সনদী বেকারদের সুখী নতুন বছর কেমন?



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ডিগ্রিধারী বেকারদের জন্য নতুন বছর সুখী না অসুখী বার্তা বয়ে আনে তা নিয়ে কেউ কি কিছু ভাববার অবকাশ মনে করে? একেকটি চাকরিতে আবেদন করার ফি বা টাকা যোগাড় করার জন্য তাদেরকে কত কষ্ট স্বীকার করতে হয় তা তো শুধু ভুক্তভোগীরাই অনুধাবন করতে পারে, অন্য কেউ নয়। তাও যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয় তাহলে কারো জন্য চাকরি নামক সোনার হরিণ ধরা দেয়- সবার কপালে তা নয়। নতুন বছরের আগমন তাদের জন্য হতাশার। কারণ, এত তাদের চাকরির সরকারি বয়সসীমা ও সামাজিক সমাযোজনের সময় পার হয়ে যাবার আতঙ্ক তৈরি  হয় শুধু।

দেশে এখন উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা শতকরা চল্লিশ ভাগ। এই সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। শিক্ষিত সনদধারী বেকারদের এই সংখ্যা লাগামহীনভাবে বেড়ে যেতে থাকায় ওনাদের পরিবারগুলো যেমন হতাশ সাথে সরকারী কর্তৃপক্ষও কিভাবে এই সমস্যা সমাধান করবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না। কারণ, ক্রমবর্ধমান সনদধারী বেকারদের এই সংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে চাকরির বাজার সম্প্রসারণ করা কঠিন ব্যাপার।

আমাদের দেশের ছোট্ট পরিসরে তৈরি অবকাঠামোর মধ্যে এ পর্যন্ত যে চাকরি সেবাদান প্রক্রিয়া চালু রয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় বড় অপ্রতুল। বিসিএস, ব্যাংক, প্রতিরক্ষাবাহিনী, ছোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তৈরি পোশাক, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও এনজিও ইত্যাদি মিলে যেসব কর্মক্ষেত্র ও পরিষেবা খাত রয়েছে সেগুলো ছাড়া ভাল কিছু লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এসব ছোট তৈরি কাঠামোতে জনবল নিয়োগ খুব বেশী লাগে না, চাওয়াও হয় না। অথচ প্রতিটি পদের জন্য প্রতিযোগিতা করেন লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার নর-নারী। সবার লক্ষ্য তৈরি কাঠামোতে প্রবেশ করা। এর জন্য বাঁধভাঙা প্রতিযোগিতায় হিমশিম খাওয়ার অবস্থা।

একটি চাকরির পদ লাভের জন্য লড়াই হাজার জনের। কখনো বা লক্ষ জনের। এজন্য বাঁধভাঙা প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা প্রমাণ করতে না পেরে শুরু হয় অবৈধ পথের অনুসন্ধান। এ থেকে জন্ম নেয় তদবির বা লবিং। আর এই তদবির বা লবিং থেকে জন্ম নেয় দুর্নীতি। এছাড়া এক তথ্যে জানা গেছে সনদী বেকার দের সাথে চাকরি দেবার নামে নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে নানা প্রতারণার কথা। একদিনে (অক্টোবর ০৮) ১৪টি চাকরির লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার তারিখ ঘোষিত হয়েছিল। কেউ কেউ কোনরকমে দুটিতে অংশ নিতে পেরেছে। এসব চাকরিতে আবেদন করতে গড়ে প্রতি প্রার্থীর আড়াই হাজার টাকা করে খরচ হয়েছে। গেল বছর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার দু’দিনে মোট ২৯টি চাকরির পরীক্ষার তারিখ ঘোষিত হয়েছিল এসব অপরিকল্পিত ও সমন্বয়হীন নিয়োগ পরীক্ষা সনদী বেকারদের জন্য ভোগান্তি বৈ কিছু নয়।

ডিগ্রীধারী বেকারদের নিয়ে কেউ কি এসব কথা ভাবার অবকাশ মনে করে? নতুন বছরের আগমন তাদের জন্য চরম হতাশার। কারণ, এতে একদিকে তাদের চাকরির সরকারী বয়সসীমা পার হয়ে যাবার আতঙ্ক অন্যদিকে বিয়ের বয়স, মা-বাবা-ভাইবোন আত্মীয়দের সাথে দূরত্ব তৈরি হয় শুধু। আর জীবনের প্রতি জন্মে একধরণের ঘৃণা। এটা কোন সভ্য জাতির উচ্চশিক্ষিত মানুষদের মনের মধ্যে গেঁথে গেলে তা সত্যিই খুব লজ্জা ও আতঙ্কের বিষয়।

