বিশ্বের ট্রাভেল ও পর্যটনকে হাতের মুঠোয় এনেছে অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সারাবিশ্বে অনলাইন ট্রাভেলে এজেন্সি (ওটিএ) ট্রাভেল ব্যবসায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায় গতি বাড়ছে। জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এ ব্যবসা। বাংলাদেশে অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা খুব অল্প দিনেই ট্রাভেলারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এই সুযোগে শুরুতেই কিছু অসাধু –সুযোগ সন্ধানীদের কবলে পড়েছে বাংলাদেশের অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা। হালট্রিপ কিংবা ২৪টিকেট ডট কমের মতো অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির মতো কিছু প্রতিষ্ঠান অগ্রসরমূখী এ ব্যবসাকে নানাবিধ প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। তারপরও এগিয়ে যাবার পালা।

সারাবিশ্বের লক্ষ লক্ষ হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট বুকিং এর জন্য ১৯৯৪ সালে প্রথম ট্রাভেলওয়েব ডট কম এর আবির্ভাব ঘটে। এ ছাড়া ১৯৯৫ সালে ওয়ার্ল্ডওয়াইড ওয়েবের মাধ্যমে ইন্টারনেট ট্রাভেল নেটওয়ার্ক প্রথম এয়ারলাইন টিকেট বিক্রয় করে অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির ধারনার গোড়াপত্তন করে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের অক্টোবরে এক্সপেডিয়া ডট কম নামের ব্যবসায়িক সফলতার জন্য অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ প্রায় দু’দশক পর বাংলাদেশে অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসার পরিধি বিস্তৃতি লাভ করে।

প্রযুক্তি উন্নয়নে বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনলাইনে ভ্রমণ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি বাংলাদেশ ট্রাভেল মার্কেটে এক বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটানোর জন্য চেষ্টা করছে। অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিগুলো ভ্রমণ পিপাসু মানুষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সকল ধরনের সুবিধা নিয়ে পথ চলতে শুরু করেছে।

অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিগুলো সারা বিশ্বের সকল এয়ারলাইন্সের টিকেট সংগ্রহের উল্লেখযোগ্য প্লাটফর্ম হিসেবে ট্রাভেলারদের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়ার জন্য কাজ করছে। এ এজেন্সিগুলো অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সকল রুটের টিকেট বুকিং সেবাই দিচ্ছে না, পাশাপাশি হোটেল বুকিং, ভিসা প্রসেসিং, ট্যুর প্যাকেজসহ ভ্রমণ সংক্রান্ত সকল ধরনের সেবা দেয়ার হাব হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

ওয়ান স্টপ সার্ভিস কিংবা এক ক্লিকেই সব চাহিদা পূরণ যেভাবেই দেখি না কেনো অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি আপনার প্রত্যাশা পূরণে এগিয়ে এসেছে। আপনার চাহিদা অনুযায়ী যেকোনো প্রত্যাশা পূরণে সফলতা দেখিয়ে যাচ্ছে সারা বিশ্বের অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি প্রতিষ্ঠানগুলো।

ট্রাভেলারগণ অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির ওয়েবসাইটের মাধ্য পেমেন্টসহ নিজের টিকেট নিজেই সংগ্রহ করার স্বাধীনতা পেয়ে থাকেন। করোনা মহামারিতে কিংবা সময়ের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আপনার পছন্দ মতো তারিখ, গন্তব্য, বাজেটের সীমাবদ্ধতা কথা বিবেচনা করে এয়ারলাইন্স, হোটেলসহ অন্যান্য সুবিধা পছন্দ করার সুযোগ রয়েছে। সকল সুবিধার মধ্যেই গ্রাহক ইমেইলের মাধ্যমে টিকেট সংগ্রহ করতে পারেন যে কোনো সময়। গ্রাহকদের জন্য ২৪ ঘন্টা থাকছে অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির সকল সেবা।

অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি আপনার পছন্দমতো যেকোনো এয়ারলাইন্স, আসন চয়েসের জন্য ইকোনমি বা বিজনেস ক্লাস, হোটেল চয়েসের ক্ষেত্রে পাঁচ তারকা, চার তারকা কিংবা তিন তারকা যেকোনোটি হতে পারে আবার রুম চয়েসের ক্ষেত্রে ডিলাক্স, সুপার ডিলাক্স কিংবা স্যুট হতে পারে। সব কিছুই নির্ভর করে বাজেটের সীমাবদ্ধতার উপর। যেকোনো পছন্দকে অগ্রাধিকার দিয়ে ওটিএ গুলো গ্রাহকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

