পানিতেও অগ্নিমৃত্যু- এ নরকযন্ত্রণার দায় কার?



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

জন্ম নিলেই জীবমাত্র মৃত্যুবরণ করার গ্যারান্টি লাভ করে। একথা কোন জীবেরই অস্বীকার করার উপায় নেই-যে তাকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। এটা প্রকৃতির অমোঘ বিধান।

মৃত্যুর একটা নিজস্ব রূপ আছে, স্বরূপও বিদ্যমান। যেটা কখনও কাঙ্খিত, কখনও স্নিগ্ধ-সুন্দর। সবাই যেটা স্বাভাবিক ভেবে মেনে নেয়। যে রূপটা কারো বা কিছু পুন্যাত্মার নিজের বা আপনজনদের পছন্দ হলেও মৃত্যুর স্বরূপটা সবার জন্য ভয়ংকর। সেজন্য এ স্বরূপকে কেউই পছন্দ করে না। এমনকি স্মরণ করতেও বিরক্ত বোধ করে করে। স্মরণে আসুক বা কেউ স্মরণ করুক সেটাও অনেকে অপছন্দ করে।

কারণ, দুনিয়াতে যত ধরনের ভয় আছে তন্মধ্যে মৃত্যুভয় হলো সবচে’ বড় ভয়। নিজের মৃত্যু অবধারিত জেনেও অনেকে তা নিয়ে ভাবতে চান না। স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক যে প্রকারেই আসুক না কেন মৃত্যুদূত হাজির হলে কারো কিছুই করার থাকে না। তবে অস্বাভাবিক ও কষ্টদায়ক বা হৃদয়বিদারক মৃত্যুকে মেনে নিতে সবারই কষ্ট হয়।

ডিসেম্বর ২৩ তারিখে রাত তিনটার সময় ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে নলছিটির দপদপিয়া এলাকায় এমভি অভিযান লঞ্চে অগ্নিকান্ডে ৪০ জন যাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে বাতাসে পোড়া গন্ধে সুগন্ধার নামটি যেন ভয় ও দুর্গন্ধের আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে সবার মনে। ইঞ্জিন রুমে থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে খবরে জানানো হয়েছে। বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন এই লঞ্চের ইঞ্জিন নষ্ট ছিল। গর্জন করে মাঝে মাঝে বন্ধ হয়ে যেত। আগুন লাগার পর এত দীর্ঘ সময়ব্যাপী এর অগ্নি নির্বাপন ব্যাবস্থা কোন কাজে আসেনি। ইঞ্জিন রুমে বিকট শব্দের পর শত শত লিটার জ্বালানিতে ভরা ট্যাংকে আগুন ধরে গেলেও তার নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থা ছিল না। ফলে সহজেই গোটা লঞ্চে খুব দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।

ঢাকা থেকে লঞ্চটি বরগুনা যাচ্ছিল। এর যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ৭৬০ জন। রাতের ভ্রমণে ঢাকা থেকে ৪২০ জন যাত্রী উঠলেও চাঁদপুর থামলে এত লোক উঠে যে লঞ্চটিতে তিল ধরনের ঠাঁই ছিল না। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে গেলে লঞ্চের মাস্টার, সারেং, সুকানী সহ ২৫ জন স্টাফ পালিয়ে যায়। (জাগোনিউজ২৪.কম ২৪.১২.২০২১)।

আগুন লাগার পরও ৩০-৪০ মিনিট লঞ্চটি চালিয়ে নদীর পাড়ে ভেড়ানো হয়। যাত্রীরা পানিতে লাফিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করে। একজন যাত্রী সন্তান হাতে নিয়ে নদীতে লাফ দিয়েছিল। প্রিয় সন্তান হাত থেকে খুলে গেছে, সংগে স্ত্রীও তলিয়ে গেছে। তাদের কারো সন্ধান মেলেনি। তিনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আহাজারি করে চলেছেন। তবে কেবিনে ঘুমিয়ে থাকা যাত্রীরা কেউ আগুন টের পাবার আগেই পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছেন! কেবিনে গিয়ে উদ্ধারকারীরা পোড়া কঙ্কাল ও খুলি খুঁজে পেয়েছেন।

নদীতে ফায়ার ব্রিগেড দ্রুত অকুস্থলে পৌঁছাতে পারে। এছাড়া প্রতিটি নৌযানের নিজস্ব ব্যবস্থায় দ্রুত আগুন নেভানোর ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু অভিযান-১০ লঞ্চের জরুরি এলার্ম বা ঘন্টা বাজেনি, নিজস্ব অগ্নি নির্বাাপণ ব্যবস্থা কেন ব্যবহার করা হয়নি বা ছিল কি-না তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সাইরেন বা এলার্ম না বাজায় কেবিনের যাত্রীদের ঘুমও ভাঙ্গেনি।

পানির উপরে বসে এমন মর্মান্তিক অগ্নিকান্ডে পুড়ে মরার বিষয়টি কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

দু’বছর আগে বনানীর সুউচ্চ ভবন থেকে আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যে নিপতিত হওয়া অসহায় মানুষের জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়া, ডিশের তার ধরে মাটিতে নেমে আসার বৃথা চেষ্টা করা মানুষগুলোর ছবি নিছক কোন ছবি ছিল না। ছবি হলেও সেগুলো আমাদেরকে বার্তা দিয়েছে- ভয়ংকর কিছুর। এটা মেনে নেয়া যায় না। এটা কাঙ্খিত, স্নিগ্ধ-সুন্দর মৃত্যু নয়। কেন এমন হয়? এমন হতে থাকলে আমাদের কি কোন করণীয় নেই?

