নয়া মেরুকরণ: যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীন!



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নয়া মেরুকরণের পূর্বাভাস।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নয়া মেরুকরণের পূর্বাভাস।

  • Font increase
  • Font Decrease

মেরুকরণ একটি পরিচিত শব্দ এবং রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত। রাজনৈতিক মেরুকরণ বলতে বিভিন্ন গোষ্ঠী, ধর্ম, স্তরের লোকের এক এক রাজনৈতিক দলের দিকে ধাবিত হওয়াকে চিহ্নিত করা হয়। আর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের দিকে ঝুঁকে যাওয়াকে মেরুকরণ বলে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগে বিশ্ব রাজনীতি ছিল দ্বিমেরুতে বিভক্ত। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগী দেশগুলো এবং বিপরীত দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার পক্ষের দেশগুলো।

বিশ্বের সেই মেরুকরণ আমূল পরিবর্তন ঘটেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একক শক্তি রূপে আবির্ভূত হয়। সূচিত হয় এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা। কিন্তু তিরিশ বছর পর বিশ্ব এখন নতুন মেরুকরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। নতুন এই মেরুকরণের পেছনে প্রধান শক্তি হচ্ছে চীন, যদিও বিশ্বশক্তির শীর্ষ স্থান এখনও যুক্তরাষ্ট্রের দখলে।

সর্বশেষ এক সমীক্ষায় সিডনির বিশ্ববিখ্যাত লোই ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আর্থিক, রাজনৈতিক, সামাজিক প্রভাবের ক্ষেত্রে আমেরিকা এই প্যান্ডেমিক-উত্তর সময়ে পিছিয়ে দিয়েছে চীনকে। এক নম্বরে আছে আমেরিকা। প্যান্ডেমিকের সময় ভারত এবং চীন তাদের সার্বিক প্রভাব অনেকটা হারিয়েছে এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে।  দ্বিতীয় স্থানটি চীনের, তৃতীয় জাপান ও চতুর্থ স্থানে আছে ভারত।

১৯৪৯ সালে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশকারী নয়া চীন নতুন উৎপাদন ব্যবস্থার আলোকে পরিচালিত হয়ে বিগত ৭০ বছরে এগিয়েছে অনেক। প্রথম ৪০ বছর তেমন কোনো সফলতা দেখাতে না পারলেও নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে চীন ক্রমান্বয়ে বিশ্ববাণিজ্যে প্রবেশ করতে থাকে। অবশেষে চীন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মার্কিন অর্থনীতির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেকে দাঁড় করিয়েছে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিশ্বের সকল পণ্য উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে চীন। বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের এই অবস্থান সদ্য সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মেনে নিতে পারেনি। নিজ দেশে জাতীয়তাবাদী ধারণা উসকে দিয়ে চীনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বাণিজ্য অবরোধ আরোপ শুরু করেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে শুরু হয় বৈশ্বিক মহামারি। কিন্তু চরম করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির মধ্যেও সাম্প্রতিক সময়ের বেশকিছু ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নয়া মেরুকরণের বিষয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য জি-৭, ন্যাটো সম্মেলন এবং গণতন্ত্র সন্মেলন।

বিগত জি-৭, ন্যাটো সম্মেলন ছিল অন্যান্য বারের চেয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্যের। কারণ দুই সম্মেলনেই গুরুত্ব পেয়েছে চীন। বিশ্বে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় জি-৭ বৈঠকে ‘বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড (বিথ্রিডব্লিউ)’ নামক একটি উদ্যোগ প্রস্তাব করেন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এর মাধ্যমে স্বল্প আয়ের দেশগুলোকে অবকাঠামো খাতে ঋণ সহায়তা দেওয়া হবে, যেটি স্পষ্টতই চীনের ‘ওয়ান বেল্ড ওয়ান রুট’ প্রকল্পের পাল্টা প্রকল্প। অন্যদিকে সামরিক হুমকির কথা উল্লেখ করে চীনকে ‘সিস্টেমেটিক চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো। স্পষ্টতই জি-৭ ও ন্যাটোর এমন অবস্থান চীনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনায় নিয়েই গৃহীত হয়েছে।

