মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরের বুদ্ধিজীবীরা কেমন!



দেবদুলাল মুন্না
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বইতিহাসে আমাদের দেশ অন্য দেশগুলোর চাইতে বিশেষ করে দুটি কারণে আলাদা। এক ভাষার জন্য লড়াই ও পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ। অন্যটি হচ্ছে যুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী হত্যা। বুদ্ধিজীবী হত্যা একই দিকে ট্র্যাজেডি ও বিউটি ।  ট্যাজেডি কেন পরে বলছি। আর বিউটি হচ্ছে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে প্রাণ ছিল। সক্রিয় ছিলেন। একটা গল্প বলি, গ্রীসীয় ফিলোসফার পলিম্যাথের। পলিম্যাথের ছয় বছরের শিশুটা, স্যামেথ খুব চঞ্চল প্রকৃতির ছিল। পলিম্যাথ কাজ করছিলেন। কিন্তু তাকে বিরক্ত করছিল স্যামেথ। তখন স্যামেথকে ব্যস্ত রাখার জন্য পলিম্যাথ একটা পত্রিকার এক পৃষ্ঠা কয়েক টুকরো  করে দিয়ে বললেন, সঠিকভাবে জোড়া লাগাও। স্যামেথ ঘটনাক্রমে ওই পৃষ্ঠার উল্টোদিকে একটা মানুষের মুখ দেখেছিল। পলিম্যাথ ভেবেছিলেন , স্যামেথকে এবার দুরুহ কাজ দিয়ে আটকানো যাবে । কিন্তু মাত্র চার মিনিটের ভেতরেই স্যামিথ ওই সাত টুকরো এক পৃষ্ঠার কাগজ হুবহু জোড়া লাগিয়ে বাবাকে চমকে দিল। কীভাবে সম্ভব ? পলিম্যাথ জানতে চাইলে স্যামিথ বলেছিল, মানুষের মুখ জোড়া লাগিয়েছি। এতো অনেক সহজ।

কিন্তু পলিম্যাথ ভাবছিলেন, মুখস্থ না, গতানুগতিক পদ্ধতিতে না, একটা নতুন কাঠামোয় ফেলে এ কাজটি করেছে স্যামিথ। পোস্ট স্ট্রাকচারিলিজমের চর্চা তখন শুরু হয়নি। গল্পটি শেষ। বলার কারণ, বুদ্ধিজীবীদের প্রাণ ও সক্রিয়তা ছিল বলেই তাদের পাক ফ্যাসিস্টরা হুমকি মনে করেছিল। আমাদের দেশেও অনেক বিদ্যাসাগর আছেন। কিন্তু গণবুদ্ধিজীবী নেই। গৌতম ভদ্র এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,  কালকাতার সংস্কৃত কলেজ থেকে যারাই গ্র্যাজুয়েশন করতেন তাদের সবাইকেই বিদ্যাসাগর বলা হতো একসময়। বিদ্যাসাগর শুধু ইশ্বরচন্দ্র ছিলেন না। তিনি গণবুদ্ধিজীবীই ছিলেন। অনেক সমাজ সংস্কার করেছেন। খালি বই লেখেননি আর পড়েননি।

আমাদের দেশেও বিদ্যাসাগর অনেক। কিন্তু গণবুদ্ধিজীবী সংখ্যায় কম। একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি, লাকাপন্থী এক অধ্যাপক যিনি আবার বুদ্ধিজীবী দাবিকারী এমন একজনের সঙ্গে আমার আলাপ হচ্ছিল। তার কাছে শহীদ বুদ্ধিজীবী শেখ আবদুস সালামের প্রসঙ্গ তুলতেই সেই লাকাপন্থী বললেন, উনাকে কে চিনে ? উনি কি লেখেন? টকশো করেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক? তিনি কেন বুদ্ধিজীবি হবেন?

লাকাপন্থী  একজন একাডেমিশিয়ান ও ট্রাডিশনাল বুদ্ধিজীবী। বই পড়া ,লেখা ও বলা তার শুধু কাজ। আর শহীদ বুদ্ধিজীবী শেখ আবদুস ছিলেন গণবুদ্ধিজীবী । নড়াইলের কালিয়ায় তার জন্ম। পাবলিক ইনটেলেকচুয়েল। তিনি ছিলেন জুলিয়ান বেন্দার সংজ্ঞায়িত বুদ্ধিজীবীদের মতো না। এলিট অবস্থানে বসে জনগণের মুক্তি চাইতেন না । প্রথমজন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। টক শো করেন। পত্রিকায় লেখেন। কিন্তু জনসম্পৃক্ত কাজে নেই। অন্যদিকে শহীদ বুদ্ধিজীবী শেখ আবদুস সালাম নিজে একের পর এক স্কুল/ কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ করতেন, বিনা বেতনে গরীব ছাত্রদের পড়াতেন। নিজ এলাকা ছাড়াও ভিন্ন এলাকায় চলে যেতেন যদি তার প্রয়োজন পড়দ সমস্যা সমাধানে।  শিক্ষাকে সচেতনতা-সংস্কৃতির সিডিয়েটর হিসেবে দেখতেন এবং রাজনীতি করতেন জনগণের জন্যে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধও করেছেন । ঘরে বসে বুদ্ধিজীবিতা করেননি। অথচ তিনিও শিক্ষকতা করেছেন। বেটার তবে কে ? একাডেমিশিয়ান বা ট্রাডিশনাল নাকি অর্গানিক নাকি আইডিয়াল বুদ্ধিজীবী নাকি গণবুদ্ধিজীবী?