সবসময় ঘটনা ঘটার পর প্রতিকার করতে লাফিয়ে উঠি কিন্তু আগেই প্রতিরোধ করি না কেন? আমরা এ ব্যাপারে পূর্বাহ্নেই সতর্কতা নিই না কেন? আগুন লেগে সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে যাবার পর কুম্ভকর্ণের মত আমাদের সবার ঘুম ভাঙে। এটা একটা মারাত্মক দেউলিয়াপনা। যা বার বার সম্পদহানি ও আগুনেমৃত্যু সংঘটিত করে অনেকের জীবনে চিরন্তর ভোগান্তি বয়ে আনছে।

প্রতিদিন বাস, রেল নৌ, বিমান কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনা হচ্ছে। কিন্তু সবচে’ ভয়ংকর দুর্ঘটনার নিদর্শন- নিমতলী ট্রাজেডী, চুড়িহাট্টা অগ্নি বিপর্যয়, বনানীর আগুন, গুলশান কিচেন মার্কেটের আগুন। ভয়ংকর সেসব দুর্ঘটনা। কেউ কেউ এগুলোকে মানবসৃষ্ট বিপর্যয় বলে আখ্যা দিয়েছেন। কেউবা বলেছেন এগুলো হত্যাকান্ড। অবহেলার ফলে এই নির্মম হত্যাযঞ্জ ঘটেছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত এভাবে অনেক কঠিন-করুণ শিক্ষা হলেও আর কত?

বনানীর আগুনে ৮ম তলায় এক বন্ধুর ১২ জন সহকর্মী একসংগে প্রাণ হারিয়েছে। সেখানে তিনজন মহিলা সহকর্মীও পুড়ে অঙ্গার! একজন সহকর্মী বাথরুমে ছিল। সেটা কেউ জানতো না। অজান্তেই ওকে ছেড়ে সবাই নেমে এল। কিন্তু সে আর নিচে নামতে পারেনি। কি মর্মান্তুদ ঘটনা! সেখানে জরুরি এলার্ম বা ঘন্টা বাজেনি, জরুরি ফায়ার এক্জিটগুলো ছিল তালাবন্ধ। সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর মারাত্মক ক্ষতি হলেও এর দায় নেবেটা কে? শুধু সামান্য ক্ষতিপূরণ দেবার ঘোষণা দিয়েউ কর্তৃপক্ষ দায় সেরেছিল।

অভিযান-১০ অগ্নিকান্ডে এবারও তাই। জেলা প্রশাসন ২৫ হাজার টাকা দেবে বলেছেন। নৌ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, এই অগ্নি দুর্ঘটনায় নিহতদের পতিজনের পরিবারকে দেড় লক্ষ টাকা দেয়া হবে। শুধু টাকাই কি সব? দেশে সড়কে নিরাপত্তা নেই। কিন্তু এখন সড়কের চেয়ে নৌপথই বেশী বিপদসংকুল হয়ে উঠেছে। মেয়াদোত্তীর্ণ নৌযানকে ঘঁেষে -মেজে অবৈধভাবে পারমিট প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রতিটি নৌযান ছাড়ার পূর্বে সেগুলোর ফিটনেস চেকআপ করার জন্য লোকবল নিয়োগ করা থাকলেও তারা দায়িত্বে অবহেলা করে থাকেন। পরে অচল বাহন সচল বলে চালিয়ে দেয়া হয। এছাড়া চাঁদপুরে থামার পর স্বাস্থ্যবিধি না মেনে অতিরিক্ত ঠাঁসা যাত্রী তোলা হবে কেন? এগুলো দেখভাল করার জন্য নিয়োজিতরা শুধু মাস ফুরালেই বেতন নেবেন আর এতগুলো মৃত্যুর জন্য নিজের কর্তব্যের দায় এড়াবেন- তাতো হয় না। মানুষের প্রতি মায়া থাকলে কর্তৃপক্ষের এসব হেঁয়ালীপনার দিকেও নজর থাকতো।

আগুন নেভাতে সবার দায় আছে। পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা এই দায়ভার অনেকাংশেই লাঘব করতে পারে। কিন্তু আমরা অনেকেই প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে এই দায়ভার এড়িয়ে ফাঁকি দিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বাসার কাছে গ্যাস ও কেমিক্যাল মজুদ করছি  ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুৎ-এর লাইন যুগ যুগ ধরে মেরামত করছি না। একই খুঁটিতে টিভি, ডিশ ও বিদ্দুতের তার সংযোজন করছি। ঘরের মধ্যে এসি লাগালেও ফায়ার ডিস্টিংগুইসার এলার্ম লাগাচ্ছি না।

এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোথাও বিল্ডিং কোড মানা হলেও কেউই ফায়ার কোড মানেনি। সাধারনত: ছয়তলা বিল্ডিং তৈরী করলেই সেখানে জীবনের নিরাপত্তার জন্য জরুরি ফায়ার কোড মানতে হবে। কিন্তু রাজধানীসহ সারা দেশে হাজার হাজার বাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জরুরি ফায়ার কোড মানা হচ্ছে না। জনসমাগম বেশী এমন এলাকায় অগ্নিনির্বাপণের জন্য জরুরি সরঞ্জাম থাকা উচিত। জানা গেছে গুলশান কিচেন মার্কেটে অগ্নিনির্র্বাপণের জন্য প্রাইমারী কিটস্গুলোও ছিল না।

এমনিতেই ঢাকা শহরে চরম ট্রাফিক জ্যাম। ফলে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না। তার ওপর হঠাৎ জড়ো হয় হাজার হাজার মানুষ। যারা আগুনের দর্শক। এরা প্রায়শ:ই দেখা যায় রাস্তা দখল করে মজা করে মোবাইলে ভিডিও করছে। গুলশান কিচেন মার্কেটে আগুনে পোড়া আলু ও ডিম খেতে ব্যস্ত হয়েছিল কেউ কেউ! হায়রে বাঙালী! কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে যেন!

নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে ইংরেজরা ধরে নিয়ে যাবার সময় এক করুণ নাটক দেখা গিয়েছিল। একজন ইতিহাসবিদ লিখেছিলেন- উপস্থিত মানুষগুলো একেকজন যদি দাঁড়িয়ে না থেকে যদি সবাই শত্রুদের প্রতি একটি করে ঢিল ছুঁড়তো তাহলে ইংরেজ সৈন্যরা পালাতে দিশা পেত না। কিন্তু সবাই ছিল বোবা দর্শক। বুদ্ধিহীন, অকর্ম্য, নির্বাক। ফলে বাংলা-বিহার- উড়িষ্যার নবাবকে সেদিন বিনা বাধায় সিংহাসন হারাতে হয়েছিল। থাক্ সেসব কথা।

বাংলদেশ দুর্যোগের দেশ। তাই এখানকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বি.এন.সি.সি ও রোভার স্কাউটদেরকে জরুরি অগ্নিনির্বপনের প্রশিক্ষণ দেয়া হোক। জরুরিভিত্তিতে প্রতিটি হাইস্কুল-কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়ে দুর্যোগ মোকাবেলা ও অগ্নিনির্বাপণের টিম তৈরী করা হোক। এরা বাড়ি বাড়ি বা বড় অফিস-আদালতে, মার্কেটে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবী হয়ে ছয়মাস অন্তর এলার্ম বাজিয়ে অগ্নিদূর্ঘটনা থেকে জীবন বাঁচানোর মহড়া পরিচালনা করে মানুষকে সতর্ক করতে পারে।

এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে- দেশে ফায়ার ফাইটার ৫০০ জনের নিচে। পুলিশের সংখ্যা ৩৫ হাজার। এই বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী থেকে কমপক্ষে পাঁচ হাজার জনকে জরুরি ভিত্তিতে অগ্নিনির্বাপণের প্রশিক্ষণ দেয়া হোক। নৌ-ফায়ার ও উঁচু ভবনের আগুন নেভাতে আরো আধুনিক অগ্নিনির্বাপণের সরঞ্জাম কেনা হোক।

আগুনেমৃত্যু ঠেকাতে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপক দল ও জরুরি অগ্নিপুলিশ বাহিনী গঠনের কোন বিকল্প নেই। অগ্নিনির্বাপক বাহিনির পরিদর্শকদেরকে নির্ভয়ে কাজ করতে দিতে হবে। পত্রিকায় প্রকাশ- বিল্ডিং কোড না মানা ও ফায়ার কোড লঙ্ঘনকারী কিছু ভবনের মালিকগণ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শকদের কাউকে কাউকে তাদের সুষ্ঠু দায়িত্ব পালনে বাধা দিযেছে। এজন্য কাউকে পরবর্তীতে মামলার আসামী হিসেবে ফাঁসিয়ে অন্যত্র বদলী করে পর্যন্ত দেয়ার মত ঘটনা ঘটেছে। এগুলো জাতির জন্য লজ্জাস্কর ও দুর্ভাগ্য স্বরুপ।

আমরা আর কোন প্রিয়জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু দেখতে চাই না। এমন কষ্টদায়ক বা হৃদয়বিদারক মৃত্যুকে সবার মেনে নিতে কষ্ট হয়। আমাদের দেশে নৌ-ফায়ার ব্রিগেডের জনবল ও শক্তি এখনও প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্ত অপ্রতুল। তাই ফায়ার ব্রিগেডের সামর্থ্য বাড়ানের পাশাপাশি আরো প্রয়োজন নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বেশী সংখ্যক ডুবুরী, আধুনিক সরঞ্জাম ও জরুরি নৌ-অগ্নিপুলিশ। এজন্য বিপর্যয় মোকাবেলা খাতে জরুরি ভিত্তিতে অর্থবরাদ্দ দিয়ে জীবনের নিরাপত্তা জোরদার করা হোক-মানুষকে নিরাপদ ভ্রমণে যাত্রাপথের নিরাপত্তা দেয়া হোক।

