প্রথমবারের মতো গিভিং টুইসডে উদযাপন বাংলাদেশে



মো. মিকাইল আহমেদ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বের বৃহত্তম উদারতা আন্দোলন গিভিং টুইসডে এ বছর ৩০ নভেম্বর সারাবিশ্বে একযোগে উদযাপন করা হবে। গিভিং টুইসডে হল বিশ্বব্যাপী একটি উদারতা আন্দোলন যা প্রতি বছর সংঘটিত হয় এবং মানুষের আমূল উদারতার শক্তি প্রকাশ করে। গিভিং টুইসডে ২০১২ সালে একটি সাধারণ ধারণা হিসাবে তৈরি করা হয়েছিল। এটি এমন একটি দিন যা মানুষকে ভাল কাজ করতে উৎসাহিত করে৷ তারপর থেকে এটি একটি বিশ্বব্যাপী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে যা কোটি কোটি মানুষকে উদার হতে, সহযোগিতা করতে এবং উদযাপন করতে অনুপ্রাণিত করে।

গিভিং টুইসডে সোশ্যাল মিডিয়ার সম্ভাবনা এবং বিশ্বব্যাপী মানুষের উদারতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবন্ধীদের ও অসহায়দের কল্যাণে তাদের সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে কাজ করে। স্থানীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের সময়, সম্পদ এবং প্রতিভা বিকাশে অনুদানকে উত্সাহিত করার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম প্রদান করে গিভিং টুইসডে। এটি অংশীদারদের একটি অনন্য মিশ্রণের সম্মিলিত শক্তিকে একত্রিত করে। অলাভজনক, নাগরিক সংস্থা, ব্যবসা এবং কর্পোরেশন, সেইসাথে পরিবার এবং ব্যক্তি দয়ার ছোট কাজগুলিকে উৎসাহিত করতে এবং দানের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে বিশ্বজুড়ে কাজ করে যাচ্ছে। গিভিং টুইসডে উদযাপনে এবারের  স্লোগান: "আমাদের কাছে দুটি দিন রয়েছে যা অর্থনীতির জন্য ভাল। এখন আমাদের কাছে এমন একটি দিন রয়েছে যা সম্প্রদায়ের জন্যও ভাল।"

বিশ্বের প্রায় ৬০টির বেশি দেশ প্রতিবছর গিভিং টুইসডে নামে এ দিবসটি উদযাপন করে । এটিকে উদারতা দিবসও বলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে দিবসটি ব্যাপকভাবে উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকার মগবাজারের জাহাবক্স লেনে অবস্থিত অর্গানাইজেশন ফর ডিসএবলড ইম্প্রুভমেন্ট এন্ড রাইটস নামের একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। দীর্ঘদিন ধরে এ সংস্থাটি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অধিকার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব শাকিল আজাদ মনন বলেন 'প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যানে সমাজের উচ্চবিত্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন দাতা সংস্হা সামাজিক দ্বায়বদ্ধতায় থেকে গিভিং প্র্যাকটিস অব্যহত রাখবে তাই এই কার্যক্রম টাকে এদেশে প্রতিষ্ঠিত করাই হলো মূল লক্ষ্য। আমাদের দেশে কোন ব্যক্তি, সংগঠন বা সরকার কেউই এই দিবসটি উদযাপন করে না। এটি একটি ভাল উদ্যোগ। আমরা অদির বাংলাদেশ ক্ষুদ্র সংগঠন হিসেবে এই দিবসটিকে দেশে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে সমাজের উচ্চবিত্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে উদ্ধুদ্ধ করতে চাই।'

তিনি আরও বলেন, 'আইন দুটির বাস্তব প্রয়োগে সরকারের জরুরি পদক্ষেপের পাশাপাশি উচ্চবিত্ত সমাজ, স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ, কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি বা সিএসআর এর আওতায় বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও দাতা সংস্থা গুলোকেও প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে এগিয়ে আসা উচিত।' 

সমাজে প্রতিনিয়ত নানা রকম অবহেলার শিকার হচ্ছে প্রতিবন্ধী শিশুরা। বহু প্রতিবন্ধী শিশু আমাদের দেশে অসহায় জীবনযাপন করছে। একটু খাতির যত্ন আর স্নেহ ভালোবাসা পেলে প্রতিবন্ধীরাও যে স্বাবলম্বী হতে পারে সেটা আমরা অনেকেই হয়তো জানিনা। প্রতিবন্ধিতা-বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা অনুযায়ী সেই শিশুকে প্রতিবন্ধী বলা হয় যে শিশু অসুস্থতার কারণে, চিকিৎসাজনিত ত্রুটি, দুর্ঘটনায় বা জন্মগতভাবে যদি কারও শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দরুন স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে লোপ পায় তাহলে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এর ৯নং ধারায় প্রতিবন্ধিতার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘‘প্রতিবন্ধিতা’’ অর্থ যেকোন কারণে ঘটিত দীর্ঘমেয়াদী বা স্থায়ীভাবে কোন ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত বা ইন্দ্রিয়গত ক্ষতিগ্রস্ততা বা প্রতিকূলতা এবং উক্ত ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত ও পরিবেশগত বাধার পারস্পরিক প্রভাব, যাহার কারণে উক্ত ব্যক্তি সমতার ভিত্তিতে সমাজে পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণে বাধাপ্রাপ্ত হন।" এ আইনের ১১নং ধারায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে  ‘‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার’’ অর্থ ধারা ১৬ তে উল্লিখিত এক বা একাধিক যে কোন অধিকার এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সংক্রান্ত আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইন বা আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন দলিলে উল্লিখিত অন্য কোন অধিকার, মানবাধিকার বা মৌলিক অধিকার।" প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরও যে সমাজের সর্বস্তরে যেকোন সেবাগ্রহণে স্বাভাবিক মানুষদের  মতই সমানসুযোগ প্রাপ্তির অধিকার রয়েছে তা বলা হয়েছে এ আইনের ১৩নং ধারায় যেমন, ‘‘প্রবেশগম্যতা’’ অর্থ ভৌত অবকাঠামো, যানবাহন, যোগাযোগ, তথ্য, এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ জনসাধারণের জন্য প্রাপ্য সকল সুবিধা ও সেবাসমূহে অন্যান্যদের মত প্রত্যেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমসুযোগ ও সমআচরণ প্রাপ্তির অধিকার।"

