মহানায়কের দেশে ফেরা, আলোর পথের যাত্রা



অধ্যাপক ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদ
মহানায়কের দেশে ফেরা, আলোর পথের যাত্রা

মহানায়কের দেশে ফেরা, আলোর পথের যাত্রা

  • Font increase
  • Font Decrease

 

চারদিকে বিজয়ের বার্তা। এরই মধ্যে আত্মসমর্পন করেছে পাকিস্তানি বাহিনী। বিজয়ের এমন ক্ষণে স্বজনসহ সর্বস্ব হারানোর গ্লানি যেমন বাঙালিকে কষ্টে বিদ্ধ করছিলো, তেমনই ছিলো বিজয় অর্জনের উল্লাসও! তবে স্বাধীনতার মহানায়কবিহীন মুক্ত বাঙলায় বিজয় পূর্ণতা পায়নি। যা উঠে আসে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের কথায়। ওইদিন কলকাতায় সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন,  ‘...বঙ্গবন্ধুর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত বিজয় অর্জিত হবে না।’

অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিশ্বের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মাতৃভূমিতে ফিরে এলেন সেই মহানায়ক; যার হৃদয়জুড়ে ছিলো এদেশের মানুষ আর তাদের অধিকার আদায়রে কথা।

বিজয় অর্জনের পর বৈশ্বিক চাপে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। দেশে ফিরেই ভঙ্গুর অর্থনীতির বাংলাদেশকে গড়ে তোলায় হাত দেন জাতির পিতা।

মুক্ত স্বদেশে ফিরে তিনি বলেছিলেন, `... নতুন করে গড়ে উঠবে এই বাংলা, বাংলার মানুষ হাসবে, বাংলার মানুষ খেলবে, বাংলার মানুষ মুক্ত হয়ে বাস করবে, বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে- এই আমার সাধনা, এই আমার জীবনের কাম্য। আমি যেন এই কথা চিন্তা করেই মরতে পারি-এই আশীর্বাদ, এই দোয়া আপনারা আমাকে করবেন।’

ওইদিন বিশাল জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাঙালির স্বাধীনতার এই মহান স্থপতি। তাদের উদ্দেশ্যে নাতিদীর্ঘ ভাষণে জাতিকে তিনি দিক-নির্দেশনা দেন।

পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি পেয়ে রক্তস্নাত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাসংগ্রামের বিজয় পূর্ণতা পায়। স্বয়ং বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদাররা বাঙালির অবিসংবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়।

বাঙালি যখন স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে, বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের কারাগারে প্রহসনের বিচারে ফাঁসির আসামি হিসেবে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। তাঁকে পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধকার ঘরে বন্দি রাখা হয়েছিল। লায়ালপুর (বর্তমানে ফয়সালাবাদ) জেলের অপরিসর একটি কুঠুরি ছিল সেই বন্দির বাসস্থান। তাঁর জগৎ বলতে সেখানে ছিল চার দেয়াল, একটি জানালা ও একটি উঁচু বিছানা।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের পর বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে নেয়া হয় কারাগার থেকে দূরে আরো দুর্গম জায়গায়। ২৪ ডিসেম্বর একটি হেলিকপ্টারে তাঁকে রাওয়ালপিন্ডির অদূরে শিহালা পুলিশ একাডেমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে নির্যাতন করা হয়েছে তাঁর ওপর।

বিশ্বনেতারা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। আন্তর্জাতিক চাপে পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। লন্ডন হয়ে ১০ জানুয়ারির পড়ন্ত বিকেলে ঢাকায় ফিরলেন রাজনীতির এই মহানায়ক।

তবে এর আগে যাত্রাবিরতি করলেন দিল্লিতে। সেই শীতের সকালে দিল্লির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানাতে সব প্রটোকল ভেঙে ছুটে এসেছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি আর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।

যেন মহানায়কের পদস্পর্শে ধন্য হলো ঐতিহাসিক দিল্লি। সেখানে সংক্ষিপ্ত এক ভাষণে ভারতবর্ষের জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান স্বাধীন বাংলাদেশের এই স্বপ্নদ্রষ্টা। ওই সময়ই ইন্দিরা গান্ধীর কাছে জানতে চাইলেন, কখন বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বাহিনী ফেরত আসছে? জবাবে ভারত প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘যখন আপনি চাইবেন।’

‘তাহলে আগামী স্বাধীনতা দিবসের আগেই হোক।’ ‘তা-ই হবে।’ এরই পরিপ্রেক্ষিতে অতিঅল্পদিনেই ভারতীয় সৈন্যদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

দেশে ফেরার একদিন পর বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করলেন। হাত দিলেন ভঙ্গুর অর্থনীতির সদ্য জন্ম নেয়া দেশটির পুনর্গঠনে। এক কোটি ছিন্নমূল শরণার্থী ভারত থেকে দেশে ফিরছে। চারদিকে লাখ লাখ স্বজন হারানো মানুষের আহাজারি। বাতাসে বারুদের গন্ধ, লাশের গন্ধ। দেশের যোগাযোগব্যবস্থা পলায়নরত পাকিস্তান সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ ধ্বংস করে রেখে গেছে। তাদের পোঁতা মাইনে সম্পূর্ণ অচল দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম।

ব্যাংকগুলোর ভল্ট শূন্য। খাদ্য গুদামগুলোতে নেই এক ছটাক চাল। বেসামরিক প্রশাসন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীন-মার্কিন-সৌদি বলয় বাংলাদেশের জন্য একটি প্রচণ্ড বৈরী পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখার জন্য সদা তৎপর। দেশের অভ্যন্তরে এ দেশীয় পাকিস্তানি দালাল ঘাতক রাজাকার-আলবদর, জামায়াত আর চীনপন্থী অতিবামরা একাট্টা হয়ে চালাতে লাগল একের পর এক অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা। আজ এই পাটের গুদামে আগুন দেয় তো কাল ওই সার কারখানায় বিস্ফোরণ।

চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পরিচালনা ও দেশ পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন, তিন বছর তিনি দেশের মানুষকে কিছু দিতে পারবেন না! এই তিন বছর হবে দেশ গড়ার প্রাথমিক পর্যায়।

সম্পূর্ণ যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ পুনর্গঠনের জন্য তিন বছর এমন কোনো সময় নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপ আর জাপানকে সার্বিক সহায়তা দিয়েছিল অর্থনৈতিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র। সেই বিচারে বঙ্গবন্ধু দেশ পুনর্গঠন কাজগুলো করেছিলেন একক প্রচেষ্টায়।

সঙ্গে ছিল এক ঝাঁক লোভ-লালসামুক্ত ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ দলীয় নেতা-কর্মী ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সহায়তা কামনা করেন। অনেকেই সাড়া দেয় তাঁর ডাকে।

এই সাড়ে তিন বছরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে ভারতীয় বাহিনীকে সসম্মানে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভারত থেকে দেশে ফেরা প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে পুনর্বাসন করে তাঁর সরকার।

বাংলাদেশকে তিনি জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসি, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনসহ অন্যান্য বিশ্ব সংস্থার সদস্য করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই স্বল্প সময়ে তিনি আদায় করেছিলেন দুই শতাধিক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছরের মাথায় বিশ্বের অন্যতম আধুনিক একটি সংবিধান রচনা ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের এক অমর কীর্তি। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড।

