তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও করোনামৃত্যু হ্রাসে ‘গার্মেন্টস প্রোটিন’ মাছ



প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে দেশে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। এ অস্থিরতা দিন দিন চরমে উঠে তেল নির্ভর সকল শিল্প, কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা তো বটেই মানুষের ঘরের নিত্যপণ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব তৈরী করে চলেছে। ব্যক্তিগত গাড়িওয়ালাদের ব্যবহৃত অকটেন, গ্যাস ইত্যাদির মূল্য বাড়েনি। তাই তারা এখনও চুপ করে থাকলেও বাজারে গিয়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেখে মাথা গরম করা শুরু করে দিয়েছেন। সরকারী ডিপো থেকে জ্বালানি ভরিয়ে গাড়ি ব্যবহারকারী কর্তারা তো কখনোই এ বিষয়ে মাথা ঘামান নি, এখনও ঘামানোর দরকার বোধ করছেন না। কারণ, তারা গাড়ি, তেল, ড্রাইভার, মেইন্টেন্যান্স সবকিছুর জন্য বড় অংকের ভর্তুকি বা ভাতা পান। তেলের দাম বৃদ্ধিতে শুধু মরণ দশা তাদের, যারা নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। প্রান্তিক কৃষক ও দিনমজুরদের দুর্দশার কথা সবার কর্ণগোচর হয় না। অন্যদিকে পুলিশের বেষ্টনীতে থেকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কথা চিন্তা করে আমরা জনসেবা দিয়ে কল্যাণরাষ্ট্র হতে চাই!

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করাটা মোটেও এই সময় অত্যাবশ্যক নয়। একদিকে করোনা ও ডেঙ্গুর প্রভাবে মানুষ নাকাল। নিম্ন আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে। এখন শুরু হয়েছে ইরি ধান আবাদের জমিতে কৃত্রিম পদ্ধতিতে পানি সেচ দেয়া। মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলানের জন্য শ্যালো, গভীর নলকূপ, পাওয়ার পাম্প ইত্যাদি চালানো হয় ডিজেলের মাধ্যমে। ডিজেলের লিটারে ১৫ টাকা মূল্যবৃদ্ধির অর্থ কৃষকের হতাশা। এটা কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের জন্য একটা বড় ধাক্কা।

এই ধাক্কার আঘাত দেশের সামগ্রীক খাদ্য উৎপাদন বিঘ্নিত করবে এবং খাদ্যাভাব দেখা দিলে তার ঢেউ সামলানো সরকারের জন্য বেশ কঠিন হবে। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়বে তার নেতিবাচক প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান হতে থাকবে যেটা ইতোমধ্যে শুধু পাবলিক বাসের মধ্যে নয়- সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে দৃশ্যমান হয়ে বিশৃংখলা শুরু হয়েছে। যার মোকাবেলা করা সহজে সম্ভব নাও হতে পারে। গ্রামে যারা কুপি, হ্যারিকেন ব্যবহার করে তারা কৃষক, দিনমজুর, ভিক্ষুক শ্রেণির মানুষ। অন্ধকার ঘরে একটু আলা জ্বালিয়ে রাতের খাবার খেতেও তাদের ব্যয় বেড়ে গেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ তেলের দাম বৃদ্ধিকে জীবনের অভিশাপ হিসেবে দেখছেন।

করোনার সংক্রমণ এখনও কমেনি। বরং ইউরোপের নানা দেশে আবারো লকডাউন শুরু হয়েছে। ইতিবাচক তেমন কিছুর উত্তরণ ঘটেনি। অথচ, আমরা ড্যামকেয়ার ভাব নিয়ে চলাফেরা শুরু করেছি। সারা বিশ্বে খাদ্যসহ সবকিছুর উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। মানুষের পুষ্টিগ্রহণের মাত্রা কমে গেছে। দৈহিক শক্তি ও মানসিক ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আরব বিশ্বে নির্মাণ কাজ স্থবির হয়েছে। এখনও করোনার উপর ইতিবাচক ভরসা না পেয়ে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে ব্যাপকভাবে। ওপেক জ্বালানি তেল উত্তোলন বাড়ানোর কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ফলে নিকট ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস পাবার কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ বলছে, আমরা এখন তেলের দাম বাড়ালাম, এটা বিশ্ববাজারে দাম কমা মাত্রই আমাদের দেশে আবার কমিয়ে সমন্বয় করা হবে। অথচ, আমাদের দেশের বৈশিষ্ট্য হলো কোন জিনিষের দাম একবার বেড়ে গেলে তা আর কখনই কমার নজির নেই। এই অবস্থায় জ্বালানি আমদানি নির্ভর বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের করণীয় হলো জ্বালানি খাতে ভর্তুকি আরো বাড়িয়ে কৃষি ও কৃষক বাঁচানো।