*লেখক সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর সাবেক ডীন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় E-mail: [email protected]

‘রাতের ভোট’: আত্মসমালোচনা ইসির



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা আছে। ওই ভোট দিনের বেলার পাশাপাশি রাতেও হয়েছে বলে সরকারবিরোধী অংশের জোর প্রচার। বর্তমান সরকারকে ‘রাতের ভোটের অবৈধ সরকার’ বলে অভিযুক্ত করে আসছে বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলো। আওয়ামী লীগ বরাবরের মতো সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জনগণ তাদের সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে ফের ক্ষমতায় এনেছে এমনই দাবি তাদের। আওয়ামী লীগের দাবি বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে দেশবাসী প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে বিপুল বিজয় উপহার দিয়েছে।

ভোট নিয়ে নানা অভিযোগ মাথায় নিয়েই বিদায় নিয়েছে সাবেক ইসি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নুরুল হুদা বারবার রাতের বেলায় ভোটের অভিযোগ অস্বীকার করলেও আবার আকারে ইঙ্গিতে সেটা কবুলও করেছেন একাধিকবার। তবে এনিয়ে তার মধ্যে অনুশোচনা লক্ষ্য করা যায়নি, বরং নিজেকে সফল দাবিও করে গেছেন শেষ পর্যন্ত। যদিও তার নেতৃত্বাধীন কমিশনের অন্য কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন একাধিকবার এবং সিইসির সঙ্গে তার বিরোধ ছিল প্রকাশ্য। সিইসির সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধের কারণে হোক আবার অনুশোচনার কারণেই হোক ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে তিনি তার খেদের কথা বারবার বলেছেন। নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতার কথা বললেও ব্যর্থতা স্বীকার করে পদত্যাগ করার সাহস দেখাতে পারেননি। তিনিও অন্যদের মতো সাংবিধানিক সকল সুযোগসুবিধা গ্রহণ করে মেয়াদ পূরণ করেই বিদায় নিয়েছেন।

আগের নির্বাচন কমিশন (ইসি) ‘রাতের ভোট’ নিয়ে নানা কথা বলেছে, বর্তমান ইসিও। মঙ্গলবার (২৪ মে) রাজধানীর নির্বাচন ভবনে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, নির্বাচনকে প্রহসনে রূপান্তর করার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই। এটা আমরা অন্তর থেকে বলছি। সুন্দর নির্বাচন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সুস্থ ধারা অব্যাহত থাকুক। ভোট নিয়মানুযায়ী হবে, দিনের ভোট দিনেই হবে। ভোট রাতে হবে না—এটা স্পষ্ট করে বলতে চাই। সিইসির এই বক্তব্য চলমান নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের নানা আলোচনার বিপরীতে আস্থা ফেরানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে চাই।

আগের ভোট রাতে হয়েছে কি-না এনিয়ে প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি, কোন আদালতও এটা বলেনি। বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোসহ দেশের অনেকের ধারণা এমনই। এই ধারণার বাইরে যেতে পারেনি সাবেক ও বর্তমান নির্বাচন কমিশন। ভোট রাতে কি দিনে হয়েছে এটা এখন পর্যন্ত অমীমাংসিত বিষয়, এনিয়ে নির্বাচন কমিশন যখন কথা বলে তখন মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগে। তবে সন্দেহ ও অনাস্থা থেকে আস্থা ফেরানোর যে পদক্ষেপ সেটা বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিচ্ছে বলে ধারণা করা যায় ইঙ্গিতবহ স্বীকারোক্তি কিংবা আত্মসমালোচনা থেকে। এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে বরং আগ্রহী।

বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যর্থতা একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের অভিযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারেনি। গত নির্বাচনে বিপুল পরাজয়ের পর তারা সেই নির্বাচন নিয়ে কোন কাজ করেছে বলে দৃশ্যমান হয়নি। নির্বাচনের ফলাফলের বিপর্যয় কী কারণে ঘটল তা নিয়ে কিছু মেঠো-বক্তৃতা দেওয়া ছাড়া আর কোন কাজ করেনি তারা। নির্বাচনের পর আসনভিত্তিক ফলাফল নিয়ে আগের নির্বাচনগুলোর সঙ্গে সবশেষ নির্বাচনের ভোটের সংখ্যা নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে সেগুলো দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করলে ওখান থেকে তারা অনেক কিছু পেতে পারত। এর মাধ্যমে তারা নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণা করাতে পারত না ঠিক তবে মানুষের কাছাকাছি যেতে পারত। লড়াইটা হতে পারত বুদ্ধিবৃত্তিক, কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে শক্তিহীন বিএনপি যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রেও শক্তিহীন একটা দল সেটাই প্রমাণ করেছে তারা।

