাকারেরা গ্রামে এলে বাড়ির সকলে জঙ্গলে গিয়ে লুকাত। ওখানে আশ্রয়ের জন্যে গর্তও খোড়া হয়েছিল বলে জেনেছি। আব্বা যুদ্ধে থাকায় তাঁকে খুঁজতে প্রায়ই আসত তারা। পায়নি কখনও, রক্ষা।  

বয়স্কদের কাছে শোনা অতীতের খানিকটা উল্লেখ করলাম, সাম্প্রতিক দেশচিত্রের বিশেষত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দেখে। প্রাণ বাঁচাতে এখনও রাতের আঁধারে মানুষকে আশ্রয় নিতে হচ্ছে বনেবাদাড়ে, ধানখেতে।  সময়টা এখন একাত্তরের মত পরাধীন দেশের নয়, তবু অনেক কিছু একাত্তরকে ফিরিয়ে আনে। একাত্তরে পাকিস্তানিরা হিন্দু দেখে বিনাপ্রশ্নে নির্যাতন করতো। এই সময়ে সব নির্যাতনের লক্ষ্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিশেষত হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। সংখ্যায় কম এই জনগোষ্ঠী সংখ্যাগুরু মুসলিমদের একাংশ দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে। প্রতিকারহীন এই নির্যাতন। না আছে প্রতিরোধ, না আছে আইনি প্রতিবিধান। রাষ্ট্রও অপেক্ষা করে। জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পর প্রথমে শোনায় প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপি-জামায়াতের ষড়যন্ত্রের গল্প, এরপর দেয় বিচারের আশ্বাসসহ ক্ষতিপূরণ হিসেবে 'প্রধানমন্ত্রীর উপহার' হিসেবে ঘর দেওয়ার গল্প। এরপর সুস্থ চিন্তার কিছু মানুষ প্রতিবাদে নামলে তারপর আসে তাদের মাঠ দখলের রাজনীতি।  এভাবে প্রতিবার, ঘটনার বদল হয় কিন্তু কৌশল থাকে একই।

একাত্তরের নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণমানুষের প্রতিরোধের ইতিহাস ছিল। ভিনদেশিদের তাড়ানোর সংকল্প আর সংগ্রাম ছিল। এখন সেটা আর নাই, কারণ নির্যাতক-নির্যাতিত দু'পক্ষই স্বদেশি। নির্যাতিতরা শ্রেণিবর্ণ নির্বিশেষে সকলেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। আর নির্যাতক মুসলমানদের একাংশ, যারা রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মতাদর্শের হলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনে একই কাতারে দাঁড়িয়ে যায়।

এবারের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর নির্যাতনের শুরু হয়েছিল কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরান শরিফের অবমাননা হয়েছে এমন গুজব ছড়িয়ে। গুজব ছড়িয়ে লোক জড়ো করে সেখানকার পূজাপর্ব ভণ্ডুল করে দেওয়ার পর সারাদেশের অন্তত ৭০টি মন্দির ও মণ্ডপে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়েছে। কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনিসহ দেশের অনেক জায়গার হিন্দুরা আক্রান্ত হয়েছেন। হতাহতের সংখ্যাও শতাধিক। এই নিবন্ধ লেখাকালে সবশেষ আক্রান্ত হয়েছে রংপুরের পীরগঞ্জ। সেখানকার পরিস্থিতি একাত্তরের প্রতিরূপ, অন্তত গণমাধ্যমে প্রকাশিত আক্রান্তদের জবানিতে সেটাই সামনে চলে আসে।

‘রাতে যখন পাশের বাড়িতে হামলা হয়, তখন তিন বছরের নাতি সার্থক রায় ও অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পাশের ধানখেতে ঢুকে পড়ি। স্ত্রীকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে নাতিকে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকি। শুধু শোরগোল কানে বাজছিল। একসময় কে যেন টর্চ জ্বালায় ধানখেতের দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে অবুঝ নাতির কাশি শুরু হলে তার মুখ চেপে ভগবানের নাম জপতে থাকি।’ [প্রথম আলো, ১৮ অক্টোবর ২০২১] এভাবেই ঘটনার বর্ণনা দিলেন রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বড়করিমপুর গ্রামের হরিদাস রায়।

