প্রাণ খুলে প্রার্থনার পরিবেশ পাব কী?



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

গত চার দিন যাবৎ পত্রিকার পাতা উল্টাতেই মন খারাপ করা খবরে মনটা আরো বেশী বিষিয়ে উঠছে। করোনা পরবর্তী ধাক্কা সামাল দিতে না পেরে এমনিতেই বহু মানুষ মানসিক সমস্যার চাপে ভূগছেন। করোনা এখনও চলে যায়নি, আজ ১৯ অক্টোবর বৃটেন ও বাংলাদেশ উভয় জায়গায় করোনা সংক্রমণ বাড়ার খবর এসেছে। কিন্তু মাস্কের ব্যবহার প্রায় উঠেই গেছে। ডেঙ্গুর বাহক এডিসের ব্যাথার কামড় শেষ হয়নি। কিন্তু মানুষ আবারো অসতর্কভাবে দিনাতিপাত শুরু করেছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও মাদকের ঘনঘটার মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়েছে। ব্যক্তি মানুষের চলাচল বেড়ে গেছে। গতি বেড়েছে প্রতিটি কর্মযজ্ঞে। কিন্তু দুর্গতির ডামাডোল নিয়ে সাম্পদায়িক অসন্তোষ শুরু হয়ে গেছে চারদিকে। ব্যক্তি নয়- অশান্ত হয়ে উঠেছে ‘মব’ বা ক্ষিপ্ত জনতা। ‘মব’ কার প্রতি ক্ষিপ্ত এবং কেন হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো তা এই মুহূর্তে বড় চিন্তার বিষয়।

পৃথিবীতে যত বিশৃংখলা ও যুদ্ধ হয়েছে তার সিংভাগই নারী ও ধর্মীয় বিষয় নিয়ে সংঘটিত হয়েছে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। ফারাও সুন্দরী, ক্লিওপেট্রা বা হাজারো কমলা সুন্দরীদের কথা বাদ দিলাম। কিন্তু ধর্মীয় প্রার্থনালয়ে হামলার ইতিহাস অতি পুরনো আমল থেকে হলেও দু’দিন আগে ঘটে যাবার মত অত্যাধুনিক। পৃথিবীর অনেক দেশে মসজিদে হামলা, ভাংচুর হলেও বাংলাদেশে সেগুলোকে কেন্দ্র করে কখনও এবারের মত সহিংস ঘটনা ঘটেনি। কারণ তখন সেসব ঘটনার নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে অত্যন্ত সুকৌশলে।

ইসরাইলের আল-আকসা মসজিদ নিয়ে প্রায় প্রতিনয়ত হামলা, মারামারির ঘটনা ঘটে। শিখদের স্বর্নমন্দিরেও সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল। বাবরি মসজিদ তো গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে নানা অজুহাত দেখিয়ে। গুজরাটে বাসার ফ্রিজে গরুর মাংস খুঁজে বের করে মুসলমানদের হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া বৃটেন, আমেরিকা, নিউজিল্যান্ড, ভারত, আফগানিস্তান সব জায়গাতেই সাম্প্রতিককালে মসজিদে হামলার ঘৃণ্য ঘটনা ঘটেছে এবং ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেগুলোকে কেন্দ্র করে তখন তেমন কিছু বড় খারাপ প্রতিক্রিয়া হয়নি। কিন্তু এবারে ঘটনার চারদিন পরও হামলা, লুটপাট চলছে। ১৯ অক্টোবর নোয়াখালিতে স্বর্ণের দোকানে হামলা দেখে মনে হচ্ছে- একটা শয়তানি চক্র অরাজকতার মাধ্যমে লুটপাট করার কাজে নেমে পড়েছে।