আন্তোনিও গ্রামসি প্রিজন নোটবুকে লিখেছেন,বুদ্ধিজীবী দুই ধরণের। ট্রাডিশনাল ও অর্গানিক। ট্রাডিশনাল বুদ্ধিজীবীরা বুদ্ধি বা মেধা বেচেই খান। আর অর্গানিকরা সরাসরি শ্রেণি, উদ্যোগ এবং এককথায় বলতে গেলে উৎপাদন ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। অর্গানিক বুদ্ধিজীবীরা সবসময় সক্রিয় থাকেন। তবে বিশেষ বিশেষ মহলের উদ্দেশ্য রক্ষা করেন। জুলিয়ান বেন্দা দ্য ট্রিজন অব দ্য ইন্টেলেকচুয়ালস বইতে বলছেন, সত্যিকার বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা হবে অনেকটা যাজকদের মতো, কারণ বুদ্ধিজীবী শ্রেণি যা ধারণ করেন তা হলো চিরন্তন সত্য এবং চিরন্তন ন্যায়বিচার- যা এই পার্থিব পৃথিবীর নয়। এগুলো আজ আলাপের  বিষয় না। বিষয় হলো, মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পর আমরা বুদ্ধিজীবী হিসেবে সামনে কাদের মুখ দেখছি সেটি আলোচনা করা। আমাদের ৫০ বছরে জাতীয় অর্জন, সম্ভাবনা ও সংকটে বুদ্ধিজীবীরা কিরকম দায়িত্ব পালন করেছেন এর একটি  ছোট চিত্র খোঁজা। এ জন্য বুদ্ধিজীবী সম্পর্কে কতোগুলো ধারণা বিষয়ে ক্লিয়ার থাকা। ব্রাকেটে বলি গ্রামসির কথা ধার করে , এক অর্থে সব মানুষ মাত্রই বুদ্ধিজীবী।

দেশ স্বাধীনের পর  সব সরকারের আমলেই  শহীদ বুদ্ধিজীবীদের  তালিকা প্রণয়ন ও কাজ নিয়ে একটা আলস্য দেখা গেছে। সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০২০ সালের ১৩ই ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের একটি প্রাথমিক তালিকা চূড়ান্ত করেছে। এতে ১২২২ জন শহিদ বুদ্ধিজীবীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অতীতে  প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করা হলেও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রাষ্ট্রীয় কোনো তালিকা এখনও নেই। মজার ব্যাপার আবার তালিকা নির্ধারণের জন্য শহীদ বুদ্ধিজীবীর পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞাও নেই। অথচ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা তৈরির কাজ প্রথমে ১৯৭২ সালে শুরু হলেও, সে তালিকা কখনো সরকারি নথি বা গেজেটভুক্ত হয়নি। এখন যে ১২২২ জনের প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, সেটি গেজেটভুক্ত করা হবে। চলতি বছরের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বলেছেন আগামী বছরের ২৬ মার্চের আগে এটি সম্পন্ন হবে। এরমানে ৫১ বছর শেষ হয় কি না সেটি এবার দেখার বিষয়।

বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনার কথা  পাকিস্তানী লেখক সেলিম মনসুর খালিদের  উর্দু গ্রন্থ ‘আলবদর ’প্রকাশিত হওয়ার পর জানা যায় যে আলবদররা এক্ষেত্রে সহায়তাকারী ছিল। বইটি বেরোয় লাহোর থেকে জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলে, ১৯৮৫ সালে। এ বইতে জানা যায়, বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাদেরই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল যাদের তারা মনে করেছিল ইসলামের শত্রু।  এর কারণ, পাকিস্তান হয়েছিল দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে।  কিন্তু ৫২তে ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানীদের ভাবিয়ে তোলে। কারণ, পাকিস্তানি জাতিসত্তা তথা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা মুছে ফেলতে চাইছিল ভাষা-সংস্কৃতি-ইতিহাস-ঐতিহ্যভিত্তিক সত্তা।

একটা ঘটনা বলি, ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশন চলছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকার জো টি নেই।’

সভায় উপস্থিত অবাঙালি শিক্ষাসচিব ফজলে আহমেদ সেদিন রেগে গিয়ে বলেন,   ‘আজ এখানে যেসব প্রবন্ধ পড়া হলো, সেগুলো শোনার পর আমি ভাবছি, আমি কি ঢাকায় আছি না কলকাতায়।’

মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী লিখেছেন তার অটোবায়োগ্রাফিতে লিখেছেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ ছিল যে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাতে ২০০ বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যবস্থা আমি করেছি। আগের সন্ধ্যায় ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠিত হয় এবং ভারতীয়রা ঢাকা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। সত্য ঘটনা হচ্ছে, ১৭ ডিসেম্বর সকালে অনেক মৃতদেহ পাওয়া যায়। এর আগে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে, তাই এই হত্যাকাণ্ড নিশ্চয় তারা ছাড়া অন্য কেউ করেছে।’ তবে এটি যে মিথ্যা এটি আবার তিনিই স্বীকার করছেন । লিখছেন,  ‘১০ ডিসেম্বর সূর্যাস্তের সময় ঢাকার কমান্ডার মেজর জেনারেল জামশেদ আমাকে পিলখানায় তাঁর দপ্তরে আসতে বলেন। তাঁর কম্যান্ড পোস্টের কাছাকাছি এসে আমি অনেকগুলো গাড়ি দেখতে পাই। বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে এসে তিনি আমাকে গাড়িতে উঠতে বলেন, কয়েক মিনিট পর আমি জানতে চাই, এই গাড়িগুলো কেন আনা হয়েছে? তিনি বললেন, “নিয়াজির সঙ্গে সেটা নিয়েই কথা বলতে চাই।” ক্যান্টনমেন্টের হেডকোয়ার্টারের দিকে যেতে যেতে তিনি জানালেন, বিপুলসংখ্যক বুদ্ধিজীবী ও অগ্রণী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করার আদেশ তিনি পেয়েছেন। আমি তাঁকে বলি, কেন, কী কারণে? গ্রেপ্তার করার সময় তো এটা নয়।’ মানে সোজা কথা রাও ফরমান আলী নিজের দোষ আড়াল করতে চাইলেও মুল ঘটনা আড়াল করতে পারেননি।