জাতীয় শিশু নীতিমালাতেও প্রতিবন্ধী শিশুসহ সব শিশুর অধিকার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে যদিও  বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন চিত্র প্রকাশ করে। প্রতিবন্ধীদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের মেধার বিকাশে অন্তরায়।নানারকম কুসংস্কারে জর্জরিত এ সমাজে প্রতিবন্ধীদের বাতিলের খাতায় ফেলে রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। নিজ পরিবারেও প্রতিবন্ধী শিশুরা নিগৃহীত হয় এমনকি পরিবারের বোঝাও মনে করা হয় কখনো কখনো। অবহেলা, লাঞ্চনা-বঞ্চনার শিকার হয় তারা জীবনের প্রতি পদে পদে। প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা নিশ্চিত করার ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতিতে। প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাসেবা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১-এও। তার পরও দেখা যায় শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী শিশুদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম।

লেখক: মো. মিকাইল আহমেদ, শিক্ষার্থী, ইমেইল: [email protected]

ভিসি উদ্ধারে শিক্ষার্থীর রক্ত ঝরানো অমানবিক  



প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মামুলি ঘটনার জেরে তুলকালাম কাণ্ড জাতির বিবেককে নাড়িয়ে তুলেছে। অভিযাগ এসেছিল ছাত্রীদের পক্ষ থেকে। তারা তাদের হলের প্রভোস্টের বিরুদ্ধে নানা কারণে পদত্যাগ দাবি করেছিলেন ভিসির কাছে। এরকম অভিযোগ ও সমস্যা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হরদম হয়ে থাকে। এর চেয়েও বড় সমস্যার প্রেক্ষিতে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান করার বহু নজির রয়েছে। ভালভাবে যুক্তি দিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে বুঝানো হলে তারা সব সময় শিক্ষকদের কথা মান্য করে। কারণ, শিক্ষার্থীরা তাদের বাবা-মায়ের পর শিক্ষকদেরকে পিতৃ-মাতৃতুল্য শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে থাকে।

শিক্ষার্থীরাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণ। তারা অনেক সময় ভুল করলেও নিজের ভুল বুঝতে পেরে নিজেরাই অনেক সমস্যার সমাধান করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু শাবিপ্রবি-র ঘটনা সামান্য আন্দোলন থেকে কেন এতবড় সমস্যা হয়ে মামলা মোকদ্দমার দিকে গড়িয়ে ভিসি পতনের আন্দোলনের দিকে গেল তা এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি করে তুলেছে জাতিকে।

দেশের স্বনামধন্য ও সুনামধারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিজস্ব গৌরব রয়েছে। যেখানে এই লেখকও বহুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন। তখনকার ছাত্র-শিক্ষক মধুর সম্পর্কের জন্য আজকের এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা সেই মধুর স্মৃতিকে যেন বার বার দুমড়ে মুচড়ে তুলছে। শিক্ষার্থীরা মনে হচ্ছে তাদের কর্তৃপক্ষের ওপর চরমভাবে নাখোশ। তারা ভিসির বাসভবনের সামনে জটলা করছে, স্লোগান দিচ্ছে, হাততালি দিয়ে নিজেদের দাবিগুলো জোর গলায় পেশ করছে। শিক্ষার্থীরা এ ধরনের দাবি দাওয়া মাঝে মধ্যে বড় -ছোট সব বিশ্ববিদ্যালয়েই করে থাকে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান পেয়ে যায় ও তাদের কণ্ঠস্বরও ঠান্ডা হয়ে পরিস্থিতি স্বাভবিক হয়ে উঠে। এটাই অলিখিত নিয়ম।

ঘটনার প্রথমদিন আমরা টিভি ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দেলানের ভাষা ও গতি দেখে এটাই ভেবেছিলাম যে পরদিন সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে। কিন্তু না। পরের দিনের ঘটনাবলী দেখে মনে হলো শাবিপ্রবি-র পবিত্র অঙ্গন যেন একটি মিনি যুদ্ধক্ষেত্র। প্রথমে একদল মানুষ কর্তৃক ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কির পর লাঠির খটাখট বাড়ি পড়ার পর বৃষ্টির মত ইট-পাটকেলের নিক্ষেপ। এরপর শক্ত পেশাদারী লাঠির দমাদম পিটুনি, বন্দুকের রাবার গুলি, সাউন্ড গ্রেনেডের মুহুর্মুহু বিকট শব্দ, দৌড়াদৌড়ি, কান্নাকাটি ইত্যাদির দৃশ্য টিভিতে দেখে মনে হলো পরিস্থিতি আসলে ভয়ানক মোড় নিয়েছে। ফিলিস্তিনে যেমন বাচ্চাদের ইট-পাটকেলের বিরুদ্ধে ইসরাইলি সেনারা কামানের গোলা ছুঁড়ে চারদিকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে ক্যামেরার গ্লাস ঘোলা করে দেয় ঠিক তেমনি একটি দৃশ্যপট। মোটেও বেশি বললাম না। যারা খবর দেখেছেন তারা আমার কথা কিছুতেই অবিশ্বাস করতে পারবেন না।

