মুজিব স্বর্ণপদক ও একজন অনন্যসাধারণ অর্থনীতিবিদ



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

২০২১ এর ২২ ডিসেম্বর দেশের প্রায় সব সংবাদপত্রে একটি খবর খুবই গুরুত্বসহকারে ছাপা হয়। সংবাদটি ছিল মুজিব জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে অর্থনীতিশাস্ত্রে অনন্যসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘মুজিব স্বর্ণপদক’ পাচ্ছেন ড. আবুল বারকাত। পদকটি প্রদান করবে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। উল্লেখ করা যেতে পারে ২০২১ এ অর্থনীতি সমিতির ২১তম দ্বিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়  এবং উক্ত সম্মেলনে অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতকে পদকটি পরিয়ে দেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আজীবন সদস্য স্বনামধন্য দুইজন প্রবীণ ব্যক্তি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিব শতবর্ষে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি কর্তৃক প্রথমবারের মতো প্রবর্তিত ‘মুজিব স্বর্ণপদক’ আবুল বারকাতের মত একজন অর্থনীতিবিদকে প্রদান করা নিঃসন্দেহে একটি যথার্থ উদ্যোগ ও তাঁর অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি এদেশের অর্থনীতিবিদদের এক প্রাণপ্রিয় সংগঠন। সাধারণ মানুষের কল্যাণে সরকারের নীতি-নির্ধারণে এই সমিতি বরাবরই তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত বিগত দুই দশকেরও অধিক সময় ধরে এই সমিতির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। এই সুদীর্ঘ সময়ে তিনি একাধিকবার সমিতির সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে এবং সর্বাধিক ভোট পেয়ে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং কার্যনির্বাহক কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়ে সমিতির দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করে আসছেন। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি সর্বদিক দিয়ে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশে আরও অনেক প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ থাকতে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি কেন ড. আবুল বারকাতকে ‘মুজিব স্বর্ণপদক’ প্রদান করলো তা জানতে হলে ড. আবুল বারকাতের সুবিশাল ও গভীর বিশ্লেষণধর্মী গবেষণাকর্ম আর একই সাথে পাবলিক ইন্টেলেকচুয়ালিজম সম্বন্ধে বিস্তারিত জানা প্রয়োজন। তবে এই লেখায় তার সুবিশাল কর্মযজ্ঞ তুলে ধরা অসম্ভব বিধায় সংক্ষেপে কিছু বিষয় তুলে ধরলে বিজ্ঞ পাঠকবর্গ কিছুটা হলেও ধারণা পাবেন  বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

আবুল বারকাতকে যারা জানেন এবং চেনেন তারা একবাক্যে স্বীকার করবেন তিনি মূল-স্রোতের বিপরীতে একজন ভিন্নধারার অর্থনীতিবিদ। গতানুগতিকতার বাইরে অর্থাৎ প্রথাবিরোধী একজন অর্থনীতিবিদ; যিনি প্রতিনিয়ত তার লেখায় ও গবেষণায় সাধারণ মানুষের কল্যাণ, জীবন সমৃদ্ধির কথা ও তাদের সার্বিক উন্নয়নের কথা তুলে ধরেন। কোনো ভয়-ভীতি বা কোনোকিছুর প্রলোভন তাকে তার এই চিন্তা ও ভাবনার জগৎ থেকে টলাতে পারেনা। যুক্তি দিয়ে সত্য উদ্ঘাটন করা ও তাতে অটল থাকা তার দৃঢ় চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। তাঁর পা-িত্যের পরিধি সুবিস্তৃত। সত্য প্রকাশে অটলতা ও পা-িত্য- উভয় কারণেই তিনি ক্ষমতাবান ও সুবিধাবাদীদের কাছে অপ্রিয় ও বিরাগভাজন। একমাত্র সাধারণ মানুষের স্বার্থ ও ভালোবাসার কাছেই তিনি পরাস্ত হন। কারণ, তিনি মনে-প্রাণে তাদের কল্যাণকামী। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও এই সাধারণ ও গরীব-দুখী মানুষের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তিনি মনেপ্রাণে ধারণ ও লালন করেন।  তিনি একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনা ও মৌলিক গবেষণায় ড. বারকাত অব্যাহতভাবে যে অবদান রেখে যাচ্ছেন তার গুরুত্ব অপরিসীম। এ পর্যন্ত তিনি যত গবেষণাকর্ম করেছেন সেসবের কয়েকটি মাইলফলক বা দিকনির্দেশক হিসেবে যেমন জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত হয়েছে তেমনি এদেশের উন্নয়ন-নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ  ভূমিকা রেখেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর “বড় পর্দায় সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্র: ভাইরাসের মহাবিপর্যয় থেকে শোভন বাংলাদেশের সন্ধানে” শীর্ষক মাষ্টারপিস গ্রন্থটি দেশে এবং দেশের বাইরে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। করোনা মহামারির শুরুতেই তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন সামনে বিশ^ব্যাপী কী বির্পয়য় ঘটতে যাচ্ছে। আর তাই তিনি নিরলস পরিশ্রম করে, দূরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত স্ত্রীকে পাশে রেখে রাতের পর রাত জেগে, ভগ্নস্বাস্থ্য হয়ে আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন এক মহামূল্যবান অভিসর্ন্দভ যা বাংলাদেশ তথা বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি উত্তর যে শোভন সমাজ গঠিত হওয়া উচিত- সেই শোভন সমাজ বিনিমার্ণের অশ্রুতপূর্ব তত্ত্ব।