ওটিএ-এর ওয়েব সাইটে একই সাথে এভেইলেবল সব এয়ারলাইন্স এর ভাড়াসহ অন্যান্য তথ্য পেয়ে যাবেন, যার কারণে আপনি টিকেট সংগ্রহের ব্যাপারে সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

স্টান্ডার্ড সব অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি থেকে সেবা নেয়ার জন্য যেকোনো ধরনের ভিসা, মাস্টার কার্ড, আমেরিকান এক্সপ্রেস, ইউনিয়ন পে, ডিবিবিএল নেক্সাস, সিটি টাচ এর মাধ্যমে অনলাইনে পেমেন্ট দেয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া দেশে মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ, রকেট, নগদ ইত্যাদি ব্যবহার করেও সহজে পেমেন্ট দেয়া সম্ভব।

অস্বাভাবিক রকমের মূল্যছাড় কখনই অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির জন্য সুস্থ ব্যবসা পরিবেশ তৈরী করতে পারে না। অযৌক্তিক অফার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বয়কট করে সুস্থ স্বাভাবিক ধারার পরিবেশ তৈরী করে জনপ্রিয় এ ব্যবসাকে বাংলাদেশে আরো গতিশীল করার সুযোগ রয়েছে। গুটি কয়েকটি এজেন্সির অপেশাদারী আচরণের কারণে জনপ্রিয় খাতটি বারবার প্রশ্নের সম্মুখিন হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সবসময়ই মনিটরিং এর মধ্যে রাখা প্রয়োজন এ খাতটি। গ্রাহকদের সচেতন হওয়াটাও খুব জরুরী। যারা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গ্রাহকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে তাদের সুরক্ষা দেয়াও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায় সম্প্রতি ইউএস-বাংলা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ট্রিপলাভার ডট কম আত্নপ্রকাশ করেছে। স্বল্প সময়ের মধ্য গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা অর্জন করতেও সক্ষম হয়েছে। ট্রিপলাভারসহ বাংলাদেশে শেয়ারট্রিপ, গো যায়ান, ফ্লাইট এক্সপার্ট, বাইটিকেট সহ অনেকগুলো অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ইতিমধ্যে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স ও ট্রাভেল এজেন্সির সাথে ব্যবসায়িক সেতু বন্ধণ রচনা করতে সক্ষম হয়েছে। 

সুস্থ ধারার ট্রাভেল ব্যবসায় বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি। সারবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা জনপ্রিয় হয়ে উঠুক এই প্রত্যাশায় ট্রাভেল সংশ্লিষ্ট সকলে।

লেখক: মো. কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা গ্রুপ

'স্টকহোম সিনড্রোম' নাকি আবহমান প্রতিবাদহীন নারী নির্যাতন?



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৭৩ সালে সুইডেনে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিলো। সে বছর ২৩ শে আগস্টের সকালবেলা সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের স্পেরিকাস ক্রেডিট ব্যাংকে একটা ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময়ে ডাকাত দল অনেক জনকেই ব্যাংকের মধ্যে জিম্মী করে রাখেন এবং সেটা টানা ৬ দিন ধরে। তাদের মধ্যে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তো ছিলেনই।

ছয় দিন পর পুলিশ যখন ডাকাত দলের উপরে অ্যাকশনে যায়, তখন ব্যাংকে জিম্মী থাকা মানুষগুলো উলটো ডাকাতদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলো। এই ঘটনায় সবাই অবাক হয়ে পরেন।

যারা আটকে রাখলো, তাদের প্রতিই এই ভালোবাসা কিভাবে তৈরী হলো! এমনকি দেশের প্রেসিডেন্ট মহোদয় যখন অপহৃত ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, তখন ডাকাতদের প্রতি সহমর্মিতার ব্যাপারেও আবেদন জানিয়েছিলেন অপহৃত ব্যক্তিরা। এই ঘটনা তখন ঘটা করে রেডিওতে প্রচার পেয়েছিলো।

এই ঘটনা থেকেই "স্টকহোম সিনড্রোম" কথাটার জন্ম। আমাদের দেশেও এমন ঘটনা ঘটে।

দেখা যায়, একজন স্বামী তার স্ত্রীর উপর নির্যাতন করলেন, এমনকি নির্যাতনের এক পর্যায়ে হত্যা চেষ্টাও করলেন। পরবর্তীতে স্ত্রীর বাপ-ভাই যখন তার স্বামীর নামে মামলা করলো, স্ত্রী আদালতে গিয়ে স্বাক্ষ্য দিলেন যে, এই অত্যাচার তার স্বামী করেন নাই বা তার স্বামী একজন আপাদমস্তক ভালো মানুষ।