প্রসঙ্গত, এই দুই জোটের পদক্ষেপ, নীতি-কৌশলের মূলে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক তথা ইন্দো-প্যাসিফিক নীতি। আর এই নীতির অধীনেই ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি চার দেশের জোট গঠন করেছে, যাকে সংক্ষেপে বলা হচ্ছে ‘কোয়াড’। আফগানিস্তান থেকে সৈন্য সরিয়ে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া-প্যাসিফিকে চীনের আরও কাছাকাছি নিজেকে সুসংহত করছে। কারণ, দক্ষিণ এশিয়াসহ সারা বিশ্বেই চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব মোকাবিলা করা ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির লক্ষ্য, যা বাস্তবায়নে কাজ করছে ‘কোয়াড’ও। ফলে দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে এক ধরনের ঠান্ডা লড়াই বা মেরুকরণ ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ নীতির এজেন্ডায় ইন্দো-প্যাসিফিক ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার বিষয়টিও সুস্পষ্ট।  কারণ, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় ইন্দো-প্যাসিফিক নীতি বাস্তবায়নে ধীরগতি ছিল। ট্রাম্পের আমলে যার শুরু হয় ন্যাটোকে কেন্দ্র করে। ন্যাটো জোটভুক্ত ৩০টি দেশের চেয়ে বেশি ব্যয় করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তাই ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে ন্যাটোতে এককভাবে বেশি অর্থ ব্যয়ের বিপক্ষে অবস্থান নেন এবং মিত্র দেশগুলোকেও অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান। এতে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিসহ সবার সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের মতোবিরোধ দেখা দেয়। এরই প্রভাব পড়ে ইন্দো-প্যাসিফিক নীতিতে।

কিন্তু জো বাইডেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই মিত্র দেশগুলোর মধ্যকার টানাপোড়ন দূর করে একত্রিতভাবে চীনকে মোকাবিলা করার কৌশল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। চীনকে মোকাবিলা করতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পার্টনারশিপ বাড়ানোর পথে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ,  করোনা মহামারি ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে আবর্তিত ইউরোপ ন্যাটোকে শক্তিশালী করার বিষয়ে উৎসাহী নয়। তদুপরি, চীনের সঙ্গে সরাসরি ন্যাটোর মোকাবিলার বিষয়টি যতটা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের, ততটা ইউরোপের নয়। সেক্ষেত্রে ইন্দো-প্যাসিফিকে পার্টনারশিপ মার্কিনিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বাইডেন কোয়াডের মাধ্যমে ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে জোট করার চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে, জি-৭-এর সাতটি দেশের মধ্যে সবগুলোই পশ্চিমা। একমাত্র ব্যতিক্রম ও এশিয়ান দেশ জাপান। এই সাতটি দেশ মিলে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এক হয়ে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সর্বশেষ যে উদ্যোগটি সামনে এসেছে, তা হলো গত ৯ ও ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে 'দ্য সামিট ফর ডেমোক্রেসি' বা 'গণতন্ত্র সম্মেলন', যাতে আমন্ত্রণ জানানো হয় বিশ্বের ১১০ দেশকে। বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিবাচক কর্মসূচি হাতে নেয়া এবং যে সকল স্থানে গণতন্ত্র হুমকির মুখে রয়েছে সেগুলো মোকাবিলার জন্য সম্মিলিত পদক্ষেপ নেয়াই ছিল এই সম্মেলনের লক্ষ্য।

ভার্চ্যুয়াল প্লাটফরমে সম্মেলন উদ্বোধনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বিশ্বের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে লড়াইয়ের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, 'গণতন্ত্র হঠাৎ করে আসেনি। দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের ফসল গণতন্ত্র।' উল্লেখ্য, প্রথমবারের মতো আয়োজিত এতো বড় আকারের  সন্মেলনে বিশ্বের ১১০ দেশকে আমন্ত্রণ জানালেও রাশিয়া ও চীনের কাউকে এ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র। এর পাল্টা হিসাবে চীনও একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। সেখানে বিশ্বের ১২০টি দেশ থেকে গবেষক, অধ্যাপকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট বাইডেনের 'গণতন্ত্র সন্মেলন'-এ যে দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে দুর্বল গণতন্ত্র, এমনকি কিছু কর্তৃত্ববাদী চরিত্রের দেশও। চীনকে আমন্ত্রণ না জানালেও বাইডেন প্রশাসন এ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তাইওয়ানকে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া ভাষায় নিন্দা জানিয়েছে চীন। এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বিশ্বকে বিভক্ত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ বেইজিংয়ের। এই সম্মেলনে আমন্ত্রণ পেয়েছেন ব্রাজিলের কঠিন ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো। আবার ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্র তুরস্ককে উপেক্ষা করা হয়েছে। 

'ফ্রিডম হাউজ ডেমোক্রেসি'র মতে আমন্ত্রিত ১১০ দেশের মধ্যে ৭৭ দেশ মুক্ত বা সম্পূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক। তবে এরমধ্যে ৩১টি দেশ আংশিকভাবে মুক্ত এবং তিনটি দেশ একেবারেই মুক্ত নয়। আমন্ত্রিতদের মধ্যে ইরাক, অ্যাঙ্গোলা এবং ডিআর কঙ্গো মুক্ত গণতন্ত্রের দেশ নয়। পাকিস্তানের স্কোর ৩৭ হলেও আমন্ত্রণ করা হয়েছে, কিন্তু শ্রীলঙ্কার স্কোর ৫৬ হওয়ার পরও আমন্ত্রণ পায়নি। যদিও এই শীর্ষ সম্মেলন এড়িয়ে গেছে পাকিস্তান।