এই বইটি নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করেছেন দেশ-বিদেশের নামকরা অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ। করোনাকালে প্রকাশিত কোনো গ্রন্থ নিয়ে এমন আলোচনা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। এই বইয়ে তিনি তুলে ধরেছেন করোনাকালে শ্রেণিকাঠামোর বিপদজনক পরিবর্তন নিম্নগামিতার কথা, তিন কোটি মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের দরিদ্র হওয়ার কথা এবং তিন কোটিরও বেশি মানুষের প্রায় নিঃস্ব হওয়ার কথা। বিপদজনক আয়-বৈষম্য, সম্পদ বৈষম্য, শিক্ষা বৈষম্য ও স্বাস্থ্য বৈষম্য বৃদ্ধির কথাও তিনি এখানে তুলে ধরেছেন এবং কী করণীয় সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট পথ বাতলে দিয়েছেন নীতিনির্ধারকদের জন্য। বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ যে পরিসংখ্যান তিনি ২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরুর প্রথমেই করেছিলেন- তাইই আজ বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে। এই বইয়েই তিনি উল্লেখ করেছেন জম্বি কর্পোরেটদের কথা যারা সরকারি ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপী হন। যারা তাদের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো কিছুই সহ্য করেন না। রেন্টসিকার, পরজীবী, লুটেরাদের কথাও তিনি স্পষ্টভাষায় তুলে ধরেছেন। করোনাকালে এমন সাহসী গবেষণা অন্য কেউ করেছেন কিনা জানা নেই। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের জনক ও জ্ঞানজগতের প-িত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি-র অধ্যাপক  নোয়াম চমস্কি আবুল বারকাতের এই বইটির জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন।

ড. বারকাত মানুষের অধিকার-ভিত্তিক উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট অনেক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থের প্রণেতা। অধ্যাপক আবুল বারকাত সম্পাদন করেছেন ৮০০টিরও অধিক মৌলিক গবেষণা কর্ম। এসবের মধ্যে আছে  ৪৬টি গবেষণাগ্রন্থ, শতাধিক জার্নাল প্রবন্ধ, প্রায় ২০০ গবেষণা মনোগ্রাফ, এবং ১৩০টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপিত গবেষণাপত্র। তাঁর An Inquiry into Causes and Consequences of Deprivation of Hindu Minorities in Bangladesh through the Vested Property Act: Framework for a Realistic Solution (২০০০), Political Economy of Land Litigation in Bangladesh: A Case of Colossal National Wastage (ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায়: ২০০৪, ২০০৬), Charland in Bangladesh: Political Economy of Ignored Resources (2007),  Political Economy of Khas Land in Bangladesh (২০০৭),  Development as Concientization (বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় প্রকাশিত ২০০১, ২০০৯), Development as Concientization (ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় প্রকাশিত, ২০০৮), Deprivation of Hindu Minority in Bangladesh: Living with Vested Property (ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায়: ২০০৮,২০০৯), Life and Land of Adibashis: Land Dispossession and Alienation of  Adibashis in the Plain Districts of Bangladesh (২০০৯), Social Protection Measures in Bangladesh: As Means to Improve Child Well-being (২০১১), Political Economy of Madrassa Education in Bangladesh: Genesis, Growth, and Impact (২০১১ ইংরেজি ভাষায়, বাংলা ভাষান্তর ২০১৭), ), Local Governance and Decentralization in Bangladesh Politics and Economics (২০১৫),  বঙ্গবন্ধু- সমতা ও সাম্রারাজ্যবাদ: বঙ্গবন্ধু  ‘বেঁচে থাকলে’ কোথায় পৌঁছতো বাংলাদেশ? সাম্রারাজ্যবাদী বিশ্ব-প্রভুত্বের যুগে সমতাবাদী সমাজ বিনির্মাণের সম্ভাব্যতা প্রসঙ্গে (২০১৫), বাংলাদেশে দারিদ্র্য-বৈষম্য-অসমতার কারণ-পরিণাম ও উত্তরণ সম্ভাবনা: একীভূত রাজনৈতিক অর্থনীতির তত্ত্বের সন্ধানে (২০১৬), Rural Land Market in Bangladesh: An Exploratory Study (২০১৬), অর্থনীতিশাস্ত্রে দর্শনের দারিদ্র্য (২০১৭); বাংলাদেশে মৌলবাদ: জঙ্গিবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতির অন্দর-বাহির (২০১৮); উৎপাদন পদ্ধতি: তত্ত্ব, এশিয়াটিক, ইতিহাস রচনায় প্রাসঙ্গিকতা, প্রাক-পুঁজিবাদী চীন, আমেরিকা, বাংলাদেশ (২০১৯); বড় পর্দায় সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্র: ভাইরাসের মহাবিপর্যয় থেকে শোভন বাংলাদেশের সন্ধানে (২০২০); বাংলাদেশের ভূমি আইনের অধিকারভিত্তিক বিশ্লেষণ (১৩ খ-ে প্রকাশিত, ২০২০), নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু: জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুযোগ– ২০১২ সালে গবেষণায় প্রমাণিত– ২০২১ সালে দৃশ্যমান বাস্তবতা (২০২১) ইত্যাদি মৌলিক গবেষণাগ্রন্থ দেশে-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে।