দৈনিক পত্রিকায় দেখলাম শিক্ষার্থীদেরকে ভবনের দরজা থেকে তাড়ানোর জন্য লাঠিপেটা করার পাশাপাশি ২১টি গুলি ও ২৩টি সাউন্ড গ্রেনেড ছোঁড়া হয়েছে সেদিন। উদ্দেশ্য ভিসিকে ‘উদ্ধার’ করতে হবে। এই শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে। কই, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে তখনকার ভিসি শিক্ষার্থীদের দ্বারা সারাদিন তালাবদ্ধ থেকে পুলিশ ডেকে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি-গ্রেনেড ছুঁড়তে বলেননি। একজন ভিসিকে অনেক সময় ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে হয়। তিনি কেন অধৈর্য্য হবেন? শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছে আদরের নিজ সন্তানতুল্য। একথা যদি মনে ধারণ না করতে পারেন তাহলে তিনি ওই পদে দায়িত্ব নিতে যাবেন কেন? আজকাল অনেক ভিসি যথার্থ জ্ঞান ও যুক্তি দিয়ে মেধাবী বা বুদ্ধিমান ছাত্রদের সাথে কথাও বলতে অপারগ। সেটাই আজকাল অনেক ভিসির চরম দুর্বলতা।

আজকাল সবাই সব জায়গায় প্রশাসক হতে চান। একজন ভালো গবেষক হতে সবার দ্বিধা। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ শুধু শিক্ষক নন। তাঁরা একাধারে শিক্ষক ও বিশিষ্ট গবেষক। এটাই এই চাকরির বিশেষত্ব বা সবিশেষ নিয়ম। কিন্তু আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক গবেষক হতে চান না। তারা নিজেদেরকে প্রশাসক ভাবতে ভালবাসেন-অথচ সেকাজে অনেকে অযোগ্য বা অনেকেরই কোন প্রশিক্ষণ ও নৈতিক গুণাবলী থাকে না। আজকাল বেশিরভাগ শিক্ষক কোন না কোন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকেন। অনেকের রাজনৈতিক নেতাদের সাথে থাকে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। আবার অনেক শিক্ষক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকেন। একটি ক্লাস নিয়েই ব্যবসার তাগিদে দেন দৌড়। এদের অনেকেই নিয়ম অমান্য করে একটি প্রশাসনিক পদের জন্য সরকারি নানা দফতরে দৌড়াদৌড়ি করে নিজের মর্যাদাকে হেয় প্রতিপন্ন করে ভিসি নামক সোনার হরিণ লাভে তৎপর হন। কেউ কেউ এক মেয়াদ শেষ হলে আরও এক-দুই মেয়াদ বেশি থাকার জন্য তদবির শুরু করেন। দেখা গেছে, যারা দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার ভিসিপদ লাভ করেছেন তারা বেশি দুর্নীতি করতে তৎপর ছিলেন। তারা অনেকে বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে চলাফেরা ও বিভিন্ন একপেশে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিভিন্ন অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি করেছেন। এজন্য অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। অনেককে মেয়াদপূর্তির আগেই পদত্যাগ করতে হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শাবিপ্রবি-তে যা ঘটেছে তার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে উপাচার্য যে ব্যর্থ হয়েছেন, তা-ই নয় বরং শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নির্দেশ দিয়ে ফৌজদারি অপরাধ করেছেন তিনি। (প্রথম আলো ১৯.০১.২০২২)।

শাবিপ্রবি-র দুঃখজনক ঘটনার প্রতিবাদে ঢাবি, রাবি, জাহাঙ্গীরনগর, খুলনা ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ মিছিল ও পথসভা হয়েছে। ঢাবি ও রাবি-তে হয়েছে মশাল মিছিল। কুবিতে মানববন্ধন হয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে বাসা বাড়িতে থাকা ও মেসের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে এসে জমায়েত হয়ে আন্দেলানে যোগ দিয়েছে। অনেকেই ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছে ও কুশপুত্তলিকায় আগুন দিয়েছে। তারা এখন একটি দাবি তুলছে। তারা উপাচার্যের পদত্যাগ চায়। এজন্য গতকালই ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে । অন্যদিকে শাবিপ্রবি-র ঘটনায় ‘২০০-৩০০ জন অজ্ঞাতনামা লোককে আসামি করে’ জালালাবাদ থানায় মামলা করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদের খোলা চিঠি পাঠানো হয়েছে। উপাচার্যের অপসারণের দাবিত শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশনের ঘোষণা দিয়েছে (দৈনিক ইত্তেফাক ১৮.০১.২০২২)। এছাড়া বিষয়টির সুরাহা নিয়ে বিভিন্ন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপ চলছে।

গত মঙ্গলবার (১৮ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টায় শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগের জন্য বুধবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। অন্যথায় আমরণ অনশনের ঘোষণা দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী (২০ জানুয়ারি) বলেন, অনশনকারীদের কয়েকজন অসুস্থ পড়েছেন। তারপরও উপাচার্য গদি ছাড়ছেন না। এই ২৪ জনের কিছু হলে আরও ২৪ জন আসবে। এরপর আরও ২৪ জন। দেখি তিনি পদত্যাগ না করে কিভাবে থাকেন।

বুধবার সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে তার পদত্যাগের অপেক্ষায় ছিলেন। তবে উপাচার্য পদত্যাগ না করায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে আমরণ অনশন শুরুর সিদ্ধান্ত নেন। অনশনকারী একজন বলেন, উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা অনশন চালিয়ে যাবো। এতে যদি আমাদের মৃত্যু হয় তাহলে দায়ভার উপাচার্যের ওপরই বর্তাবে।

এদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রায় আড়াইশ শিক্ষকের সঙ্গে জুম মিটিং করেন উপাচার্য। মিটিং শেষে রাত ৮টার দিকে শতাধিক শিক্ষক আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে তাদের আন্দোলন স্থগিত করার অনুরোধ করেন। তবে আন্দোলন স্থগিতে রাজি হননি শিক্ষার্থীরা। (জাগো নিউজ ২০.০১.২০২২)।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। ফেডারেশন বলছে, কয়েকদিন ধরে শাবিতে শিক্ষার্থীরা কিছু ন্যায্য দাবি—দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করছেন। তাদের আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সর্বোচ্চ এ ফোরামের নেতাদের জোর দাবি, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক সব দাবি—দাওয়া মেনে নিয়ে দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক। (জাগো নিউজ ২১.০১.২০২২)।