ভারতের ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার ‘রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র বিরোধী বুদ্ধিজীবী’ ( বাংলা অনুবাদ, এক্ষণ প্রকাশনী) বইতে বলছেন,  পাকিস্তানি ফ্যাসিস্ট বুঝেছিল যে বাংলার বুদ্ধিজীবীরা জীবিত থাকলে একটা সেক্যুলার রাষ্ট্রের দিকে যাবে।  তাই তারা প্রথম হামলা চালায়  বুদ্ধিজীবীদের ওপর। শেষ হামলা চালায় বুদ্ধিজীবীদের ওপর। একটা জাতিকে সাংস্কৃতিকভাবে পঙ্গু করাই এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল। দ্বিজাতি তত্ত্ব হেরেছিল ভাষা আন্দোলনের কাছে। আর  রিলিজিয়ন বেইসড রাষ্ট্র হেরেছিল ৭২ এর সংবিধানের কাছে। বাংলাদেশে বেঙ্গলস ইন্টেলেকচুয়াল ( যারা উর্দুভাষী এলিট  শিক্ষিত মুসলিম) রা বাংলা চাননি। চেয়েছিলেন বাঙালি ( বাংলাভাষী তুলনামুলক পিছিয়ে পড়া ইন্টেলেকচুয়াল) বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশ। আবার দেখা যায়,  যাদের বামপন্থী বুদ্ধিজীবীর একাংশ  আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কম্যুনিস্ট চীনের ভূমিকার জন্য ১৯৭১ সালে এই যুদ্ধে দুরে ছিলেন। কারণ ওই যে  ১৯৭১ সালে পাক-চীন-মার্কিন সখ্যতা।আবার একদল বুদ্ধিজীবী দুর্গম পথ অতিক্রম করে মুজিবনগরে গিয়েছিলেন, তারা প্রবাসী সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন। অন্যদিকে  আরেকটি শ্রেনী সরকারি চাকরি করেছেন যদিও গোপনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ছিলেন  ফলে সেসময়ে বিভিন্নধরণের বুদ্ধিজিীবীতা দেখা যায়। ওই যে শ্রেনীচরিত্র ও রাজনৈতিক অবস্থানের ওপরে বুদ্ধিজীবীতা যায় না এর প্রমাণ তখনও মিলেছে। অমলেন্দু দে’র একটি বই পড়লাম সম্প্রতি। নাম, বাঙালী বুদ্ধিজীবি ও বিচ্ছিন্নতাবাদ। বইতে তিনি বলছেন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থার পরই বুকাননের রিপোর্ট অনুযায়ী ১৮০৬ ও ১৮০৭ সালের মধ্যে যে মধ্যস্বত্তভোগী শ্রেনীর আবির্ভাব ঘটে সেসময় থেকেই বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা কৃষকের জন্য ভুমি ব্যবস্থার ব্যাপারে বড়ো কোন প্রতিবাদ করেনি। কারণ তখন হিন্দুদের দখলে ছিল ভুমি বেশি। তাই হিন্দু সম্প্রদায়ের বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন চুপ।

এরই যেন প্রতিশোধ নিতে চেয়েছেন বেঙ্গলস বুদ্ধিজীবীরা ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বুদ্ধিজীবীদের একাংশ যারা পাকিস্তানপন্থী ছিলেন। বিচ্ছিন্নতাবাদের শুরুটা আঠারো শতকেই। মানে এই বিচ্ছিন্নতাবাদে রাজনীতি ও ধর্মের ব্যবহার কাজ করেছে।

তবে মুক্তিযুদ্ধের আগেই প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সচেতনতা ও বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ যতো বৃদ্ধি পাচ্ছিল ততোই পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে ততো বেশি চেষ্টা করা হয়েছে তাদের প্রলুব্ধ করার। বুদ্ধিজীবীদের পেছনে আর্থিক বরাদ্দ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, তাদের জন্য সংগঠন প্রতিষ্ঠান গড়া হয়েছে, পুরস্কার পারিতোষিকের সুবন্দোবস্ত করা হয়েছিল। অনেকে সেইসব প্রলোভনে পা দিয়েছেন অনেকে দেননি। যারা দেননি তারাই মুলত উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’ প্রবন্ধে বলছেন, একসময় ধর্ম ছিল ঐক্যের বন্ধন, এখন সেখানে এলো ভাষা। একুশে ফেব্রুয়ারির পর বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী যখন দেশের কথা বলছেন, ‘ তখন অধিকাংশ সময় তাঁরা আসলে বাংলাদেশের কথাই বলেছেন, পাকিস্তানের কথা নয়। দেশপ্রেম তাঁদের দেশদ্রোহী করেছে- এক অর্থে। বায়ান্নর পর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি মমতার ক্ষেত্রে, চর্চার ক্ষেত্রে বান ডেকে জোয়ার এসেছে। রচনার উৎকর্ষতাও বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক পরিমাণে। এর ফলে শুধু যে ভাষা ও সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে তা নয়, মানুষের মধ্যে ঐক্যের বোধ বেড়েছে, বেড়েছে সচেতনতা, বেড়েছে সুন্দরতর জীবনের প্রতি আকর্ষণ। বাইরে যাই বলুক, পাকিস্তানের শাসকরা একুশে ফেব্রুয়ারি শেষ পর্যন্ত চিনতে পেরেছিল, তাই গণহত্যা শুরু করেই তারা ছুটে গিয়েছিল শহীদ মিনারের দিকে, মিনারকে ভেঙে দিয়ে আক্রোশ মিটিয়েছিল তারা। আর মিনারের জায়গায় মসজিদ তৈরি করে তারা তাদের পুরাতন কৌশল নতুন করে প্রকাশ করেছিল : কৌশলটা হলো ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে বিক্ষোভকে স্তিমিত করা ‘