কেবল হরিদাস রায়ই নন, লোমহর্ষক কালরাত্রির বর্ণনায় একই গ্রামের রানীবালা জানান, ‘যখন বুঝলাম গ্রামে হামলা হয়েছে, তখন আমার ক্লাস এইটের ছেলে গৌতম রায়কে নিয়ে পাশের ধানখেতের ভেতরে গিয়ে শুয়ে পড়ি। শরীর চুলকাতে থাকে। তারপরও কষ্ট করে শুয়ে থাকি। স্যাররা (পুলিশ) মাইকে ডাকলে ভোরে বের হয়ে বাড়িতে এসে দেখি, ঘরে আগুন জ্বলছে। জীবনে এমন কষ্টের দিন আসবে, কোনো দিন ভাবিনি।’

এই যে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেই চলেছে তার সমূল বিনাশে রাষ্ট্রের ভূমিকার অভাব রয়েছে বলে আমাদের ধারণা। ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার জিগির তুলে সংঘবদ্ধ আক্রমণের একের পর এক ঘটনা সত্ত্বেও সরকার এগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাজ ও ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেই যাচ্ছে।  এক যুগের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ সরকার। এই সময়ে সরকারবিরোধী মাঠের রাজনীতি নেই। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর এখন সরকারের অনুকম্পায় নিজের বাসায় অবস্থান করছেন। কারাগারের বাইরে থাকলেও তিনি রাজনীতি থেকে দূরে চলে গেছেন কয়েক বছর আগে থেকেই।  দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক মামলায় আদালতে রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত এবং পলাতক। এই দলের শীর্ষ নেতাদের ক'জন সংবাদ সম্মেলন ও বিবৃতিসর্বস্ব রাজনীতিবিদে পরিণত হয়েছেন। এছাড়া সারাদেশের কোথাও বিএনপির কেউ মাঠে নামার সাহস করে না, কঠোর পুলিশি নজরদারিতে তারা। দলটির এমন অবস্থা এমন হলেও সরকার প্রতি ঘটনায় তাদেরকে দোষারোপ করে পার পেতে চায়। বিএনপিও প্রতি ঘটনায় আগেভাগে সরকারের কাজ বলেও অভিযোগ করে আসছে। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে কোন ঘটনারই সুরাহা হয় না। তবে ক্ষমতায় যখন আওয়ামী লীগ তখন নিশ্চিতভাবেই তাদের দায় ও দায়িত্ব বেশি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে সরকার দল এটা নিয়েও রাজনীতি করতে আগ্রহী।  ফলে প্রতিকারহীন এই ঘটনাগুলো। 

এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্যে করুণ এক আর্তনাদের প্রতীক হয়ে ওঠেছে। তারা যে কতখানি বিপন্ন তার প্রমাণ পেয়েছে তারা আরও একবার। 

আশার কথা এত নির্যাতন সত্ত্বেও তাদের পক্ষে কথা বলার মত কিছু লোক অন্তত আছে দেশে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পেরিয়ে মাঠেও নেমেছেন অনেকেই। হ্যাঁ, সংখ্যার বিচারে এই সংখ্যা হয়ত অসুরাদর্শবাদীদের চাইতে কম, তবু এই ভেবে রক্ষা এখনও ফুরিয়ে যায়নি মনুষ্যত্ববোধ মানুষের। 

দেশে চলমান হিন্দু-নিগ্রহ সত্ত্বেও মানবিক মানুষের জয়ের আলোরেখা দেখি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের অমর পঙক্তিমালায়, যেখানে তিনি লিখেছিলেন- 'বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ/বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান,/ আমরা সবাই বাঙালী।/ তিতুমীর, ঈসা খাঁ, সিরাজ/ সন্তান এই বাংলাদেশের।/ ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, নেতাজী/ সন্তান এই বাংলাদেশের।' 

সকল শ্রেণিপেশার মানুষের তুমুল প্রতিবাদ না হলেও প্রেরণা জোগায় মুজিবনগর সরকারের অন্যতম যোদ্ধা বরেণ্যশিল্পী দেবদাস চক্রবর্তীর অমর সেই পোস্টার- 'বাংলার হিন্দু/বাংলার খ্রিস্টান/ বাংলার বৌদ্ধ/বাংলার মুসলমান/আমরা সবাই বাঙালী'।

ধর্ম পরিচয় যাই হোক আমরা বাঙালি। এটাই আমাদের মূল পরিচয়। এটাই আমাদের শক্তি। 

কবির য়াহমদ: লেখক, সাংবাদিক।