উচ্চশিক্ষা একটি জাতির অন্যতম ভিত্তি। সেই ভিত্তি মজবুত করতে তিনি গঠন করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন। আজীবন দুখী মানুষের পক্ষে সংগ্রাম করা মানুষটি চেয়েছিলেন, বীরের জাতি বাঙালি বিশ্বে মাথা উঁচু করে বাঁচবে। একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ, ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ। কিন্তু ঘাতকের বুলেট তাঁকে সে সুযোগ দেয়নি।

স্বাধীনতাবিরোধীদের একটি চক্র সপরিবারে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ সপরিবারে তাঁকে হত্যা করে। ঘাতকের হাত থেকে রেহাই পায়নি ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেলও।

ওই সময় দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোটবোন শেখ রেহানা। পিতার অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে এখন দিন-রাত এক করে কঠোর পরিশ্রম করে চলেছেন শেখ হাসিনা।

দেশের কল্যাণে নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছেন তিনি। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এখন বাস্তব। উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এরই মধ্যে ফ্রেমওর্য়াক গড়ে দিয়েছেন তিনি। তা হচ্ছে- ভিশন ২০২১, ২০৩০ এবং ২০৪১। রয়েছে শতবর্ষব্যাপী ডেল্টা প্ল্যান।

বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফিরছিলেন, তখন দিল্লি থেকে তার সঙ্গী হয়েছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ফারুক চৌধুরী। যিনি এখন প্রয়াত। এক স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন, ‘‘...ব্রিটিশ রয়েল প্লেনটি যখন ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরের ওপর চক্কর দিয়ে অবতরণের সুযোগ খুঁজছে, তখন নিচে মহানায়ককে বরণ করার জন্য হাজার হাজার মানুষ। বঙ্গবন্ধু মাথায় হাত দিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, নিচে তাকিয়ে দেখুন। বঙ্গবন্ধু প্লেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে শুধু একটা কথাই বললেন, ‘এত মানুষকে খাওয়াব কী?’’

বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছে। এরই মধ্যে তাঁর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কটাক্ষ করে বলেছিলো- ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। সেই দেশটির মানুষ এখন কয়েকগুণ বেড়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমানে ১৬ কোটির বেশি মানুষকে বাংলাদেশ বর্তমানে শুধু খাওয়ায়-ই না, তাদের খাদ্যের যোগান দিয়ে উদ্বৃত্ত রপ্তানিও করে।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসক) মানদন্ড অনুযায়ী, একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এর চেয়ে দুইগুণ বেশি। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২ দমমিক ৯।

জন্মের ৫০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অন্য দেশের জন্যও অনুকরণীয়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মতো সফলতাও দেখিয়েছে বাংলাদেশ।

জাতির পিতা সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার জন্য একতাবদ্ধ করেছিলেন। তাঁর কন্যার নেতেৃত্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই দেশটি জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হতে যাচ্ছে। এমডিজি অর্জন, এসডিজি বাস্তবায়নসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, কৃষি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রপ্তানীমুখী শিল্পায়ন, ১০০ টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাক শিল্প, ঔষধ শিল্প, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচকও পাল্টে গেছে। অর্থনীতির গতিপথ পাল্টে দেবে পদ্মাসেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর, ঢাকার মেট্রোরেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পসমূহ।

শস্য-শ্যামলা সোনার বাঙলাকে শশ্মানে পরিণত করে যায় পাকিস্তানিরা। পুরো দেশ নিমজ্জিত হয় কালো অন্ধকারে। পুরো জাতি অপেক্ষা, কখন আসছেন প্রিয় নেতা। তিনি এলেন, অবশেষে বাঙালির অপেক্ষার প্রহর কাটলো। তার সেই ফেরার মধ্য দিয়ে দূর হয় অন্ধকার; যেন অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা করে বাংলাদেশ। আর তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পূর্ণতা পায় বাঙালি। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের এই দিনে জাতির পিতার  প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: উপাচার্য, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর।

বঙ্গমাতা: প্রেরণাদায়ী ও মমতাময়ী সহচর



খায়রুল আলম
বঙ্গমাতা : প্রেরণাদায়ী ও মমতাময়ী সহচর

বঙ্গমাতা : প্রেরণাদায়ী ও মমতাময়ী সহচর

  • Font increase
  • Font Decrease

একজন নারী । যিনি তার সারা জীবন বিলিয়ে  দিয়েছেন দেশ ও জাতির তরে। যার ত্যাগের কারণেই আমরা পেয়েছি স্বাধীন দেশ ও একজন নেতা। যিনি বাংলাদেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। খোকা থেকে মুজিব, মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং সবশেষে বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠার পেছনে যে নারীর অবদান অনস্বীকার্য তিনি আর কেউ নন। তিনি আমাদের নারী জাতির অহংকার শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। যিনি সোনার বাংলা বির্নিমানে আড়ালে অন্তরালে থেকে রেখেছেন অসামান্য অবদান।

যিনি কখনো নিজের সুখ সাচ্ছ্যন্দ ও ভোগ বিলাসের কথা ভাবেনি। ভেবেছেন দেশ, দেশের মানুষ আর নেতা কর্মীদের কথা। বঙ্গবন্ধুর বন্দি জীবনে দক্ষ হাতে সামলিয়েছেন ছেলে মেয়ে, সংসার এবং ভেবেছেন নেতা কর্মীদের কথা। সেই দক্ষ সংগঠক মহিয়সি নারী বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

তিনি এক মহীয়সী নারীর অনন্য উদহারণ। যিনি নিজের ও পরিবারের স্বার্থ ত্যাগ করে কাজ করেছেন বাঙ্গালী জাতির জন্য। যেমন বলা যায় এই লেখাটির অংশবিশেষে: ‘আপনি শুধু আমার স্বামী হওয়ার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্যও জন্ম নিয়েছেন,দেশের কাজই আপনার সবচাইতে বড় কাজ,আপনি নিশ্চিত মনে সেই কাজে যান,আমার জন্য চিন্তা করবেন না।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেলে থাকাকালে তার স্ত্রীর লেখা একটি চিঠির অংশ। এভাবেই স্বামীর পাশে থেকে সারাজীবন উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন বিজয়লক্ষী নারী জাতির পিতার অর্ধাঙ্গীনী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। স্বাধীনতার জন্য বঙ্গমাতার মহান ত্যাগ ইতিহাসে চিরভাস্মর হয়ে আছে। পিতৃ-মাতৃহারা এক অনাথ শিশু জীবন শুরু করেছিলেন শত প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে। নিজের আন্তরিকতা, প্রচেষ্টা ও মানসিক দৃঢ়তা দিয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি। 

১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট । শেখ মোহাম্মদ জহুরুল হক এবং হোসেন আরা বেগমের কোল আলো করে শ্রাবণের দুপুরে জন্ম নিল এক মহিয়সী নারী ফজিলাতুন্নেছা যার ডাক নাম রেনু। মাত্র তিন বছর বয়সে তিনি তার পিতাকে হারান। তারপরে দু’বছরের মাথায় তার মাকে ও হারান। বড় বোন জিনাতুন্নেছা, ডাকনাম জিন্নি ও ছোট বোন ফজিলাতুন্নেছা এই দুই অনাথ শিশুর দায়িত্ব নেন বঙ্গমাতার দাদা শেখ মো. আবুল কাসেম। দাদার ইচ্ছায় মাত্র তিন বছর বয়সের ফজিলাতুন্নেছার সাথে দশ বছরের শেখ মুজিবুর রহমানের বিয়ে হয়। শাশুড়ি সায়রা খাতুন এবং শ্বশুর শেখ লুৎফর রহমানের কাছে তিনি বাড়ির বউ হয়ে থাকেননি, থেকেছেন নিজের সন্তান হয়ে। শিশু অবস্থায় বিয়ে হলেও বঙ্গমাতার সংসার শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর এন্ট্রান্স পাশের পর ১৯৪২ সালে।