বিএনপির এই ব্যর্থতা রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক। এর সুযোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তারপরেও ‘রাতের ভোট’ নিয়ে আলোচনা আছে। সরকার দল আওয়ামী লীগ যতই এটা অস্বীকার করুক না কেন মানুষের মনে বিভ্রান্তি আছে, নানা মত আছে ইসিতেও। নির্বাচন কমিশন এনিয়ে কথা বলার মধ্যে আত্মসমালোচনার যে পথ দেখাচ্ছে এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। আগের ‘ভুল’ শুধরে নিয়মানুযায়ী ভোটগ্রহণের যে প্রত্যয় বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মধ্যে দেখা যাচ্ছে এটা দেখে আশাবাদী হতে পারে দেশের মানুষ, আশাবাদী হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো; নির্বাচন হতে পারে অংশগ্রহণমূলক। বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে অস্বীকার তত্ত্ব এই নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে আমাদের।

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি-না এনিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে, কারণ বর্তমান সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা আছে বিএনপির। আবার বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে না আওয়ামী লীগ সরকার। আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক কিংবা জাতীয় সরকারের দাবি আদায়ের মাঠের শক্তিও নেই বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোর। ফলে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের চ্যালেঞ্জ আছে নির্বাচন কমিশনের। তারা পারবে কি-না এটা সময়ই বলে দেবে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের যে অবস্থান তাতে অন্তত আশাবাদী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।

নিয়মানুযায়ী দিনের ভোট, অনিয়মের রাতের ভোট—এ আলোচনা চলতেই থাকবে। তবু মানুষকে আস্থা রাখতে হবে নির্বাচন কমিশনের ওপর। বর্তমান নির্বাচন কমিশন কতটুকু কী করতে পারবে এনিয়ে এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছার সময় হয়নি দেশবাসীর। তারা মানুষের আস্থা ফেরাতে কাজ করছে, আপাতত এটাই স্বস্তির। কাজের আগে কাজ নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়, তাদেরকে সমর্থনের পাশাপাশি দিতে হবে প্রয়োজনীয় সময়। দেশবাসীর সমর্থন পেলে তারা তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারবে বলে বিশ্বাস রাখতে চাই।

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

রবীন্দ্রনাথ কোনদিন আমাকে কল করেননি!



ডা. রাজীব দে সরকার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘুম ভাঙলো একা একাই।

একটু ঘেমে গিয়েছি।

চোখ খুলে একবার মনে হলো, নিজের ঘরটাকেও চিনতে পারছি না।

মোবাইলটা বাজছে। সম্ভবত: এ কারনেই ঘুম ভেঙেছে।

- হ্যালো, কে? (ঘুম এখনো কাটেনি আমার কন্ঠে)

- আমি শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জোড়াসাঁকোর। তুমি এক সময় আমার কবিতা পড়েছো।

- ও, কি চাই? আমি ভ্যাকসিন সংক্রান্ত কাজে জড়িত নই।

- আমার ভ্যাকসিন লাগবে না, বাবা।

("বাবা" বলায় একটু ঘুম কাটিয়ে কথা বলা চেষ্টা করলাম। কারন রোগীদেরকে 'বাবা' বলে সম্বোধন করতেন আমার সার্জারীর গুরু)

- ও, কেন ফোন দিয়েছেন, কেউ কি অসুস্থ?

- হ্যাঁ অসুস্থ। সেটা বলতেই ফোন দেওয়া।

- জ্বী, বলুন। আমি শুনছি।

- বৈদ্য রাজীব, তোমার সমাজের একদল পুরুষ খুব অসুস্থ।

- আচ্ছা কাল হসপিটালে পাঠিয়ে দেবেন, দেখে দেবো।

- পারবে তো দেখে দিতে? আচ্ছা, একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো। তোমরা কবিতা পড়া ছেড়ে দিলে কেন?

- কবিতা পড়া ছাড়িনি তো।

- মিথ্যা কথা। তোমরা এখন কবিতা পড়ো না। আগের পড়া কবিতাগুলো কোটেশন অভ্র দিয়ে লিখে ফেইসবুকে পোস্ট করো। শেয়ার করো। ব্লগে লেখো। কিন্তু কবিতা আর পড়ো না।

- ও, তাহলে বোধহয় ভালো লাগে না। আপনি লেখেন এখনো?

- না। লেখার প্রয়োজন পড়ে না। কবিতা-গল্প কিছুই লিখি না

- কেন?

- তোমাদের সমাজে নিরুপমা, কেটি, বিনোদিনী, গোড়া কিংবা হৈমন্তী এরা আজো কেউ ভালো নেই। অপু সেদিনও ওরা বাবার করা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে নি, আজো একজন মেয়ে লাঞ্ছিত হলে তোমরা প্রতিবাদ করো না। তোমাদের চোখের সামনে জলজ্যান্ত মেয়েদের সম্ভ্রমহানি হয়। তোমরা প্রতিবাদ করো না।

- নাহ। প্রতিবাদ তো করি।

- দৌড়ে গিয়ে ফেইসবুকে বসে টিপাটিপি শুরু করলে তাকে কি প্রতিবাদ বলে? প্রোফাইল পিকচার টা কালো রঙের করে দিলেই বুঝি প্রতিবাদ হয়? গান্ধী - মুজিবরা এই শিখিয়েছিলো তোমাদের?

- না, আমরা বীরের জাতি, আমরা অন্যায় সহ্য করি না।

- এজন্যই আমি গল্প-কবিতা লেখা ছেড়েছি।

- মানে?