আমি যতীন সরকারের কাছে কয়েকবছর আগে জানতে চেয়েছিলাম, এখন আমাদের দেশে গণবুদ্ধিজীবী কারা? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, তার জানা নেই। কারণ বুদ্ধিজীবীরাও এখন পার্টিজান। বিভিন্ন ফোরামে বিভক্ত।দলভিত্তিক বুদ্ধিজীবী থাকলেও জনমুখী বুদ্ধিজীবী নেই। আরেকটি কারণ এখন সব দলই রাজনীতির জন্য ক্ষমতার জন্য রিলিজিয়নকে ব্যবহার করে। ফলত, বুদ্ধিজীবীরাও  সুবিধা বোঝে সরব নীরব থাকেন। এজন্যই বুদ্ধিজীবী ‘গালি’তেও রুপান্তরিত হয়েছে।

আহমদ ছফা তার ‘বুদ্ধি বৃত্তির নতুন বিন্যাস’ বইতে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের সুবিধাবাদিতা নিয়ে আলোচনা করে বলেছিলেন,‘বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন, তা শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না ।’ তিনি তখনই বলেছিলেন ‘ এখন যা বলছেন সেটা শুনলে বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটবে না৷’

ছফা মনে করতেন বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের বেশিরভাগই সুবিধাবাদি৷ মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে তারা নিজেদের জ্ঞান বুদ্ধি ব্যয় করতে আগ্রহী নন৷ অথচ এডওয়ার্ড সাঈদ থেকে শুরু করে নোয়াম চমস্কি মনে করেন বুদ্ধিজীবী এমন একজন ব্যক্তি যিনি স্বাধীনতা ও ন্যায় বিচারের পক্ষে একটি নির্দিষ্ট বার্তা। সত্য প্রকাশে ভয়হীন। বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্র ও সরকারের মিথ্যাগুলোকে জনগণের সামনে উন্মোচন করা৷ কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য বুদ্ধিজীবীরা এখন কি সবকিছু বলতে পারছেন ? এদেশে স্বাধীন মতপ্রকাশ করতে পারছেন? কারণ ডিজিটাল আইনসহ বেশ কিছু নিয়ন্ত্রিত বিধিব্যবস্থাগত চাপের কারণে অনেকেই কথা বলতেও কৌশলী। নোয়াম চমস্কি  ২০১৭ সালে লেখা Requiem for the American Dream: The Principles of Concentrated Wealth and Power জানাচ্ছেন বিভিন্ন দেশেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কর্পোরেশন হয়ে পড়ছে। গবেষণার জন্যও যে ফান্ডিং করা হয় সেসব প্রতিষ্ঠানও সরকার বা পশ্চিমাশক্তির মদদপুষ্ট। ফলে ভিন্নচিন্তা-বিচিন্তা-প্রতিচিন্তার বুদ্ধিজীবীদের সীমাহীন ভয় কী বললে কী যে পরিণতি হয় না হয়!ক্রেইগ ম্যুর ও একই আশংকা করেছেন। আর স্লাভায় জিজেক তো রসিকতা করে বলেছেন, বুদ্ধিজীবী জন্মানোর সুযোগ না দিলে বুদ্ধিজীবী জন্মাবে না , হত্যা করারও দরকার পড়বে না।

এখন বুদ্ধিজীবীদের কেউ ইস্যুভিত্তিক মুভমেন্টের পক্ষে। কেউ নির্বিশেষ মুভমেন্টের পক্ষে। ক্ষমতার চর্চাকারীরাও বর্গীকরণের ফাঁদ হাজির করে রাখছেন। ফলে দেশ কোন পথে এগুবে এ ব্যাপারে গণবুদ্ধিজীবীরা এখন মাঠে থাকলেও কিছুটা অসহায়। বাজার রমরমা একাডেমিশিয়ান , ট্রাডিশনাল, অর্গানিকদের। প্রতিটি সরকারেরই বোঝা উচিত স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা। গ্রহণ করা না করা সেটা সরকারের ব্যাপার। কিন্তু বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত করলে অন্তত সরকারের বুঝতে সুবিধা হবে  কে কি বলছে, কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক। কোনপথে দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা পাবে। একটা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে জাতিকে সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ করেন গণবুদ্ধিজীবীরাই। অন্যরা নন। বিদ্যাসাগররা তো ননই। সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুরাদও বিদ্যাসাগরই ছিলেন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

‘রাতের ভোট’: আত্মসমালোচনা ইসির



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা আছে। ওই ভোট দিনের বেলার পাশাপাশি রাতেও হয়েছে বলে সরকারবিরোধী অংশের জোর প্রচার। বর্তমান সরকারকে ‘রাতের ভোটের অবৈধ সরকার’ বলে অভিযুক্ত করে আসছে বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলো। আওয়ামী লীগ বরাবরের মতো সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জনগণ তাদের সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে ফের ক্ষমতায় এনেছে এমনই দাবি তাদের। আওয়ামী লীগের দাবি বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে দেশবাসী প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে বিপুল বিজয় উপহার দিয়েছে।

ভোট নিয়ে নানা অভিযোগ মাথায় নিয়েই বিদায় নিয়েছে সাবেক ইসি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নুরুল হুদা বারবার রাতের বেলায় ভোটের অভিযোগ অস্বীকার করলেও আবার আকারে ইঙ্গিতে সেটা কবুলও করেছেন একাধিকবার। তবে এনিয়ে তার মধ্যে অনুশোচনা লক্ষ্য করা যায়নি, বরং নিজেকে সফল দাবিও করে গেছেন শেষ পর্যন্ত। যদিও তার নেতৃত্বাধীন কমিশনের অন্য কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন একাধিকবার এবং সিইসির সঙ্গে তার বিরোধ ছিল প্রকাশ্য। সিইসির সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধের কারণে হোক আবার অনুশোচনার কারণেই হোক ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে তিনি তার খেদের কথা বারবার বলেছেন। নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতার কথা বললেও ব্যর্থতা স্বীকার করে পদত্যাগ করার সাহস দেখাতে পারেননি। তিনিও অন্যদের মতো সাংবিধানিক সকল সুযোগসুবিধা গ্রহণ করে মেয়াদ পূরণ করেই বিদায় নিয়েছেন।