এটাকেও 'স্টকহোম সিনড্রোম' বলা যায়।

দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচারিত হতে হতে অত্যাচারকারীর প্রতি এক সময় একটি অসুস্থ আবেগ বা অস্বাভাবিক দুর্বলতার জন্ম হয়।

অত্যাচার সহ্য করে হলেও তাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না। এভাবেই একটি জনপদে শিশু নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতনগুলো আলো বা বিচারের মুখ দেখে না।

২০০২ সালে মাত্র স্টন হর্ণব্যাক নামের এক ব্যক্তিকে অপহরণ করা হয়। তাকে প্রায় ২ বছর পরে অপহরণকারীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে অত্যাচারের চিহ্ণ ছিলো। তদন্তে দেখা যায়, অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে পালানোর কোনো চেষ্টা করেনি। এমনকি স্টন হর্ণব্যাকের কাছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পর্যন্ত ছিলো!

২০২২ সালে একটি জেলার একটি লোকারণ্য রেলস্টেশনে একজন নারী অন্য একজন নারীর উপরে আক্রমনাত্নক হয়ে ওঠেন। প্রথন নারীর অভিযোগ এই যে, দ্বিতীয় নারী একটি স্লিভলেস পোশাক পরিধান করেছেন যা মোটেও সেই দেশে কোন ফৌজদারী বা দেওয়ানী অপরাধ না।

কিন্তু সারা জীবন একটি মহলের দ্বারা শাসিত ও পদদলিত হয়ে থাকতে থাকতে প্রথম নারী তার ব্যক্তিসত্ত্বাকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছেন। পোশাকের মতো একটি সাধারণ নাগরিক 'অধিকার' তার কাছে অনৈতিক, বেমানান ও অসামাজিক মনে হচ্ছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটি অসুস্থ অংশের এই নোংরা শোষণের প্রতি তার গভীর আবেগ ও ভালোবাসা তৈরী হয়েছে। তাই সেই দিন একজন নারী হয়েও অন্য একজন নারীকে আক্রমণ করতে, শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিত করতে এবং দ্বিতীয় নারীর গায়ের পোশাক টেনে ছিঁড়ে ফেলতেও তার খারাপ লাগছিলো না। অথচ 'স্বল্প' পোশাক পরিধান নিয়েই তার অভিযোগ ছিলো। কিন্তু তিনি নিজেই আবার অন্য নারীটির পোশাক ছিঁড়ে ফেলছেন নির্দ্বিধায়। আবার এই কাজে তিনি সেই সমাজের গুটিকয়েক পুরুষের সাহায্য নিচ্ছেন!

সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থা একদিনে তৈরী হয় না। মানসিক দৈন্যতার এই স্তরে যেতে কয়েক মাস, কয়েক বছর এমনকি কয়েক প্রজন্ম লেগে যেতে পারে।

অত্যাচারকারীর প্রতি এই স্নেহ বা আবেগ অনেক সময় বিপদজনক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এমনকি এ সময় কেউ উদ্ধারে এগিয়ে এলে তাকেও আক্রমণ করে বসতে পারেন স্টকহোম সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি। অবশ্য ক্রিমিনোলজিস্টরা অনেকে স্টকহোম সিনড্রোমে বিশ্বাস করে না।

যাই হোক, চোখের সামনে প্রতিনিয়ত একটি অন্যায় দেখছেন, অথচ সেই অন্যায়ে আপনি কোন বাঁধা দিচ্ছেন না। বরং সেই অন্যায় আপনার ভালো লাগছে, মজা লাগছে। সেই অন্যায়কে আপনি যত্নে এবং খুব গর্বে লালন করছেন, পৃষ্ঠপোষকতা করছেন -

এরকম উদাহরণ এই দেশে কি খুব বেশি অপ্রতুল?