গণতন্ত্র সম্মেলন বিশ্বের জন্য তো বটেই, খোদ আমেরিকার জন্য নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত সদ্য-বিগত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একগুঁয়েমির নীতির কারণে সারা বিশ্বেই একঘরে হয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য বলতে সে আমলে বিশেষ কিছুই উল্লেখ করার মতো নেই। সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীন বার বার আমেরিকাকে  টেক্কা দিয়েছে। বিশ্বে আমেরিকার কৌশলজনক উপস্থিতিও সঙ্কুচিত হয়েছে। ফলে প্রবীণ ও বয়েসী প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে মিত্র বাড়ানোর কাজ করতে হচ্ছে।

উল্লেখ্য করা প্রয়োজন যে, ক্ষমতায় আসার আগেই জো বাইডেন এসব বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছিলেন। তাঁর নির্বাচন-পূর্ব প্রতিশ্রুতি ছিল গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে মৈত্রী প্রতিষ্ঠার। সেই প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় এ উদ্যোগকে দেখা যেতে পারে। এতে যারা কর্তৃত্ববাদের বিরোধিতা করছেন, যারা দুর্নীতি মোকাবিলার চেষ্টা করছেন এবং যারা মানবাধিকার রক্ষণ করছেন কিংবা যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরোধিতা করছেন, এমন মোট ১১০টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এইসব ঘোষিত নীতিমালা উপেক্ষা করেও কোনো কোনো দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যেমন, পাকিস্তান, যেখানে প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে সেনাবাহিনীই সরকার চালায় এবং  ভারত, যেখানে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন, সুশাসনের অভাব, মৌলিক নাগরিক অধিকার হননের জন্য দেশে-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ ও চরমভাবে সমালোচিত।

নানা প্রশ্ন এবং অসঙ্গতির পরেও বৈশ্বিক পরিসরে এই সন্মেলনের তাৎপর্য অনস্বীকার্য। আন্তর্জাতিক মেরুকরণ ও বিশ্ব ক্ষমতার বিন্যাসের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগের নানামুখী গুরুত্ব রয়েছে। আফগানিস্তান থেকে হটে গিয়ে দক্ষিণ চীন সাগর ও এশিয়া-প্যাসিফিককে সামনে রেখে সামরিক শক্তি জোট 'কোয়ার্ড' গঠনের পর পরই ১১০টি দেশকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই সন্মেলন যে কেবল শুভেচ্ছামূলক নয়, সে কথাও জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টে। সম্মেলন উপলক্ষে যারা দুর্নীতি, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত এবং যে সকল ব্যক্তি দেশে দেশে গণতন্ত্রকে দুর্বল করে এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। এটাই সন্মেলনের মূল হাতিয়ার। যার প্রমাণও তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে উপস্থাপিত হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীন যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে নেয়া কোয়ার্ড ও অন্যান্য সামরিক তৎপরতার বিরোধিতা করছে, তেমনিভাবে এই রাজনৈতিক উদ্যোগ 'গণতন্ত্র সন্মেলন'-এর বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনে পাল্টা জোটের পথেও এগুতে পারে চীন। সেক্ষেত্রে চীন রাজনৈতিক মতাদর্শের বদলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের পথকেই বরাবরের মতো প্রাধান্য দিয়ে সবাইকে ডাকবে। কারণ, চীন গণতন্ত্র বা জনগণের অংশগ্রহণমূলক কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি ও সাফল্য অর্জন করাকেই গুরুত্ব দেয়। আর গণতন্ত্র বা জনগণের অংশগ্রহণহীন রাজনৈতিক ব্যবস্থার কোনো অভাব নেই বর্তমান পৃথিবীতে।

ফলে বিশ্বব্যাপী সামরিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের মতোই রাজনৈতিক মতাদর্শিক বিবেচনায় গণতান্ত্রিক শাসন বনাম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বিষয়গুলোও সামনে চলে আসছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে, যা বিশ্ব পরিস্থিতির চলমান মেরুকরণকে আরও তীব্র এবং স্নায়ুযুদ্ধের মতো উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সঞ্চার করতে পারে।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম।

‘রাতের ভোট’: আত্মসমালোচনা ইসির



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা আছে। ওই ভোট দিনের বেলার পাশাপাশি রাতেও হয়েছে বলে সরকারবিরোধী অংশের জোর প্রচার। বর্তমান সরকারকে ‘রাতের ভোটের অবৈধ সরকার’ বলে অভিযুক্ত করে আসছে বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলো। আওয়ামী লীগ বরাবরের মতো সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জনগণ তাদের সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে ফের ক্ষমতায় এনেছে এমনই দাবি তাদের। আওয়ামী লীগের দাবি বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে দেশবাসী প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে বিপুল বিজয় উপহার দিয়েছে।