আগের নির্বাচন কমিশন (ইসি) ‘রাতের ভোট’ নিয়ে নানা কথা বলেছে, বর্তমান ইসিও। মঙ্গলবার (২৪ মে) রাজধানীর নির্বাচন ভবনে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, নির্বাচনকে প্রহসনে রূপান্তর করার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই। এটা আমরা অন্তর থেকে বলছি। সুন্দর নির্বাচন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সুস্থ ধারা অব্যাহত থাকুক। ভোট নিয়মানুযায়ী হবে, দিনের ভোট দিনেই হবে। ভোট রাতে হবে না—এটা স্পষ্ট করে বলতে চাই। সিইসির এই বক্তব্য চলমান নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের নানা আলোচনার বিপরীতে আস্থা ফেরানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে চাই।

আগের ভোট রাতে হয়েছে কি-না এনিয়ে প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি, কোন আদালতও এটা বলেনি। বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোসহ দেশের অনেকের ধারণা এমনই। এই ধারণার বাইরে যেতে পারেনি সাবেক ও বর্তমান নির্বাচন কমিশন। ভোট রাতে কি দিনে হয়েছে এটা এখন পর্যন্ত অমীমাংসিত বিষয়, এনিয়ে নির্বাচন কমিশন যখন কথা বলে তখন মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগে। তবে সন্দেহ ও অনাস্থা থেকে আস্থা ফেরানোর যে পদক্ষেপ সেটা বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিচ্ছে বলে ধারণা করা যায় ইঙ্গিতবহ স্বীকারোক্তি কিংবা আত্মসমালোচনা থেকে। এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে বরং আগ্রহী।

বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যর্থতা একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের অভিযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারেনি। গত নির্বাচনে বিপুল পরাজয়ের পর তারা সেই নির্বাচন নিয়ে কোন কাজ করেছে বলে দৃশ্যমান হয়নি। নির্বাচনের ফলাফলের বিপর্যয় কী কারণে ঘটল তা নিয়ে কিছু মেঠো-বক্তৃতা দেওয়া ছাড়া আর কোন কাজ করেনি তারা। নির্বাচনের পর আসনভিত্তিক ফলাফল নিয়ে আগের নির্বাচনগুলোর সঙ্গে সবশেষ নির্বাচনের ভোটের সংখ্যা নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে সেগুলো দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করলে ওখান থেকে তারা অনেক কিছু পেতে পারত। এর মাধ্যমে তারা নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণা করাতে পারত না ঠিক তবে মানুষের কাছাকাছি যেতে পারত। লড়াইটা হতে পারত বুদ্ধিবৃত্তিক, কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে শক্তিহীন বিএনপি যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রেও শক্তিহীন একটা দল সেটাই প্রমাণ করেছে তারা।

বিএনপির এই ব্যর্থতা রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক। এর সুযোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তারপরেও ‘রাতের ভোট’ নিয়ে আলোচনা আছে। সরকার দল আওয়ামী লীগ যতই এটা অস্বীকার করুক না কেন মানুষের মনে বিভ্রান্তি আছে, নানা মত আছে ইসিতেও। নির্বাচন কমিশন এনিয়ে কথা বলার মধ্যে আত্মসমালোচনার যে পথ দেখাচ্ছে এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। আগের ‘ভুল’ শুধরে নিয়মানুযায়ী ভোটগ্রহণের যে প্রত্যয় বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মধ্যে দেখা যাচ্ছে এটা দেখে আশাবাদী হতে পারে দেশের মানুষ, আশাবাদী হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো; নির্বাচন হতে পারে অংশগ্রহণমূলক। বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে অস্বীকার তত্ত্ব এই নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে আমাদের।

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি-না এনিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে, কারণ বর্তমান সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা আছে বিএনপির। আবার বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে না আওয়ামী লীগ সরকার। আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক কিংবা জাতীয় সরকারের দাবি আদায়ের মাঠের শক্তিও নেই বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোর। ফলে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের চ্যালেঞ্জ আছে নির্বাচন কমিশনের। তারা পারবে কি-না এটা সময়ই বলে দেবে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের যে অবস্থান তাতে অন্তত আশাবাদী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।

নিয়মানুযায়ী দিনের ভোট, অনিয়মের রাতের ভোট—এ আলোচনা চলতেই থাকবে। তবু মানুষকে আস্থা রাখতে হবে নির্বাচন কমিশনের ওপর। বর্তমান নির্বাচন কমিশন কতটুকু কী করতে পারবে এনিয়ে এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছার সময় হয়নি দেশবাসীর। তারা মানুষের আস্থা ফেরাতে কাজ করছে, আপাতত এটাই স্বস্তির। কাজের আগে কাজ নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়, তাদেরকে সমর্থনের পাশাপাশি দিতে হবে প্রয়োজনীয় সময়। দেশবাসীর সমর্থন পেলে তারা তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারবে বলে বিশ্বাস রাখতে চাই।

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

রবীন্দ্রনাথ কোনদিন আমাকে কল করেননি!



ডা. রাজীব দে সরকার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘুম ভাঙলো একা একাই।

একটু ঘেমে গিয়েছি।

চোখ খুলে একবার মনে হলো, নিজের ঘরটাকেও চিনতে পারছি না।

মোবাইলটা বাজছে। সম্ভবত: এ কারনেই ঘুম ভেঙেছে।

- হ্যালো, কে? (ঘুম এখনো কাটেনি আমার কন্ঠে)

- আমি শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জোড়াসাঁকোর। তুমি এক সময় আমার কবিতা পড়েছো।

- ও, কি চাই? আমি ভ্যাকসিন সংক্রান্ত কাজে জড়িত নই।

- আমার ভ্যাকসিন লাগবে না, বাবা।

("বাবা" বলায় একটু ঘুম কাটিয়ে কথা বলা চেষ্টা করলাম। কারন রোগীদেরকে 'বাবা' বলে সম্বোধন করতেন আমার সার্জারীর গুরু)

- ও, কেন ফোন দিয়েছেন, কেউ কি অসুস্থ?