কৃষিপ্রধান দেশ হলেও আমাদের কৃষকের সন্তানরা আর কৃষিকাজে আগ্রহী নন। কারণ জমি চাষ করে প্রতিবছর সেখানে বিরাট ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে- বাংলাদেশে শতকরা আশিভাগ রাজনীতিবিদ ও সাংসদ ব্যবসায়ী। তাঁরা জনগণের ধরা মাছ নিজেদের বলে চালিয়ে দিয়ে জনগণকে দেন। সাধারণ জনগণ সচরাচর সেটার নাগাল পান না। শুধু নিকটস্থ চাটুকার জনগণ সেই সেবার সিংহভাগের ভোক্তা। এভাবে সমাজে একটি বঞ্চিত শ্রেণি নিয়মিত হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। ফলে দেশে ভাতের আবাদ হলেও তার সঠিক সংরক্ষণ ও সুষম বন্টন নেই। আবাদীরা ক্ষতিগ্রস্ত ও হতাশ। একজন প্রান্তিক ধানচাষির বার্ষিক উৎপাদন ও আয় আর একজন ছোট চাকরিজীবীর বার্ষিক আয়ের মূল্য ও ব্যবধান অতি চরম। এই ধরনের আর্থিক ব্যবধান ও বৈষম্যের মুখে কল্যাণ অর্থনীতির সূত্র গোলমেলে হয়ে পড়েছে। এছাড়া গত দশ বছর ধরে চেষ্টার পর এখনও অনেক ক্ষেত্রে আছে লাগামহীন দুর্নীতি করার সুযোগ। একদিকে শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ নেই অপরদিকে কোন কোন ক্ষেত্রে মনের মত ভাল কাজ ও ব্যক্তিমর্যাদা নেই। ফলে উপযুক্ত কাজের অভাবে মেধা পাচার হয়ে যায়-আর ফিরে আসে না।

দেশে প্রান্তিক কৃষক বা চাষীর মাসিক আয় ও চাকরিজীবিদের মাসিক আয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক তৈরি হওয়ায় কৃষকরা হতাশ হয়ে শেষ সম্বল ভিটেমাটি বা কৃষি জমিটুকু বন্দক রেখে বা বিক্রি করে তাদের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সস্তানকে ঘুষ দিয়ে হলেও সরকারী চাকরির পাবার জন্য উৎসাহিত করছে। অধিকাংশ সময় তারা দেশে চাকরি পাবার প্রতিযোগিতায় ব্যর্থ হয়ে কোন কোন সময় বিভিন্ন দুয়ারে ধর্ণা দিয়ে ঘুষের টাকাটাও উদ্ধার করতে না পেরে আদরের সন্তানকে জীবন বাজি রেখে অবৈধ পথে বিদেশে পাঠাতে কুণ্ঠিত হচ্ছে না। সেখানেও বিপত্তি। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রচ্যে পুরুষ শ্রমিক তো বটে, শিক্ষিতা, সনদী মহিলা শ্রমিকদের নির্যাতিতা হয়ে মান-সম্ভ্রম খুইয়ে দেশে পালিয়ে আসার মত অপমানজনক ঘটনাগুলো আমাদের মাথা হেঁট করে দিয়েছে। দেশে চাকরি নেই, বিদেশে গেলেও বিপদ। তাহলে আমাদের সনদপ্রাপ্ত শিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়েরা কোথায় ঠাঁই নেবে?