- নিজেকে বীরের জাতি ভেবেই লেখালেখি করতাম। কিন্তু তোমাদের নির্বুদ্ধিতায় আমারই লেখা নারী চরিত্ররা আমাকে অপমান করে। আমারই লেখা ধর্মান্ধ চরিত্র গুলো আমাকে দেখে হাসে।

- পহেলা বৈশাখের কথা বলছেন? নাকি বাউলের চুল কেটে দেওয়া? নাকি মৌলবাদীদের ফতোয়া? আমি বুঝতে পারছি না।

- কুষ্টিয়ায় ছিলাম কিছুদিন। বাংলাদেশ গেছি বহুবার। এমন বাংলাদেশ আমরা রেখে আসিনি। হানাদার নেই যে দেশে, সে দেশে আমাদের কন্যাদের ধর্ষণ করে কারা? কেন আজো আমার দেশের বাতাস একজন অত্যাচারিত মেয়ের চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে, বলতে পারো?

- আপনি রাজনৈতিক কথা বলছেন।

- "মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে... পার হয়ে আসিলাম... আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়; রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়, আমার পুরানো নাম, ..ফিরিবার পথ নাহি"

- থামেন, মাঝরাতে কবিতা ভালো লাগছে না

- থামলাম, কিন্তু মানুষের চিকিৎসার পাশাপাশি সমাজের চিকিতসা শুরু করো বৈদ্য।

- সে দায় কি আমার একার নাকি?

- দায় আমাদের সবার। হৈমন্তীর গা থেকে কাপড় খুলে নেওয়া হলে, ওর আগে তোমার সমাজ ল্যাংটা হবে, তুমি ল্যাংটা হবে - সাদা পাঞ্জাবী পড়ে শরীরের কালো লুকানো যায়, মনের কালি না। তাই সমাজের চিকিৎসা করার দায় বৈদ্য-বণিক-শিক্ষক-ছাত্র-সাহিত্যিক-ব্লগার সবার!

- কি করবো?

- তোমার যতোটুকু করার আছে।

- যদি আমার ক্ষতি হয়?

- তোমার ঘরের সামনে তোমারই প্রেয়সীর কাপড় ধরে টানা হলো। এর থেকে আর কি ক্ষতিই বা হতে পারে। এটা তো ১৯৭১ না। নাকি তোমরা মনে করো, মরে যাওয়া পাকিস্তানি হানাদার গুলো, তোমাদের শরীরে আবার জন্ম নিয়েছে?

- ছিঃ ছিঃ এসব কি বলেন?

- আমার লেখা গানটাকে এবার ছেড়ে দাও। ওটা নিয়েও তোমাদের জাতের রশি ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এক মালাউন কবির গান দিয়ে কেন তোমরা দেশের সব শুভ কাজ শুরু করবে?

- আমার ঘুম পাচ্ছে, কাল সকালে হসপিটালে যাবো

- বেশ, বাঙ্গালী। জাতি হিসেবে তুমি ঘুমিয়ে যাও। ঘুমিয়ে থাকো। ঠিক যেমন করে আমার নোবেলটি চুরি গেলো, তোমার-তোমাদের প্রতিবাদ করার শক্তিটুকুও নিঃশব্দে চুরি গেছে তা তোমরা জানো না।

- আচ্ছা আপনি আমাকে এসব বলছেন কেন, হ্যালো... ... শুনছেন...

- টু... টু... ... টুট...টু

আমি ঘুমিয়ে গেলাম, অনেক গভীর সে ঘুম...

আমার সামনে আমার সমাজের মেয়েরা আক্রান্ত হলেও ভাঙে না সেই ঘুম...

আমার সামনে রেল স্টেশনে কয়েকজন মিলে একজন নারীর কাপড় ধরে টানলেও ভাঙে না সেই ঘুম। যে দেশে হানাদার নেই, চরিত্রহীন জমিদার নেই, তারপরো মেয়েদের সম্ভ্রম হানি হলে ভাঙে না সেই ঘুম... সেই ঘুম পাচ্ছে আমার...

পুনশ্চ:

আজ নারী দিবস না। এটা নারী দিবসের লেখা না। যে দেশে বাঁধাহীন ভাবে পথে ঘাটে একজন নারী কিংবা একজন পুরুষের সম্মান ক্ষুন্ন হতে পারে, এটা সেই 'প্রতিবাদ করতে ভুলে যাওয়া' মানুষের দেশের জন্য লেখা। ভাগ্যিস আমরা সেই দেশে থাকি না!

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক, সার্জারী বিভাগ (৩৩ বিসিএস), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

;

'স্টকহোম সিনড্রোম' নাকি আবহমান প্রতিবাদহীন নারী নির্যাতন?