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক, সার্জারী বিভাগ (৩৩ বিসিএস), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

;

জেট ফুয়েল প্রাইস, সরু আলোর পথটাকে রুদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনা মহামারির পর সরু আলোর পথ দেখা যাচ্ছিল এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম সেক্টরে। সেই পথকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলতে যারপর নাই চেষ্টা করে যাচ্ছে জেট ফুয়েল প্রাইস। জেট ফুয়েলের প্রাইস নির্ধারণ করে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন। কখনো লোকসানকে পুষিয়ে নিতে দাম বৃদ্ধি করে থাকে, কখনো যুদ্ধের ডামাডোলে রিনঝিন পায়ে নুপুরের ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে জেট ফুয়েলের প্রাইস বৃদ্ধি করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে বিপিসি নিয়ন্ত্রাধীণ পদ্মা অয়েল কোম্পানী।

বাংলাদেশ এভিয়েশনের যাত্রা শুরু থেকেই বন্ধুর পথে হাঁটা একটি সেক্টর। দেশের প্রায় ১৫ মিলিয়ন জনগন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে কিংবা কাজের প্রয়োজনে অথবা ভ্রমনের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করে থাকে আকাশ পথে। আর আকাশ পথে যাতায়াতের জন্য বৃহদাংশই বহন করছে বিদেশী বিমান সংস্থাগুলো।

নানা প্রতিবন্ধকতা আর সীমাবদ্ধতার কারনে জাতীয় বিমান সংস্থাসহ বেসরকারী বিমান সংস্থাসমূহ প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না। বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলোর সাথে সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া সরকারী বিভিন্ন সংস্থাগুলোর সহযোগিতা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। এর মাঝে অন্যতম হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিভিল এভিয়েশন অথরিটি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন প্রমুখ।

কোভিডকালীন সময়  ও কোভিড পরবর্তী গত আঠারো মাসে জেট ফুয়েলের মূল্য বেড়েছে ১৩০ শতাংশ। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ছিলো প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য ৪৬ টাকা অথচ গত আঠারো মাসে প্রায় ১৫ বার জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি করে বর্তমানে দাড়িয়েছে ১০৬ টাকা। যা বাংলাদেশের এভিয়েশনের ইতিহাসে জেট ফুয়েল প্রাইসের সর্বোচ্চ রেকর্ড। যে রেকর্ড একটি খাতকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্যই যথেষ্ট। যে রেকর্ড আকাশ পথের যাত্রীদের বিপর্যস্ত করে তুলে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত করে, সেই রেকর্ড কখনো প্রত্যাশিত নয়।

বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সকে প্রতিযোগিতা করতে হয় সকল বিদেশি এয়ারলাইন্স এর সাথে। জেট ফুয়েল প্রাইস সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ভাড়ার উপর। সেই ভাড়া বৃদ্ধির ফলে দেশীয় এয়ারলাইন্স চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দর সময়ে নব প্রতিষ্ঠিত তিনটি এয়ারলাইন্স- ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, এভিয়ানা এয়ারওয়েজ ও বেস্ট এয়ার, জেট ফুয়েলের উর্ধ্বগতির সাথে তাল না মিলিয়ে চলতে না পারার কারনে এভিয়ানা এয়ারওয়েজ, বেস্ট এয়ার বছর ঘোরার আগেই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলো। যার ফলে বাংলাদেশ এভিয়েশন ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছিলো সাথে বেসরকারী বিনিয়োগে নিরোৎসাহী হতে দেখা গিয়েছিলো এভিয়েশন খাতে।

কোভিডকালীন সময়ে এয়ারলাইন্সগুলো বিভিন্ন চার্জ বিশেষ করে এ্যারোনোটিক্যাল ও নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ মওকুফের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেছিলো এভিয়েশন সেক্টরটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলে সত্য চার্জ মওকুফের পরিবর্তে নতুন দু’টি চার্জ সংযুক্ত হতে দেখেছি- তা হচ্ছে বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি এবং নিরাপত্তা ফি। যা সরাসরি যাত্রীদের ভাড়ার উপর বর্তায়।

এই সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার কর্মীবাহিনী যুক্ত আছে। যাদের ভবিষ্যতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন না করে সেক্টরটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন পথ বের করে দেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে সহায়তা করুন। বর্তমানে জিডিপি’র ৩ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম সেক্টরের। সঠিক পরিচালনার মাধ্যমে এই সেক্টর থেকে ১০ শতাংশ অংশীদারিত্ব রাখা সম্ভব জিডিপি-তে।

সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা এভিয়েশন সেক্টরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে, সাথে ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি, হোটেল ইন্ডাস্ট্রিসহ সকল ইন্ডাস্ট্রিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সকল শিল্পের গতিশীলতা বজায় রাখতে হলে এভিয়েশনের গতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকলে সেই দিকে সচেতন হলে এভিয়েশন সেক্টর বেঁচে যাবে।

জেট ফুয়েল প্রাইস সহ বিভিন্ন চার্জ নির্ধারণের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে দেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির কথা বিবেচনায় রেখে দেশের নাগরিকদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন। তাহলে দেশের উন্নয়নমূখী একটি খাত নিশ্চিত ক্ষতি হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে।    

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;

গণকমিশনের শ্বেতপত্র ও আলোচিত ১১৬!