অনেকে বলেন- আমাদের দেশে সস্তায় হাইব্রিড চাল, মাছ মুরগি সবই পাওয়া যায়। বাজার ভর্তি খাদ্য সাজানো রয়েছে বিক্রির জন্য। বাসা ভাড়া পাওয়া যায়। হাসপাতাল হয়েছে অনেক দামি দামি। মানুষের গতি বেড়েছে। চাকরিতে অনেক পদখালি রয়েছে। একথাগুলোর সংগে আমি অমত নই। তবে অসংগতিগুলো লক্ষ্য করলে আমি বেশ হতাশ হয়ে যাই।

কারণ, আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যা কত? আয় বেড়েছে কতজনের? হয়তো কিছু মানুষের আয় বেড়েছে। গতি বেড়েছে কোন মানুষগুলোর? নিশ্চয়ই দালাল ও তদবিরকারী লোকগুলোর গতিই বেড়ে চলেছে! এই দালাল ও তদবিরকারী লোকগুলো দেশের অর্থনীতিকে মৌসুমী ইঁদুরের মত শোষণ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠনগুলোর কাঠামো ধ্বংস ও মূলধন নিঃশেষ করে দিচ্ছে। গেল সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সেমিনারে বক্তারা আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন- এনবিআর বিলিয়নস টাকা আর্থিক ডেফিসিটে ভুগছে। এছাড়া তাদের ধার-দেনা করার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় বিশেষ সাহায্য পাবার ব্যবস্থা করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

আমাদের বাজার ভর্তি খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী সাজানো। কিন্তু আমার ক্রয় ক্ষমতা নেই। থাকলেও সেটা খুবই সীমিত। সস্তায় যেসব হাইব্রীড চাল, মাছ, মুরগি, তেল পাওয়া যায সেগুলো ভেজালে পরিপূর্ণ। দেশীটাও পাওয়া যায়। যার দাম আকাশচুম্বী। ধনীর জন্য দামি হাসপাতাল, বিদেশি ডাক্তার, বিদেশি দামি ওষুধ। এমনকি দেশী ভাল ডাক্তারদের ফি বেশি। গ্রামে-গঞ্জে এমনকি জেলা শহরের স্থানীয় হাসপাতালে তারা থাকেন না। লক্ষ লক্ষ ফ্লাট বাড়ি তৈরী হলেও সেগুলো নিম্ন আয়ের মানুষেরা পান না। হাজার হাজার চাকরির পদখালি শোনা যায়। নিয়োগ হয়ে গেলে দেখা যায় সামর্থ্যবানরাই কোন না কোন উপায়ে চাকরিগুলো লাভ করেছেন অথবা ক্ষমতাবলে কিনে ফেলেছেন! গরিবদের এখানেও ক্রয়ক্ষমতা হরিত! ঘুষ-দুর্নীতি ছাড়া এক শ্রেণির মানুষের নিকট চাকরি যেন সোনার হরিণ। এভাবে অর্থ ও ক্ষমতাশালীরা সমাজের সব সুবিধার ভোক্তা হয়ে উঠছেন এবং সনদধারী মেধাবী বিত্তহীনরা শত শত ভাইভা দেয়ার পরও নানাভাবে বঞ্চিত হয়ে আরো বেশি দুর্বল ও হতাশ হয়ে পড়ছেন।

একদিকে কর্মের সংগে সম্পর্কহীন ও সামঞ্জস্যহীন শিক্ষা ও সার্টিফিকেট, অন্যদিকে বৈষম্যপূর্ণ আর্থ-প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক ভাঁওতাবাজি দেশের অনৈতিক কাজের গতি বাড়িয়ে দিলেও মানুষের নৈতিক মেরুদণ্ড বাঁকা করে দিয়েছে।

উচ্চশিক্ষার সংগে গবেষণা ও উন্নয়ন নীতি ও পরিকল্পনার সংযোগ ঘটাতে হলে আমাদের পাবলিক, অ-পাবলিক সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাগারকে শক্তিশালী করার সময় এসেছে। শুধু শুধু শিক্ষার পরিবেশ ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দরজায় সূর্য ডোবার পূর্বে তালা ঝুলিয়ে বাসা –বাড়িতে ঘুমাতে গেলে সময়ের অপচয় হবে। বরং দিন-রাত গবেষণা করে বের করতে হবে যেন লক্ষ লক্ষ সনদধারী বেকার তৈরি না হয়ে সনদধারী মানবসম্পদ তৈরি হয়। শিক্ষিত, জ্ঞানী ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে তৎপর হতে হবে। এজন্য নতুন বছরে সময় এসেছে জরুরি ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নতুন করে  ভাববার।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

‘ত্রিশঙ্কু অবস্থা’