সাম্প্রতিক বিষয় এবং দূরাগত পরিণতি সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আবুল বারকাতের অন্তরস্থিত ক্ষমতা তাঁকে সর্বজনগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। তিনিই এদেশের প্রথম অর্থনীতিবিদ যিনি খাবার পানিতে আর্সেনিক দূষণের সামাজিক-অর্থনৈতিক অভিঘাত নিয়ে নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, ‘আর্সেনিকোসিস দারিদ্রের রোগ।’ তিনি খাবার পানি থেকে আর্সেনিক দূরীকরণে পরিবেশ-বান্ধব প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী বিষ্ময়কর গ্রেইঞ্জার চ্যালেঞ্জ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার (এনএই, যুক্তরাষ্ট্র) প্রাপ্ত ‘সনো ফিল্টার’ আবিষ্কারের সহকর্মী। তিনিই প্রথম এদেশে মৌলবাদের অর্থনীতি নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিশ্লেষণ করেছেন। অন্যত্র তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, ‘বাংলাদেশে নগরায়ন হচ্ছে আসলে বস্তিয়ায়ন প্রক্রিয়া’, ‘খানায় বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন সম্ভব।’ তিনিই প্রথম গভীর বিশ্লেষণপূর্বক দেখিয়েছেন যে পদ্মা সেতুসহ অনেক জাতীয় গুরুত্বপুর্ণ অবকাঠামো বিনির্মাণ নিজস্ব অর্থায়নেই সম্ভব।  

তাঁর গবেষণা, চিন্তা ও লেখার বিষয়- অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রত্যক্ষ বিনিয়োগসহ বিনিয়োগ আবহ, শিল্প অর্থায়ন, মানব উন্নয়ন, মানব উন্নয়ন এবং নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উন্নয়নের অধিকার, জমি-জলা অধিকার, বিশ্বায়ন এবং উন্নয়ন, জ্বালানী-বিদ্যুৎ এবং দারিদ্র বিমোচন, জাতীয় বাজেট এবং দারিদ্র, দারিদ্রের রোগ, কল্যাণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ঋণ এবং উন্নয়নের অধিকার, ভূমিহীনতা এবং গ্রামীণ দারিদ্র, জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ, শিশু দারিদ্র, যুব দারিদ্র, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্য, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য ইত্যাদি। তিনি প্রতিনিয়ত গভীরভাবে আরো যেসব বিষয়ে গবেষণা করে চলেছেন, তা’হলো: উন্নয়ন এবং মানব উন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতি, উন্নয়ন এবং দারিদ্র বিমোচন, ভূমি-পানি-জ্বালানী এবং উন্নয়ন প্রসঙ্গ, মানবাধিকার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠির উন্নয়নের অধিকার, টেকসই উন্নয়ন বিশ্লেষণ, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মূল্যায়ন এবং বিশ্লেষণ, প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা, মানব সম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ-ভিত্তিক গবেষণা, উন্নয়নে নারী, আঞ্চলিক জ্বালানী নিরাপত্তা, চেতনায়ন এবং কল্যাণমুখী মানসকাঠামো বিনির্মাণ প্রক্রিয়া, দুর্ভিক্ষ, জনমিতিক বিশ্লেষণ, মানব উন্নয়নে বৈষম্য, বিশ্বায়নের অধীন কৃষি এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, উৎপাদন পদ্ধতি বিতর্ক, বাংলাদেশে আত্ম-কর্মসংস্থান, বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণ ও অভিঘাত, অর্পিত সম্পত্তি আইনের রাজনৈতিক-অর্থনীতি, খাসজমির রাজনৈতিক-অর্থনীতি, মানব বঞ্চনার রাজনৈতিক-অর্থনীতি, ভূমি মামলার রাজনৈতিক-অর্থনীতি, সংবিধান ও উন্নয়ন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ ইত্যাদি।

দেশ-বিদেশের অনেক পেশাজীবী সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে বারকাত সম্পৃক্ত। তিনি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির একটানা চারবার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সমিতির মূখপাত্রের দায়িত্ব পালন  করেছেন। ইতোমধ্যে তিনবার নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, করোনা মহামারির কারণে গত দুই বছর সমিতির নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। ২০২১ এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান-এর দায়িত্ব পালন করেছেন (২০১০-২০১২)। তিনি প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২০১৭-২০২০)। এছাড়াও, তিনি Member, Scientific Advisory Board (2021-2030), Transformation, Integration and Globalization Economic Research (TIGER); Chairman of the Board– José Ramos-Horta (1996 Nobel laureate in peace) (১৯৯৬ ঘড়নবষ ষধঁৎবধঃব রহ ঢ়বধপব)। জার্মানির লিস্টব্রুক নামক সংস্থার বাংলাদেশের সম্মানিত ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দীর্ঘদিন যাবত।

গণমানুষের অর্থনীতিবিদ হিসেবে খ্যাত আবুল বারকাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন প্রথিতযশা অধ্যাপক। ড. বারকাত অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রথাবিরোধী, শেকড়-সন্ধানী এবং জন-হিতৈষী গবেষণার জন্য একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন। অর্থনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণায় অনন্য অবদানের জন্য তিনি  পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। পেয়েছেন ইউজিসি (ইউনির্ভাসিটি গ্রান্টস কমিশন) স্বর্ণপদক (২০১৭), ও সামাজিক গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রদত্ত বিচারপতি ইব্রাহিম স্মারক স্বর্ণপদক (২০০৪-২০০৫) সম্মাননা। অর্থনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণায় অনন্য অবদানের জন্য তিনি ২০০৯ সালে মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার পান।

আবুল বারকাত ২০০৯ সালে জনতা ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন। জনতা ব্যাংকে তাঁর সাফল্য অনেক, যার মধ্যে পরিচালন মুনাফা সর্ব্বোচ্চকরণের পাশাপাশি আছে দীর্ঘদিনের অস্থায়ী (ক্যাজুয়াল) কর্মচারীদের স্থায়ীকরণ, কর্পোরেট সোশাল রেসপনসিবিলিটি সংশ্লিষ্ট কর্মকা-ের দেশব্যাপী সম্প্রসারণ, ভূমিহীন-প্রান্তিক কৃষকদের জন্য স্বল্পমেয়াদী সুদমুক্ত ঋণ ইত্যাদি। তাঁর সময়ে ব্যাংকটি সার্বিক দিক দিয়ে উন্নতি লাভ করে। তাসত্ত্বেও মেয়াদান্তে তাঁকে অনেক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। একটি রেন্টসিকার, পরজীবী গোষ্ঠী তাঁকে জড়িয়ে ভ্রান্ত ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাঁর সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালান। কিন্তু তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এসব ভিত্তিহীন প্রচারণার বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জানান। যে প্রতিবাদের কোন প্রত্যুত্তর মেলেনি।