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সরকারের নানা উদ্যোগে মাঠপর্যায়ের জঙ্গি দমনে সাফল্য এসেছে। তবে রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবে এই মোকাবিলা করার কোন উদ্যোগ দৃশ্যমান হচ্ছে না। ফলে আইনশৃঙ্খলাকারী বাহিনীগুলোর নিয়মিত নজরদারি ও অভিযানগুলো বন্ধ হয়ে গেলে কী পরিণতি হবে সেটা নিয়ে আমরা এখনও নিঃসন্দেহ হতে পারছি না। কারণ ধর্মীয় জঙ্গিবাদ মূলত ধর্মের মোড়কে, ধর্মের নামে পরিচালিত হয়ে থাকে। দেশ-দেশে ধর্মীয় সংখ্যাগুরুদের মধ্যকার নির্দিষ্ট এবং গোপন গোষ্ঠীগুলো বেশিরভাগ মানুষের মগজধোলাই করে জঙ্গিবাদে উদ্বুব্ধ করে থাকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

সম্প্রতি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ‘শ্বেতপত্র: বাংলাদেশে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ২০০০ দিন’ নামের একটা প্রকাশনা উন্মোচন করেছে। গত মার্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান কামাল এই শ্বেতপত্র প্রকাশনা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তি ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ আগমনকে বিরোধিতা করে এবং তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের বাড়িঘর লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে জাতীয় সংসদের আদিবাসী ও সংখ্যালঘু বিষয়ক ককাসের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গঠিত মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস তদন্তে গণকমিশন তদন্ত শুরু করে। দীর্ঘ নয়মাস তদন্ত করে এর ফলাফল ও কমিশনের সুপারিশ শ্বেতপত্র আকারে প্রকাশ করেছে।’

দুইমাস আগে এই শ্বেতপত্র প্রকাশিত হলেও সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে মূলত ১১৬ ‘ধর্মব্যবসায়ীর’ নাম গণমাধ্যমে প্রকাশের পর। এই শ্বেতপত্র তারা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় মানবাধিকার কমিশনেও জমা দিয়েছে, এবং শ্বেতপত্রে তাদের দেওয়া সুপারিশগুলো বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে। দুদকের এই তালিকা দেওয়ার পর দুদক আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য না দিলেও জঙ্গি অর্থায়নে যুক্ত নামগুলো এবং তাদের কার্যক্রম নজরদারির মধ্যে নিয়ে আসার কথা জানা যাচ্ছে। দুদক এই ধর্মীয় নেতাদের সম্পদের হিসাব চাইতে পারে এমন এক আলোচনা সামাজিক মাধ্যমে ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার আগেভাগে প্রশ্নও তোলে রেখেছেন ধর্মীয় নেতাদের হিসাব চাইবে কেন দুদক? হেফাজতে ইসলাম স্বাভাবিকভাবেই এই শ্বেতপত্রের বিরোধিতা করে নির্মূল কমিটিকে ‘ভুঁইফোড়’ সংগঠন দাবি করে একে ‘ধৃষ্টতা’ বলেও আখ্যা দিয়েছে। নির্মূল কমিটি হেফাজতের এই প্রতিক্রিয়াকে আমলে নেওয়ার দাবিও জানিয়েছে। অর্থাৎ শ্বেতপত্র প্রকাশের দুইমাস পর কথিত আলেম-ওলামাদের তালিকা যখন দুদকে গেল তখনই সবাই নড়েচড়ে বসতে শুরু করেছে। 

হেফাজতের প্রতিক্রিয়া ও তালিকার ১১৬ আলেমের শুভাকাঙ্ক্ষীরা চাইছেন না উল্লিখিতজনেরা তাদের সম্পদের হিসাব দিক, অথবা দুদককে এক্ষেত্রে কোন ভূমিকায় দেখতে রাজি নন তারা। তারা তাদের অর্জিত সম্পদ নিজেদের প্রয়োজনে ব্যয় করছেন, নাকি জঙ্গি অর্থায়নের ব্যয় করছেন এনিয়েও তাদের ভাবান্তর নেই। এটাকে ‘ধর্মের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ বলেও অনেকের অভিযোগ। কিন্তু কেউ যদি তার সম্পদের হিসাব দেয়, কাউকে যদি তার সম্পদের হিসাব দিতে বলা হয় সেটা কি অপরাধ হয়? বরং আলোচিতজনদের সম্পদের হিসাব না দেওয়াটাই অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। ১১৬ জন আলেমের যে তালিকা দেখছি আমরা তারা হিসাব দিলেই বরং তাদের অঘোষিত সম্পদ আর থাকে না, সবটাই শুদ্ধ ধর্মের ভাষায় যা ‘হালাল’ হয়ে যায়! হেফাজত ও ১১৬ আলেমের শুভাকাঙ্ক্ষীরা কেন তাদের শ্রদ্ধাভাজনদের সম্পদকে স্বীকৃত কিংবা ‘হালাল’ রূপে দেখতে চাইছেন না?