- হ্যাঁ অসুস্থ। সেটা বলতেই ফোন দেওয়া।

- জ্বী, বলুন। আমি শুনছি।

- বৈদ্য রাজীব, তোমার সমাজের একদল পুরুষ খুব অসুস্থ।

- আচ্ছা কাল হসপিটালে পাঠিয়ে দেবেন, দেখে দেবো।

- পারবে তো দেখে দিতে? আচ্ছা, একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো। তোমরা কবিতা পড়া ছেড়ে দিলে কেন?

- কবিতা পড়া ছাড়িনি তো।

- মিথ্যা কথা। তোমরা এখন কবিতা পড়ো না। আগের পড়া কবিতাগুলো কোটেশন অভ্র দিয়ে লিখে ফেইসবুকে পোস্ট করো। শেয়ার করো। ব্লগে লেখো। কিন্তু কবিতা আর পড়ো না।

- ও, তাহলে বোধহয় ভালো লাগে না। আপনি লেখেন এখনো?

- না। লেখার প্রয়োজন পড়ে না। কবিতা-গল্প কিছুই লিখি না

- কেন?

- তোমাদের সমাজে নিরুপমা, কেটি, বিনোদিনী, গোড়া কিংবা হৈমন্তী এরা আজো কেউ ভালো নেই। অপু সেদিনও ওরা বাবার করা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে নি, আজো একজন মেয়ে লাঞ্ছিত হলে তোমরা প্রতিবাদ করো না। তোমাদের চোখের সামনে জলজ্যান্ত মেয়েদের সম্ভ্রমহানি হয়। তোমরা প্রতিবাদ করো না।

- নাহ। প্রতিবাদ তো করি।

- দৌড়ে গিয়ে ফেইসবুকে বসে টিপাটিপি শুরু করলে তাকে কি প্রতিবাদ বলে? প্রোফাইল পিকচার টা কালো রঙের করে দিলেই বুঝি প্রতিবাদ হয়? গান্ধী - মুজিবরা এই শিখিয়েছিলো তোমাদের?

- না, আমরা বীরের জাতি, আমরা অন্যায় সহ্য করি না।

- এজন্যই আমি গল্প-কবিতা লেখা ছেড়েছি।

- মানে?

- নিজেকে বীরের জাতি ভেবেই লেখালেখি করতাম। কিন্তু তোমাদের নির্বুদ্ধিতায় আমারই লেখা নারী চরিত্ররা আমাকে অপমান করে। আমারই লেখা ধর্মান্ধ চরিত্র গুলো আমাকে দেখে হাসে।

- পহেলা বৈশাখের কথা বলছেন? নাকি বাউলের চুল কেটে দেওয়া? নাকি মৌলবাদীদের ফতোয়া? আমি বুঝতে পারছি না।

- কুষ্টিয়ায় ছিলাম কিছুদিন। বাংলাদেশ গেছি বহুবার। এমন বাংলাদেশ আমরা রেখে আসিনি। হানাদার নেই যে দেশে, সে দেশে আমাদের কন্যাদের ধর্ষণ করে কারা? কেন আজো আমার দেশের বাতাস একজন অত্যাচারিত মেয়ের চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে, বলতে পারো?

- আপনি রাজনৈতিক কথা বলছেন।

- "মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে... পার হয়ে আসিলাম... আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়; রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়, আমার পুরানো নাম, ..ফিরিবার পথ নাহি"

- থামেন, মাঝরাতে কবিতা ভালো লাগছে না

- থামলাম, কিন্তু মানুষের চিকিৎসার পাশাপাশি সমাজের চিকিতসা শুরু করো বৈদ্য।

- সে দায় কি আমার একার নাকি?

- দায় আমাদের সবার। হৈমন্তীর গা থেকে কাপড় খুলে নেওয়া হলে, ওর আগে তোমার সমাজ ল্যাংটা হবে, তুমি ল্যাংটা হবে - সাদা পাঞ্জাবী পড়ে শরীরের কালো লুকানো যায়, মনের কালি না। তাই সমাজের চিকিৎসা করার দায় বৈদ্য-বণিক-শিক্ষক-ছাত্র-সাহিত্যিক-ব্লগার সবার!

- কি করবো?

- তোমার যতোটুকু করার আছে।

- যদি আমার ক্ষতি হয়?

- তোমার ঘরের সামনে তোমারই প্রেয়সীর কাপড় ধরে টানা হলো। এর থেকে আর কি ক্ষতিই বা হতে পারে। এটা তো ১৯৭১ না। নাকি তোমরা মনে করো, মরে যাওয়া পাকিস্তানি হানাদার গুলো, তোমাদের শরীরে আবার জন্ম নিয়েছে?

- ছিঃ ছিঃ এসব কি বলেন?

- আমার লেখা গানটাকে এবার ছেড়ে দাও। ওটা নিয়েও তোমাদের জাতের রশি ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এক মালাউন কবির গান দিয়ে কেন তোমরা দেশের সব শুভ কাজ শুরু করবে?

- আমার ঘুম পাচ্ছে, কাল সকালে হসপিটালে যাবো

- বেশ, বাঙ্গালী। জাতি হিসেবে তুমি ঘুমিয়ে যাও। ঘুমিয়ে থাকো। ঠিক যেমন করে আমার নোবেলটি চুরি গেলো, তোমার-তোমাদের প্রতিবাদ করার শক্তিটুকুও নিঃশব্দে চুরি গেছে তা তোমরা জানো না।

- আচ্ছা আপনি আমাকে এসব বলছেন কেন, হ্যালো... ... শুনছেন...

- টু... টু... ... টুট...টু

আমি ঘুমিয়ে গেলাম, অনেক গভীর সে ঘুম...

আমার সামনে আমার সমাজের মেয়েরা আক্রান্ত হলেও ভাঙে না সেই ঘুম...