আবুল বারকাত হলেন সেই অর্থনীতিবিদ যিনি সর্বদা দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করেন এবং তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট। তিনি সাধারণ মানুষের কথা বলেন, তাদের মতোই জীবন যাপন করেন। সেজন্য তিনি গণমানুষের অর্থনীতিবিদ হিসেবে খ্যাত। তিনি অন্তরে ধারণ করে আছেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বির্নিমাণের স্বপ্ন। প্রতি মুহূর্তে তিনি এদেশে বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক আলোকিত সমাজ বির্নিমাণে কাজ করে যাচ্ছেন। মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণার মাধ্যমে তিনি স্বদেশ ও জনগণের কল্যাণে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আবুল বারকাত পিস অ্যান্ড প্রোগ্রেস ফাউ-েশনের মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র, কন্যাদায়গ্রস্ত মাতা-পিতা, জটিল রোগে আক্রান্ত ও অন্যান্য মহান উদ্যোগে নিরবে, নিভৃতে সহযোগিতা করে চলেছেন ।

দূরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রিয়তমা পত্নীর অকাল মৃত্যুর পরও তিনি মনোবল হারাননি। এখনো রাত দিন চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে জানামতে আঠারো ঘণ্টা কাজের মধ্যে ডুবে থাকেন। সাধারণ খাদ্য দিয়ে দুপুর ও রাতের খাবার খান। রিকশা বা ভাড়ায় চালিত যানবাহনে চলাচল করেন। সাধারণ পোষাক পরেন। অথচ জ্ঞানচর্চার যে ভূবনে (গবেষণাকর্ম) তিনি বিচরণ করেন সেখানে অর্থের কোনো অভাব নেই। কিন্তু অর্থের মোহ তাকে কখনই তাঁর স্থিরকর্তব্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। মুজিব জন্মশতবর্ষে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি এমন একজন অর্থনীতিবিদকে ‘মুজিব স্বর্ণ পদকে’ ভূষিত করায় আমরা আনন্দিত ও গর্বিত। ভবিষ্যতে এই অনন্যসাধারণ অর্থনীতিবিদকে সরকার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করে তারপ্রতি যথাযথ সম্মান জানাবে বলে  দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

ড. মতিউর রহমান: গবেষণা পরামর্শক, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (এইচডিআরসি)।

‘রাতের ভোট’: আত্মসমালোচনা ইসির



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা আছে। ওই ভোট দিনের বেলার পাশাপাশি রাতেও হয়েছে বলে সরকারবিরোধী অংশের জোর প্রচার। বর্তমান সরকারকে ‘রাতের ভোটের অবৈধ সরকার’ বলে অভিযুক্ত করে আসছে বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলো। আওয়ামী লীগ বরাবরের মতো সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জনগণ তাদের সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে ফের ক্ষমতায় এনেছে এমনই দাবি তাদের। আওয়ামী লীগের দাবি বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে দেশবাসী প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে বিপুল বিজয় উপহার দিয়েছে।

ভোট নিয়ে নানা অভিযোগ মাথায় নিয়েই বিদায় নিয়েছে সাবেক ইসি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নুরুল হুদা বারবার রাতের বেলায় ভোটের অভিযোগ অস্বীকার করলেও আবার আকারে ইঙ্গিতে সেটা কবুলও করেছেন একাধিকবার। তবে এনিয়ে তার মধ্যে অনুশোচনা লক্ষ্য করা যায়নি, বরং নিজেকে সফল দাবিও করে গেছেন শেষ পর্যন্ত। যদিও তার নেতৃত্বাধীন কমিশনের অন্য কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন একাধিকবার এবং সিইসির সঙ্গে তার বিরোধ ছিল প্রকাশ্য। সিইসির সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধের কারণে হোক আবার অনুশোচনার কারণেই হোক ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে তিনি তার খেদের কথা বারবার বলেছেন। নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতার কথা বললেও ব্যর্থতা স্বীকার করে পদত্যাগ করার সাহস দেখাতে পারেননি। তিনিও অন্যদের মতো সাংবিধানিক সকল সুযোগসুবিধা গ্রহণ করে মেয়াদ পূরণ করেই বিদায় নিয়েছেন।

আগের নির্বাচন কমিশন (ইসি) ‘রাতের ভোট’ নিয়ে নানা কথা বলেছে, বর্তমান ইসিও। মঙ্গলবার (২৪ মে) রাজধানীর নির্বাচন ভবনে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, নির্বাচনকে প্রহসনে রূপান্তর করার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই। এটা আমরা অন্তর থেকে বলছি। সুন্দর নির্বাচন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সুস্থ ধারা অব্যাহত থাকুক। ভোট নিয়মানুযায়ী হবে, দিনের ভোট দিনেই হবে। ভোট রাতে হবে না—এটা স্পষ্ট করে বলতে চাই। সিইসির এই বক্তব্য চলমান নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের নানা আলোচনার বিপরীতে আস্থা ফেরানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে চাই।