এটা ঠিক আমাদের দেশে যাদের সম্পদের হিসাব জনগণ দাবি করে তারা সেটা করেন না। মন্ত্রী-সাংসদদের হিসাব প্রকাশের কথা থাকলেও তারা করেন না। বরং ক্ষমতার পটপরিবর্তনে ক্ষমতা-হারা হয়ে যাওয়ার পর দুদকের পক্ষ থেকে তাদের অনেকের বিরুদ্ধে  মামলা হয়, জেলা-জরিমানাও হয়। তারাও সে পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। গণকমিশন ১১৬ আলেমের সম্পদ ও জঙ্গি অর্থায়নে তাদের জড়িত থাকার কথা বললে অনেকেই এখন রাজনীতিবিদ, আমলা, প্রশাসন, পুলিশের লোকজন, ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষের সম্পদের হিসাব চাওয়ার কথা বলছেন। এটা মূলত গণকমিশনের দাবিকে গুরুত্বহীন করে তোলার হীন প্রচেষ্টা; অর্থাৎ কেউ সম্পদের হিসাব দেয় না, আলেমরা দেবে কেন? গণকমিশন কেন অন্যদের হিসাব না চেয়ে কেবলই আলেমদের হিসাব চাইছে, এ প্রশ্নও করছেন অনেকেই। অথচ এই কমিশনই গঠন করা হয়েছিল মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের দিনগুলো, এর কারণ অনুসন্ধান এবং সমস্যা থেকে উত্তরণের সুপারিশের জন্যে। বিষয় যেখানে সুনির্দিষ্ট সেখানে এর সঙ্গে যুক্ত যারা তাদের নাম-পরিচয় ও জঙ্গি অর্থায়নে তারা জড়িত কি-না এটা আসাটাই তো স্বাভাবিক!

গণকমিশনের শ্বেতপত্রে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও জঙ্গি অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত কেবল ১১৬ ধর্মীয় বক্তার নাম আসেনি। এসেছে পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম, ইউএনওর নাম, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম যারা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসে, বিদ্বেষ  প্রচারে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন, সহযোগিতা করেছেন। নির্মূল কমিটি এই নামগুলো পেয়েছে ঘটনার শিকার ব্যক্তিসহ এর সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত মানুষদের সাক্ষ্যে। এখানে তাই উদ্দেশ্যমূলকভাবে ১১৬ ধর্মীয় বক্তাকে জড়ানো হয়েছে বলে যে অভিযোগ অনেকের তা সঠিক নয়। ২ হাজার ২০০ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র স্রেফ ১১৬ নামেই সীমাবদ্ধ নয়; এরসঙ্গে যুক্ত আছে আরও অনেক নাম, অনেক সাক্ষীর সাক্ষ্য, অনেক ঘটনার বিবরণ, সমস্যা থেকে উত্তরণের পথও।

মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, জঙ্গি অর্থায়নে যারা যুক্ত তাদেরকে আইনের আওতায় না আনলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব না। বর্তমানে দেশে জঙ্গিবাদের প্রকাশ বিস্তৃত পরিসরে দেখা না গেলেও সময়ে-সময়ে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটতেই আছে। নির্মূল কমিটির শ্বেতপত্রে ধর্মীয় বক্তা, প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতাসহ যাদের নাম এসেছে তারা কোনো না কোনোভাবে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের অংশ হয়েছে বলে তাদের অনুসন্ধানে ওঠে আসা তথ্য। তালিকার সবাই যে জঙ্গি অর্থায়ন করছে এমন নাও হতে পারে, তবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে, নারীদের অসম্মান করতে নানাভাবে ভূমিকা রেখেছে, এবং সেটা ধর্মের নামে। সামাজিক বিভক্তি, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টির সহায়ক যারাই হয়েছেন তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