কারণ, একমাত্র কৃষিই আমাদেরকে করোনার করাল থাবা থেকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে সহায়তা করেছে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। আমাদের ভাত, শাক-সব্জি, মাছগ্রহণ বহুলাংশে আমাদেরকে বাঁচতে সহায়তা করেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে- সারা বিশ্বে মাছের মাধ্যমে আমিষ গ্রহণের পরিমাণ শতকরা মাত্র ২৯ শতাংশ। আমাদের দেশে মাছের মাধ্যমে খাদ্যে আমিষ গ্রহণের পরিমাণ শতকরা ৬৩ শতাংশ। আমাদের ব্রয়লার মুরগি তেলাপিয়া, কই, পাঙ্গাশের নাম এখন ‘গার্মেন্টস্ প্রোটিন’। কারণ পোষাক শ্রমিকরা পাঁচ হাজার টাকা বেতন পেয়েও সপ্তাহে কমপক্ষে দু’দিন এসব আমিষ কিনতে পারে। এগুলোর দাম কম এবং এসব মাছ-মাংস এখন গরিবের আমিষ মেটানোর প্রধান উপায়। এগুলোর সস্তা ও সহজলভ্য আমিষ খেয়ে করোনাক্রান্ত হয়েও আমাদের দেশে মৃত্যুর হার কম হয়েছে বলে উন্নত দেশের গবেষক ও সারা বিশ্ববাসী মনে করে।

তাই জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়িয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের পকেট কাটা বন্ধ করে হরতাল, ধর্মঘট, ঘেরাও ইত্যাদি সৃষ্টি হতে না দিয়ে সামাজিক শৃংখলা অটুট রাখার চেষ্টা করা উচিত। সরকারের বুঝা উচিত, তেলের দাম কমানোর সঙ্গে ‘গার্মেন্টস্ প্রোটিন’ বৃদ্ধি ও করোনার পরোক্ষ প্রতিরোধ জড়িত রয়েছে।

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আপাতত: কোনো রাজনীতি নেই বলে মনে হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে এটা নিয়ে ব্যাপক রাজনীতি শুরু হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশ ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের বড় ভোক্তা। সেজন্য এদেশ মাদকের বাজারে পরিণত হয়েছে। মানি লন্ডারিং এখন আরেকটি বড় ব্যবসা। সেগুলো থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্নদিকে সরানোর জন্য অহেতুক ভারতে জ্বালানি পাচার ও দেশের অভ্যন্তরে মূল্য বৃদ্ধি করে উন্মাদনা তৈরি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। ভারত অনেক বড় দেশ। সেখানে বাংলাদেশে রপ্তানী করা পেঁয়াজের ট্রাকের ট্যাংকিতে কয়ফোঁটা তেল ভরিয়ে নিয়ে গেল সেটাকে সীমান্তে ট্যাংকে স্কেল ঢুকিয়ে মাপজোখ করে দেখাটা হাস্যকর ব্যাপার। তাই যদি হয় তাহলে যেসব বিমান বিদেশে গিয়ে জ্বালানী ফুরিয়ে ফেলে তারা কি ফুয়েল রিফিল না করে অথবা পুনরায় কি জ্বালানী না ভরিয়ে বিনা ফুয়েলে দেশে ফিরতে পারবে? ভারতে আমাদের দেশ থেকে তেল পাচার হয়ে যাওয়ার কথাটা একটি আজব আবিষ্কার। এর চেয়ে ইলিশ মাছ, পাট, চামড়া, পুরনো গরম কাপড়, মাদকদ্রব্য ইত্যাদি স্থল ও আকাশ পথে বেশি পাচার হয়। মিয়ানমারের ইয়াবা, ক্রিষ্টাল বাংলাদেশে ঢুকে ভারতের অনেক রাজ্যে পাচার হয়ে থাকে। স্বর্ণ চোরাচালান তো আছেই। সেগুলোতে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। সেদিকে নজর নেই অথচ, মালবাহী ট্রাকে কয়ফোটা জ্বালানি ভরিয়ে নিলে আপত্তি করে সেটাকে তেল পাচার বলা হচ্ছে কেন তা মোটেও বোধগম্য নয়। বাংলাদেশ থেকে ভারতে বছরে কি পরিমান জ্বালানি তেল পাচার হয়েছে বা হয় তার কোন পরিসংখ্যান নেই। এটা এখনও একটা উদ্ভট ধারনা মাত্র।

