প্রথমবারের মতো গিভিং টুইসডে উদযাপন বাংলাদেশে



মো. মিকাইল আহমেদ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বের বৃহত্তম উদারতা আন্দোলন গিভিং টুইসডে এ বছর ৩০ নভেম্বর সারাবিশ্বে একযোগে উদযাপন করা হবে। গিভিং টুইসডে হল বিশ্বব্যাপী একটি উদারতা আন্দোলন যা প্রতি বছর সংঘটিত হয় এবং মানুষের আমূল উদারতার শক্তি প্রকাশ করে। গিভিং টুইসডে ২০১২ সালে একটি সাধারণ ধারণা হিসাবে তৈরি করা হয়েছিল। এটি এমন একটি দিন যা মানুষকে ভাল কাজ করতে উৎসাহিত করে৷ তারপর থেকে এটি একটি বিশ্বব্যাপী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে যা কোটি কোটি মানুষকে উদার হতে, সহযোগিতা করতে এবং উদযাপন করতে অনুপ্রাণিত করে।

গিভিং টুইসডে সোশ্যাল মিডিয়ার সম্ভাবনা এবং বিশ্বব্যাপী মানুষের উদারতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবন্ধীদের ও অসহায়দের কল্যাণে তাদের সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে কাজ করে। স্থানীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের সময়, সম্পদ এবং প্রতিভা বিকাশে অনুদানকে উত্সাহিত করার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম প্রদান করে গিভিং টুইসডে। এটি অংশীদারদের একটি অনন্য মিশ্রণের সম্মিলিত শক্তিকে একত্রিত করে। অলাভজনক, নাগরিক সংস্থা, ব্যবসা এবং কর্পোরেশন, সেইসাথে পরিবার এবং ব্যক্তি দয়ার ছোট কাজগুলিকে উৎসাহিত করতে এবং দানের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে বিশ্বজুড়ে কাজ করে যাচ্ছে। গিভিং টুইসডে উদযাপনে এবারের  স্লোগান: "আমাদের কাছে দুটি দিন রয়েছে যা অর্থনীতির জন্য ভাল। এখন আমাদের কাছে এমন একটি দিন রয়েছে যা সম্প্রদায়ের জন্যও ভাল।"

বিশ্বের প্রায় ৬০টির বেশি দেশ প্রতিবছর গিভিং টুইসডে নামে এ দিবসটি উদযাপন করে । এটিকে উদারতা দিবসও বলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে দিবসটি ব্যাপকভাবে উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকার মগবাজারের জাহাবক্স লেনে অবস্থিত অর্গানাইজেশন ফর ডিসএবলড ইম্প্রুভমেন্ট এন্ড রাইটস নামের একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। দীর্ঘদিন ধরে এ সংস্থাটি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অধিকার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব শাকিল আজাদ মনন বলেন 'প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যানে সমাজের উচ্চবিত্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন দাতা সংস্হা সামাজিক দ্বায়বদ্ধতায় থেকে গিভিং প্র্যাকটিস অব্যহত রাখবে তাই এই কার্যক্রম টাকে এদেশে প্রতিষ্ঠিত করাই হলো মূল লক্ষ্য। আমাদের দেশে কোন ব্যক্তি, সংগঠন বা সরকার কেউই এই দিবসটি উদযাপন করে না। এটি একটি ভাল উদ্যোগ। আমরা অদির বাংলাদেশ ক্ষুদ্র সংগঠন হিসেবে এই দিবসটিকে দেশে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে সমাজের উচ্চবিত্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে উদ্ধুদ্ধ করতে চাই।'

তিনি আরও বলেন, 'আইন দুটির বাস্তব প্রয়োগে সরকারের জরুরি পদক্ষেপের পাশাপাশি উচ্চবিত্ত সমাজ, স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ, কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি বা সিএসআর এর আওতায় বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও দাতা সংস্থা গুলোকেও প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে এগিয়ে আসা উচিত।' 

সমাজে প্রতিনিয়ত নানা রকম অবহেলার শিকার হচ্ছে প্রতিবন্ধী শিশুরা। বহু প্রতিবন্ধী শিশু আমাদের দেশে অসহায় জীবনযাপন করছে। একটু খাতির যত্ন আর স্নেহ ভালোবাসা পেলে প্রতিবন্ধীরাও যে স্বাবলম্বী হতে পারে সেটা আমরা অনেকেই হয়তো জানিনা। প্রতিবন্ধিতা-বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা অনুযায়ী সেই শিশুকে প্রতিবন্ধী বলা হয় যে শিশু অসুস্থতার কারণে, চিকিৎসাজনিত ত্রুটি, দুর্ঘটনায় বা জন্মগতভাবে যদি কারও শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দরুন স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে লোপ পায় তাহলে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এর ৯নং ধারায় প্রতিবন্ধিতার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘‘প্রতিবন্ধিতা’’ অর্থ যেকোন কারণে ঘটিত দীর্ঘমেয়াদী বা স্থায়ীভাবে কোন ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত বা ইন্দ্রিয়গত ক্ষতিগ্রস্ততা বা প্রতিকূলতা এবং উক্ত ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত ও পরিবেশগত বাধার পারস্পরিক প্রভাব, যাহার কারণে উক্ত ব্যক্তি সমতার ভিত্তিতে সমাজে পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণে বাধাপ্রাপ্ত হন।" এ আইনের ১১নং ধারায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে  ‘‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার’’ অর্থ ধারা ১৬ তে উল্লিখিত এক বা একাধিক যে কোন অধিকার এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সংক্রান্ত আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইন বা আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন দলিলে উল্লিখিত অন্য কোন অধিকার, মানবাধিকার বা মৌলিক অধিকার।" প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরও যে সমাজের সর্বস্তরে যেকোন সেবাগ্রহণে স্বাভাবিক মানুষদের  মতই সমানসুযোগ প্রাপ্তির অধিকার রয়েছে তা বলা হয়েছে এ আইনের ১৩নং ধারায় যেমন, ‘‘প্রবেশগম্যতা’’ অর্থ ভৌত অবকাঠামো, যানবাহন, যোগাযোগ, তথ্য, এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ জনসাধারণের জন্য প্রাপ্য সকল সুবিধা ও সেবাসমূহে অন্যান্যদের মত প্রত্যেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমসুযোগ ও সমআচরণ প্রাপ্তির অধিকার।"

জাতীয় শিশু নীতিমালাতেও প্রতিবন্ধী শিশুসহ সব শিশুর অধিকার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে যদিও  বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন চিত্র প্রকাশ করে। প্রতিবন্ধীদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের মেধার বিকাশে অন্তরায়।নানারকম কুসংস্কারে জর্জরিত এ সমাজে প্রতিবন্ধীদের বাতিলের খাতায় ফেলে রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। নিজ পরিবারেও প্রতিবন্ধী শিশুরা নিগৃহীত হয় এমনকি পরিবারের বোঝাও মনে করা হয় কখনো কখনো। অবহেলা, লাঞ্চনা-বঞ্চনার শিকার হয় তারা জীবনের প্রতি পদে পদে। প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা নিশ্চিত করার ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতিতে। প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাসেবা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১-এও। তার পরও দেখা যায় শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী শিশুদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম।

লেখক: মো. মিকাইল আহমেদ, শিক্ষার্থী, ইমেইল: [email protected]