আমরা জানি না নির্মূল কমিটির শ্বেতপত্রে উল্লেখ সুপারিশগুলো সরকার গ্রহণ করবে কি-না। আমাদের বিশ্বাস ধর্মাচার ও ধর্মীয় বক্তব্য দেওয়া কোনোভাবেই অপরাধ নয়, তবে ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও বিভক্তি ছড়ানো নিশ্চিতভাবেই অপরাধ। এই অপরাধে যারা জড়িত তারা হতে পারে ‘হেভিওয়েট’ কোনো, তবু তাদের কোনোভাবেই ছাড় নয়!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

তেল নিয়ে তেলেসমাতি ও মঈনুদ্দীনের সাথে কথোপকথন



মো. বজলুর রশিদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মঈনুদ্দীন মিয়া একজন রিকশা চালক। আমার অফিসের সামনে প্রায়ই অপেক্ষা করে যাত্রীর জন্য। গত কয়েক বছর যাবত সে ঢাকা শহরে বসবাস করে পরিবার নিয়ে। ব্যক্তিগত কাজে কোথাও যেতে হলে মঈনুদ্দীনের রিকশাতেই যাতায়াত করি। এবারে ঈদের পরে তার রিকশায় ধানমন্ডি এলাকায় যেতে যেতে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন আছ মঈনুদ্দীন? দিনকাল চলছে কেমন? ঈদ কেমন কাটল? অত্যন্ত হতাশার সুরে সে জবাব দিল, গরীবের আর থাকা কি স্যার! যা ইনকাম তা দিয়ে তো আর জীবন চলে না। জিনিসপাতির যে দাম তাতে সংসার আর চলে কই? রিকশা টাইন্যা শরীর শ্যাষ; জীবনও শ্যাষ! তার কথায় আক্ষেপের সুর।

আমি আর কথা বাড়াতে পারলাম না। ঝিম ধরে রিকশায় বসে থাকার চেষ্টা করলাম। কিন্তুু পারলাম না। এক সিএনসি এসে মঈনুদ্দীনের রিকশার পিছনে বেমক্কা ধাক্কা দিল। পড়তে পড়তে বেঁচে গেলাম। মঈনুদ্দীন সিএনজি চালককে ‘হালার পুুঁত’ বলে কষে এক গালি দিল। তাতে কোনো কাজ হলো না। সিএনজি চালক নির্বিকার মুখে সিএনজির মুখ অন্যদিকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। আমিসহ মঈনুদ্দীনের রিকশা বিশাল এক বাসের পিছনে ও ডানে-বাঁয়ে অন্যান্য যানবাহনের ফাঁকে আটকে পড়লাম। ট্রাফিকের জ্যাম। মিনিম্যাম দশ মিনিটতো লাগবেই জ্যাম ছাড়াতে। বিরক্তি নিয়ে বসে থাকলাম আর চারদিকের অবস্থা দেখতে লাগলাম। মঈনুদ্দীন তার গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, ঢাকা শহরের অবস্থা কী হইছে দ্যাখছেন স্যার। মানুষ ক্যামনে যে এই শহরে থাকে বুঝবার পারি না। আমি শুধু বললাম উপায় কী? জীবিকার তাগিদে তো থাকতেই হবে। তুমি যেমন আছ, আমি আছি, অন্যরাও আছে।

মঈনুদ্দীন বলল সবাই কিন্তু জীবিকার জন্য নেই স্যার । অনেকেই আছে ধান্ধাবাজি করতে। দেখছেন না ত্যাল নিয়া কী কা-টায় না চলছে। ঈদের আগে কেজি খানেক গরুর মাংস কিনছিলাম। ৭৫০ টাকা দিয়া। আমার একদিনের ইনকাম। ভাবলাম পোলাপানরা অনেকদিন গরুর মাংস খাইতে পাই নাই। আমি নিজেও তার স্বাদ ভুলতে বসছিলাম। রান্ধন করার সময় বউয়ে কইল ত্যাল নাই। দোকান থেকে ত্যাল নিয়ে আস। বোতল হাতে দিয়া ছোট পোলাটারে দোকানে পাঠাইলাম ত্যাল আনবার জন্য। পোলা খালি বোতল নিয়া ফির‌্যা কয় দোকানথো ত্যার নাই। শেষে আমি নিজেই বারাইলাম। ঘটনাতো সত্য। হালার কোনো দোকানে এক ফোটা ত্যাল নাই। শ্যাষম্যাষ ওর মায়ে কথথোন একটু ত্যাল আইনা রান্ধন সারল। আর এহন শুনি গুদাম থেইক্যা খালি ত্যাল বেরাইতেছে। ব্যবসায়ীগো দোকান। এরা তো স্যার জীবিকার তাগিদে নাই। আছে ধান্ধাবাজি কইরা মানুষরে কষ্ট দিয়া পয়সা বানাবার তালে। আমি বললাম সেকথা ঠিক। তবে তাদেরকে তো ধরারও হচ্ছে। জরিমানা করা হচ্ছে অবৈধভাবে তেল মজুদ রাখার জন্য।