তবে যাই হোক না কেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবিতে ছাত্রীদের আন্দোলন ভিসি পতনের আন্দেলনের মত এতদূর গড়াবে তা কারো কাম্য ছিল না। এখন সামনে আরও কী জটিলতা তৈরি হতে যাচ্ছে তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। করোনার জমজ ভ্যারিয়্যান্ট ডেলমিক্রনের ঊর্ধ্বগতির এই কালো সময়ে সামনে কী ঘটবে তার জন্য কেউ গভীরে চিন্তা করছেন না। করোনাভীতি ছাড়াও একটি মামুলি ঘটনার জেরে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নষ্ট হোক এটাও কারো কাম্য হতে পারে না।

শিক্ষক হতে হবে শিক্ষাবান্ধব, গবেষণাবান্ধব ও শিক্ষার্থীবান্ধব। শিক্ষক-শিক্ষার্থী কেউই হঠাৎ বিগড়ে গেলে চলবে না। পারস্পরিক ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধের যথার্থ প্রকাশের মাধ্যমে শাবিপ্রবি-র মতো একটি পবিত্র শিক্ষাঙ্গন হয়ে উঠুক জ্ঞানার্জনের পবিত্র বাগান-এই প্রত্যাশা শাবিপ্রবি-র একজন সাবেক শিক্ষক হিসেবে আমার। আর শিক্ষার্থীদের একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বার্থে একই চাওয়া সবার হওয়া উচিত।

;

সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধান জরুরি



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

 

২০২০-২০২১ মেয়াদে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবাষির্কী ‘মুজিব শতবর্ষ’ পালিত হয়। গত বছর (২০২১) একই সাথে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবও উদযাপিত হয়েছে। মুজিব শতবর্ষ, স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে প্রায় দুই বছর ধরে বিরাজমান করোনা মহামারি সত্ত্বেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকার কারণে মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। ২০২১ এর ৬ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ করে, যা ওই বছর ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশেও উর্ত্তীণ হয়েছে।

২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অন্যান্য অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি বিভিন্ন মেগাপ্রকল্প গ্রহণ করে। যার অনেকগুলোই আজ দৃশ্যমান। বিশেষজ্ঞদের মতে, এইসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার পথে ধাবিত হবে। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা এ সরকারের ব্যর্থতার চেয়ে সাফল্য অনেক। স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় একটি স্বীকৃতি।

অন্যদিকে গত বছর দেশে করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে দেশব্যাপী সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ায় বছরের প্রায় অর্ধেক সময় জুড়ে ধারাবাহিক লকডাউনের কারণে জনজীবনে সঙ্কট নেমে আসে। করোনাকালীন এই সঙ্কটের মধ্যেও দেশে অনেকগুলো বৃহৎ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান হয়েছে। পদ্মা সেতু এখন আর কোন কল্পনা নয়, এটি দৃশ্যমান। এবছরেই পদ্মা সেতু চালু হচ্ছে এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই। পদ্মা সেতু এখন  বাংলাদেশের সম্মান এবং মর্যাদার প্রতীক। কর্ণফুলী টানেলের কাজও এগিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে। এবছর এই টানেলের উদ্বোধন করা হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। মেট্রোরেল ইতিমধ্যে ট্রায়াল দেওয়া শুরু করেছে। এই বছরেই মেট্রোরেলও চালু হবে। এছাড়াও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।

একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন সেক্টরে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। ২০০৮ এ প্রণীত নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিন বদলের সনদ’ এর ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেয়া ‘রূপকল্প ২০২১’, ‘রূপকল্প ২০৪১’, ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পনা’, বিভিন্ন পঞ্চ-বাষির্কী পরিকল্পনা গ্রহণ করে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। জাতিসংঘ ঘোষিত “সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা” সফলভাবে অর্জিত হয়েছে। “টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা”র বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে। উন্নয়নের প্রধান শক্তি বিদ্যুৎ  উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত দেশের নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা যেমন, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদনের ক্ষেত্রে গত একযুগে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিভিন্ন আন্তজার্তিক সংস্থার হিসেবেও বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক সূচকের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে।

খাদ্য ও টেকসই কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বিশেষ করে কৃষিখাতে ঘটেছে বিপ্লব। মৎস্য ও পশু সম্পদ উন্নয়নে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ইলিশ মাছ আহরণে বিশে^ প্রথম অবস্থানে আছে। জাতীয় মহাসড়কসহ গ্রামীণ অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় আয় বেড়েছে, দারিদ্য্রের হারও কমেছিল উল্লেখযোগ্যভাবে; যদিও করোনা মহামারিতে তা ফের বেড়েছে। বাংলাদেশ রপ্তানি বৃদ্ধি ও রেমিটেন্স অর্জনেও সাফল্য অর্জন করেছে।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে সমাজের দুর্গত মানুষের অভিগম্যতা বৃদ্ধি, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দূর্যোগ মোকাবেলা, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন, নারীর ক্ষমতায়ন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয় প্রদান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে গৃহহীনদের ঘর প্রদান, বস্তিবাসীদের জন্য স্বল্পভাড়ায় ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ফ্ল্যাট নির্মাণ, করোনা মহামারি মোকাবেলায় সরকারের সাফল্য অনেক। সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। এদেশের আপামর জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে ‘উন্নয়নের রোল মডেলে’পরিণত করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সরকার এত বেশি উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কিন্তু এই গর্বের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো যখন চলছে তখন কিছু অস্বস্তি এবং সামাজিক সমস্যা এই বড় বড় উন্নয়নগুলোকে ম্লান করে দিচ্ছে। এসবের মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। লাফিয়ে লাফিয়ে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। আয়ের সাথে ব্যয়ের সংকুলান করা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। ক্রমাগত বাড়ছে অসন্তোষ।