আগের ভোট রাতে হয়েছে কি-না এনিয়ে প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি, কোন আদালতও এটা বলেনি। বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোসহ দেশের অনেকের ধারণা এমনই। এই ধারণার বাইরে যেতে পারেনি সাবেক ও বর্তমান নির্বাচন কমিশন। ভোট রাতে কি দিনে হয়েছে এটা এখন পর্যন্ত অমীমাংসিত বিষয়, এনিয়ে নির্বাচন কমিশন যখন কথা বলে তখন মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগে। তবে সন্দেহ ও অনাস্থা থেকে আস্থা ফেরানোর যে পদক্ষেপ সেটা বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিচ্ছে বলে ধারণা করা যায় ইঙ্গিতবহ স্বীকারোক্তি কিংবা আত্মসমালোচনা থেকে। এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে বরং আগ্রহী।

বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যর্থতা একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের অভিযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারেনি। গত নির্বাচনে বিপুল পরাজয়ের পর তারা সেই নির্বাচন নিয়ে কোন কাজ করেছে বলে দৃশ্যমান হয়নি। নির্বাচনের ফলাফলের বিপর্যয় কী কারণে ঘটল তা নিয়ে কিছু মেঠো-বক্তৃতা দেওয়া ছাড়া আর কোন কাজ করেনি তারা। নির্বাচনের পর আসনভিত্তিক ফলাফল নিয়ে আগের নির্বাচনগুলোর সঙ্গে সবশেষ নির্বাচনের ভোটের সংখ্যা নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে সেগুলো দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করলে ওখান থেকে তারা অনেক কিছু পেতে পারত। এর মাধ্যমে তারা নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণা করাতে পারত না ঠিক তবে মানুষের কাছাকাছি যেতে পারত। লড়াইটা হতে পারত বুদ্ধিবৃত্তিক, কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে শক্তিহীন বিএনপি যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রেও শক্তিহীন একটা দল সেটাই প্রমাণ করেছে তারা।

বিএনপির এই ব্যর্থতা রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক। এর সুযোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তারপরেও ‘রাতের ভোট’ নিয়ে আলোচনা আছে। সরকার দল আওয়ামী লীগ যতই এটা অস্বীকার করুক না কেন মানুষের মনে বিভ্রান্তি আছে, নানা মত আছে ইসিতেও। নির্বাচন কমিশন এনিয়ে কথা বলার মধ্যে আত্মসমালোচনার যে পথ দেখাচ্ছে এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। আগের ‘ভুল’ শুধরে নিয়মানুযায়ী ভোটগ্রহণের যে প্রত্যয় বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মধ্যে দেখা যাচ্ছে এটা দেখে আশাবাদী হতে পারে দেশের মানুষ, আশাবাদী হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো; নির্বাচন হতে পারে অংশগ্রহণমূলক। বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে অস্বীকার তত্ত্ব এই নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে আমাদের।

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি-না এনিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে, কারণ বর্তমান সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা আছে বিএনপির। আবার বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে না আওয়ামী লীগ সরকার। আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক কিংবা জাতীয় সরকারের দাবি আদায়ের মাঠের শক্তিও নেই বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোর। ফলে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের চ্যালেঞ্জ আছে নির্বাচন কমিশনের। তারা পারবে কি-না এটা সময়ই বলে দেবে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের যে অবস্থান তাতে অন্তত আশাবাদী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।

নিয়মানুযায়ী দিনের ভোট, অনিয়মের রাতের ভোট—এ আলোচনা চলতেই থাকবে। তবু মানুষকে আস্থা রাখতে হবে নির্বাচন কমিশনের ওপর। বর্তমান নির্বাচন কমিশন কতটুকু কী করতে পারবে এনিয়ে এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছার সময় হয়নি দেশবাসীর। তারা মানুষের আস্থা ফেরাতে কাজ করছে, আপাতত এটাই স্বস্তির। কাজের আগে কাজ নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়, তাদেরকে সমর্থনের পাশাপাশি দিতে হবে প্রয়োজনীয় সময়। দেশবাসীর সমর্থন পেলে তারা তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারবে বলে বিশ্বাস রাখতে চাই।

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

রবীন্দ্রনাথ কোনদিন আমাকে কল করেননি!



ডা. রাজীব দে সরকার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘুম ভাঙলো একা একাই।

একটু ঘেমে গিয়েছি।

চোখ খুলে একবার মনে হলো, নিজের ঘরটাকেও চিনতে পারছি না।

মোবাইলটা বাজছে। সম্ভবত: এ কারনেই ঘুম ভেঙেছে।

- হ্যালো, কে? (ঘুম এখনো কাটেনি আমার কন্ঠে)

- আমি শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জোড়াসাঁকোর। তুমি এক সময় আমার কবিতা পড়েছো।

- ও, কি চাই? আমি ভ্যাকসিন সংক্রান্ত কাজে জড়িত নই।

- আমার ভ্যাকসিন লাগবে না, বাবা।

("বাবা" বলায় একটু ঘুম কাটিয়ে কথা বলা চেষ্টা করলাম। কারন রোগীদেরকে 'বাবা' বলে সম্বোধন করতেন আমার সার্জারীর গুরু)

- ও, কেন ফোন দিয়েছেন, কেউ কি অসুস্থ?

- হ্যাঁ অসুস্থ। সেটা বলতেই ফোন দেওয়া।

- জ্বী, বলুন। আমি শুনছি।

- বৈদ্য রাজীব, তোমার সমাজের একদল পুরুষ খুব অসুস্থ।

- আচ্ছা কাল হসপিটালে পাঠিয়ে দেবেন, দেখে দেবো।

- পারবে তো দেখে দিতে? আচ্ছা, একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো। তোমরা কবিতা পড়া ছেড়ে দিলে কেন?