ফজিলাতুন্নেছা মুজিব স্থানীয় একটি মিশনারি স্কুলে ভর্তি হলেও তার স্কুল জীবনের পড়ালেখা বেশি দূর এগোয়নি। তিনি ঘরে বসেই পড়ালেখা শিখেছেন। তারা যখন সংসার শুরু করেন, তখন বঙ্গবন্ধুর বয়স ১৯ বছর আর ফজিলাতুন্নেছার বয়স ১০ বছর। স্বামী বাইরে থাকাকালীন ফজিলাতুন্নেছা অবসর সময়ে বিভিন্ন রকমের বই পড়তেন, গান শুনতেন।

বাংলাদেশের মুক্তির দীর্ঘ  সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও দেশ গঠনে, উচ্চারিত নাম মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতির পিতার নামের সাথে শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত নামটি শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। যখনই আমরা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কথা বলি তখনই বঙ্গমাতার নাম চলে আসে।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণের সঙ্গে বঙ্গমাতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক দায়ের করা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জন বাঙালি নৌ ও সেনাবাহিনীর সদস্য এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র্রদ্রোহের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়। বঙ্গবন্ধু এ মামলায় বিচলিত না হয়ে আইনিভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য আইনজীবীদের অর্থ জোগানোর জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেন। এ মামলায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলে বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দির মুক্তি দাবিতে বাঙালি রাস্তায় নামে। পূর্ব পাকিস্তানের রাজপথ বিক্ষোভে জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

বঙ্গবন্ধু কলকাতায় লেখাপড়া ও রাজনীতি করতেন, দফায় দফায় কারাবরণ করেছেন। এই নিয়ে কোন অভিযোগ ছিলনা তার। বঙ্গবন্ধু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন, “রেনু খুব কষ্ট করত কিন্তু কিছুই বলতোনা। নিজে কষ্ট করে আমার জন্য টাকা পয়সা জোগাড় করে রাখত। যাতে আমার কষ্ট না হয়।”

১৯৪৪ সালের ডিসেম্বরে তাদের প্রথম সন্তান জন্মের সময় মারা যায়। দুই কন্যা ও তিন পুত্র সন্তানের মধ্যে ’৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহন করেন কন্যা শেখ হাসিনা, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৪৯ সালে পুত্র শেখ কামাল, ১৯৫৩ সালে শেখ জামাল, ১৯৫৭ সালে কন্যা শেখ রেহানা, ১৯৬৪ সালে পুত্র রাসেল জন্মগ্রহন করে।

অনন্য মানবিক গুণাবলী ছিল তার। ঘরে বসে নিজেই স্কুল খুলে মেয়েদের লেখাপড়া ও সেলাই শেখাতেন। গরীব ছেলেমেয়ে, এতিম, কন্যাদায়গ্রস্থ পিতামাতাকে অর্থ সাহায্য করতেন। দলের নেতাকর্মীদের চিকিৎসার খরচ যোগাতেন। সংগঠন ও আন্দোলন সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর প্রয়োজন মেটাতে নিজের সম্পদ বিলিয়ে দিতেন। তার কাছ থেকে কেউ কোনদিন রিক্ত হস্তে ফেরেনি।

এ প্রসঙ্গে কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন,“বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনীতিক জীবন, লড়াই, সংগ্রামে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে, কিন্তু কখনো মাকে ভেঙ্গে পড়তে দেখিনি। যতো কষ্টই হোক আমার বাবাকে কখনোই বলেননি যে তুমি রাজনীতি ছেড়ে দাও বা সংসার কর বা খরচ দাও। আব্বা যে পদক্ষেপ নিতেন সেটাকেই সমর্থন করতেন তিনি।”

নিজের জমানো টাকা ও আবাসন ঋণ নিয়ে ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়ি নির্মান করেন। এ প্রসঙ্গে বেবী মওদুদ ‘মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন নেছা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “সব কাজ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করতেন। খরচ বাঁচানোর জন্য নিজের হাতে পানি দেয়া, ইট ভেজানোসহ বহু শ্রম, যত্ন ও মমতা দিয়ে বত্রিশ নম্বরের বাড়িটি নির্মান করেন।”

জাতির এক সন্ধিক্ষণে বঙ্গমাতা মুজিবের একটি সিদ্ধান্ত বাঙালিকে মুক্তির সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় প্যারলে মুক্তি নিতে চাপ দেওয়া হয়। মাকে ভয় দেখানো হয়েছিল ‘পাকিস্তানিদের শর্ত না মানলে তিনি বিধবা হবেন।’ কিন্তু মা কোনো শর্তে মুক্তিতে রাজি হননি। আব্বাও প্যারলে মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। শেষ পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানে পাকিস্তান সরকার আব্বাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।”

১৯৬৬ এর ৫ ফেব্রুয়ারি, বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালীর মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণা করেন। ৮ মে নারায়নগঞ্জে ছয়দফার সমর্থনে জনসভা করে ঘরে ফেরার পর গভীর রাতে গ্রেফতার হন। ঐ সময় ছয়দফা না আটদফা বিভ্রান্তিতে অনেক নেতাও আটদফার পক্ষে কথা বলেন। ছয়দফা থেকে একচুলও নড়া যাবে না- বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশ বাস্তবায়নে বঙ্গমাতা ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন। ছয়দফার সমর্থনে বোরকা পরে জনসংযোগ করেন।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ক্ষেত্রেও রয়েছে বঙ্গমাতার বুদ্ধিমত্তার ছাপ। ওইদিনের ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বঙ্গমাতার জন্মদিনের এক অনুষ্ঠানে তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ৭ মার্চ ভাষণের আগে কতজনের কত পরামর্শ, আমার আব্বাকে পাগল বানিয়ে ফেলছে! সবাই এসেছে-এটা বলতে হবে, ওটা বলতে হবে। আমার মা আব্বাকে খাবার দিলেন, ঘরে নিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। আব্বাকে সোজা বললেন, তুমি ১৫টা মিনিট শুয়ে বিশ্রাম নিবা। অনেকেই অনেক কথা বলবে। তুমি সারা জীবন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছ, তুমি জেল খেটেছ। তুমি জান কী বলতে হবে? তোমার মনে যে কথা আসবে, সে কথা-ই বলবা।

৭১ এর ২৫মার্চ, দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বত্রিশ নম্বর বাড়ি আক্রমন করে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাকিস্তানী সেনারা। বঙ্গমাতা ছেলেমেয়ে নিয়ে প্রথমে পাশের বাসায় আশ্রয় নেন। বত্রিশ নম্বর বাড়ি তছনছ করে, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মা বাবার সামনে বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়। বড় ছেলে শেখ কামাল ২৫ মার্চ রাতেই মুক্তিযুদ্ধে যান, আটক অবস্থায় শেখ জামাল ও যান। উনিশবার জায়গা বদল করেও রেহাই পেলেন না, একদিন মগবাজারের বাড়ি থেকে ছেলে-মেয়ে সহ বঙ্গমাতাকে গ্রেফতার করে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের একটি বাড়িতে রাখে পাকসেনারা, বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন কিনা জানতেন না। বন্দি অবস্থায় কন্যা শেখ হাসিনার সন্তান জন্ম নেয়ার সময় তাকে একবারের জন্যও ঢাকা মেডিক্যালে যেতে দেয়া হয়নি।

কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা ‘একজন আদর্শ মায়ের প্রতিকৃতি’ লেখায় এ প্রসঙ্গে বলেছেন,“জুলাই মাসের শেষ দিকে হাসু আপা হাসপাতালে গেল। মা যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েও যেতে পারলেন না। সৈন্যরা তাকে যেতে দিলনা। বলল, ‘তুমি কি নার্স না ডাক্তার যে সেখানে যাবে’ মা খুব কষ্ট পেয়ে সারারাত কেঁদেছিলেন।” বন্দি অবস্থায় তিনি অসুস্থ্য শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করান তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (যা বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়), সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন, খবরাখবর আদান প্রদান করতেন।

তাদের যুদ্ধ দিনের বন্দীদশার অবসান ঘটে ১৭ ডিসেম্বর। মুক্তি পেয়ে বঙ্গমাতা বাড়ির ছাদ থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে টুকরো টুকরো করে আগুন ধরিয়ে দেন। জয় বাংলা শ্লোগান দেন। এসময় হাজার হাজার জনতা ছুটে আসে।

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান। এরপর সেখান থেকেই লন্ডনে যান। লন্ডন থেকেই বেগম মুজিবের সঙ্গে তার প্রথম কথা হয়। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। অবসান ঘটে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার দীর্ঘ প্রতীক্ষার। এরপর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজেও বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়ান তিনি। অনেক বীরাঙ্গনাকে বিয়ে দিয়ে সামাজিকভাবে মর্যাদাসম্পন্ন জীবন দেন। 

স্বাধীনতার পর বীরাঙ্গনাদের উদ্দেশ্যে বঙ্গমাতা বলেন, ‘আমি তোমাদের মা।’ তিনি বলেন, ‘এই বীরাঙ্গনা রমণীদের জন্য জাতি গর্বিত। তাদের লজ্জা কিংবা গ্লানিবোধের কোনো কারণ নেই। কেননা তারাই প্রথম প্রমাণ করেছেন যে, কেবল বাংলাদেশের ছেলেরাই নয়, মেয়েরাও আত্মমর্যাদাবোধে কী অসম্ভব বলীয়ান। (দৈনিক বাংলার বাণী, ১৭ ফাল্গুন, ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ)। ’

বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা অবিছিন্ন সত্তা ছিলেন। ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ গ্রন্থে মযহারুল ইসলাম লিখেছেন, “আমি বঙ্গবন্ধুর অনাবিল সাক্ষাতকার লাভ করেছি। একবার তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে দুটো বৃহৎ অবলম্বন আছে-- একটি আমার আত্মবিশ্বাস, অপরটি --- তিনি একটু থেকে আমাকে বললেন, অপরটি বলুন তো কি?’ হঠাৎ এ-রকম একটি প্রশ্নের জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি একটু মৃদু হেসে বললেন,‘অপরটি আমার স্ত্রী, আমার আকৈশোর গৃহিণী।”

তিনি বঙ্গবন্ধুকে শক্তি, সাহস, মনোবল, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন বলেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, বঙ্গবন্ধু ‘জাতির পিতা’ হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু জীবনে যত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছেন সবটাতেই বঙ্গমাতা তাকে ছায়ার মত সাহায্য করেছেন। ডঃ নীলিমা ইব্রাহিম বলেন,“রেণু ছিলেন নেতা মুজিবের Friend, Philosopher and Guide.”।

৭৫ এর ১৫ আগস্ট বাঙালী জাতির জীবনে নিকষ কালো অধ্যায়। খুনী মোশতাক, খুনী জিয়া বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গমাতা সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে ঘাতকদের বলেন,“তোমরা আমাকে এখানেই মেরে ফেল।” জীবনের মত মরণেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গী হলেন এই মহাপ্রাণনারী।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর ক্ষমতায়নের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং শ্রেষ্ঠ স্মরনীয় মানবী। বিশ শতকের প্রথমার্ধে নারীর অবরোধের বেড়াজাল উপেক্ষা করে সাহসী পদক্ষেপে বেরিয়ে আসেন তিনি। সহধর্মিণী হিসেবে নয়, রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে আজীবন প্রিয়তম স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের ছায়াসঙ্গী ছিলেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ইতিহাসের কালজয়ী মহানায়ক শেখ মুজিবের অনুপ্রেরণাদায়িনী হয়ে পাশে ছিলেন। বাঙালি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে ধাপে বঙ্গমাতার অবদান রয়েছে। আর সেটা বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী হিসেবে নয়, একজন দক্ষ নারী সংগঠক হিসেবে। যিনি ধূপের মতো নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন এবং বঙ্গবন্ধুকে হিমালয়সম আসনে অধিষ্ঠিত হতে সহায়তা করেছেন।

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক , ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন(ডিইউজে)

;

স্বপ্ন বাস্তবায়নে সঠিক পথে এগিয়ে যাচ্ছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স



মো. কামরুল ইসলাম
স্বপ্ন বাস্তবায়নে সঠিক পরিকল্পনায় এগিয়ে চলছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

স্বপ্ন বাস্তবায়নে সঠিক পরিকল্পনায় এগিয়ে চলছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের আকাশ পরিবহনে বন্ধ হওয়ার মিছিল যখন দীর্ঘায়িত হচ্ছিল, ঠিক তখনই দেশের সর্বকনিষ্ঠ এয়ারলাইন্স হিসেবে দেশের এভিয়েশনে আবির্ভাব ঘটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের। অনেক স্বপ্নকে সাথে নিয়ে ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই ঢাকা থেকে যশোরে ড্যাশ৮-কিউ৪০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে যাত্রা শুরু করে। দেশের আকাশ পরিবহনে যাত্রীদের অনেক না পাওয়ার আক্ষেপ রয়েছে। সেই অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দিতেই ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বাংলাদেশের আকাশ পরিবহনে একটি নিশানা ঠিক করে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে।

যাত্রা শুরুর পর ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স সর্বপ্রথম যে সিদ্ধান্তটা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, তা হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরে সবগুলো বিমানবন্দরে প্রথম বছরেই ফ্লাইট পরিচালনা করা। সেবা আর সময়ানুবর্তীতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যাত্রীদের মধ্যে আস্থার সঞ্চারন ঘটিয়েছে ইউএস-বাংলা। এক বছর শেষ হওয়ার পূর্বেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার, যশোর, সৈয়দপুর, রাজশাহী ও বরিশালে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে।

পরিকল্পনার মাঝে ইউএস-বাংলা দেশের অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীদের প্রতিটি গন্তব্যে ডে-রিটার্ণ ফ্লাইট সূচী দিয়ে যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনাকে সহজ করে দিয়েছে, যার ধারাবাহিকতা এখনো চলমান। বরিশাল ও রাজশাহীতে যেখানে অন্য এয়ারলাইন্সগুলো প্রতিদিন একটি ফ্লাইট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই অনেক সময় ব্যয় করেছে, সেখানে ইউএস-বাংলা প্রতিদিন দু’টি করে ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে শুরু থেকে। সিলেটে একটি ফ্লাইটের সূচীই যেখানে বিগত দিনে বন্ধ হওয়া কিংবা বর্তমানে চালু এয়ারলাইন্সগুলো  নিয়মিত পরিচালনা করতে বেগ পেতে হয় সেখানে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বৃহত্তর সিলেটবাসীর কাছে প্রতিজ্ঞাস্বরূপ প্রতিদিন ঢাকা থেকে সর্বোচ্চ চারটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। 

সঠিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউএস-বাংলা যাত্রা শুরুর পর দু’বছর অতিক্রম করার পূর্বেই ঢাকা থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে যাত্রা শুরু করে।