গণপরিবহনে বিশৃংখলা সাধারণ মানুষের জন্য বিশাল এক দুভোর্গের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনার কারণে একটা দীর্ঘসময় গণপরিবহন বন্ধ ছিলো। তারপর যখন গণপরিবহন অর্ধেক আসন রেখে চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তখন এর ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছিল। তারপর এই ভাড়া আর কমানো হয়নি। এর মধ্যে ডিজেল এবং কেরোসিনের দাম বৃদ্ধি করার সাথে সাথে আবার গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ে এবং এই ভাড়া বাড়ার পর এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলেছে। গণপরিবহন নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা এবং অস্বস্তি ছিলো এবং এখনও রয়ে গেছে। গণপরিবহনকর্মীদের বিশেষ করে চালক ও সুপারভাইজারদের দুর্ব্যবহার, নারী যাত্রীদের হেনস্থা ও সম্ভ্রমহানির মত ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে যা সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছে।

নৌপরিবহনেও স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন সময়ে লঞ্চ ডুবি এবং সর্বশেষ লঞ্চে অগ্নিকা-ের ঘটনা সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। গত বছর ও এ বছরের শুরুতে স্থানীয় পরিষদ নির্বাচন, বিশেষ করে ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এই ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষকে এক ধরনের অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করেন। অসৎ কিছু নেতা. পাতি নেতা, কর্মীদের ক্ষমতার প্রর্দশন সাধারণ মানুষকে তটস্থ করে ফেলেছ্। ক্ষমতা প্রর্দশনের এই সংস্কৃতি সাধারণ জনগণ বাদে সবার মধ্যেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। ক্ষমতা প্রর্দশনের এই সংষ্কৃতি বিপদজনক বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কারণ সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে ক্ষমতা দেখালে তার পরিণতি অশুভ হতে পারে। কাজেই এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে করণীয় ঠিক করতে হবে।

এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের সামাজিক ব্যাধি এবং অন্যান্য সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়েছে যা জনগণকে কিছুটা হলেও আতঙ্কের মধ্যে ফেলেছে। বেকারত্ব, দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, অসমতা বৃদ্ধি, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, নারীর প্রতি সহিংসতা আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয়। বিশেষ করে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা, যৌন হয়রানি, পারিবারিক নির্যাতন এবং নারী পাচার এর মত ঘটনার ভয়াবহতা লক্ষ্য করা গেছে। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে অসন্তোষও দেখা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ক্ষোভ ও বিক্ষোভ দানা বাঁধছে। এসব সমস্যার সমাধানে মনোযোগ দেয়া দরকার বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং অগ্রযাত্রায় বৃহৎ প্রকল্প  যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সামাজিক জীবনে স্থিরতা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দারিদ্র দূরীকরণ, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি কমানো, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, কর্মসংস্থান, গণপরিবহণে শৃংখলা ফেরানো এবং বৈষম্য ও অসমতা দূর করা। সেই সাথে ক্ষমতা প্রদর্শনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। আর এইসব যদি বন্ধ করা সম্ভব না হয় তাহলে বড় বড় উন্নয়নগুলোর সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

সে কারণেই এসব সামাজিক সমস্যা ও সঙ্কটগুলোর দিকে সবার আগে নজর দেয়া উচিত। ছোট ছোট সমস্যাগুলো যদি জিইয়ে রাখা হয় তাহলে বড় বড় উন্নয়নগুলো ম্লান হয়ে যেতে পারে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করেন। এসব সামাজিক সমস্যা যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায় তাহলে ভবিষ্যতে জনগণ বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর দিকে মনোযোগ দেবে না বলে বিশেষজ্ঞরা বার বার সর্তক করে আসছেন। সুতরাং সরকারের এ বিষয়ে আশু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তা নিয়ে ‘সামাজিক শৃংখলা উন্নয়ন কর্মসূচি’ পরিচালনা করতে হবে।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন কর্মী

;

এয়ারলাইন্সকে এগিয়ে যেতে হয় অনেক প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নানা প্রতিকূলতার মাঝেও এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রী সন্তুষ্টি দেয়ার চেষ্টা করে থাকে। যাত্রী সেবাই মূল আদ্যোপান্ত। যেকোন পরিস্থিতিতেই যাত্রী সেবাই প্রথম।

প্রতিকূল আবহাওয়া উড়োজাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে সিদ্ধহস্ত। গ্রীষ্ম-বর্ষায় কাল বৈশাখির তাণ্ডব উড়োজাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নানাভাবে বাঁধা সৃষ্টি করে। সেই সময় উড়োজাহাজ উড্ডয়ন ও অবতরণে অনেক ঝুঁকি নিতে হয় পাইলটদের, এত অনেক সময় জানমালের ক্ষতিও হয়ে থাকে। খারাপ আবহাওয়ার কারণে উড়োজাহাজের দিক পরিবর্তন করে অন্য কোনো বিমানবন্দরে অবতরণ করাতে হয়। এতে যেমন শিডিউল বিপর্যয় হয় তেমনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এয়ারলাইন্স কোম্পানি।

শীতকালে ঘনকুয়াশার কারণে ফ্লাইট উঠানামায় বিঘ্ন ঘটে। ভিজিবিলিটি কম থাকার কারণে সিডিউল বিপর্যয় ঘটে, যাত্রীদের পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটে। আবার গ্রীষ্মে অতিরিক্ত তাপমাত্রা থাকায় অভ্যন্তরীণ রুটে স্বল্প সময়ের ফ্লাইট থাকায় উড়োজাহাজের অভ্যন্তরেও শীততাপনিয়ন্ত্রণ ঠিকভাবে কার্যকর হয় না। ফলে যাত্রীরা পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়েই ইন-ফ্লাইট নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে থাকে। আর এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ যাত্রীদেরকে আরামদায়ক সেবা দেয়ারর জন্য যারপর নাই সচেষ্ট থাকে।