ভোট নিয়ে নানা অভিযোগ মাথায় নিয়েই বিদায় নিয়েছে সাবেক ইসি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নুরুল হুদা বারবার রাতের বেলায় ভোটের অভিযোগ অস্বীকার করলেও আবার আকারে ইঙ্গিতে সেটা কবুলও করেছেন একাধিকবার। তবে এনিয়ে তার মধ্যে অনুশোচনা লক্ষ্য করা যায়নি, বরং নিজেকে সফল দাবিও করে গেছেন শেষ পর্যন্ত। যদিও তার নেতৃত্বাধীন কমিশনের অন্য কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন একাধিকবার এবং সিইসির সঙ্গে তার বিরোধ ছিল প্রকাশ্য। সিইসির সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধের কারণে হোক আবার অনুশোচনার কারণেই হোক ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে তিনি তার খেদের কথা বারবার বলেছেন। নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতার কথা বললেও ব্যর্থতা স্বীকার করে পদত্যাগ করার সাহস দেখাতে পারেননি। তিনিও অন্যদের মতো সাংবিধানিক সকল সুযোগসুবিধা গ্রহণ করে মেয়াদ পূরণ করেই বিদায় নিয়েছেন।

আগের নির্বাচন কমিশন (ইসি) ‘রাতের ভোট’ নিয়ে নানা কথা বলেছে, বর্তমান ইসিও। মঙ্গলবার (২৪ মে) রাজধানীর নির্বাচন ভবনে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, নির্বাচনকে প্রহসনে রূপান্তর করার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই। এটা আমরা অন্তর থেকে বলছি। সুন্দর নির্বাচন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সুস্থ ধারা অব্যাহত থাকুক। ভোট নিয়মানুযায়ী হবে, দিনের ভোট দিনেই হবে। ভোট রাতে হবে না—এটা স্পষ্ট করে বলতে চাই। সিইসির এই বক্তব্য চলমান নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের নানা আলোচনার বিপরীতে আস্থা ফেরানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে চাই।

আগের ভোট রাতে হয়েছে কি-না এনিয়ে প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি, কোন আদালতও এটা বলেনি। বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোসহ দেশের অনেকের ধারণা এমনই। এই ধারণার বাইরে যেতে পারেনি সাবেক ও বর্তমান নির্বাচন কমিশন। ভোট রাতে কি দিনে হয়েছে এটা এখন পর্যন্ত অমীমাংসিত বিষয়, এনিয়ে নির্বাচন কমিশন যখন কথা বলে তখন মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগে। তবে সন্দেহ ও অনাস্থা থেকে আস্থা ফেরানোর যে পদক্ষেপ সেটা বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিচ্ছে বলে ধারণা করা যায় ইঙ্গিতবহ স্বীকারোক্তি কিংবা আত্মসমালোচনা থেকে। এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে বরং আগ্রহী।

বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যর্থতা একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের অভিযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারেনি। গত নির্বাচনে বিপুল পরাজয়ের পর তারা সেই নির্বাচন নিয়ে কোন কাজ করেছে বলে দৃশ্যমান হয়নি। নির্বাচনের ফলাফলের বিপর্যয় কী কারণে ঘটল তা নিয়ে কিছু মেঠো-বক্তৃতা দেওয়া ছাড়া আর কোন কাজ করেনি তারা। নির্বাচনের পর আসনভিত্তিক ফলাফল নিয়ে আগের নির্বাচনগুলোর সঙ্গে সবশেষ নির্বাচনের ভোটের সংখ্যা নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে সেগুলো দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করলে ওখান থেকে তারা অনেক কিছু পেতে পারত। এর মাধ্যমে তারা নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণা করাতে পারত না ঠিক তবে মানুষের কাছাকাছি যেতে পারত। লড়াইটা হতে পারত বুদ্ধিবৃত্তিক, কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে শক্তিহীন বিএনপি যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রেও শক্তিহীন একটা দল সেটাই প্রমাণ করেছে তারা।

বিএনপির এই ব্যর্থতা রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক। এর সুযোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তারপরেও ‘রাতের ভোট’ নিয়ে আলোচনা আছে। সরকার দল আওয়ামী লীগ যতই এটা অস্বীকার করুক না কেন মানুষের মনে বিভ্রান্তি আছে, নানা মত আছে ইসিতেও। নির্বাচন কমিশন এনিয়ে কথা বলার মধ্যে আত্মসমালোচনার যে পথ দেখাচ্ছে এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। আগের ‘ভুল’ শুধরে নিয়মানুযায়ী ভোটগ্রহণের যে প্রত্যয় বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মধ্যে দেখা যাচ্ছে এটা দেখে আশাবাদী হতে পারে দেশের মানুষ, আশাবাদী হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো; নির্বাচন হতে পারে অংশগ্রহণমূলক। বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে অস্বীকার তত্ত্ব এই নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে আমাদের।

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি-না এনিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে, কারণ বর্তমান সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা আছে বিএনপির। আবার বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে না আওয়ামী লীগ সরকার। আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক কিংবা জাতীয় সরকারের দাবি আদায়ের মাঠের শক্তিও নেই বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোর। ফলে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের চ্যালেঞ্জ আছে নির্বাচন কমিশনের। তারা পারবে কি-না এটা সময়ই বলে দেবে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের যে অবস্থান তাতে অন্তত আশাবাদী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।