আমার সামনে রেল স্টেশনে কয়েকজন মিলে একজন নারীর কাপড় ধরে টানলেও ভাঙে না সেই ঘুম। যে দেশে হানাদার নেই, চরিত্রহীন জমিদার নেই, তারপরো মেয়েদের সম্ভ্রম হানি হলে ভাঙে না সেই ঘুম... সেই ঘুম পাচ্ছে আমার...

পুনশ্চ:

আজ নারী দিবস না। এটা নারী দিবসের লেখা না। যে দেশে বাঁধাহীন ভাবে পথে ঘাটে একজন নারী কিংবা একজন পুরুষের সম্মান ক্ষুন্ন হতে পারে, এটা সেই 'প্রতিবাদ করতে ভুলে যাওয়া' মানুষের দেশের জন্য লেখা। ভাগ্যিস আমরা সেই দেশে থাকি না!

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক, সার্জারী বিভাগ (৩৩ বিসিএস), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

;

'স্টকহোম সিনড্রোম' নাকি আবহমান প্রতিবাদহীন নারী নির্যাতন?



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৭৩ সালে সুইডেনে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিলো। সে বছর ২৩ শে আগস্টের সকালবেলা সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের স্পেরিকাস ক্রেডিট ব্যাংকে একটা ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময়ে ডাকাত দল অনেক জনকেই ব্যাংকের মধ্যে জিম্মী করে রাখেন এবং সেটা টানা ৬ দিন ধরে। তাদের মধ্যে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তো ছিলেনই।

ছয় দিন পর পুলিশ যখন ডাকাত দলের উপরে অ্যাকশনে যায়, তখন ব্যাংকে জিম্মী থাকা মানুষগুলো উলটো ডাকাতদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলো। এই ঘটনায় সবাই অবাক হয়ে পরেন।

যারা আটকে রাখলো, তাদের প্রতিই এই ভালোবাসা কিভাবে তৈরী হলো! এমনকি দেশের প্রেসিডেন্ট মহোদয় যখন অপহৃত ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, তখন ডাকাতদের প্রতি সহমর্মিতার ব্যাপারেও আবেদন জানিয়েছিলেন অপহৃত ব্যক্তিরা। এই ঘটনা তখন ঘটা করে রেডিওতে প্রচার পেয়েছিলো।

এই ঘটনা থেকেই "স্টকহোম সিনড্রোম" কথাটার জন্ম। আমাদের দেশেও এমন ঘটনা ঘটে।

দেখা যায়, একজন স্বামী তার স্ত্রীর উপর নির্যাতন করলেন, এমনকি নির্যাতনের এক পর্যায়ে হত্যা চেষ্টাও করলেন। পরবর্তীতে স্ত্রীর বাপ-ভাই যখন তার স্বামীর নামে মামলা করলো, স্ত্রী আদালতে গিয়ে স্বাক্ষ্য দিলেন যে, এই অত্যাচার তার স্বামী করেন নাই বা তার স্বামী একজন আপাদমস্তক ভালো মানুষ।

এটাকেও 'স্টকহোম সিনড্রোম' বলা যায়।

দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচারিত হতে হতে অত্যাচারকারীর প্রতি এক সময় একটি অসুস্থ আবেগ বা অস্বাভাবিক দুর্বলতার জন্ম হয়।

অত্যাচার সহ্য করে হলেও তাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না। এভাবেই একটি জনপদে শিশু নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতনগুলো আলো বা বিচারের মুখ দেখে না।

২০০২ সালে মাত্র স্টন হর্ণব্যাক নামের এক ব্যক্তিকে অপহরণ করা হয়। তাকে প্রায় ২ বছর পরে অপহরণকারীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে অত্যাচারের চিহ্ণ ছিলো। তদন্তে দেখা যায়, অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে পালানোর কোনো চেষ্টা করেনি। এমনকি স্টন হর্ণব্যাকের কাছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পর্যন্ত ছিলো!

২০২২ সালে একটি জেলার একটি লোকারণ্য রেলস্টেশনে একজন নারী অন্য একজন নারীর উপরে আক্রমনাত্নক হয়ে ওঠেন। প্রথন নারীর অভিযোগ এই যে, দ্বিতীয় নারী একটি স্লিভলেস পোশাক পরিধান করেছেন যা মোটেও সেই দেশে কোন ফৌজদারী বা দেওয়ানী অপরাধ না।

কিন্তু সারা জীবন একটি মহলের দ্বারা শাসিত ও পদদলিত হয়ে থাকতে থাকতে প্রথম নারী তার ব্যক্তিসত্ত্বাকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছেন। পোশাকের মতো একটি সাধারণ নাগরিক 'অধিকার' তার কাছে অনৈতিক, বেমানান ও অসামাজিক মনে হচ্ছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটি অসুস্থ অংশের এই নোংরা শোষণের প্রতি তার গভীর আবেগ ও ভালোবাসা তৈরী হয়েছে। তাই সেই দিন একজন নারী হয়েও অন্য একজন নারীকে আক্রমণ করতে, শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিত করতে এবং দ্বিতীয় নারীর গায়ের পোশাক টেনে ছিঁড়ে ফেলতেও তার খারাপ লাগছিলো না। অথচ 'স্বল্প' পোশাক পরিধান নিয়েই তার অভিযোগ ছিলো। কিন্তু তিনি নিজেই আবার অন্য নারীটির পোশাক ছিঁড়ে ফেলছেন নির্দ্বিধায়। আবার এই কাজে তিনি সেই সমাজের গুটিকয়েক পুরুষের সাহায্য নিচ্ছেন!

সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থা একদিনে তৈরী হয় না। মানসিক দৈন্যতার এই স্তরে যেতে কয়েক মাস, কয়েক বছর এমনকি কয়েক প্রজন্ম লেগে যেতে পারে।

অত্যাচারকারীর প্রতি এই স্নেহ বা আবেগ অনেক সময় বিপদজনক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এমনকি এ সময় কেউ উদ্ধারে এগিয়ে এলে তাকেও আক্রমণ করে বসতে পারেন স্টকহোম সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি। অবশ্য ক্রিমিনোলজিস্টরা অনেকে স্টকহোম সিনড্রোমে বিশ্বাস করে না।

যাই হোক, চোখের সামনে প্রতিনিয়ত একটি অন্যায় দেখছেন, অথচ সেই অন্যায়ে আপনি কোন বাঁধা দিচ্ছেন না। বরং সেই অন্যায় আপনার ভালো লাগছে, মজা লাগছে। সেই অন্যায়কে আপনি যত্নে এবং খুব গর্বে লালন করছেন, পৃষ্ঠপোষকতা করছেন -

এরকম উদাহরণ এই দেশে কি খুব বেশি অপ্রতুল?

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক, সার্জারী বিভাগ (৩৩ বিসিএস), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

;

জেট ফুয়েল প্রাইস, সরু আলোর পথটাকে রুদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনা মহামারির পর সরু আলোর পথ দেখা যাচ্ছিল এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম সেক্টরে। সেই পথকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলতে যারপর নাই চেষ্টা করে যাচ্ছে জেট ফুয়েল প্রাইস। জেট ফুয়েলের প্রাইস নির্ধারণ করে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন। কখনো লোকসানকে পুষিয়ে নিতে দাম বৃদ্ধি করে থাকে, কখনো যুদ্ধের ডামাডোলে রিনঝিন পায়ে নুপুরের ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে জেট ফুয়েলের প্রাইস বৃদ্ধি করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে বিপিসি নিয়ন্ত্রাধীণ পদ্মা অয়েল কোম্পানী।

বাংলাদেশ এভিয়েশনের যাত্রা শুরু থেকেই বন্ধুর পথে হাঁটা একটি সেক্টর। দেশের প্রায় ১৫ মিলিয়ন জনগন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে কিংবা কাজের প্রয়োজনে অথবা ভ্রমনের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করে থাকে আকাশ পথে। আর আকাশ পথে যাতায়াতের জন্য বৃহদাংশই বহন করছে বিদেশী বিমান সংস্থাগুলো।

নানা প্রতিবন্ধকতা আর সীমাবদ্ধতার কারনে জাতীয় বিমান সংস্থাসহ বেসরকারী বিমান সংস্থাসমূহ প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না। বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলোর সাথে সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া সরকারী বিভিন্ন সংস্থাগুলোর সহযোগিতা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। এর মাঝে অন্যতম হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিভিল এভিয়েশন অথরিটি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন প্রমুখ।

কোভিডকালীন সময়  ও কোভিড পরবর্তী গত আঠারো মাসে জেট ফুয়েলের মূল্য বেড়েছে ১৩০ শতাংশ। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ছিলো প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য ৪৬ টাকা অথচ গত আঠারো মাসে প্রায় ১৫ বার জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি করে বর্তমানে দাড়িয়েছে ১০৬ টাকা। যা বাংলাদেশের এভিয়েশনের ইতিহাসে জেট ফুয়েল প্রাইসের সর্বোচ্চ রেকর্ড। যে রেকর্ড একটি খাতকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্যই যথেষ্ট। যে রেকর্ড আকাশ পথের যাত্রীদের বিপর্যস্ত করে তুলে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত করে, সেই রেকর্ড কখনো প্রত্যাশিত নয়।

বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সকে প্রতিযোগিতা করতে হয় সকল বিদেশি এয়ারলাইন্স এর সাথে। জেট ফুয়েল প্রাইস সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ভাড়ার উপর। সেই ভাড়া বৃদ্ধির ফলে দেশীয় এয়ারলাইন্স চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দর সময়ে নব প্রতিষ্ঠিত তিনটি এয়ারলাইন্স- ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, এভিয়ানা এয়ারওয়েজ ও বেস্ট এয়ার, জেট ফুয়েলের উর্ধ্বগতির সাথে তাল না মিলিয়ে চলতে না পারার কারনে এভিয়ানা এয়ারওয়েজ, বেস্ট এয়ার বছর ঘোরার আগেই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলো। যার ফলে বাংলাদেশ এভিয়েশন ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছিলো সাথে বেসরকারী বিনিয়োগে নিরোৎসাহী হতে দেখা গিয়েছিলো এভিয়েশন খাতে।

কোভিডকালীন সময়ে এয়ারলাইন্সগুলো বিভিন্ন চার্জ বিশেষ করে এ্যারোনোটিক্যাল ও নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ মওকুফের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেছিলো এভিয়েশন সেক্টরটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলে সত্য চার্জ মওকুফের পরিবর্তে নতুন দু’টি চার্জ সংযুক্ত হতে দেখেছি- তা হচ্ছে বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি এবং নিরাপত্তা ফি। যা সরাসরি যাত্রীদের ভাড়ার উপর বর্তায়।

এই সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার কর্মীবাহিনী যুক্ত আছে। যাদের ভবিষ্যতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন না করে সেক্টরটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন পথ বের করে দেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে সহায়তা করুন। বর্তমানে জিডিপি’র ৩ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম সেক্টরের। সঠিক পরিচালনার মাধ্যমে এই সেক্টর থেকে ১০ শতাংশ অংশীদারিত্ব রাখা সম্ভব জিডিপি-তে।

সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা এভিয়েশন সেক্টরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে, সাথে ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি, হোটেল ইন্ডাস্ট্রিসহ সকল ইন্ডাস্ট্রিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সকল শিল্পের গতিশীলতা বজায় রাখতে হলে এভিয়েশনের গতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকলে সেই দিকে সচেতন হলে এভিয়েশন সেক্টর বেঁচে যাবে।

জেট ফুয়েল প্রাইস সহ বিভিন্ন চার্জ নির্ধারণের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে দেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির কথা বিবেচনায় রেখে দেশের নাগরিকদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন। তাহলে দেশের উন্নয়নমূখী একটি খাত নিশ্চিত ক্ষতি হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে।    

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;