আবহাওয়াজনিত কিংবা অন্য কোনো কারণে যদি এয়ারপোর্ট বন্ধ থাকে কিংবা রানওয়ে বন্ধ থাকে তখন অবতরণের অপেক্ষায় থাকা বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজগুলো আকাশে নির্দিষ্ট উচ্চতায় এয়ারজটে পড়ে থাকে। কিংবা রানওয়ে কিংবা ট্যাক্সিওয়েতে লম্বা সময় ধরে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সগুলো উড্ডয়নের অপেক্ষায় থাকে টাওয়ারের অনুমতি সাপেক্ষে, যা ট্রাফিকজটের সৃষ্টি করে। উড্ডয়ন কিংবা অবতরণের সময় এয়ারজট কিংবা ট্রাফিকজটের কারণে এয়ারলাইন্সগুলোর পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, ফলে এয়ারলাইন্সগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এত সিডিউলে ব্যাঘাত ঘটে। এয়ারজট কিংবা ট্রাফিকজটে এয়ারলাইন্সের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

শীতকালে র‌্যাম্প এরিয়াতে মশার আধিক্য দেখা যায়। সন্ধ্যা হতে না হতেই মশার কামড়ে অতিষ্ট হয়ে যাত্রী ও বিমানবন্দরে কর্মরত কর্মীবাহিনী যারপর নাই কষ্ট ভোগ করেন। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ যার কাছেই মশা নিধনের দায়িত্ব থাকুক না কেনো, মশা নিধন করা খুবই জরুরী, যা সময়ের দাবি হিসেবে পরিগণিত। নতুবা যাত্রীদের অনুযোগ অভিযোগ বর্তায় এয়ারলাইন্সগুলোর উপর। এয়ারক্রাফটের ভিতর মশার অত্যাচারের কারণে অনেক বিদেশি এয়ারালাইন্স এর ফ্লাইটও বিলম্বে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে বিগত দিনে।

বার্ড হিট এভিয়েশনে একটি প্রচলিত শব্দ। বার্ড হিটের কারণে অনেক বড় দূর্ঘটনা ঘটার আশংকা থাকে। উড়োজাহাজ উড্ডয়ন কিংবা অবতরনের সময় বিমানবন্দরের রানওয়ের আশেপাশে বড় বড় পাখির উপস্থিতি দেখা যায়। বার্ড শুটার থাকার পরও মাঝে মাঝেই দূর্ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। এতে উড়োজাহাজের ক্ষতি হয়ে থাকে। ক্ষিতিগ্রস্ত হয় ফ্লাইট সিডিউল। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এয়ারলাইন্সগুলো।

বাংলাদেশে এয়ারলাইন্সগুলোকে জেট ফুয়েল এ-ওয়ান বিতরনকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের অধীনস্ত পদ্মা অয়েলই যারা দেশী-বিদেশি সব এয়ারলাইন্সকে জেট ফুয়েল বিতরণ করে থাকে। একই সময়ে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স এর ফ্লাইট সিডিউল থাকায় পদ্মা অয়েলের সক্ষমতায় ঘাটতি দেখা যায়। যার ফলে নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইট ছেড়ে যেতেও বিলম্ব হয়।

বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের বিদেশগামী যাত্রীরা চেক-ইন কাউন্টারের কার্যকলাপ শেষ করে ইমিগ্রেশন কাউন্টারের স্বল্পতার কারণেও বোর্ডিং গেটে আসতে সময়ক্ষেপন হয়ে থাকে। আবার বোর্ডিং গেটে সিকিউরিটি চেক-ইন শেষ করে নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইট ছেড়ে যেতে প্রায় সব এয়ারলাইন্সকে বেগ পেতে হয়। শুধু বোর্ডিং গেট নয়, বোর্ডিং ব্রিজের স্বল্পতাও এখন চোখে পড়ছে। দিন দিন যাত্রী বাড়ছে সেইসঙ্গে দেশী- বিদেশী এয়ারলাইন্স এর ফ্লাইট সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। থার্ড টার্মিনালের অপারেশন শুরু হওয়ার পর বোর্ডিং গেট ও ব্রিজের স্বল্পতা কেটে যাবে ধারনা করা যাচ্ছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে বিমানবন্দর সড়কে নানাবিধ উন্নয়ন কাজের জন্য যানজট একটি নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। পরোক্ষভাবে যাত্রী ভোগান্তির জন্য বিমানবন্দর সড়কে প্রতিনিয়ত যানজট একটি প্রধান কারন হয়ে আছে। নির্দিষ্ট সময়ে বিমানবন্দরে না পৌঁছানোর ফলে ফ্লাইট ধরতে না পারার কারণে যাত্রী অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। এর ফলে যাত্রীরা ফ্লাইটে অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে ভ্রমণে অনুৎসাহী হতে পারে। এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো বিমানবন্দরের বাহিরের সড়কের একই চিত্র।

বিমান ভ্রমণ শেষে অবতরণের পূর্ব মূহূর্তে বিমানবন্দরের আশে পাশে এলাকা থেকে বিমানে লেজার রশ্মি ফেলা হয়, যা বড় কোনো দূর্ঘটনার কারন হতে পারে। এ ব্যাপারে জনসচেতনতা তৈরি করা খুব বেশি জরুরি। একটি দুর্ঘটনা একটি এয়ারলাইন্স নয় পুরো এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

ফ্লাইট অনুপাতে লাগেজ বেল্টের স্বল্পতা আছে বিমানবন্দরে। যেমন আছে অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে তেমনি আছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্পতা বিরাজ করছে। তবে আশার আলো থার্ড টার্মিনালের অপারেশন শুরু হলে এ সমস্যাগুলো থাকবে না বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। পরোক্ষভাবে যাত্রীরা অভিযোগ করে থাকে এয়ারলাইন্সগুলো সঠিকসময়ে লাগেজ যাত্রীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে না।

গত কয়েকবছরে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু সেই অনুপাতে প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়নি।  কোনো কারণে বিমানবন্দরে ফ্লাইট উড্ডয়ন না করতে পারলে  প্যাসেঞ্জারদের বসার জন্য পর্যাপ্ত আসন থাকছে না। সেখানেও যাত্রীদের অভিযোগ এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের বসার ব্যবস্থাও করছে না।