নিয়মানুযায়ী দিনের ভোট, অনিয়মের রাতের ভোট—এ আলোচনা চলতেই থাকবে। তবু মানুষকে আস্থা রাখতে হবে নির্বাচন কমিশনের ওপর। বর্তমান নির্বাচন কমিশন কতটুকু কী করতে পারবে এনিয়ে এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছার সময় হয়নি দেশবাসীর। তারা মানুষের আস্থা ফেরাতে কাজ করছে, আপাতত এটাই স্বস্তির। কাজের আগে কাজ নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়, তাদেরকে সমর্থনের পাশাপাশি দিতে হবে প্রয়োজনীয় সময়। দেশবাসীর সমর্থন পেলে তারা তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারবে বলে বিশ্বাস রাখতে চাই।

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

রবীন্দ্রনাথ কোনদিন আমাকে কল করেননি!



ডা. রাজীব দে সরকার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘুম ভাঙলো একা একাই।

একটু ঘেমে গিয়েছি।

চোখ খুলে একবার মনে হলো, নিজের ঘরটাকেও চিনতে পারছি না।

মোবাইলটা বাজছে। সম্ভবত: এ কারনেই ঘুম ভেঙেছে।

- হ্যালো, কে? (ঘুম এখনো কাটেনি আমার কন্ঠে)

- আমি শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জোড়াসাঁকোর। তুমি এক সময় আমার কবিতা পড়েছো।

- ও, কি চাই? আমি ভ্যাকসিন সংক্রান্ত কাজে জড়িত নই।

- আমার ভ্যাকসিন লাগবে না, বাবা।

("বাবা" বলায় একটু ঘুম কাটিয়ে কথা বলা চেষ্টা করলাম। কারন রোগীদেরকে 'বাবা' বলে সম্বোধন করতেন আমার সার্জারীর গুরু)

- ও, কেন ফোন দিয়েছেন, কেউ কি অসুস্থ?

- হ্যাঁ অসুস্থ। সেটা বলতেই ফোন দেওয়া।

- জ্বী, বলুন। আমি শুনছি।

- বৈদ্য রাজীব, তোমার সমাজের একদল পুরুষ খুব অসুস্থ।

- আচ্ছা কাল হসপিটালে পাঠিয়ে দেবেন, দেখে দেবো।

- পারবে তো দেখে দিতে? আচ্ছা, একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো। তোমরা কবিতা পড়া ছেড়ে দিলে কেন?

- কবিতা পড়া ছাড়িনি তো।

- মিথ্যা কথা। তোমরা এখন কবিতা পড়ো না। আগের পড়া কবিতাগুলো কোটেশন অভ্র দিয়ে লিখে ফেইসবুকে পোস্ট করো। শেয়ার করো। ব্লগে লেখো। কিন্তু কবিতা আর পড়ো না।

- ও, তাহলে বোধহয় ভালো লাগে না। আপনি লেখেন এখনো?

- না। লেখার প্রয়োজন পড়ে না। কবিতা-গল্প কিছুই লিখি না

- কেন?

- তোমাদের সমাজে নিরুপমা, কেটি, বিনোদিনী, গোড়া কিংবা হৈমন্তী এরা আজো কেউ ভালো নেই। অপু সেদিনও ওরা বাবার করা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে নি, আজো একজন মেয়ে লাঞ্ছিত হলে তোমরা প্রতিবাদ করো না। তোমাদের চোখের সামনে জলজ্যান্ত মেয়েদের সম্ভ্রমহানি হয়। তোমরা প্রতিবাদ করো না।

- নাহ। প্রতিবাদ তো করি।

- দৌড়ে গিয়ে ফেইসবুকে বসে টিপাটিপি শুরু করলে তাকে কি প্রতিবাদ বলে? প্রোফাইল পিকচার টা কালো রঙের করে দিলেই বুঝি প্রতিবাদ হয়? গান্ধী - মুজিবরা এই শিখিয়েছিলো তোমাদের?

- না, আমরা বীরের জাতি, আমরা অন্যায় সহ্য করি না।

- এজন্যই আমি গল্প-কবিতা লেখা ছেড়েছি।

- মানে?

- নিজেকে বীরের জাতি ভেবেই লেখালেখি করতাম। কিন্তু তোমাদের নির্বুদ্ধিতায় আমারই লেখা নারী চরিত্ররা আমাকে অপমান করে। আমারই লেখা ধর্মান্ধ চরিত্র গুলো আমাকে দেখে হাসে।

- পহেলা বৈশাখের কথা বলছেন? নাকি বাউলের চুল কেটে দেওয়া? নাকি মৌলবাদীদের ফতোয়া? আমি বুঝতে পারছি না।

- কুষ্টিয়ায় ছিলাম কিছুদিন। বাংলাদেশ গেছি বহুবার। এমন বাংলাদেশ আমরা রেখে আসিনি। হানাদার নেই যে দেশে, সে দেশে আমাদের কন্যাদের ধর্ষণ করে কারা? কেন আজো আমার দেশের বাতাস একজন অত্যাচারিত মেয়ের চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে, বলতে পারো?