ড. হাসিন মাহবুব চেরী
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

জীবনে কখনো কখনো রাজা ত্রিশঙ্কুর মতো হাল হয়। পৌরাণিক কাহিনীর মতো এমন অবস্থা অনেকের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। যখন মান্ধাতা স্বর্গ জয় করতে গিয়ে নিহত হন, তখন ভারতীয় পুরাণের আরেক রাজা ত্রিশঙ্কু স্বর্গে যেতে গিয়ে আকাশ আর পৃথিবীর মাঝখানে আটকে থেকে যান।

রাজা ত্রিশঙ্কুর এই হাল থেকেই তৈরি হয়েছে বাংলা প্রবচন 'ত্রিশঙ্কু অবস্থা'। এ অবস্থা হলো অনিশ্চিত অবস্থা। কোন দিকে যে যাবে, তা স্থির করতে না পেরে অনেকেই ত্রিশঙ্কুর মতো ঝুলে থাকে। এটা ব্যক্তি মানুষের বেলাতেও ঘটে, রাজনীতির বেলাতেও ঘটে, সমাজে, সংসারে, সর্বত্র কখনো কখনো ঘটে।

প্রশ্ন হলো, আপনার কি কখনো এমন হয়েছে জীবনে? যে আপনি এমন কিছু একটা নিয়ে আটকে গেছেন, যা আপনি উপভোগ করতেও পারছেন না, আবার ছাড়তেও পারছেন না। কারণ, এই বিষয়ে আপনি অনেক টাকা, সময় অথবা মানসিক ভাবে নিজেকে invest করে ফেলেছেন ? আর এখন যদি মাঝপথে ছেড়ে দেন তাহলে আপনার এতদিনের সব কষ্ট বৃথা হয়ে যাবে? এমন অচলাবস্থা বা দোদুল্যমানতা জীবনে হয়ে থাকে বা হতেই পারে।

আপনার ক্ষেত্রে ঘটনা যদি এরকম হয়, তাহলে আপনি এমন একটি অবস্থায় আছেন, বিশেষায়িত পরিভাষায় যাকে বলে 'Sunk Cost Fallacy'। Sunk Cost মানে হলো, যে সম্পদ আপনি অলরেডি খরচ করে ফেলেছেন, যেমন  টাকা অথবা সময় যেটা  আপনি ব্যয় করে ফেলেছেন, তা কিন্তু আর কোনোভাবেই ফেরত আসবে না।  তাই এই Cost টা অলরেডি sunk মানে ডুবে গেছে এবং ফেরত পাওয়া যাবে না ! আর Fallacy মানে হলো ভ্রান্ত বিশ্বাস -মানে আপনি পুরো ব্যাপারটা উপভোগ না করলেও এর পেছনে আরো সময়, টাকা অথবা মানসিক ভাবে নিজেকে invest করে যাচ্ছেন শুধুমাত্র এই ধারণা থেকে যে, লেগে থাকলে হয়তো ভালো কিছু হতেও পারে অথবা আপনি নিজের এতটা সম্পদ ব্যয় করার পর মাঝপথে হাল ছেড়ে দেয়াকে নিজের পরাজয় বলে মনে করছেন।

মানসিকভাবে এরকম ভাবার পেছনে কাজ করে আপনার বাল্যকালের শিক্ষা, যেখানে বলা হয়েছে, 'একবার না পারিলে দেখো শতবার', 'সবুরে মেওয়া ফলে' অথবা 'Persistence is the key to success'! এই কথাগুলো অনেক ক্ষেত্রে সত্যি হলেও সর্ব ক্ষেত্রে সত্যি নয়।  বরঞ্চ এই থিওরি ফলো করে এই কাজের প্রতি লেগে থেকে অনেক ক্ষেত্রেই আপনি আপনার জীবনের অমূল্য সম্পদ নষ্ট করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন।  বুঝার সুবিধার্থে একটু উদাহরণ দিয়ে বলি:

ঘটনা ১: রহিম ১২ বছর ধরে লন্ডন থাকছে illigally, কিন্তু এখনো তার ব্রিটিশ পাসপোর্ট হয়নি, হবার সম্ভাবনাও খুবই কম। কেননা পাসপোর্ট পেতে যে নিয়মকানুন মেনে থাকতে হয়, সেসব সে পালন করেনি। সে আসলে খরচ ও শক্তি ব্যয় করে পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। দেশ থেকে টাকা এনে চলছে। কিন্তু পাসপোর্টের আশা সে ছাড়তে পারছে না ! সে যেহেতু তার জীবনের মূল্যবান অনেকটা সময় এর পেছনে ব্যয় করে ফেলেছে, তাই সে দেশে ফিরেও যেতে পারছে না  এবং এই পাসপোর্টের আশায় তার জীবনের বাকি সময় গুলোও নষ্ট করছে !