প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ যত সমস্যা থাকুক না কেনো, আরামদায়ক যাত্রীসেবা দেয়ার দায়িত্ব এয়ারলাইন্স ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের। এভিয়েশন ব্যবসায় সেবাই প্রথম। অনেক প্রতিকূলতা পরিস্থিতি যেখানে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই, সেখানেও এয়ারলাইন্সকে সচেষ্ট থাকতে হয় যাত্রীদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে হবে যাত্রী সন্তুষ্টির জন্য। যাত্রীরা যাতে কোনো ধরনের বিরূপ পরিস্থিতিতে না পরেন, সেদিকে সুদৃষ্টি দিতে হবে। বিমানবন্দর হচ্ছে একটি দেশের ড্রয়িং রুমের মতো। দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় ড্রয়িং রুমের সৌন্দর্য বর্ধণে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স লিমিটেড

;

আমরা ‘চাষাভুষা’,  চাষাভুষার সন্তান



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘চাষাভুষার সন্তান, আমরা সবাই সাস্টিয়ান’ শীর্ষক এক স্লোগান ওঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির একজন শিক্ষক কর্তৃক ‘আমরা কোনো চাষাভুষা নই যে আমাদের যা খুশি তাই বলবে’—এমন এক মন্তব্যের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এই প্রতিবাদী স্লোগান। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. লায়লা আশরাফুন গতকাল সকালে শ্রেণিবৈষম্যের যে মন্তব্য করেছেন তার জবাব শিক্ষার্থীর। শিক্ষক শেকড়কে অস্বীকার করলেও শিক্ষার্থীরা শেকড়ের টান উপেক্ষা করতে পারছে না। তাই তাদের সরব প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদে আমরাও শামিল। যদিও সাস্টিয়ান নই, তবু আমরাও এই মাটির সন্তান; চাষাভুষারা আমাদের পূর্বপুরুষ, যাদের উত্তরাধিকার আমরা বয়ে চলেছি সযত্নে।

আমি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নই। আমার শিক্ষাজীবনের সমাপন অন্য কোথাও। ড. লায়লা আশরাফুনের মত পিএইডি ডিগ্রিধারী না হলেও আমারও পাঠ সমাজবিজ্ঞানে। পাঠের যে বিশালতা তার বেশিরভাগই আমার বা আমাদের মত অনেকের আয়ত্বে না থাকলেও অন্তত সমাজ-পাঠের সাধারণ জ্ঞানটুকু অর্জন ও প্রতিপালনের চেষ্টা করি, যেখানে শ্রেণিবিভাজনের স্থান নেই; বরং অবারিত এখানে সাম্যের পাঠ। অধ্যয়নলব্ধ জ্ঞানের বিষয়ই কেবল নয় এটা, মানসিকতা ও প্রকাশের যা একান্তই ব্যক্তিক চিন্তার প্রতিফলন। তাই বিষয়কে কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে শুধু বলা যায় এ যে প্রকাশের অজ্ঞতা, পাঠান্তে লব্ধ জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। লায়লা আশরাফুন এখানে পিএইডিধারী যদিও, তবু এ সীমাবদ্ধতা কিংবা সংকীর্ণতা অতিক্রম করতে পারেননি।

ড. লায়লা আশরাফুন শিক্ষক। তার দাবি তারা ‘বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ধারণ করেন’, তারা ‘চাষাভুষা নন যে তাদেরকে যা খুশি তাই বলা যাবে’। তার শিক্ষা, তার অবস্থান তাকে হয়ত তার দাবির বুদ্ধিজীবী শ্রেণিতে স্থান দেয়, কিন্তু কেমন বুদ্ধিজীবী তিনি যিনি শেকড়কে অস্বীকার করেন। চাষাভুষা শব্দ উল্লেখে প্রান্তিক মানুষদের অবজ্ঞা করেন প্রকাশ্যে। কেউ কি অপমান করেছে তাকে? তাকে বা তাদেরকে উদ্দেশ করে কেউ কি ‘কুরুচিপূর্ণ’মন্তব্য করেছে? তিনি সম্মানের জন্যে শিক্ষকতা পেশায় এসেছেন, সম্মানের জন্যে কাজ করেন বলে জানাচ্ছেন। সম্মাননীয় পেশা যে শিক্ষকতা যা তার মুখ থেকে বেরিয়েছে তা সর্বাংশে সত্য, সম্মানের জন্যে মানুষ শিক্ষকতা পেশায় আসে, এটাও সত্য। তবে তিনি কি সেই সম্মাননীয় পেশার সম্মানকে ধরে রাখতে পেরেছেন? পারেননি। না পারার কারণ ওই উদ্ধত, অশালীন, অসংলগ্ন এবং শেকড়কে তাচ্ছিল্য করা মন্তব্য। এমন মন্তব্য একজন শিক্ষকের কাছ থেকে আসলে আদতে শিক্ষকের মহান পেশাকে কলঙ্কিত করা হয়। ড. লায়লা আশরাফুন সেটাই করেছেন।

দেশবাসী ইতোমধ্যেই জেনে গেছে, শাবিপ্রবির এই শিক্ষার্থী-আন্দোলন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের নয়। এটা একান্তই বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়। শুরুতে একটি হলের প্রভোস্টের অসদাচরণের প্রতিবাদে নির্দিষ্ট ওই হলের ছাত্রীদের বিক্ষোভ। কিন্তু ব্যর্থ প্রশাসন এটাকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যা এখন জাতীয় ইস্যু হয়ে ওঠার অপেক্ষায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী ছাত্রী হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক জাফরিন আহমেদ লিজার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে সত্য কিন্তু তার আগে নিপীড়নমূলক এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যেখানে বিনা উসকানিতে পুলিশ হামলা করেছে শিক্ষার্থীদের ওপর। এতে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পুলিশ এসে হামলা করবে তা শিক্ষার্থীরা মেনে নেবে—এমন করুণ অবস্থা এখনও হয়নি ছাত্রসমাজের। ফলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের জাগরণ ওঠেছে ক্যাম্পাসে। পূর্বের সব দাবি তাই এখন এক দাবিতে পরিণত হয়েছে, এবং তা উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ। এরআগে পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে, আইসিইউতেও। এই যে নির্যাতন, এই নির্যাতনে কি দমে যাবে শিক্ষার্থী-আন্দোলন? মনে হয় না। বরং তা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে দেশের অপরাপর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