- আপনি রাজনৈতিক কথা বলছেন।

- "মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে... পার হয়ে আসিলাম... আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়; রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়, আমার পুরানো নাম, ..ফিরিবার পথ নাহি"

- থামেন, মাঝরাতে কবিতা ভালো লাগছে না

- থামলাম, কিন্তু মানুষের চিকিৎসার পাশাপাশি সমাজের চিকিতসা শুরু করো বৈদ্য।

- সে দায় কি আমার একার নাকি?

- দায় আমাদের সবার। হৈমন্তীর গা থেকে কাপড় খুলে নেওয়া হলে, ওর আগে তোমার সমাজ ল্যাংটা হবে, তুমি ল্যাংটা হবে - সাদা পাঞ্জাবী পড়ে শরীরের কালো লুকানো যায়, মনের কালি না। তাই সমাজের চিকিৎসা করার দায় বৈদ্য-বণিক-শিক্ষক-ছাত্র-সাহিত্যিক-ব্লগার সবার!

- কি করবো?

- তোমার যতোটুকু করার আছে।

- যদি আমার ক্ষতি হয়?

- তোমার ঘরের সামনে তোমারই প্রেয়সীর কাপড় ধরে টানা হলো। এর থেকে আর কি ক্ষতিই বা হতে পারে। এটা তো ১৯৭১ না। নাকি তোমরা মনে করো, মরে যাওয়া পাকিস্তানি হানাদার গুলো, তোমাদের শরীরে আবার জন্ম নিয়েছে?

- ছিঃ ছিঃ এসব কি বলেন?

- আমার লেখা গানটাকে এবার ছেড়ে দাও। ওটা নিয়েও তোমাদের জাতের রশি ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এক মালাউন কবির গান দিয়ে কেন তোমরা দেশের সব শুভ কাজ শুরু করবে?

- আমার ঘুম পাচ্ছে, কাল সকালে হসপিটালে যাবো

- বেশ, বাঙ্গালী। জাতি হিসেবে তুমি ঘুমিয়ে যাও। ঘুমিয়ে থাকো। ঠিক যেমন করে আমার নোবেলটি চুরি গেলো, তোমার-তোমাদের প্রতিবাদ করার শক্তিটুকুও নিঃশব্দে চুরি গেছে তা তোমরা জানো না।

- আচ্ছা আপনি আমাকে এসব বলছেন কেন, হ্যালো... ... শুনছেন...

- টু... টু... ... টুট...টু

আমি ঘুমিয়ে গেলাম, অনেক গভীর সে ঘুম...

আমার সামনে আমার সমাজের মেয়েরা আক্রান্ত হলেও ভাঙে না সেই ঘুম...

আমার সামনে রেল স্টেশনে কয়েকজন মিলে একজন নারীর কাপড় ধরে টানলেও ভাঙে না সেই ঘুম। যে দেশে হানাদার নেই, চরিত্রহীন জমিদার নেই, তারপরো মেয়েদের সম্ভ্রম হানি হলে ভাঙে না সেই ঘুম... সেই ঘুম পাচ্ছে আমার...

পুনশ্চ:

আজ নারী দিবস না। এটা নারী দিবসের লেখা না। যে দেশে বাঁধাহীন ভাবে পথে ঘাটে একজন নারী কিংবা একজন পুরুষের সম্মান ক্ষুন্ন হতে পারে, এটা সেই 'প্রতিবাদ করতে ভুলে যাওয়া' মানুষের দেশের জন্য লেখা। ভাগ্যিস আমরা সেই দেশে থাকি না!

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক, সার্জারী বিভাগ (৩৩ বিসিএস), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

;

'স্টকহোম সিনড্রোম' নাকি আবহমান প্রতিবাদহীন নারী নির্যাতন?



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৭৩ সালে সুইডেনে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিলো। সে বছর ২৩ শে আগস্টের সকালবেলা সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের স্পেরিকাস ক্রেডিট ব্যাংকে একটা ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময়ে ডাকাত দল অনেক জনকেই ব্যাংকের মধ্যে জিম্মী করে রাখেন এবং সেটা টানা ৬ দিন ধরে। তাদের মধ্যে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তো ছিলেনই।

ছয় দিন পর পুলিশ যখন ডাকাত দলের উপরে অ্যাকশনে যায়, তখন ব্যাংকে জিম্মী থাকা মানুষগুলো উলটো ডাকাতদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলো। এই ঘটনায় সবাই অবাক হয়ে পরেন।

যারা আটকে রাখলো, তাদের প্রতিই এই ভালোবাসা কিভাবে তৈরী হলো! এমনকি দেশের প্রেসিডেন্ট মহোদয় যখন অপহৃত ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, তখন ডাকাতদের প্রতি সহমর্মিতার ব্যাপারেও আবেদন জানিয়েছিলেন অপহৃত ব্যক্তিরা। এই ঘটনা তখন ঘটা করে রেডিওতে প্রচার পেয়েছিলো।