- কবিতা পড়া ছাড়িনি তো।

- মিথ্যা কথা। তোমরা এখন কবিতা পড়ো না। আগের পড়া কবিতাগুলো কোটেশন অভ্র দিয়ে লিখে ফেইসবুকে পোস্ট করো। শেয়ার করো। ব্লগে লেখো। কিন্তু কবিতা আর পড়ো না।

- ও, তাহলে বোধহয় ভালো লাগে না। আপনি লেখেন এখনো?

- না। লেখার প্রয়োজন পড়ে না। কবিতা-গল্প কিছুই লিখি না

- কেন?

- তোমাদের সমাজে নিরুপমা, কেটি, বিনোদিনী, গোড়া কিংবা হৈমন্তী এরা আজো কেউ ভালো নেই। অপু সেদিনও ওরা বাবার করা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে নি, আজো একজন মেয়ে লাঞ্ছিত হলে তোমরা প্রতিবাদ করো না। তোমাদের চোখের সামনে জলজ্যান্ত মেয়েদের সম্ভ্রমহানি হয়। তোমরা প্রতিবাদ করো না।

- নাহ। প্রতিবাদ তো করি।

- দৌড়ে গিয়ে ফেইসবুকে বসে টিপাটিপি শুরু করলে তাকে কি প্রতিবাদ বলে? প্রোফাইল পিকচার টা কালো রঙের করে দিলেই বুঝি প্রতিবাদ হয়? গান্ধী - মুজিবরা এই শিখিয়েছিলো তোমাদের?

- না, আমরা বীরের জাতি, আমরা অন্যায় সহ্য করি না।

- এজন্যই আমি গল্প-কবিতা লেখা ছেড়েছি।

- মানে?

- নিজেকে বীরের জাতি ভেবেই লেখালেখি করতাম। কিন্তু তোমাদের নির্বুদ্ধিতায় আমারই লেখা নারী চরিত্ররা আমাকে অপমান করে। আমারই লেখা ধর্মান্ধ চরিত্র গুলো আমাকে দেখে হাসে।

- পহেলা বৈশাখের কথা বলছেন? নাকি বাউলের চুল কেটে দেওয়া? নাকি মৌলবাদীদের ফতোয়া? আমি বুঝতে পারছি না।

- কুষ্টিয়ায় ছিলাম কিছুদিন। বাংলাদেশ গেছি বহুবার। এমন বাংলাদেশ আমরা রেখে আসিনি। হানাদার নেই যে দেশে, সে দেশে আমাদের কন্যাদের ধর্ষণ করে কারা? কেন আজো আমার দেশের বাতাস একজন অত্যাচারিত মেয়ের চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে, বলতে পারো?

- আপনি রাজনৈতিক কথা বলছেন।

- "মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে... পার হয়ে আসিলাম... আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়; রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়, আমার পুরানো নাম, ..ফিরিবার পথ নাহি"

- থামেন, মাঝরাতে কবিতা ভালো লাগছে না

- থামলাম, কিন্তু মানুষের চিকিৎসার পাশাপাশি সমাজের চিকিতসা শুরু করো বৈদ্য।

- সে দায় কি আমার একার নাকি?

- দায় আমাদের সবার। হৈমন্তীর গা থেকে কাপড় খুলে নেওয়া হলে, ওর আগে তোমার সমাজ ল্যাংটা হবে, তুমি ল্যাংটা হবে - সাদা পাঞ্জাবী পড়ে শরীরের কালো লুকানো যায়, মনের কালি না। তাই সমাজের চিকিৎসা করার দায় বৈদ্য-বণিক-শিক্ষক-ছাত্র-সাহিত্যিক-ব্লগার সবার!

- কি করবো?

- তোমার যতোটুকু করার আছে।

- যদি আমার ক্ষতি হয়?

- তোমার ঘরের সামনে তোমারই প্রেয়সীর কাপড় ধরে টানা হলো। এর থেকে আর কি ক্ষতিই বা হতে পারে। এটা তো ১৯৭১ না। নাকি তোমরা মনে করো, মরে যাওয়া পাকিস্তানি হানাদার গুলো, তোমাদের শরীরে আবার জন্ম নিয়েছে?

- ছিঃ ছিঃ এসব কি বলেন?

- আমার লেখা গানটাকে এবার ছেড়ে দাও। ওটা নিয়েও তোমাদের জাতের রশি ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এক মালাউন কবির গান দিয়ে কেন তোমরা দেশের সব শুভ কাজ শুরু করবে?

- আমার ঘুম পাচ্ছে, কাল সকালে হসপিটালে যাবো

- বেশ, বাঙ্গালী। জাতি হিসেবে তুমি ঘুমিয়ে যাও। ঘুমিয়ে থাকো। ঠিক যেমন করে আমার নোবেলটি চুরি গেলো, তোমার-তোমাদের প্রতিবাদ করার শক্তিটুকুও নিঃশব্দে চুরি গেছে তা তোমরা জানো না।

- আচ্ছা আপনি আমাকে এসব বলছেন কেন, হ্যালো... ... শুনছেন...

- টু... টু... ... টুট...টু

আমি ঘুমিয়ে গেলাম, অনেক গভীর সে ঘুম...

আমার সামনে আমার সমাজের মেয়েরা আক্রান্ত হলেও ভাঙে না সেই ঘুম...

আমার সামনে রেল স্টেশনে কয়েকজন মিলে একজন নারীর কাপড় ধরে টানলেও ভাঙে না সেই ঘুম। যে দেশে হানাদার নেই, চরিত্রহীন জমিদার নেই, তারপরো মেয়েদের সম্ভ্রম হানি হলে ভাঙে না সেই ঘুম... সেই ঘুম পাচ্ছে আমার...