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৭৩ সালে সুইডেনে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিলো। সে বছর ২৩ শে আগস্টের সকালবেলা সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের স্পেরিকাস ক্রেডিট ব্যাংকে একটা ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময়ে ডাকাত দল অনেক জনকেই ব্যাংকের মধ্যে জিম্মী করে রাখেন এবং সেটা টানা ৬ দিন ধরে। তাদের মধ্যে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তো ছিলেনই।

ছয় দিন পর পুলিশ যখন ডাকাত দলের উপরে অ্যাকশনে যায়, তখন ব্যাংকে জিম্মী থাকা মানুষগুলো উলটো ডাকাতদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলো। এই ঘটনায় সবাই অবাক হয়ে পরেন।

যারা আটকে রাখলো, তাদের প্রতিই এই ভালোবাসা কিভাবে তৈরী হলো! এমনকি দেশের প্রেসিডেন্ট মহোদয় যখন অপহৃত ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, তখন ডাকাতদের প্রতি সহমর্মিতার ব্যাপারেও আবেদন জানিয়েছিলেন অপহৃত ব্যক্তিরা। এই ঘটনা তখন ঘটা করে রেডিওতে প্রচার পেয়েছিলো।

এই ঘটনা থেকেই "স্টকহোম সিনড্রোম" কথাটার জন্ম। আমাদের দেশেও এমন ঘটনা ঘটে।

দেখা যায়, একজন স্বামী তার স্ত্রীর উপর নির্যাতন করলেন, এমনকি নির্যাতনের এক পর্যায়ে হত্যা চেষ্টাও করলেন। পরবর্তীতে স্ত্রীর বাপ-ভাই যখন তার স্বামীর নামে মামলা করলো, স্ত্রী আদালতে গিয়ে স্বাক্ষ্য দিলেন যে, এই অত্যাচার তার স্বামী করেন নাই বা তার স্বামী একজন আপাদমস্তক ভালো মানুষ।

এটাকেও 'স্টকহোম সিনড্রোম' বলা যায়।

দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচারিত হতে হতে অত্যাচারকারীর প্রতি এক সময় একটি অসুস্থ আবেগ বা অস্বাভাবিক দুর্বলতার জন্ম হয়।

অত্যাচার সহ্য করে হলেও তাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না। এভাবেই একটি জনপদে শিশু নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতনগুলো আলো বা বিচারের মুখ দেখে না।

২০০২ সালে মাত্র স্টন হর্ণব্যাক নামের এক ব্যক্তিকে অপহরণ করা হয়। তাকে প্রায় ২ বছর পরে অপহরণকারীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে অত্যাচারের চিহ্ণ ছিলো। তদন্তে দেখা যায়, অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে পালানোর কোনো চেষ্টা করেনি। এমনকি স্টন হর্ণব্যাকের কাছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পর্যন্ত ছিলো!

২০২২ সালে একটি জেলার একটি লোকারণ্য রেলস্টেশনে একজন নারী অন্য একজন নারীর উপরে আক্রমনাত্নক হয়ে ওঠেন। প্রথন নারীর অভিযোগ এই যে, দ্বিতীয় নারী একটি স্লিভলেস পোশাক পরিধান করেছেন যা মোটেও সেই দেশে কোন ফৌজদারী বা দেওয়ানী অপরাধ না।

কিন্তু সারা জীবন একটি মহলের দ্বারা শাসিত ও পদদলিত হয়ে থাকতে থাকতে প্রথম নারী তার ব্যক্তিসত্ত্বাকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছেন। পোশাকের মতো একটি সাধারণ নাগরিক 'অধিকার' তার কাছে অনৈতিক, বেমানান ও অসামাজিক মনে হচ্ছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটি অসুস্থ অংশের এই নোংরা শোষণের প্রতি তার গভীর আবেগ ও ভালোবাসা তৈরী হয়েছে। তাই সেই দিন একজন নারী হয়েও অন্য একজন নারীকে আক্রমণ করতে, শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিত করতে এবং দ্বিতীয় নারীর গায়ের পোশাক টেনে ছিঁড়ে ফেলতেও তার খারাপ লাগছিলো না। অথচ 'স্বল্প' পোশাক পরিধান নিয়েই তার অভিযোগ ছিলো। কিন্তু তিনি নিজেই আবার অন্য নারীটির পোশাক ছিঁড়ে ফেলছেন নির্দ্বিধায়। আবার এই কাজে তিনি সেই সমাজের গুটিকয়েক পুরুষের সাহায্য নিচ্ছেন!

সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থা একদিনে তৈরী হয় না। মানসিক দৈন্যতার এই স্তরে যেতে কয়েক মাস, কয়েক বছর এমনকি কয়েক প্রজন্ম লেগে যেতে পারে।

অত্যাচারকারীর প্রতি এই স্নেহ বা আবেগ অনেক সময় বিপদজনক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এমনকি এ সময় কেউ উদ্ধারে এগিয়ে এলে তাকেও আক্রমণ করে বসতে পারেন স্টকহোম সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি। অবশ্য ক্রিমিনোলজিস্টরা অনেকে স্টকহোম সিনড্রোমে বিশ্বাস করে না।

যাই হোক, চোখের সামনে প্রতিনিয়ত একটি অন্যায় দেখছেন, অথচ সেই অন্যায়ে আপনি কোন বাঁধা দিচ্ছেন না। বরং সেই অন্যায় আপনার ভালো লাগছে, মজা লাগছে। সেই অন্যায়কে আপনি যত্নে এবং খুব গর্বে লালন করছেন, পৃষ্ঠপোষকতা করছেন -

এরকম উদাহরণ এই দেশে কি খুব বেশি অপ্রতুল?