তিনটি ড্যাশ৮ –কিউ৪০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে যাত্রা শুরুর পর তিন বছরের মধ্যে বহরে বড় এয়ারক্রাফট যোগ করার পরিকল্পনা ছিলো। যা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ পূর্ব এশিয়ার দেশ গুলোতে বিচরণ করা সহজ হয়। যার ফলশ্রুতিতে বহরে ২টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এয়ারক্রাফট যোগ করা হয়। বাংলাদেশের নাগরিকদের সেবা দেয়ার মানসিকতায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গন্তব্য মাস্কাট, দোহা, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর ও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের জনপ্রিয় গন্তব্য কলকাতায় নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে তৃতীয় বছর থেকে।

স্বাধীনতার পর প্রায় ৪৬ বছরে বাংলাদেশের কোনো বেসরকারি এয়ারলাইন্স কিংবা জাতীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স চীনের কোনো প্রদেশে ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারেনি। জিএমজি এয়ারলাইন্স, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ কিংবা রিজেন্ট এয়ারওয়েজ সবাই শুধু স্বপ্ন দেখেছে কিন্তু বাস্তবে কেউ তা পূরণ করতে পারেনি এমনকি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও চীনে ফ্লাইট পরিচালনার স্বপ্ন দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। অথচ চীন সিভিল এভিয়েশন অথরিটির সকল ধরনের শর্ত পূরণ করে চার বছরের অধিক সময় ধরে ২০১৮ এর ২৬ এপ্রিল থেকে ঢাকা থেকে চীনের অন্যতম গন্তব্য গুঢয়াংজুতে প্রতিনিয়ত ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে। এমনকি করোন মহামারির সময়েও বাংলাদেশ থেকে একটি মাত্র রুট উন্মুক্ত ছিলো তা হচ্ছে ঢাকা-গুয়াংজু।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ চিকিৎসা সেবার জন্য ভারতের বিভিন্ন  গন্তব্যে ভ্রমণ করে থাকে। চিকিৎসা সেবার জন্য সবচেয়ে বেশী যাত্রী ভ্রমণ করে থাকে ভারতের চেন্নাই। অথচ স্বাধীনতার পর একমাত্র এয়ারলাইন্স হিসেবে ইউএস-বাংলা গত চার বছর ধরে প্রতিদিন ঢাকা থেকে চেন্নাই ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে। ভারতের চেন্নাই কিংবা চীনের গুয়াংজু সবই ইউএস-বাংলার সুষ্ঠু পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন।  

আকাশপথের পরিধি বাড়ার সাথে সাথে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানবহরে প্রতিনিয়ত উড়োজাহাজ যুক্ত করে চলেছে। বর্তমানে বহরে ১৬টি উড়োজাহাজ রয়েছে, যার মধ্যে ৬টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০, ৭টি ব্র্যান্ডনিউ এটিআর ৭২-৬০০ আর ৩টি ড্যাশ৮-কিউ৪০০ এয়ারক্রাফট। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স যাত্রীদের নিরাপত্তা আর সেবাকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলের জন্য ব্র্যান্ডনিউ এয়ারক্রাফট দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে। বাংলাদেশে বেসরকারী বিমান পরিবহনের ইতিহাসে ইউএস-বাংলাই সর্বপ্রথম ব্র্যান্ডনিউ এয়ারক্রাফট দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। এয়ারক্রাফটগুলোর গড় আয়ূ ১০ বছরের নীচে রাখার কাজ করছে ইউএস-বাংলা।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের সেবা দেয়ার ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইউএস-বাংলা শারজাহ, দুবাই, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ মালদ্বীপের রাজধানী মালে, পূর্ব এশিয়ার অন্যতম পর্যটন গন্তব্য থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে চট্টগ্রাম থেকে কলকাতা ফ্লাইট পরিচালনার মধ্য দিয়ে প্রতিদিন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ফ্লাইট পরিচালনা করবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।

নিকট ভবিষ্যতে ভারতের রাজধানী দিল্লী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবী, প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম গন্তব্য সৌদি আরবের জেদ্দা, রিয়াদ, মদিনা, দাম্মাম রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।

চলতি বছর বহরে ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ও ৩টি এটিআর৭২-৬০০ এয়ারক্রাফট ইউএস-বাংলার বিমানবহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্য ও ২০২৫ সালের মধ্যে উত্তর আমেরিকার টরেন্টো ও নিউইয়র্ক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত রয়েছে ইউএস-বাংলার।

১৭ জুলাই ২০২২, নয় বছরে পদার্পণ করেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। স্বল্প সময়ের যাত্রায় ইউএস-বাংলা শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশের এভিয়েশনের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ইউএস-বাংলা শুধু স্বপ্ন দেখে না, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। 

লেখক- মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;

কাজের মঙ্গাকে গুরুত্ব দিন



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

 

অধুনা ‘মঙ্গা’ শব্দটি বললেই ভাবা হয় অন্যকিছু। ধরে নেয়া হয় সেখানে রাজনীতি অথবা অপপ্রচার শুরু হয়ে গেছে। মঙ্গা শুধু ভাত বা খাদ্যের অভাবের জন্য নাও হতে পারে। যিনি যেভাবে ভাবুন না কেন-বড় মানুষের বড় বড় জিনিষের জন্য মঙ্গা আর খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষের মঙ্গা মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্রমাগত অপূরণ থেকে হতে পারে।

কারণ, মঙ্গার বাংলা অর্থ সংকট বা বড় অভাব। মূলত: প্রায় সবার ঘরের ধান-চাল তথা খাবার নি:শেষ হলে এবং খাদ্য কেনার সামর্থ্য না থাকলে যে সংকট সৃষ্টি হয় সে থেকে চারদিকে হাহাকার তৈরী হলে সেটাই মঙ্গা নামে পরিচিত। “মঙ্গা একটি বিদেশী শব্দ। হিন্দী ও উর্দুতে বলা হয় ম্যোঙ্গা। দেশের কুমিল্লা ও নোয়াখালি অঞ্চলে উচ্চারিত হয় মাঙ্গা। উত্তরাঞ্চলের রংপুরে একে বলা হয় মঙ্গা। এর আভিধানিক অর্থ উচ্চ মূল্য, এমন মূল্য যা সর্ব সাধারণের নাগালের বাইরে।”

বলা হয়-কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে মঙ্গার চিত্র পাল্টে গেছে। তবে দেশের চরাঞ্চল ও দরিদ্র জেলাগুলোতে বিপুল সংখ্যক ভূমিহীন মানুষের কর্মসংস্থান না থাকায় মৌসুমী বেকারত্ম ও বেঁচে থাকার অবলম্বন সংকুচিত হওয়ায় মঙ্গার চিত্র চেখে পড়ে। যেমন, কুড়িগ্রাম জেলায় দারিদ্র্যের হার ৭০.৮ শতাংশ (বিবিএস)। বিআইডিএস-এর মতে, কুড়িগ্রামে অতিদরিদ্রের হার ৫৩.২ শতাংশ (প্রথম আলো জুলাই ৩০, ২০২২)। খাদ্যের মঙ্গা কমে গেলেও প্রতিবছর বন্যা আর নদীভাঙ্গনের কারণে দারিদ্র্যের সংগে লড়াই করতে হয় লক্ষ লক্ষ মানুষকে। অভাব বিমোচনের বিভিন্ন প্রকল্পে যাদের অনেকের নেই কোন সংযোগ ও অংশগ্রহণ।

