রানীগঞ্জে গণহত্যার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চান শহীদ সন্তান আকবর হোসেন



সাঈদ চৌধুরী
আকবর হোসেন ও শাহেদ আলী

আকবর হোসেন ও শাহেদ আলী

  • Font increase
  • Font Decrease

আকবর হোসেন সৎ, সাহসী ও পরিশ্রমী সাংবাদিক। হাওর বাংলা ডাইজেস্ট (ইউকে) সম্পাদক, রানীগঞ্জ দর্পনের প্রধান সম্পাদক ও লন্ডনবাংলা.কমের সহ-সম্পাদক। এক সময় আমার সহকর্মী হিসেবে ইউরোপের জনপ্রিয় বাইলিঙ্গুয়াল (বাংলা-ইংলিশ) সাপ্তাহিক ইউরোবাংলা‘র সাব এডিটর ছিলেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী গণহত্যার প্রতিবাদ এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য কয়েক দশক ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। তার পিতাসহ রানীগঞ্জে গণহত্যার স্বীকৃতি চান শহীদ সন্তান আকবর হোসেন।

জগন্নাথপুর উপজেলাধীন রানীগঞ্জ ইউনিয়নের বাগময়না গ্রামের অধিবাসী ও লন্ডন প্রবাসী আকবর হোসেন স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পিতাকে হারিয়েছেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৪ বছর।

সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলায় কুশিয়ারা নদী পারে প্রাচীনতম নৌ বন্দর রানীগঞ্জ বাজার ছিল ভাটি অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান ঘাঁটি। ফলে হানাদার বাহিনী গণহত্যা চালিয়ে সেখানে বহু মানুষকে হতাহত করে। তাদের মধ্যে ছিলেন আকবর হোসেনের পিতা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বাজার কমিটির সভাপতি শহীদ আকলু মিয়া।

১৯৭১ সালের ১ সেপ্টেম্বর রানীগঞ্জ বাজারে সংঘটিত বর্বর গণহত্যা ও ধ্বংযজ্ঞের খবর তখন বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়।

আকবর হোসেনের মা ফিরোজা বেগমকে (শহীদ আকলু মিয়ার স্ত্রী) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রিয় বোন, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনার সুযোগ্য স্বামী আত্মোৎসর্গ করেছেন। আপনাকে আমি গভীর দুঃখের সাথে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক সমবেদনা। আপনার শোক-সন্তপ্ত পরিবারের প্রতিও রইল আমার প্রাণঢালা সহানুভূতি। এমন নিঃস্বার্থ মহান দেশ প্রেমিকের স্ত্রী হিসেবে গৌরব লাভ করে সত্যিই আপনি ধন্য হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে আপনার ও আপনার পরিবারের উপকারার্থে আপনার সংশ্লিষ্ট মহকুমা প্রশাসকের নিকট ২০০০ টাকার চেক প্রেরিত হল। চেক নম্বর সিএ ০১৫৭৭৩।
আমার প্রাণঢালা ভালবাসা ও সংগ্রামী অভিনন্দন নিন।

বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত পত্র থাকা সত্ত্বেও ইতিহাসের নারকীয় তাণ্ডবে নিহতদের আজো সরকারিভাবে আর কোন সহায়তা বা স্বীকৃতি মিলেনি। ১৯৮৭ সালে তৎকালীন জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু খালেদ চৌধুরীর প্রচেষ্টায় ৩৪ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও ছয় জন আহত মুক্তিযোদ্ধার নাম লিপিবদ্ধ হয়। সেই সাথে একটি স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়। বর্তমানে শহীদ-গাজী ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গণহত্যায় নিহত সকল শহীদ ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা করে একটি মনুমেন্ট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শহীদ-গাজী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাংবাদিক আকবর হোসেন রানীগঞ্জে গণহত্যার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, বর্তমান প্রজন্মের কাছে গণহত্যার সঠিক বর্ণনা এবং সকল শহীদের পরিচিতি তুলে ধরা, প্রস্তাবিত ঢাকা-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে রানীগঞ্জ সেতুর সাথে ‘শহীদ‘ শব্দ যুক্ত করে সেতুর নামকরণের দাবি জানান। সেই সাথে গণহত্যায় শহীদ ও যুদ্ধাহতদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাহায্য সহযোগিতারও দাবি জানান।

ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আকবর হোসেন বলেন, ১ সেপ্টেম্বর আমাদের জন্য খুবই বেদনাদায়ক একটি দিন। সেদিন ভাটি অঞ্চলের অন্যতম নৌবন্দর রানীগঞ্জ বাজারে সংঘটিত হয় ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যা। হানাদার বাহিনী গুলি করে হত্যা করে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ। জ্বালিয়ে দেয় বাজারের অনেক দোকানপাট।

মর্মভেদী এই ঘটনার স্মৃতি উল্লেখ করতে গিয়ে আকবর হোসেন বলেন, আমার বাবা শহীদ আকলু মিয়া ছিলেন বাজারের অন্যতম বৃহৎ মনোহারী দোকানের মালিক। প্রতিদিনের মতো তিনিও বাজারে আসেন। আমাদের মেঝো চাচা বিশিষ্ট গীতিকার ডা. মো. আলমাছ মিয়া সেদিন বাজারে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। কেউ কেউ বাবাকে বাজার থেকে চলে যেতে বলেছিলেন। আমাদের প্রতিবেশী পটই কাকা ও ছোটচাচা বাবাকে বাজার থেকে চলে যেতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি সবাইকে ফেলে এভাবে চলে যেতে চাননি। ভাবছিলেন হয়তো কিছুই হবেনা।

ঘটনার দিন আমি, বড় ভাই (আরজু মিয়া) ও ছোট বোন (রুমেনা বেগম) আমাদের মায়ের সাথে মামার বাড়ি দোস্তপুরে ছিলাম। রানীগঞ্জের বাসায় তখন আমার দাদা-দাদি ছিলেন। বাজার থেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে কেউ কেউ আমাদের বাসায় এসে আশ্রয় নেন। বাবার লাশ বাজার থেকে আমাদের বাগময়নার বাড়িতে নেওয়া হয়।

এদিকে, দোস্তপুর থেকে আমাদেরকেও বাগময়না গ্রামে নিয়ে আসা হয়। তখন চিকিৎসার জন্য ভালো কোন ডাক্তার পাওয়া যায়নি। বাবাকে সিলেট শহরের হাসপাতালে নেওয়াও সম্ভব হয়নি। তিনি পেটে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। অসহনীয় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। এক সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বাগময়না কদম বাড়ির গুরুস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

রানীগঞ্জ বাজার কমিটির তৎকালীন সভাপতি আমার বাবা শহীদ আকলু মিয়া ছাড়াও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন আমার খালু আব্দুল মজিদ (দুর্ভাগ্যবশতঃ যার লাশ পাওয়া যায়নি), আনোয়ার হোসেন ও আকিল হোসেন (সহোদর), আলতা মিয়া, তছর উদ্দিন, সোনাহর আলী, মিছির আলী, আব্দাল মিয়াসহ অনেক ব্যবসায়ী, ক্রেতা, শ্রমিকসহ যারা নিত্যদিনের মতো বাজারে এসেছিলেন।

গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন আরও অনেকে। গুলিবিদ্ধ আমার ছোটচাচা আকল মিয়া গাজী বহুদিন বেঁচে ছিলেন। আরেক যোদ্ধাহত মজমিল মিয়াও এখন পরপারে। আহতদের মধ্যে ছিলেন বিনোদ রায়, ক্বারী এখলাছুর রহমান, তফজ্জুল হোসেন, ওয়াহিদ আলী প্রমুখ। তাদের কেউই এখন আর বেঁচে নেই।
শহীদ সন্তান আকবর হোসেন দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বর্বর এই হত্যাকাণ্ডের ৫০ বছর পরও কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলেনি শহীদ স্মৃতি বিজড়িত রানীগঞ্জের। আজো পৰ্যন্ত সরকাবিভাবে শহীদ ও পঙ্গুত্ব বরণকারীদের কোন চূড়ান্ত তালিকা হয়নি। অনেক পরিবারের সদস্যরা এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের নিয়মিত রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতার কোন ব্যবস্থা হয়নি।

দিনটি আঞ্চলিকভাবে শোক দিবস হিসেবে প্রতি বছরই পালিত হয়। এদিনে শহীদ-গাজী ফাউন্ডেশনসহ এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল, শোক র‌্যালি, শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পণ ইত্যাদি কর্মসূচি থাকে।