এই ঘটনা থেকেই "স্টকহোম সিনড্রোম" কথাটার জন্ম। আমাদের দেশেও এমন ঘটনা ঘটে।

দেখা যায়, একজন স্বামী তার স্ত্রীর উপর নির্যাতন করলেন, এমনকি নির্যাতনের এক পর্যায়ে হত্যা চেষ্টাও করলেন। পরবর্তীতে স্ত্রীর বাপ-ভাই যখন তার স্বামীর নামে মামলা করলো, স্ত্রী আদালতে গিয়ে স্বাক্ষ্য দিলেন যে, এই অত্যাচার তার স্বামী করেন নাই বা তার স্বামী একজন আপাদমস্তক ভালো মানুষ।

এটাকেও 'স্টকহোম সিনড্রোম' বলা যায়।

দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচারিত হতে হতে অত্যাচারকারীর প্রতি এক সময় একটি অসুস্থ আবেগ বা অস্বাভাবিক দুর্বলতার জন্ম হয়।

অত্যাচার সহ্য করে হলেও তাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না। এভাবেই একটি জনপদে শিশু নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতনগুলো আলো বা বিচারের মুখ দেখে না।

২০০২ সালে মাত্র স্টন হর্ণব্যাক নামের এক ব্যক্তিকে অপহরণ করা হয়। তাকে প্রায় ২ বছর পরে অপহরণকারীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে অত্যাচারের চিহ্ণ ছিলো। তদন্তে দেখা যায়, অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে পালানোর কোনো চেষ্টা করেনি। এমনকি স্টন হর্ণব্যাকের কাছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পর্যন্ত ছিলো!

২০২২ সালে একটি জেলার একটি লোকারণ্য রেলস্টেশনে একজন নারী অন্য একজন নারীর উপরে আক্রমনাত্নক হয়ে ওঠেন। প্রথন নারীর অভিযোগ এই যে, দ্বিতীয় নারী একটি স্লিভলেস পোশাক পরিধান করেছেন যা মোটেও সেই দেশে কোন ফৌজদারী বা দেওয়ানী অপরাধ না।

কিন্তু সারা জীবন একটি মহলের দ্বারা শাসিত ও পদদলিত হয়ে থাকতে থাকতে প্রথম নারী তার ব্যক্তিসত্ত্বাকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছেন। পোশাকের মতো একটি সাধারণ নাগরিক 'অধিকার' তার কাছে অনৈতিক, বেমানান ও অসামাজিক মনে হচ্ছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটি অসুস্থ অংশের এই নোংরা শোষণের প্রতি তার গভীর আবেগ ও ভালোবাসা তৈরী হয়েছে। তাই সেই দিন একজন নারী হয়েও অন্য একজন নারীকে আক্রমণ করতে, শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিত করতে এবং দ্বিতীয় নারীর গায়ের পোশাক টেনে ছিঁড়ে ফেলতেও তার খারাপ লাগছিলো না। অথচ 'স্বল্প' পোশাক পরিধান নিয়েই তার অভিযোগ ছিলো। কিন্তু তিনি নিজেই আবার অন্য নারীটির পোশাক ছিঁড়ে ফেলছেন নির্দ্বিধায়। আবার এই কাজে তিনি সেই সমাজের গুটিকয়েক পুরুষের সাহায্য নিচ্ছেন!

সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থা একদিনে তৈরী হয় না। মানসিক দৈন্যতার এই স্তরে যেতে কয়েক মাস, কয়েক বছর এমনকি কয়েক প্রজন্ম লেগে যেতে পারে।

অত্যাচারকারীর প্রতি এই স্নেহ বা আবেগ অনেক সময় বিপদজনক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এমনকি এ সময় কেউ উদ্ধারে এগিয়ে এলে তাকেও আক্রমণ করে বসতে পারেন স্টকহোম সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি। অবশ্য ক্রিমিনোলজিস্টরা অনেকে স্টকহোম সিনড্রোমে বিশ্বাস করে না।

যাই হোক, চোখের সামনে প্রতিনিয়ত একটি অন্যায় দেখছেন, অথচ সেই অন্যায়ে আপনি কোন বাঁধা দিচ্ছেন না। বরং সেই অন্যায় আপনার ভালো লাগছে, মজা লাগছে। সেই অন্যায়কে আপনি যত্নে এবং খুব গর্বে লালন করছেন, পৃষ্ঠপোষকতা করছেন -

এরকম উদাহরণ এই দেশে কি খুব বেশি অপ্রতুল?