ঘটনা ২: সুমি  তার বিয়ের পর থেকেই বুঝতে পারছে সে ভুল মানুষের সাথে আছে। তার স্বামী তাকে নানা ভাবে মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার করে চলেছে।  তার কাছে এ জীবন দুর্বিষহ মনে হয়।  কিন্তু তারপরেও সে এ ভুল সম্পর্ক থেকে নিজেকে বের করে আনতে পারছে না। কারণ সে এই সম্পর্কে জীবনের অনেকটা সময় ব্যয় করেছে, তাই ভাবছে আরেকটু ধৈর্য্য ধরে দেখবে তার স্বামীর ব্যবহারে কোনো পরিবর্তন আসে কিনা!

ঘটনা ৩: আসিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে টপ সাবজেক্টে চান্স পেয়ে পড়া শুরু করার কিছুদিন পরেই বুঝতে পারে যে, এই বিষয়ে সে কোনো ইন্টারেস্ট পাচ্ছে না, কিন্তু যেহেতু অনেক পরিশ্রম  করে পড়াশুনা করে এই সাবজেক্টে চান্স পেয়েছে তাই সে মাঝপথে ছাড়তেও পারছে না, ভাবছে আরেকটু সময় দিলে হয়তো ভালো লেগে যাবে !

ঘটনা ৪. ইমতিয়াজ একজন শিল্পপতি , যার বিশাল ব্যবসা তাকে অনেক স্ট্রেস দিচ্ছে। সে শারীরিক এবং মানসিক ভাবে অসুস্থ্য অনুভব করছে। কিন্তু ব্যবসার পরিধি কমিয়ে আনতেও পারছে না কারণ এই ব্যাবসাকে এ পর্যন্ত আনতে তাকে অনেক টাকা ইনভেস্ট এবং মানসিক ও শারীরিক পরিশ্রম করতে  হয়েছে। তাই সে মনে করছে এখন ব্যবসার পরিধি কমিয়ে আনলে তার পরাজয়। 

ঘটনা ৫. রিনা একটা traumatic রিলেশনশিপের মধ্যে ছিল। যেটা থেকে অবশেষে সে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। কিন্তু তার মনের মধ্যে সারাক্ষণ অতীতের  চিন্তা আসতে থাকে ঘুরে ফিরে। যে কারণে সে ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনা করতে পারে না।  তার কেবলি মনে হতে থাকে তার জীবনের এতগুলো সময় নষ্ট হয়ে গেলো। আর এটা  সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না ! এগুতেও পারে না, পেছাতেও পারে না।

উপরোক্ত ঘটনাগুলো সবই 'Sunk Cost Fallacy'র উদাহরণ। খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন যে, উপরোক্ত প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই তাদের জীবনের যে সময়, টাকা অথবা মানসিক investment করেছেন, সেটার কারণে তারা ওই পুরো ব্যপারটা  উপভোগ না করলেও সেটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না।  আর এই কারণেই তারা এখান থেকে তাদের ভালো কিছু হবে না জেনেও জীবনের বাকি সময়টা এর পিছনেই আবর্তিত হয়ে ব্যয় করে দিচ্ছেন ! কিন্তু তারা একবারও  ভাবছেন না যে, যে সময়, টাকা অথবা মানসিক investment এতদিন করেছেন, সেটা কিন্তু অলরেডি sunk cost, যা আর কোনোদিন ফিরে  আসবে না। বরং এই sunk cost এর মায়ায় তারা জীবনের বাকি সময়, টাকা সব নষ্ট করছেন!