এবার দুর্গাপুজোয় কুমিল্লার ঘটনা সবাইকে বিস্মিত করেছে। কারণ, সকল ধর্মের মানুষ তাদের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থকে গভীর ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে। মুসলমানগণ পবিত্র কোরআন শরীফকে ওজু করে স্পর্শ করে, সকাল বিকেল পড়ে চুমু দেয় এবং যত্ন করে নিরাপদ স্থানে রেখে দেয়। তাই একজন সাচ্চা মুসলিম কখনো তার ভালবাসার পবিত্র গ্রন্থকে পূজামণ্ডপে রেখে আসার কথা নয়। যারা এটা করেছে সে বা তারা মুসলিম হতে পারেন না। আবার, হিন্দুদের পবিত্র পূজামণ্ডপ তারা মনের মাধুরী দিয়ে সাজিয়ে প্রিয় দেবীর আরাধনা করেন। তারাও চাইবেন না সেখানে খারাপ কিছু ঘটুক এবং তার জের ধরে সাজানো সবকিছু কেউ ভন্ডুল করুক। তাহলে এটা কি তৃতীয় পক্ষের কাজ। তারা মানুষরূপী চতুর ইবলিশ শয়তান। অথবা কোন বড় ধরনের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র? তাই এই ঘৃণ্য ঘটনাটি নিয়ে যারপরনাই সন্দেহ শুরু হয়েছে।

একে তো করোনার সময় মানুষ মৃত্যুভয়ে মসজিদে বা প্রার্থনালয়ে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল তার ওপর বোমা-গুলি ইত্যাদির ভয়ে প্রাণনাশের হুমকি থাকলে প্রার্থনাকারীর অশান্ত অন্তর শান্ত হবে কোথায় গিয়ে? কিভাবে?

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান যদি পাহারা বসিয়ে পরিচালনা করতে হয় তাহলে মানুষের আত্মিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা বলে কিছু বাকী থাকে কি?

সাধারণত: কোন মানুষের মনে চরম অশান্তি, অতি ক্ষোভ, না পাওয়ার বেদনা, অভাব, কঠিন রোগ-শোক, অতি দুঃখবোধ কাজ করলে মন থেকে ধর্মীয় বিষয়ে উদাসীনতা তৈরি হয় এবং সেটা থেকে স্রষ্টার প্রতি ভালবাসা কমে গিয়ে তার ভেতর নাস্তিকতাবোধ সৃষ্টি হওয়া অমূলক নয়। কিছু মানুষ জ্ঞানের গভীরতায় ডুবে যেতে না পেরে মনগড়া বৈষয়িকতা নিয়ে হাবুডাবু খেয়ে হতাশ হয়ে অসীম চিন্তার জগৎ থেকে নিজেকে আড়াল বা বিচ্যুত করে নাস্তিক হয়ে যান। ধর্মীয় জ্ঞানকে অবহেলা করার অর্থ জ্ঞানের বিশাল জগৎ থেকে নিজেকে এড়িয়ে গা বঁচিয়ে চলা। তাদের কেউ হতাশা থেকে আস্তিকদের অনুষ্ঠানে ঝামেলা সৃষ্টি করার অপচেষ্টা করাটাও অমূলক বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

তবে সকল ধরনের হামলা বা আক্রমণের জন্য নিশ্চয়ই এক বা একাধিক প্লট বা ছঁক তৈরিকারী থাকেন। কুমিল্লার ঘটনাতেও তেমন কেউ নেপথ্যে রয়েছেন। তার বা তাদের ব্যাপারে কিছু তথ্য হয়তো অনুসন্ধানকারীগণ এতদিনে জেনে গেছেন। তাদেরকে নিশ্চয়ই চিহ্নিত করা হয়েছে। তাহলে আসল ঘটনা দ্রুত প্রকাশ করতে দ্বিধা ও দেরী কেন?

আমরা জানি, কান টানলে মাথা আসে। মাথাকে জানা গেলে অনেক সময় সংকোচ তৈরি হয়। এতে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে দেরী হয় এবং শাস্তি প্রদানে দ্বিধা থেকে ভিন্ন অসত্য ঘটনার ডালি সাজানোর চেষ্টা চলে। শুরু হয় রাজনীতির ঘোলা ও ঘৃণ্য খেলা। ফলে অনেক ক্ষয়ক্ষতিসম্পন্ন ও মর্মান্তিক ঘটনার জন্যেও শাস্তি দেয়া সম্ভব হয় না।

অপরাধের জন্য ন্যায়বিচার ও শাস্তি না হলে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে। দেশে বা সমাজে ঘুষ-দুর্নীতির ব্যাপকতা তৈরি হয় এবং মানুষ ন্যায়বিচার না পেয়ে আস্থা হারিয়ে গুজবের মধ্যে নিজের বিশ্বাসকে সঁপে দিয়ে ‘মব’ নামক সামাজিক দলে হঠাৎ ভিড়ে গিয়ে চরম বেপরোয়া চরিত্রে অনেক বিধ্বংসী ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে মুহূর্তের মধ্যে।