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক, সার্জারী বিভাগ (৩৩ বিসিএস), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

;

জেট ফুয়েল প্রাইস, সরু আলোর পথটাকে রুদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনা মহামারির পর সরু আলোর পথ দেখা যাচ্ছিল এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম সেক্টরে। সেই পথকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলতে যারপর নাই চেষ্টা করে যাচ্ছে জেট ফুয়েল প্রাইস। জেট ফুয়েলের প্রাইস নির্ধারণ করে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন। কখনো লোকসানকে পুষিয়ে নিতে দাম বৃদ্ধি করে থাকে, কখনো যুদ্ধের ডামাডোলে রিনঝিন পায়ে নুপুরের ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে জেট ফুয়েলের প্রাইস বৃদ্ধি করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে বিপিসি নিয়ন্ত্রাধীণ পদ্মা অয়েল কোম্পানী।

বাংলাদেশ এভিয়েশনের যাত্রা শুরু থেকেই বন্ধুর পথে হাঁটা একটি সেক্টর। দেশের প্রায় ১৫ মিলিয়ন জনগন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে কিংবা কাজের প্রয়োজনে অথবা ভ্রমনের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করে থাকে আকাশ পথে। আর আকাশ পথে যাতায়াতের জন্য বৃহদাংশই বহন করছে বিদেশী বিমান সংস্থাগুলো।

নানা প্রতিবন্ধকতা আর সীমাবদ্ধতার কারনে জাতীয় বিমান সংস্থাসহ বেসরকারী বিমান সংস্থাসমূহ প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না। বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলোর সাথে সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া সরকারী বিভিন্ন সংস্থাগুলোর সহযোগিতা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। এর মাঝে অন্যতম হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিভিল এভিয়েশন অথরিটি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন প্রমুখ।

কোভিডকালীন সময়  ও কোভিড পরবর্তী গত আঠারো মাসে জেট ফুয়েলের মূল্য বেড়েছে ১৩০ শতাংশ। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ছিলো প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য ৪৬ টাকা অথচ গত আঠারো মাসে প্রায় ১৫ বার জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি করে বর্তমানে দাড়িয়েছে ১০৬ টাকা। যা বাংলাদেশের এভিয়েশনের ইতিহাসে জেট ফুয়েল প্রাইসের সর্বোচ্চ রেকর্ড। যে রেকর্ড একটি খাতকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্যই যথেষ্ট। যে রেকর্ড আকাশ পথের যাত্রীদের বিপর্যস্ত করে তুলে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত করে, সেই রেকর্ড কখনো প্রত্যাশিত নয়।

বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সকে প্রতিযোগিতা করতে হয় সকল বিদেশি এয়ারলাইন্স এর সাথে। জেট ফুয়েল প্রাইস সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ভাড়ার উপর। সেই ভাড়া বৃদ্ধির ফলে দেশীয় এয়ারলাইন্স চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দর সময়ে নব প্রতিষ্ঠিত তিনটি এয়ারলাইন্স- ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, এভিয়ানা এয়ারওয়েজ ও বেস্ট এয়ার, জেট ফুয়েলের উর্ধ্বগতির সাথে তাল না মিলিয়ে চলতে না পারার কারনে এভিয়ানা এয়ারওয়েজ, বেস্ট এয়ার বছর ঘোরার আগেই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলো। যার ফলে বাংলাদেশ এভিয়েশন ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছিলো সাথে বেসরকারী বিনিয়োগে নিরোৎসাহী হতে দেখা গিয়েছিলো এভিয়েশন খাতে।

কোভিডকালীন সময়ে এয়ারলাইন্সগুলো বিভিন্ন চার্জ বিশেষ করে এ্যারোনোটিক্যাল ও নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ মওকুফের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেছিলো এভিয়েশন সেক্টরটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলে সত্য চার্জ মওকুফের পরিবর্তে নতুন দু’টি চার্জ সংযুক্ত হতে দেখেছি- তা হচ্ছে বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি এবং নিরাপত্তা ফি। যা সরাসরি যাত্রীদের ভাড়ার উপর বর্তায়।

এই সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার কর্মীবাহিনী যুক্ত আছে। যাদের ভবিষ্যতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন না করে সেক্টরটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন পথ বের করে দেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে সহায়তা করুন। বর্তমানে জিডিপি’র ৩ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম সেক্টরের। সঠিক পরিচালনার মাধ্যমে এই সেক্টর থেকে ১০ শতাংশ অংশীদারিত্ব রাখা সম্ভব জিডিপি-তে।

সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা এভিয়েশন সেক্টরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে, সাথে ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি, হোটেল ইন্ডাস্ট্রিসহ সকল ইন্ডাস্ট্রিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সকল শিল্পের গতিশীলতা বজায় রাখতে হলে এভিয়েশনের গতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকলে সেই দিকে সচেতন হলে এভিয়েশন সেক্টর বেঁচে যাবে।

জেট ফুয়েল প্রাইস সহ বিভিন্ন চার্জ নির্ধারণের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে দেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির কথা বিবেচনায় রেখে দেশের নাগরিকদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন। তাহলে দেশের উন্নয়নমূখী একটি খাত নিশ্চিত ক্ষতি হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে।    

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;