এখন প্রশ্ন হলো এটা  থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি? বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই Sunk Cost Fallacy থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় হলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে carefully ভবিষ্যতের পর্য্যবেক্ষণ করা, ভেবে দেখা যে এই ইনভেস্টমেন্ট থেকে আপনি আদৌ ভবিষ্যতে সত্যি কিছু পজিটিভ ফলাফল পাবেন কিনা।  এবং এই পর্য্যবেক্ষণ হতে হবে বর্তমানের বাস্তবতার ভিত্তিতে।  আপনি যদি আপনার বাস্তব লজিক দিয়ে ভাবেন, তাহলে দেখবেন যে এই ঘটনাগুলোয় আপনি যতটাই ইনভেস্টমেন্ট করে থাকেন না কেন, এর থেকে এখনই বেরিয়ে আসলেই কেবল মাত্র আপনি আপনার ভবিষ্যতের সময়, টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের শরীর-স্বাস্থ্য সব কিছুকে অপচয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেন। 

আমাদের সবারই মনে রাখা উচিৎ যে, জীবন একটাই, তাই জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিৎ জীবনকে পজিটিভ ভাবে উপভোগ করা, আর এজন্যে জীবনে যা কিছু আপনাকে স্ট্রেস, মানসিক অথবা শারীরিক অশান্তি দিচ্ছে তার থেকে যত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসবেন ততই আপনার জন্যে মঙ্গল। কখনো কখনো যুদ্ধের ময়দানের 'কৌশলগত পশ্চাদপসরণ' করার মতোই জীবনেও অনেক কিছু ছেড়ে, ফেলে সামনে এগুতে হয়। চিন্তার অন্ধ প্রকোষ্ঠে বা কর্মের দ্বিধায় আবর্তিত হলেই আসে হতাশা ও অনুশোচনা। ফলে এমন ত্রিশঙ্কু অবস্থার ক্ষতিকর পরিস্থিতি থেকে থেকে যত দ্রুত বের হয়ে ইতি ও গতির লাভজনক ও উপভোগ্য অবস্থায় আসা যায়, ততই ভালো। এতে জীবনে ক্ষতির মাত্রা কমে এবং সাফল্যের দিগন্ত উন্মোচিত হয়।  

. হাসিন মাহবুব চেরী, যুক্তরাজ্য প্রবাসী মাইক্রোবায়োলজিস্ট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক

;

জীবনের মূল্যে কেন উপাচার্য-রক্ষা



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের জীবনের চাইতেও উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের ‘চেয়ারের মূল্য’ বেশি বলেই মনে হচ্ছে। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে টানা ছয়দিনের অনশন, তেরোদিনের আন্দোলনেও সরকারের টনক নড়েনি। জীবনের মূল্য গুরুত্ব পায়নি সরকারের কাছে, উপাচার্যের কাছে, শিক্ষক সংগঠনগুলোর কাছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ, সুধীজন, বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীসহ অপরাপর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষার্থী।

যারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জীবনকে মূল্যবান ভাবছেন, তাদের ন্যায্য দাবির পক্ষে বলছেন তারা ব্যাপকভাবে প্রভাববিস্তারী জনগোষ্ঠী নয়। তাই হয়ত তারা উপাচার্যের চেয়ারের চাইতে অনশনরত শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের এই গুরুত্ব দেওয়া যদিও উপাচার্যের সিদ্ধান্তে, সরকারের সিদ্ধান্তে কোন প্রভাব ফেলছে তবু বলি এটা অন্তত মানবিকতার বিপুল পরাজয়ের বিপরীতে ক্ষীণতম হলেও আশার আলো।

হয় উপাচার্যের পদত্যাগ, নয় মৃত্যু— এমনই সংকল্প শাবির অনশনরত শিক্ষার্থীদের। দীর্ঘ এই আন্দোলন, তবু নির্বিকার উপাচার্য, নির্বিকার সরকার, নির্বিকার শিক্ষক সমাজ, নির্বিকার আচার্যসহ সবাই। এমন অবস্থায় তারা মৃত্যুর দিকে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে। অসুস্থ ও মুমূর্ষু অবস্থায় তারা হাসপাতালে যাচ্ছে, সেখানেও খাবার গ্রহণ করছে না। ওখান থেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ফিরছে অনশনস্থলে। বিদ্রোহ তাদের রক্তে মিশে গেছে। আপোষ তাদের কাছ থেকে দূরে অনেক দূরে চলে গেছে।

তাদেরকে ফেরানোর মত কোন অভিভাবক নেই শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে, সিলেটে, এমনকি রাষ্ট্রেও। উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদ নিজ থেকে পদত্যাগ করবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। সরকার বললে পদত্যাগ করবেন, অন্যথায় নয়। এদিকে, সরকারের যে অবস্থান তাতে এটাও পরিষ্কার সরকার চাইতে না ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগকৃত’ এই উপাচার্যের পদত্যাগ। শিক্ষার্থীদের প্রাণ গেলে যাক, তবু উপাচার্য রক্ষা পাক—এমনই ভাবনা সরকারের।