চিলমারীর জোড়গাছ বাজারের ব্রহ্মপুত্রের চরে কাজ করে একজন দিনমজুর জমির আল থেকে হেলেঞ্চা শাক তুলে বাড়ি ফিরছেন। সম্প্রতি তিনি একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় হেলেঞ্চার বোঝাসহ সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। তার এলাকায় বন্যার পর খাদ্য ও কাজের দারুণ অভাব দেখা দিয়েছে। দৈনিক মজুরীভিত্তিক কাজ না থাকলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় তাদের আর কি-ই বা করার আছে? একজন বা দু’জন তো নয়। যেখানে অতিদরিদ্র মানুষের হার তিপ্পান্ন শতাংশ। সেখানে কাজের মঙ্গা শ্রমিকদের জন্যে। ওদের গ্রামে কাজ নেই। শহুরে ভাসমান মানুষ ও বস্তিবাসীদের কথা বাদ দিলাম। আর আর দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৪০ ভাগের বেশী। এদের চাকুরী নেই। সুতরাং কাজের মঙ্গা গ্রাম-শহর সব জায়গায়।

আমাদের চারদিকে চোখ মেললেই কতকিছুর প্রাচুর্য্য দেখি আবার চোখ মেলা বা বন্ধ করা অবস্থাতে অনুভব করি নানা অভাব। তবে যারা অভাবকে অভাব বলে কপটতা করেন বা স্বীকার করেন না- তাদের কথা আলাদা। কারণ, কিছু মানুষের অভাববোধ নেই। যেসব মানুষের অভাব বোধ নেই তারা অতিমানব অথবা পেটে পাথর বেঁধে কায়ক্লেশে বেঁচে থাকা সুখী মানুষের নামান্তর।

মাটির মানুষের শরীরে রক্তমাংস তাই প্রতিটি মানুষের অভাববোধ থাকে। তাইতো ‘ঝিনুক দিয়ে মেপে খেলেও রাজার ভান্ডার ফুরিয়ে যায়’। পৃথিবীতে শক্তির নিত্যতা নীতি অনুযায়ী সবকিছু পরিবর্তিত হয়। একবার বেশী হয়, আবার কমতে কমতে নি:শেষিত হয়ে যায়। ভাঙ্গা-গড়া ও কমা-বাড়ার মধ্যে ঘুরতে থাকে ঘড়ির চাকা। সেজন্য ধনী-দরিদ্র হয় আর দরিদ্র হয়ে যায় ধনী।

এটা স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু কিছু মানুষ সেটা স্বীকার করতে লজ্জা পায়। অথবা অস্বীকার করে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দেয়। এই হাম্বরা ভাব ও বাস্তবতাকে লুকানোর কপটতা মানুষের অভাব ও দারিদ্রের আরেকটি বড় কারণ। সেজন্য আমরা সুখী মানুষের দেশের তালিকার শীর্ষে বার বার আসি আবার পরক্ষণে বন্যার স্রোতের মতো দু:খের সাগরে ভেসে যাই।

আমাদের চেপে রাখা অভাব আর মুখের সাজানো হাসির আমন্ত্রণ একটি বিশেষ কৃষ্টি এবং ঐতিহ্যও বটে। এজন্য গভীর রাতে গৃহস্থ বাড়িতে অতিথি এলে ঘরের ডিমপাড়া পোষা মুরগীটা জবাই করে আপ্যায়ন করতে দ্বিধা করি না।

সেদিন আমাদের পরিবারের একজন বিদেশিনী ভাবী বলেছেন, তোমাদের বাড়ির ভেতরটা সুন্দর। ড্রইংরুমটা আরো সুন্দর, খুব গুছানো থাকে। কিন্তু সেটার সাজসজ্জা দেখে বলার উপায় নেই সব জায়গায় একই রকম। বাড়ির পাশের রাস্তা কেন এত নোংরা? বিশেষ করে বাইরের হাট-বাজারের অবস্থা কিরকম তা জানি না কিন্তু রাজধানীতেই কাঁচা বাজারে একহাঁটু পানি, কাদা, ময়লা। আমার নিজ হাতে বাজার করতে ইচ্ছে হয় কিন্তু বাজারের পরিবেশ এত নোংরা! তার উপর দামের হেরফের। বাজারে গেলে টোকাই ও ভিক্ষুকরা জামা ধরে টানাটানি করে। আমি ভীমড়ি খেয়ে যাই। দেশের মানুষের অভাবটা সেখানেই চোখে পড়ে। ওনার পর্যবেক্ষণমূলক কথা শুনে আসলেই ভীষণ লজ্জা লাগে। তার উপর তিনি পেশায় একজন ডাক্তার।

কিন্তু কিছু মানুষের সেসব চোখে পড়ে না। তারা অভাব, মঙ্গা, দারিদ্র, হতাশা, চুরি, দুর্নীতি ইত্যাদি নিয়ে কথা বললে রাগ করে। তাদের নিজেদের অভাববোধ নেই, নিত্য সকালে বাজারে যেতে হয় না। ভিক্ষুক এসে তাদের বাসার কলিং বেল বার বার টেপার অধিকার পায় না। অথবা দারোয়ান বাসার দরজা পর্যন্ত ভিক্ষুক প্রবেশের সেই সুযোগটা হরণ করে নিয়েছে মালিকের আদেশে। তাই তারা চারদিকের গিজ গিজ করা অভাবী মানুষের সঠিক সংখ্যাটা জানেন না।

গত জুন ২৭, ২০২২ তারিখে প্রকাশিত জনশুমারীর প্রাথমিক রিপোর্ট দেখে প্রথমেই হোঁচট খেতে হলো। সেখানে মোট জনসংখ্যার কথা বলা হয়েছে ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন। তার মধ্যে নারী ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৪৭ হাজার ২০৬ জন। পুরুষ ৮ কোটি ১৭ লাখ ১২ হাজার ৮২৪ জন। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সংখ্যা ১২ হাজার ৬২৯ জন। এই তিন শ্রেণি আলাদা করে যোগ করলে দাঁড়ায় ১৬ কোটি ৫০ লাখ ৬৫৯ জন। যা হিসেবকৃত মোট জনসংখ্যার চেয়ে ৮৫ হাজার ৯৫৭ জন কম দেখায়। অতিরিক্ত ৮৬ হাজার কম জনসংখ্যা সম্বলিত তথ্যবিভ্রান্তি হয়তো পরবর্তী সংশোধনীতে ঠিক করা হবে। কিন্তু শুরুতেই এতবড় অসামঞ্জস্য নানা সন্দেহের উদ্রেক করেছে। এমন বিভ্রান্তিকর পরিসংখ্যান যেখানে- সেখানে এক শ্রেণির মানুষ দেশের প্রত্যন্ত এলাকার শতকরা তিপ্পান্ন ভাগ অতিদরিদ্র মানুষের মঙ্গা বা অতিঅভাবের কথা স্বীকার করতে চাইবেন না-এটাই স্বাভাবিক।

এত কষ্টের নিয়তি নিয়ে দরিদ্র মানুষগুলোর কষ্টের কথা বলা যাবে না। বললেই রাজনৈতিক অপপ্রচার ও উপহাস দিয়ে ‘তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার’ লোকের অভাব নেই। এই ধরনের দৈন্য মানসিকতার জন্য দেশের দারিদ্র ক্রমাগত জিইয়ে থাকে। অনেক সময় দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমেও সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। তারা ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকল সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার নৈতিক দায়িত্বটুকুও অবহেলা করে বসেন। ফলে সবকিছু পিছিয়ে চলে যায় গহীন অন্ধকারে। সমাজের কল্যাণের নিমিত্তে এসব মৌলিক বিষয়ের সমালোচনাকারীরা কারো কোন পক্ষ নন। বরং জাতীয় গুরুত্বপূর্ন এসব বিষয় নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনাকারীরা নীতিমালা গ্রহণের ক্ষেত্রে ছায়াসিদ্ধান্ত প্রদানকারী।