পুনশ্চ:

আজ নারী দিবস না। এটা নারী দিবসের লেখা না। যে দেশে বাঁধাহীন ভাবে পথে ঘাটে একজন নারী কিংবা একজন পুরুষের সম্মান ক্ষুন্ন হতে পারে, এটা সেই 'প্রতিবাদ করতে ভুলে যাওয়া' মানুষের দেশের জন্য লেখা। ভাগ্যিস আমরা সেই দেশে থাকি না!

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক, সার্জারী বিভাগ (৩৩ বিসিএস), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

;

'স্টকহোম সিনড্রোম' নাকি আবহমান প্রতিবাদহীন নারী নির্যাতন?



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৭৩ সালে সুইডেনে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিলো। সে বছর ২৩ শে আগস্টের সকালবেলা সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের স্পেরিকাস ক্রেডিট ব্যাংকে একটা ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময়ে ডাকাত দল অনেক জনকেই ব্যাংকের মধ্যে জিম্মী করে রাখেন এবং সেটা টানা ৬ দিন ধরে। তাদের মধ্যে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তো ছিলেনই।

ছয় দিন পর পুলিশ যখন ডাকাত দলের উপরে অ্যাকশনে যায়, তখন ব্যাংকে জিম্মী থাকা মানুষগুলো উলটো ডাকাতদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলো। এই ঘটনায় সবাই অবাক হয়ে পরেন।

যারা আটকে রাখলো, তাদের প্রতিই এই ভালোবাসা কিভাবে তৈরী হলো! এমনকি দেশের প্রেসিডেন্ট মহোদয় যখন অপহৃত ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, তখন ডাকাতদের প্রতি সহমর্মিতার ব্যাপারেও আবেদন জানিয়েছিলেন অপহৃত ব্যক্তিরা। এই ঘটনা তখন ঘটা করে রেডিওতে প্রচার পেয়েছিলো।

এই ঘটনা থেকেই "স্টকহোম সিনড্রোম" কথাটার জন্ম। আমাদের দেশেও এমন ঘটনা ঘটে।

দেখা যায়, একজন স্বামী তার স্ত্রীর উপর নির্যাতন করলেন, এমনকি নির্যাতনের এক পর্যায়ে হত্যা চেষ্টাও করলেন। পরবর্তীতে স্ত্রীর বাপ-ভাই যখন তার স্বামীর নামে মামলা করলো, স্ত্রী আদালতে গিয়ে স্বাক্ষ্য দিলেন যে, এই অত্যাচার তার স্বামী করেন নাই বা তার স্বামী একজন আপাদমস্তক ভালো মানুষ।

এটাকেও 'স্টকহোম সিনড্রোম' বলা যায়।

দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচারিত হতে হতে অত্যাচারকারীর প্রতি এক সময় একটি অসুস্থ আবেগ বা অস্বাভাবিক দুর্বলতার জন্ম হয়।

অত্যাচার সহ্য করে হলেও তাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না। এভাবেই একটি জনপদে শিশু নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতনগুলো আলো বা বিচারের মুখ দেখে না।

২০০২ সালে মাত্র স্টন হর্ণব্যাক নামের এক ব্যক্তিকে অপহরণ করা হয়। তাকে প্রায় ২ বছর পরে অপহরণকারীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে অত্যাচারের চিহ্ণ ছিলো। তদন্তে দেখা যায়, অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে পালানোর কোনো চেষ্টা করেনি। এমনকি স্টন হর্ণব্যাকের কাছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পর্যন্ত ছিলো!

২০২২ সালে একটি জেলার একটি লোকারণ্য রেলস্টেশনে একজন নারী অন্য একজন নারীর উপরে আক্রমনাত্নক হয়ে ওঠেন। প্রথন নারীর অভিযোগ এই যে, দ্বিতীয় নারী একটি স্লিভলেস পোশাক পরিধান করেছেন যা মোটেও সেই দেশে কোন ফৌজদারী বা দেওয়ানী অপরাধ না।

কিন্তু সারা জীবন একটি মহলের দ্বারা শাসিত ও পদদলিত হয়ে থাকতে থাকতে প্রথম নারী তার ব্যক্তিসত্ত্বাকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছেন। পোশাকের মতো একটি সাধারণ নাগরিক 'অধিকার' তার কাছে অনৈতিক, বেমানান ও অসামাজিক মনে হচ্ছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটি অসুস্থ অংশের এই নোংরা শোষণের প্রতি তার গভীর আবেগ ও ভালোবাসা তৈরী হয়েছে। তাই সেই দিন একজন নারী হয়েও অন্য একজন নারীকে আক্রমণ করতে, শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিত করতে এবং দ্বিতীয় নারীর গায়ের পোশাক টেনে ছিঁড়ে ফেলতেও তার খারাপ লাগছিলো না। অথচ 'স্বল্প' পোশাক পরিধান নিয়েই তার অভিযোগ ছিলো। কিন্তু তিনি নিজেই আবার অন্য নারীটির পোশাক ছিঁড়ে ফেলছেন নির্দ্বিধায়। আবার এই কাজে তিনি সেই সমাজের গুটিকয়েক পুরুষের সাহায্য নিচ্ছেন!

সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থা একদিনে তৈরী হয় না। মানসিক দৈন্যতার এই স্তরে যেতে কয়েক মাস, কয়েক বছর এমনকি কয়েক প্রজন্ম লেগে যেতে পারে।

অত্যাচারকারীর প্রতি এই স্নেহ বা আবেগ অনেক সময় বিপদজনক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এমনকি এ সময় কেউ উদ্ধারে এগিয়ে এলে তাকেও আক্রমণ করে বসতে পারেন স্টকহোম সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি। অবশ্য ক্রিমিনোলজিস্টরা অনেকে স্টকহোম সিনড্রোমে বিশ্বাস করে না।

যাই হোক, চোখের সামনে প্রতিনিয়ত একটি অন্যায় দেখছেন, অথচ সেই অন্যায়ে আপনি কোন বাঁধা দিচ্ছেন না। বরং সেই অন্যায় আপনার ভালো লাগছে, মজা লাগছে। সেই অন্যায়কে আপনি যত্নে এবং খুব গর্বে লালন করছেন, পৃষ্ঠপোষকতা করছেন -

এরকম উদাহরণ এই দেশে কি খুব বেশি অপ্রতুল?