মঈনুদ্দীন এবার একটু ক্ষেপে গেল মনে হয়। ঝাজের সাথে বলল জরিমানাতো স্যার এখন যারা করতাছে তাদেরই করন লাগে। এরা আগে আছিল কই। এই কাজটা যদি ঈদের আগে করত- তাহলে তো মানুষগো ত্যাল নিয়া কষ্ট হইত না। আমার পোলাপানও স্বাদ কইরা একটু গরুর মাংস খাইতে পারত। মঈনুদ্দীন আফসোস ভরা কণ্ঠে বলতে লাগল। এরা তো সবই জানে। তয় আগে থেকে অ্যাকশন লইনা ক্যান?

আমি বললাম, অ্যাকশান নিলে সমস্যা আছে মঈনুদ্দীন। যারা তেল আমদানি করে তারা আমদানি বন্ধ করে দিতে পারে। তখন আরো বেশি সমস্যা দেখা দিবে। মানুষ এখন যেটুকু পাচ্ছে তখন তাও পাবে না। সমস্যা আরো প্রকট হবে। মঈনুদ্দীন বলল এরা বন্ধ করবে কিল্লাই? সরকার আছে না? সরকার ব্যবস্থা নিব। আমি বললাম, সরকার ইচ্ছা করলেই ব্যবস্থা নিতে পারে না। কারণ মুক্তবাজার অর্থনীতি। সরকারের একার পক্ষে তেল আমদানি করা সম্ভব না। তাছাড়া যুদ্ধের জন্য এখন অনেক দেশ তেল রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। সামনে অবস্থা আরো খারাপ হবে বলে সবাই বলাবলি করছে। মঈনুদ্দীন এতো কিছু বুঝল কিনা জানি না। হঠাৎ জ্যাম ছুটে যাওয়ায় সে রিকশা চালাতে শুরু করল।

রিকশা চালাতে চালাতেই সে আবার জিজ্ঞাসা করল স্যার হুনছিতো আমাগো দ্যাশ থেইকা অনেক গার্মেন্টস-এর কাপড় বিদেশ যায়। তয় আমাগো দ্যাশ যদি কাপড় দেওন বন্ধ কইরা দেয় তয় ওইসব দেশের কী হইব? পিন্দনের কাপড় পাইব কই? শরমে পড়বতো? মঈনুদ্দীনের এই কথায় আমি একটু অবাক হলেও স্বাভাবিকভাবেই বললাম- মঈনুদ্দীন অনেক দেশ আছে যেখানে আমাদের দেশ থেকে কাপড় না নিলেও সমস্যা নেই। কারণ শীতকাল বাদে গরমের দিনে তাদের কাপড় চোপড় খুব একটা প্রয়োজন হয় না। একটা গেঞ্জি ও হাফ প্যাণ্ট হলেই তাদের চলে যায়। মঈনুদ্দীন বলল মাইয়ারাও কি তাই পরে? আমি বললাম- হ্যাঁ, মেয়েরাও প্রায় একই ড্রেস পরে। সে শুধু বলল- তাজ্জব দেশ! আমি বললাম তাছাড়া আমরা কাপড় না দিলেও তারা অন্য দেশ থেকে নিবে। তাদের সমস্যা হবে না।

মঈনুদ্দীনকে জিজ্ঞাসা করলাম তোমার কাছে কী মনে হয়- আমাদের দেশটা চলছে কেমন? আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশ কেমন চালাচ্ছে? জবাবে সে বলল প্রধানমন্ত্রীতো দেশটা ভালই চালাইতেছে। দেশের অনেক উন্নতি করছে। আমার এক বোনে তার দেওয়া ঘর পাইছে। কিন্তু হের লগে আর যারা সরকার চালাইতেছে তাদের মধ্যে দেশের প্রতি মহব্বত কম। দেশের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মতো মায়া এদের মধ্যে নাই। মায়া থাকলে ত্যাল নিয়া সমস্যা হয়ত না। ত্যালের মতো আরো অনেক সমস্যা হইত না। এতো সমস্যা প্রধানমন্ত্রী একা কিভাবে সামলাইব। সবাই যদি প্রধানমন্ত্রীর মতো হইত- মঈনুদ্দীনের গলায় আক্ষেপ উথলে ওঠে। রিকশা চলতে থাকে।

মো. বজলুর রশিদ, সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা

 

 

;