আমাদের দেশে সব ধরনের পরিবর্তন একসংগে শুরু হওয়ায় একটি ক্রান্তিকাল চলছে। এই পরিবর্তনে নেতিবাচক দিকগুলোকে সতর্কতার সাথে পরিহার করার জন্য কর্র্তপক্ষের সূক্ষ চিন্তাভাবনা থাকতে হবে। শুধু ইতিবচাক পরিবর্তনগুলো যেন সামনে যাবার গতিবেগপ্রাপ্ত হয় সেজন্য সব ধরনের ছলচাতুরী পরিহার করার মানসিকতা থাকতে হবে।

তা-না হলে গলার গামছায় হেলেঞ্চা শাকের আঁটি বেঁধে বিষন্নচিত্তে দাঁড়িয়ে থাকা চিলমারীর দিনমজুর হযরত আলীর মতো করুণ চাহনিধারী মানুষের সংখ্যা দিন দিন আরো বেড়ে যাবে। সামাজিক বঞ্চনা ও বৈষম্য আমাদের সবাইকে অহেতুক পরস্পরকে প্রহসন ও হেয় করতে শেখাবে। নিশ্চয়ই এই অবস্থা আমরা কেউই আর হতে দিতে চাই না।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

;

‘ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান’ কোর্স প্রচলন সময়ের দাবি



মো. বজলুর রশিদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের জীবন এখন প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট সুবিধাযুক্ত স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন স্মার্ট ডিভাইস এর উপর আমাদের দৈনন্দিন কার্যাবলী এখন অনেকটাই নির্ভর করে। আমরা এগুলিকে বিভিন্ন উপায়ে ব্যবহার করি যেমন যোগাযোগ এবং নেটওয়ার্কিং, তথ্য আদান-প্রদান, অনলাইন কেনাকাটা, ডকুমেন্টেশন, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক তথ্য বিনিময়, ভাব ও আবেগ বিনিময়, রোমান্স, বিনোদন, শিক্ষা, সংগঠন এবং উৎপাদনশীলতা ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য এবং অবসর উপভোগের মাধ্যম হিসাবে এবং আরও অনেক কিছু এখন আমরা ইন্টারনেট সুবিধাযুক্ত ডিজিটাল ডিভাইস এর মাধ্যমে করে থাকি।

সামগ্রিকভাবে প্রযুক্তির এই ব্যবহার আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময় প্রভাব ফেলে। ইন্টারনেট প্রযুক্তি নির্ভর মানুষের কার্যাবলী সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আমেরিকাতে সর্বপ্রথম ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান বিষয়টি নিয়ে পঠন, পাঠন ও গবেষণা শুরু হয়। ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান ধারণাটি ২০০০ সালের শেষের দিকে ইন্টারনেটের সমাজবিজ্ঞান থেকে উৎপত্তি লাভ করে।

২০১২ সাল থেকে কয়েকজন সমাজবিজ্ঞানী ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের বিষয়সমূহ সংজ্ঞায়িত করার উপর এবং এটিকে গবেষণা ও শিক্ষার একটি ক্ষেত্র হিসাবে প্রচার করার উপর মনোনিবেশ করেন। অস্ট্রেলীয় সমাজবিজ্ঞানী ডেবোরা লুপটন তার ২০১৫ সালে ‘ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান’ শিরোনামে প্রকাশিত বইতে উল্লেখ করেছেন যে মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী ড্যান ফারেল এবং জেমস সি পিটারসন ২০১০ সালে সমাজবিজ্ঞানীদেরকে কেবল ওয়েব-ভিত্তিক ডেটা নিয়ে গবেষণা না করার জন্য আহবান জানিয়েছিলেন। কারণ, এ বিষযে গবেষণার আরও ক্ষেত্র ছিল। ২০১২ সালে সাবফিল্ডটি যুক্তরাজ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে চর্চা শুরু হয় যখন মার্ক ক্যারিগান, এমা হেড এবং হু ডেভিস সহ ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞান সমিতির সদস্যরা ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের সর্বোত্তম অনুশীলনের জন্য একটি নতুন অধ্যয়ন গ্রুপ তৈরি করে। তারপরে, ২০১৩ সালে, এই বিষয়ে প্রথম সম্পাদিত ভলিউম প্রকাশিত হয়েছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান: সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি’। ২০১৫ সালে নিউইয়র্কের সম্মেলনটি এ বিষয়ের ওপর ফোকাস করে অনুষ্ঠিত হয়।

ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান হল সমাজবিজ্ঞানের একটি উপবিভাগ, যেখানে গবেষকরা দেখার চেষ্টা করেন কীভাবে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মধ্যে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে যোগাযোগ ঘটে ও পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। কীভাবে এটি ভার্চুয়ালি সামাজিক জীবনকে আরও বিস্তৃতভাবে প্রভাবিত করে। সমাজবিজ্ঞানের একটি উপক্ষেত্র হিসেবেই এটি প্রযুক্তি নির্ভর অনলাইন যোগাযোগ, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এবং বাণিজ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলোর উপর ফোকাস করে।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি হয় ইন্টারনেটের সমাজবিজ্ঞান থেকে। ইন্টারনেটের সমাজবিজ্ঞান নব্বই এর দশকের শেষের দিকে একটি উপক্ষেত্রের রূপ নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলিতে ইন্টারনেটের আকস্মিক বিস্তার এবং গ্রহণযোগ্যতা এই প্রযুক্তি দ্বারা প্রবর্তিত মানুষের ক্রিয়াকলাপ প্রাথমিক প্ল্যাটফর্ম হিসাবে সমাজবিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ইমেল এর মাধ্যমে বার্তা আদান প্রদান, অনলাইন আলোচনা, অনলাইন ফোরাম, অনলাইন সংবাদ, চ্যাটিং, কর্মসূচী সংক্রান্ত যোগাযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্র নিয়ে এটি কাজ শুরু করে।

ইন্টারনেট প্রযুক্তি যোগাযোগের নতুন ফর্ম, তথ্যের নতুন উৎস এবং প্রচারের নতুন উপায়ের পথ বাতলে দেয়। সুতরাং সমাজবিজ্ঞানীরা বুঝতে চেয়েছেন যে কীভাবে এটি মানুষের জীবন, সাংস্কৃতিক ধরণ এবং সামাজিক প্রবণতা, সেইসাথে অর্থনীতির মতো বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে। এবং সেই সাথে রাজনীতিও কিভাবে প্রভাবিত হয় তাও তারা বোঝার চেষ্টা করেন।

সমাজবিজ্ঞানীরা যারা প্রথম ইন্টারনেট-ভিত্তিক যোগাযোগ অধ্যয়ন করেছিলেন তারা সামাজিক নেটওয়ার্কগুলিতে মানুষের পরিচিতি এবং এর প্রভাব নিয়ে অধ্যয়নে আগ্রহী ছিলেন। বিশেষ করে যারা তাদের মত প্রকাশের কারণে সামাজিক সমালোচনার সম্মুখীন হন তাদের নিয়ে অধ্যয়নে অধিকতর আগ্রহী হন। তারা তাদেরকে "অনলাইন সম্প্রদায়" হিসাবে বুঝার চেষ্টা করে যা ব্যক্তির জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যেমন তাদের অনলাইন ক্রিয়াকলাপগুলো বাস্তব পরিবেশে বিদ্যমান ফর্মগুলির পরিপূরক কি না তা জানার চেষ্টা করা।