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক, সার্জারী বিভাগ (৩৩ বিসিএস), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

;

জেট ফুয়েল প্রাইস, সরু আলোর পথটাকে রুদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনা মহামারির পর সরু আলোর পথ দেখা যাচ্ছিল এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম সেক্টরে। সেই পথকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলতে যারপর নাই চেষ্টা করে যাচ্ছে জেট ফুয়েল প্রাইস। জেট ফুয়েলের প্রাইস নির্ধারণ করে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন। কখনো লোকসানকে পুষিয়ে নিতে দাম বৃদ্ধি করে থাকে, কখনো যুদ্ধের ডামাডোলে রিনঝিন পায়ে নুপুরের ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে জেট ফুয়েলের প্রাইস বৃদ্ধি করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে বিপিসি নিয়ন্ত্রাধীণ পদ্মা অয়েল কোম্পানী।

বাংলাদেশ এভিয়েশনের যাত্রা শুরু থেকেই বন্ধুর পথে হাঁটা একটি সেক্টর। দেশের প্রায় ১৫ মিলিয়ন জনগন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে কিংবা কাজের প্রয়োজনে অথবা ভ্রমনের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করে থাকে আকাশ পথে। আর আকাশ পথে যাতায়াতের জন্য বৃহদাংশই বহন করছে বিদেশী বিমান সংস্থাগুলো।

নানা প্রতিবন্ধকতা আর সীমাবদ্ধতার কারনে জাতীয় বিমান সংস্থাসহ বেসরকারী বিমান সংস্থাসমূহ প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না। বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলোর সাথে সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া সরকারী বিভিন্ন সংস্থাগুলোর সহযোগিতা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। এর মাঝে অন্যতম হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিভিল এভিয়েশন অথরিটি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন প্রমুখ।

কোভিডকালীন সময়  ও কোভিড পরবর্তী গত আঠারো মাসে জেট ফুয়েলের মূল্য বেড়েছে ১৩০ শতাংশ। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ছিলো প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য ৪৬ টাকা অথচ গত আঠারো মাসে প্রায় ১৫ বার জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি করে বর্তমানে দাড়িয়েছে ১০৬ টাকা। যা বাংলাদেশের এভিয়েশনের ইতিহাসে জেট ফুয়েল প্রাইসের সর্বোচ্চ রেকর্ড। যে রেকর্ড একটি খাতকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্যই যথেষ্ট। যে রেকর্ড আকাশ পথের যাত্রীদের বিপর্যস্ত করে তুলে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত করে, সেই রেকর্ড কখনো প্রত্যাশিত নয়।

বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সকে প্রতিযোগিতা করতে হয় সকল বিদেশি এয়ারলাইন্স এর সাথে। জেট ফুয়েল প্রাইস সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ভাড়ার উপর। সেই ভাড়া বৃদ্ধির ফলে দেশীয় এয়ারলাইন্স চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দর সময়ে নব প্রতিষ্ঠিত তিনটি এয়ারলাইন্স- ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, এভিয়ানা এয়ারওয়েজ ও বেস্ট এয়ার, জেট ফুয়েলের উর্ধ্বগতির সাথে তাল না মিলিয়ে চলতে না পারার কারনে এভিয়ানা এয়ারওয়েজ, বেস্ট এয়ার বছর ঘোরার আগেই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলো। যার ফলে বাংলাদেশ এভিয়েশন ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছিলো সাথে বেসরকারী বিনিয়োগে নিরোৎসাহী হতে দেখা গিয়েছিলো এভিয়েশন খাতে।

কোভিডকালীন সময়ে এয়ারলাইন্সগুলো বিভিন্ন চার্জ বিশেষ করে এ্যারোনোটিক্যাল ও নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ মওকুফের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেছিলো এভিয়েশন সেক্টরটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলে সত্য চার্জ মওকুফের পরিবর্তে নতুন দু’টি চার্জ সংযুক্ত হতে দেখেছি- তা হচ্ছে বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি এবং নিরাপত্তা ফি। যা সরাসরি যাত্রীদের ভাড়ার উপর বর্তায়।

এই সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার কর্মীবাহিনী যুক্ত আছে। যাদের ভবিষ্যতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন না করে সেক্টরটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন পথ বের করে দেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে সহায়তা করুন। বর্তমানে জিডিপি’র ৩ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম সেক্টরের। সঠিক পরিচালনার মাধ্যমে এই সেক্টর থেকে ১০ শতাংশ অংশীদারিত্ব রাখা সম্ভব জিডিপি-তে।

সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা এভিয়েশন সেক্টরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে, সাথে ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি, হোটেল ইন্ডাস্ট্রিসহ সকল ইন্ডাস্ট্রিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সকল শিল্পের গতিশীলতা বজায় রাখতে হলে এভিয়েশনের গতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকলে সেই দিকে সচেতন হলে এভিয়েশন সেক্টর বেঁচে যাবে।

জেট ফুয়েল প্রাইস সহ বিভিন্ন চার্জ নির্ধারণের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে দেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির কথা বিবেচনায় রেখে দেশের নাগরিকদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন। তাহলে দেশের উন্নয়নমূখী একটি খাত নিশ্চিত ক্ষতি হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে।    

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;