সপ্তাহ ধরে চলমান এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা আগ্রাসী হয়নি। পুলিশ গুলি চালিয়েছে, লাঠিপেটা করেছে, মামলা দিয়েছে। শুরুর মার খাওয়ার পর প্রতিরোধ করেছে শিক্ষার্থীরা। এরপর আন্দোলনের একটা পর্যায়ে এই শিক্ষার্থীরা আবার শান্তির বার্তা ছড়াতে পুলিশের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে গিয়ে বলেছে—‘পুলিশ তুমি ফুল নাও, আমার ক্যাম্পাস ছেড়ে দাও’! ক্যাম্পাসে পুলিশের আগ্রাসী ভূমিকা, অবস্থানে তারা সংক্ষুব্ধ, তবে আগ্রাসী হয়ে পুলিশকে ধাওয়া দিয়ে স্থায়ীভাবে ক্যাম্পাস-ছাড়া করতে যায়নি। এখানে তাদের প্রাপ্তমনস্কতার প্রশংসা করতে হয়। ফুল হাতে তাদের এই আহ্বানকে আন্দোলনের শিল্পিত প্রকাশ রূপেও বর্ণনা করা যায়। দেশের অন্যতম সেরা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মন-মনন-চিন্তা ও প্রকাশে যে উচ্চতর এরচেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে!

শিক্ষার্থীরা যেখানে উচ্চতর চিন্তায় সেখানে কিছু শিক্ষক কি সেটা ধারণ করতে পারছেন? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে কেউ কেউ পারছেন না। ড. লায়লা আশরাফুন তার বড় প্রমাণ। শিক্ষার্থীদের ‘কুরুচিপূর্ণ’ মন্তব্যের অভিযোগের বিরুদ্ধে মানববন্ধনের নামে বিতর্কিত ভিসির পক্ষ নিয়ে তিনি যে দাম্ভিক মন্তব্য করেছেন তা সুরুচির পরিচয় বহন করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তুঙ্গু পরিস্থিতিতে তার মত একজন শিক্ষক যেখানে স্থির-চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে পারতেন সেখানে তিনি আগুনে ঘি ঢেলেছেন। বিক্ষুব্ধ করছে শিক্ষার্থীদের, একই সঙ্গে আমরা যারা সরাসরি আন্দোলনে নেই সেই আমাদেরকেও সংক্ষুব্ধ করছেন। এটা শিক্ষক অবস্থানে থাকা কারও যথাযথ মন্তব্য হতে পারে না। কৃষক-মজুর সমাজের ঐতিহ্যিক উত্তরাধিকার হিসেবে আমরা এর প্রতিবাদ করি।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। শিক্ষার্থীদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে আমরা একাত্ম। শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে এখন পর্যন্ত অনড়। তারা কেবলই উপাচার্যের সংশ্লিষ্ট অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলছে। উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের ভাইরাল হওয়া এক কথোপকথন নিয়ে এখন পর্যন্ত তাদের মাথাব্যথা নেই, যদিও ওটা আরেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষত নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে চরম অপমানজনক মন্তব্য। আন্দোলনকে নানাভাবে ভাগ না করে কেবল একটা নির্দিষ্ট দাবিতে মনোনিবেশে তাদের এই দৃঢ়তা আশাব্যঞ্জক। এইধরনের মন্তব্যের বিরুদ্ধে উপর্যুক্ত কর্তৃপক্ষ তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেবেন আশা করি। অথবা সংক্ষুব্ধ কেউ এই অপমানের আইনি প্রতিবিধানের পথে গেলে যাক। তবে আমরা চাই নারী নিয়ে এইধরনের অপমানের বিচার হওয়া উচিত। 

শিক্ষক-শিক্ষার্থী পরস্পরবিরোধী সত্ত্বা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া আবশ্যক। সর্বোচ্চ পর্যায়ে শিক্ষা নিতে আসা শিক্ষার্থী আর সর্বোচ্চ পর্যায়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া শিক্ষকের মধ্যকার সম্পর্ক শিক্ষাস্তরের প্রাথমিক আর মাধ্যমিক পর্যায়ের মত হওয়ার কথা নয়। এই সম্পর্ক পরস্পরের মধ্যকার সম্মানের হতে হবে। তা না হলে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের শঙ্কা থাকবেই। এই পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী তাদের নিজেদের অবস্থান ভুলে গেলে সেটা হবে হতাশার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকশ’ শিক্ষক যে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এমন না, কয়েক হাজার শিক্ষার্থী যে শিক্ষকদের অপমান (যদিও অপমানের কোন প্রমাণ কেউ দেখায়নি) করছেন এমনও না। তবে যারাই অদ্যকার এই উত্তুঙ্গু পরিস্থিতিতে আগুনে ঘি ঢালবে তারা মোটেও শিক্ষাবান্ধব কেউ নয়। তাদের উচিত হবে সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়া।

শাবিপ্রবিতে এই যখন পরিস্থিতি তখন নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠান রীতিমত ‘গণঘুমে’। এই ঘুম ভাঙবে কবে তাদের? এত জল ঘোলা করে যদি সবশেষে নামা হয় তবে যা কিছু বাকি তা জল নয়, উচ্ছিষ্টই! দাবি করি ‘গণঘুম’ থেকে জাগুক তারা। আচার্য, সরকার কিংবা যারাই নিয়ন্ত্রক তারা শিক্ষা ও শিক্ষার্থীবান্ধব হয়ে বাঁচিয়ে দিক দেশের অন্যতম সেরা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে।

‘বাঁচাও শাবি, সরাও ভিসি’—শিক্ষার্থীদের এমনই দাবি। শিক্ষার্থীদের এই দাবিতে যুক্তি আছে। যুক্তি থাকায় গণভিত্তিও আছে!

কবির য়াহমদ, প্রধান সম্পাদক, সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর, মোবাইল- ০১৬১৪ ৩৪ ৮২ ৮২, ইমেইল- [email protected]

;