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক, সার্জারী বিভাগ (৩৩ বিসিএস), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

;

জেট ফুয়েল প্রাইস, সরু আলোর পথটাকে রুদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনা মহামারির পর সরু আলোর পথ দেখা যাচ্ছিল এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম সেক্টরে। সেই পথকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলতে যারপর নাই চেষ্টা করে যাচ্ছে জেট ফুয়েল প্রাইস। জেট ফুয়েলের প্রাইস নির্ধারণ করে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন। কখনো লোকসানকে পুষিয়ে নিতে দাম বৃদ্ধি করে থাকে, কখনো যুদ্ধের ডামাডোলে রিনঝিন পায়ে নুপুরের ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে জেট ফুয়েলের প্রাইস বৃদ্ধি করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে বিপিসি নিয়ন্ত্রাধীণ পদ্মা অয়েল কোম্পানী।

বাংলাদেশ এভিয়েশনের যাত্রা শুরু থেকেই বন্ধুর পথে হাঁটা একটি সেক্টর। দেশের প্রায় ১৫ মিলিয়ন জনগন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে কিংবা কাজের প্রয়োজনে অথবা ভ্রমনের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করে থাকে আকাশ পথে। আর আকাশ পথে যাতায়াতের জন্য বৃহদাংশই বহন করছে বিদেশী বিমান সংস্থাগুলো।

নানা প্রতিবন্ধকতা আর সীমাবদ্ধতার কারনে জাতীয় বিমান সংস্থাসহ বেসরকারী বিমান সংস্থাসমূহ প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না। বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলোর সাথে সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া সরকারী বিভিন্ন সংস্থাগুলোর সহযোগিতা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। এর মাঝে অন্যতম হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিভিল এভিয়েশন অথরিটি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন প্রমুখ।

কোভিডকালীন সময়  ও কোভিড পরবর্তী গত আঠারো মাসে জেট ফুয়েলের মূল্য বেড়েছে ১৩০ শতাংশ। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ছিলো প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য ৪৬ টাকা অথচ গত আঠারো মাসে প্রায় ১৫ বার জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি করে বর্তমানে দাড়িয়েছে ১০৬ টাকা। যা বাংলাদেশের এভিয়েশনের ইতিহাসে জেট ফুয়েল প্রাইসের সর্বোচ্চ রেকর্ড। যে রেকর্ড একটি খাতকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্যই যথেষ্ট। যে রেকর্ড আকাশ পথের যাত্রীদের বিপর্যস্ত করে তুলে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত করে, সেই রেকর্ড কখনো প্রত্যাশিত নয়।

বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সকে প্রতিযোগিতা করতে হয় সকল বিদেশি এয়ারলাইন্স এর সাথে। জেট ফুয়েল প্রাইস সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ভাড়ার উপর। সেই ভাড়া বৃদ্ধির ফলে দেশীয় এয়ারলাইন্স চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দর সময়ে নব প্রতিষ্ঠিত তিনটি এয়ারলাইন্স- ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, এভিয়ানা এয়ারওয়েজ ও বেস্ট এয়ার, জেট ফুয়েলের উর্ধ্বগতির সাথে তাল না মিলিয়ে চলতে না পারার কারনে এভিয়ানা এয়ারওয়েজ, বেস্ট এয়ার বছর ঘোরার আগেই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলো। যার ফলে বাংলাদেশ এভিয়েশন ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছিলো সাথে বেসরকারী বিনিয়োগে নিরোৎসাহী হতে দেখা গিয়েছিলো এভিয়েশন খাতে।

কোভিডকালীন সময়ে এয়ারলাইন্সগুলো বিভিন্ন চার্জ বিশেষ করে এ্যারোনোটিক্যাল ও নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ মওকুফের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেছিলো এভিয়েশন সেক্টরটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলে সত্য চার্জ মওকুফের পরিবর্তে নতুন দু’টি চার্জ সংযুক্ত হতে দেখেছি- তা হচ্ছে বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি এবং নিরাপত্তা ফি। যা সরাসরি যাত্রীদের ভাড়ার উপর বর্তায়।

এই সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার কর্মীবাহিনী যুক্ত আছে। যাদের ভবিষ্যতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন না করে সেক্টরটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন পথ বের করে দেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে সহায়তা করুন। বর্তমানে জিডিপি’র ৩ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম সেক্টরের। সঠিক পরিচালনার মাধ্যমে এই সেক্টর থেকে ১০ শতাংশ অংশীদারিত্ব রাখা সম্ভব জিডিপি-তে।

সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা এভিয়েশন সেক্টরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে, সাথে ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি, হোটেল ইন্ডাস্ট্রিসহ সকল ইন্ডাস্ট্রিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সকল শিল্পের গতিশীলতা বজায় রাখতে হলে এভিয়েশনের গতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকলে সেই দিকে সচেতন হলে এভিয়েশন সেক্টর বেঁচে যাবে।

জেট ফুয়েল প্রাইস সহ বিভিন্ন চার্জ নির্ধারণের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে দেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির কথা বিবেচনায় রেখে দেশের নাগরিকদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন। তাহলে দেশের উন্নয়নমূখী একটি খাত নিশ্চিত ক্ষতি হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে।    

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;