প্রতি বছর জ্বালানি খাতে ৫৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। ভর্তুকির পরিমাণ আরো বৃদ্ধি করা হলে উন্নয়ন কার্যক্রম বিঘ্নিত হবে- আসলে সেটা সত্য নয়। কৃষিতে ভর্তুকি আমাদের খাদ্য উৎপাদান বৃদ্ধি করবে, জীবন বাঁচাবে। নৌপরিবহন ও মৎস্য আহরনের জন্য ট্রলারের জ্বালানি সস্তা হলে বেশী সামুদ্রিক মাছ ধরা যাবে। সামুদ্রিক মাছ দিয়ে পুষ্টির চাহিদা পূরিত হলে মানুষের স্বাস্থ্য ভাল থাকবে।

জাপান গাড়ির দেশ। সেখানে একজন মানুষের গড়ে তিন-চারটি গাড়ি। সেদেশে একজন কৃষকের আরো বেশী গাড়ি ও ট্রাক্টর, ক্রেণ, ক্রাসিং মেশিন ইত্যাদি থাকে।  তাদর দেশে কৃষকরা বেশী ধনী ব্যাক্তি। জাপানের মত দেশের চারদিকে সমুদ্র। তারা দেশটির চারদিকের সমুদ্র উপকূলে বৃহৎ সংরক্ষণাগার তৈরি করে বিদেশ থেকে তেল কিনে মজুত গড়ে তুলেছে। স্থলে ভূমিকম্পের কথা মাথায় রেখে তারা সমুদ্রে ভাসমান ট্যাংকারে তেলের মজুদ গড়ে তুলেছে। আরো একটি বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলেও তাদের জ্বালানির অভাব হবে না। যা আগামী বিশ বছরের জন্য যথেষ্ট। আমাদের মত আমদানী নির্ভর দেশে সেরুপ জ্বালানি কিনে মজুদ গড়ে তোলা দরকার। কারণ, তেল তো আর দু’এক বচরে পচে নষ্ট হয়ে যায় না।

জ্বালানি তেল আমদানি নির্ভর দেশগুলোর জন্য জ্বালানি তেলের বিকল্প অনুসন্ধান করা অনেকটা জরুরি। সমতল ছাড়াও আমাদের সমুদ্রে তেল, গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে এবং নিজেরাই নিজেদের প্রযুক্তি দিয়ে সেগুলো আহরণ বা উত্তোলণ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিবেশি দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য আমাদের দেশের তুলনায় বেশি। তাই মূল্য সমন্বয় করা না হলে জ্বালানি তেল পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার হবার আশঙ্কা ছিল। এই যুক্তি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয। এটা হাস্যকর যুক্তি। ভারত অনেক বড় দেশ। সেখানে বাংলাদেশ থেকে তেল পাচার করে তাদের কোটি কোটি গাড়ি চলবে তা গ্রহণযোগ্য যুক্তি হতে পারে না। তেল ইয়াবা নয় যে, পকেটে করে গোপনে পাচার করা যায়। আমাদের সীমান্তে পাহারাদার আছেন। তারা সবসময় সব গাড়ি চেক করেন। তেলের গাড়িকে তারা নিশ্চই চেনেন। তাই তাদের চোখের সামনে দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে তেলের গাড়ি পাচার হবার আশঙ্কা রয়েছে- একথা বলে তাদেরকে সন্দেহ ও অপমান করা হয়ে মাত্র।

আমি আগেই বলেছি- বাংলাদেশ বলছে, আমরা এখন তেলের দাম বাড়ালাম, এটা বিশ্ববাজারে দাম কমা মাত্রই আমাদের দেশে আবার কমিয়ে সমন্বয় করা হবে। আমি আবারো বলছি, আমাদের দেশের বৈশিষ্ট্য হলো কোন জিনিষের দাম একবার বেড়ে গেলে তা আর কখনই কমার নজির নেই। আমাদের দেশের সিংহভাগ ব্যবসায়ীর লোভ বেশী। তাই জনগণের কথা চিন্তা না করে তারা নিজের লাভটাই দেখেন। সবক্ষেত্রে তাই হয়, তেলের ক্ষেত্রেও তাই হবে, তাদের ইতিবাচক মানসিকতার ব্যতিক্রমটা সুদূর পরাহত। তাই গবেষণা রিপোর্টের ভাষ্য অনুযায়ী কৃষি ও মাছের উৎপাদন তথা ‘গার্মেন্টস্ প্রোটিন’ আরো বৃদ্ধির সুযোগ দিয়ে করোনামৃত্যু হ্রাসে এগিয়ে থাকার জন্য তেলের মূল্যবৃদ্ধি বাতিল করার বিকল্প নেই।

লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান। E-mail: [email protected]