করোনার মধ্যে আমাদের দেশে কিশোর গ্যাংরা বেশ সক্রিয়। তার সাথে এরূপ ধর্মীয় উন্মাদনা যেন ভস্মে ঘি ঢেলে দেবার মত পরিবেশ তৈরি করেছে। এসব কিশোর গ্যাং ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলে আরো বেশী সংঘটিত ও সক্রিয়। তারা গুজবের একটু ‘ছুঁতো পেলে সেখানে কঠিন গুঁতো’ দিতে পারঙ্গম। পীরগঞ্জের জেলে পাড়ার বাড়িতে রাতে আঁধারে আগুন লাগানোর মত কাজটি এরূপ গুজবের উন্মাদনা থেকে ঘটেছে বলে মনে হয়। কারণ, সেখানে মণ্ডপ ছাড়া বাকী চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকারের সুবিধা নিয়ে হাজারো মানুষ দল বেঁধে যেতে পেরেছে। যাদের বেশীরভাগই অল্পবয়স্ক। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তারা কোনরূপ নিরাপত্তা বাধার সন্মুখীন হয়নি বলে সংবাদে জানা গেছে।

এরূপ ঘৃণ্য ঘটনার পর গণমাধ্যমে দেশের নেতারা যেসব ‘ব্লেম-গেমের’ অবতারণা করেছেন তা দেশের রাজনৈতিক আস্থাহীনতা ও গভীর শূণ্যতাকে প্রমাণ করে। এসব বক্তব্য শুনে জালিয়াতচক্র, ভয়ংকর পেশাদার অপরাধী, মাদক ব্যবসায়ী, কিশোর গ্যাং সকলেই আরো বেশী আস্কারা পেয়েছে, খুশি হয়েছে। আর কিছু মানুরূপী ইবলিশ শয়তান এসব ঘৃণ্য ঘটনার প্রতিরোধে নিজ নিজ এলাকায় না গিয়ে, সহযোগিতা না করে নিজেরা গুজব ছড়িয়ে হৈচৈ করে মানুষের সম্পদ লুটে নিচ্ছে।

আর নিরীহ ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ আরো বেশি হতাশ হয়ে পড়েছে। যারা নিজ নিজ জীবন, পরিবার ও সমাজের মঙ্গলের জন্য নিত্য ব্যক্তিগত ধর্মীয় প্রার্থনার মাধ্যমে আশ্রয় ও শান্তি খুঁজে ফেরে তারা এসব ঘটনায় আরো বেশী মর্মাহত হয়ে মৃত্যুকে কামনা করেছে। বাড়ি পুড়ে যাওয়া এক নারীর হৃদয়বিদারক আর্তস্বর ছিল- “এলা ছাই ছাড়া মোর কপালোত কিছুই নাই, এর চায়া মোর দুনিয়া থাকি মরি যাওয়া ভাল।” একদিকে প্রকৃতি যদি ক্রমাগত মরণরোগের সংক্রমণ ছড়াতে থাকে থাকে আর অন্যদিকে মানুষ- মানুষের সম্বল ও বাক্ স্বাধীনতা কেড়ে নেয়, প্রার্থনা করার স্বাধীনতার স্থান মসজিদ-মন্দির কিছুই যদি অবশিষ্ট না থাকে তাহলে পৃথিবীটা তাদের জন্য অন্ধকার জায়গা বৈ কি?

কোন উসকানীমূলক অপরাধের উৎসকে যদি চিহ্নিত করা না যায়, অথবা চিহ্নিত হবার পর রাজনৈতিক কারণে ধামাচাপা দেয় হয় তাহলে বিশ্বাসী মানুষের প্রার্থনার জায়গাটাই শুধু নয়- জেগে ওঠা ব্যাকুল মনটাও নিষ্প্রভ হয়ে যেতে বাধ্য। আর এভাবে শুধু বাংলাদেশেই নয়- দেশে দেশে পার্থিব সব আশা-ভরসা, সম্বল ও শান্তি নষ্ট হয়ে গেলে মানষু কি নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে? আর এসব মানুষরূপী ইবলিশ শয়তানদের ঠেকাবে কে?

লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান। E-mail: [email protected]