সমাজবিজ্ঞানীরা ভার্চুয়াল বাস্তবতা, পরিচয় এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় এর প্রভাব এবং ইন্টারনেটের প্রযুক্তিগত আবির্ভাবের মাধ্যমে শিল্প থেকে তথ্য অর্থনীতিতে সমাজের ব্যাপক রূপান্তরের প্রভাব সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তারা দেখার চেষ্টা করেছেন যে অনেক কর্মী এবং রাজনীতিবিদদের দ্বারা ইন্টারনেট প্রযুক্তি গ্রহণের সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। গবেষণার বেশিরভাগ বিষয় জুড়ে, সমাজবিজ্ঞানীরা অনলাইন ক্রিয়াকলাপগুলিতে মনোনিবেশ করেছেন এবং পর্যবেক্ষণ করেছেন যে অনলাইনে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের অফলাইনে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হতে পারে।

অনলাইন সম্পর্ক অধ্যয়নের এই প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবহৃত প্রচলিত পদ্ধতিগুলির মধ্যে রয়েছে নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ, যা ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রবেশাধিকারযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে সম্পূরক পরীক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়েছিল;। ভার্চুয়াল এথনোগ্রাফি আলোচনা ফোরাম, চ্যাট রুমে পাঠানো মেসেজ এবং অনলাইন ডেটা বিশ্লেষণও এ পর্যায়ে করা হয়।

ইন্টারনেট কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) যেমন বিকশিত হয়েছে, তেমনি আমাদের জীবনে এর ভূমিকা এবং সামগ্রিকভাবে সামাজিক সম্পর্ক এবং সমাজে এর প্রভাব রয়েছে। ইন্টারনেটের সমাজবিজ্ঞান এবং অনুশীলন যা এখনও বিদ্যমান এবং অনলাইন সোসাইটির বিভিন্ন ফর্মে অংশগ্রহণ করার জন্য ইন্টারনেটযুক্ত ডেস্কটপ পিসি বা ইন্টারনেটযুক্ত মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে যোগাযোগ ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া অতি সাধারণ বিষয় হয়ে ওঠেছে। নতুন যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম এবং নতুন নতুন ডিজিটাল ডিভাইসের উদ্ভাবন মানুষের অনলাইন যোগাযোগ ও ক্রিয়াকলাপগুলোকে আরো সহজ করে তুলেছে।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদের সামাজিক জীবনে বর্তমানে ডিজিটাল মিডিয়া বা ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের আচরণ, সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপ ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রন করছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন আমাদের জীবনের কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং সমাজবিজ্ঞানীদের অবশ্যই এদিকটাকে গুরুত্বসহ বিবেচনা করতে হবে এবং ডিজিটাল সামাজিক সম্পর্ক ও এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করতে হবে।

এখানে উল্লেখ্য যে, সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক ব্যবহার এবং হ্যাশট্যাগের ব্যবহার সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য অনেক তথ্য প্রদান করছে। ব্যক্তিগত অনুভূতি, সমসাময়িক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যা এবং জনমানসের প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা গবেষণা করতে পারেন। বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, এসবের পরিচালনা ও কী বিষয় প্রচারের জন্য ব্যবহার করে এসব নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে।

ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন বিষয় এবং ঘটনা অধ্যয়ন করতে পারেন যেমন, সামাজিক সম্পর্কের উপর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রভাব, তরুণ প্রজন্মের বন্ধুত্বে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা, অন্যদের সাথে মিথস্ক্রিয়া এবং শিষ্টাচারের নিয়ম; ডিজিটাল যুগে তরুণ প্রজন্মের প্রেম, ভালোবাসা এবং রোম্যান্স, ইত্যাদি। এসব নিয়ে তারা গবেষণা করতে পারেন।

ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান জাতিগত সংখ্যালঘু, চরমপন্থী গোষ্ঠী এবং ঘৃনা ও বিদ্বেষ ছড়ানো গোষ্ঠীগুলোর ক্রিয়াকলাপ নিয়ে গবেষণা করতে পারে। এছাড়াও সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে ব্যক্তি ও দল যত ধরনের বার্তা আদান-প্রদান করে, যে সব বিষয় আপলোড করে, যে সব বিষযে যে ধরনের মন্তব্য করে, ও কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় এসব বিষয় ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গবেষণার বিষয়বস্তু হতে পারে। এছাড়াও আরও অনেক বিষয় রয়েছে যা ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের আওতাভুক্ত হতে পারে।

সাম্প্রতিককালে গণমাধ্যমে আমরা দেখছি যে বিভিন্ন দেশের নাগরিকের সাথে আমাদের দেশের নাগরিকদের অনলাইনে সম্পর্ক হচ্ছে। প্রেম, ভালোবাসা হচ্ছে এবং বিয়েও হচ্ছে। এসব বিষয়গুলো ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানে আলোচিত হতে পারে। এছাড়াও এমন প্রবণতাও আমরা দেখছি যে ছেলে মেয়েরা তাদের বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত মায়ের বিয়ে দেয়ার জন্য অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন যা সাধারণ মানুষের আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সুতরাং এ বিষয়গুলো ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের আওতায় পঠন পাঠন হতে পারে।

ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ অধ্যয়নের বিষয় হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার, অপব্যবহার ও প্রভাব নিয়ে বস্তনিষ্ঠ গবেষণা হতে পারে। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের দেশের মোট জনগোষ্ঠীর বৃহৎ একটি অংশ এখন সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে। তবে এই মাধ্যমের সঠিক ব্যবহার সংক্রান্ত জ্ঞান সবার মাঝে এখনও তৈরি হয়নি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব, অপ-প্রচার ছড়ানো, ব্লাকমেইলিং, নারীদের নিয়ে কটূক্তি ইত্যাদির মাত্রা বেড়ে গেছে। ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের পঠন, পাঠন এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে দেশ এখন ‘ ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এ পরিণত হয়েছে। শহর থেকে গ্রাম পর্যায়ে ডিজিটাল বিপ্লবের ফলস্বরূপ শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই এখন কম বেশি ডিজিটাল প্রযুক্তির আওতায় চলে এসেছে। ডিজিটাল বিপ্রবের ছোঁয়ায় তাদের আচার, আচরণ, ক্রিয়াকলাপ ও সংস্কৃতিও পরিচালিত হচ্ছে। অনেকেই এখন অনলাইনে নাটক, সিনেমা, ভিডিও ব্লগ ইত্যাদির মাধ্যমে অবসর বিনোদন করে থাকেন। ভবিষ্যতে এ ধারা আরো বাড়বে। কাজেই ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞানের পঠন, পাঠন ও গবেষণায় এগুলো অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

উন্নত দেশগুলোতে যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অষ্ট্রেলিয়ার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডার গ্রাজুয়েট ও মাস্টার্স পর্যায়ে ‘ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান’ কোর্স পঠন, পাঠন হয়ে থাকে। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমাজবিজ্ঞান ও অন্যান্য সাবজেক্টে এ বিষয়ে কিছু পঠন, পাঠন হলেও সরাসরি ‘ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান’ শীর্ষক কোনো কোর্স আছে বলে জানা নেই। সুতরাং উচ্চ শিক্ষায় বিশেষ করে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের একটি কোর্স হিসাবে ‘ডিজিটাল সমাজবিজ্ঞান’ চালু করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়টি ভেবে দেখবেন বলে প্রত্যাশা করি।

মো. বজলুর রশিদ: সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা।

 

;