শহীদ-গাজী ফাউন্ডেশন, ইউকে‘র উদ্যোগে এবারও রানীগঞ্জ গণহত্যায় নিহত সকল শহীদ ও যুদ্ধাহত গাজীদের স্মরণে ‘আমরা তোমাদের ভুলিনি‘ শীর্ষক ভার্চুয়াল স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নিজের বাবাকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করে বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক আকবর হোসেন বলেন, আমার বয়স তখন ৪ বছর। আমি ও আমার বড় ভাই পিঠাপিঠি। অনেক কিছু মনে না থাকলেও কিছু কিছু স্মৃতি আজো মানসপটে ভেসে আসে। বাবা যখন রাতে দোকান শেষে বাসায় ফিরতেন তখন আমি ঘুমে থাকলেও মশারি তুলে টর্চ জ্বালিয়ে আমাকে দেখতেন, আদর দিতেন। মাঝে মাঝে সকাল বেলা আমাদের বাজারের শাহজাহান রেস্টুরেন্টে নিয়ে যেতেন। আমরা একসাথে নাস্তা করতাম।

বাবা সুন্দর লালচে চেহারার মানুষ ছিলেন। তিনি খুবই ধার্মিক ও অমায়িক ছিলেন। সবার সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিলো। হাসিখুশি থাকতেন সব সময়। খাবার সময় একা খেতে পছন্দ করতেন না। দুপুরবেলা বন্ধুবান্ধব কেউ সাথে না থাকলে পরিচিত লোকজনকে ডেকে নিয়ে আসতেন। তার মৃত্যুর পর অনেকেই এসব কখা বলেছেন। এখনো বাবার নাম শুনলে যারা তাকে চিনেন ও জানেন তারা খুবই আফসোস করেন। বাবার বন্ধুরা সংগ্র্রামের পর আমদের দেখতে এবং মাকে শান্তনা দিতে আসতেন। তারা আমাদের হাতে চকলেট তুলে দিতেন। বাবার জন্য কান্নাকাটি করতেন। আমাদের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আদর করতেন।

বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনা ও প্রেরণার কথা উল্লেখ করে শহীদ সন্তান আকবর হোসেন বলেন, আমরা স্বজন হারিয়েছি, আমাদের দুঃখ নেই। এর বিনিময়ে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি। একটি স্বাধীন দেশ ও একটি লাল সবুজের পতাকা। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশে মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে বর্ণিত সাম্য, মানবিক মর্যাদাবোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হোক। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও মুক্ত গণমাধ্যম চর্চা বিকশিত হোক -এই প্রত্যাশা করি।

উল্লেখ্য, সাংবাদিক আকবর হোসেন পাইলগাঁও বিএন হাইস্কুল থেকে ১৯৮৩ সালে এসএসসি, সিলেট এমসি কলেজ থেকে ১৯৮৫ সালে এইচএসসি, মদনমোহন কলেজ থেকে ১৯৮৭ সালে বিকম দেন। ১৯৯২ সালে এমকম (একাউন্টিং) অধ্যয়নকালে জার্মানিতে চলে যান। সেখানে প্রায় ১০ বছর বসবাস করেন। ২০০২ সালে তিনি লন্ডনে চলে আসেন।

আকবর হোসেন ১৯৯৬ সালে বিয়ে করেছেন। স্ত্রী ব্রুনেল ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েট এবং লোকাল কাউন্সিল সিভিক সেন্টারে কর্মরত। তাদের ৩ মেয়ে। বড় মেয়ে রয়্যাল হলওয়ে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে ফাইনাল ইয়ারে ক্রিমিনোলজি এন্ড সোসিওলজি অধ্যয়ন করছে ।

লেখালেখি ছাড়াও আকবর হোসেন লন্ডনে হালাল ফুড অথরিটিতে কর্মরত। এডমিন ম্যানেজার ও ফিনান্স কোঅর্ডিনেটর। আশির দশকের শেষদিকে তার জনপ্রিয় গান ‘সুরমা গাঙের পারো বাড়ি, শাহজালালের উত্তরসূরি, আমরা হক্কল সিলেটি‘ ব্যাপক সাড়া জাগায়। সংলাপ সাহিত্য-সংস্কৃতি ফ্রন্টের সেক্রেটারিয়েট মেম্বার আকবর হোসেন এখনো লিখে চলেছেন বিরামহীন গতিতে।

লেখক: লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক, কবি ও কথাসাহিত্যিক