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি গত শুক্রবার লোক দেখানো যে ভূমিকা পালন করেছেন সেটা অপ্রত্যাশিত। আন্দোলনের মাঠ ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে তার সঙ্গে আলোচনার যে প্রস্তাব প্রথমে তিনি দিয়েছিলেন সেটা আমাদেরকে বিস্মিত করেছিল। শিক্ষার্থীরা অবশ্য যোগ্য প্রত্যুত্তরে তাকে সিলেটে এসে তাদেরকে দেখে যাওয়া, অথবা ভিডিয়ো কনফারেন্সে যে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল সেটা পরিপক্ব চিন্তার প্রকাশ ছিল। শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী সিলেট আসেননি, শিক্ষা উপমন্ত্রীও সিলেট আসেননি, ঢাকা থেকে সরকারের কেউ সিলেটে এসে শিক্ষার্থীদের দেখে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। তবে পরের দিন মাঝরাতে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙার আহবান জানান। শিক্ষার্থীরা ওই সময়ে তাদের দাবির কথা জানালেও তিনি উপাচার্যের পদত্যাগ বিষয়ে কোন মন্তব্য করেননি।

মন্ত্রী-শিক্ষার্থীদের আলোচনা ওই পর্যায়েই শেষ! এরপর শনিবার মন্ত্রী কথা বলবেন বললেও কথা বলেননি। রোববার গেছে, সোমবার গেছে; মন্ত্রীর তরফে যোগাযোগ হয়নি। স্থানীয় আওয়ামী লীগের যে সকল নেতা শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিনিধি দলের নামে শাবিতে গিয়েছিলেন তারাও যাননি। উপরন্তু এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে শিক্ষামন্ত্রী-শিক্ষা উপমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের নিয়ে যে সকল ইঙ্গিত দিয়েছেন সেগুলো আর যাই হোক সুচিন্তার প্রকাশ বলে মনে হয়নি। শিক্ষার্থীদের নিষ্পাপ-নির্ভেজাল-রাজনৈতিক অভিসন্ধিহীন আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। আগামী দুই বছরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন এই প্রসঙ্গ এনে তারা শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করে গেছেন, যাচ্ছেন। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত, একই সঙ্গে অমানবিকও।

একদিকে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে অহিংস আন্দোলনের সর্বশেষ ধাপ আমরণ অনশনে। একের পর মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে যাচ্ছে, ফিরছে, স্যালাইন গায়ে নিয়ে বেঁচে আছে; অন্যদিকে এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ভাষায় কালিমা লেপনের অপচেষ্টা; তাও আবার মন্ত্রীর পক্ষ থেকে। শিক্ষার্থীদের জীবনের চাইতে মূল্য বেশি রাজনীতির? অথচ এই শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনকে সচেতনভাবে রাজনীতির বাইরে প্রথম থেকেই রেখেছে।

আন্দোলনের স্লোগানে শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেওয়া হয়। কিন্তু শাবির এই আন্দোলনে অদ্যাবধি সরকারের বিরুদ্ধে কোন স্লোগান উচ্চারিত হয়নি। শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা উপমন্ত্রী টেলিভিশনে-টেলিভিশনে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলছেন যদিও তবু তারা এর পাল্টা জবাব দিচ্ছে না। আলোচনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী কথা দিয়ে কথা রাখেননি, আন্দোলনে ‘তৃতীয় পক্ষ’ দেখছেন যদিও, শিক্ষার্থীরা তবু সতর্ক। মন্ত্রী ‘অভিভাবক’ বলছেন নিজেকে, ‘মা’ প্রতিরূপ দাবিও করছেন, তবে তার অবস্থান দাবির সঙ্গে মেলে না, বলা যায় বিপরীত। মন্ত্রীর অবস্থান স্পষ্টত উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পক্ষে।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের গণভিত্তি আছে, জনসমর্থন আছে। শিক্ষার্থীদের পাশে তাদের পরিবার আছে, পুরো দেশ আছে। নেই শুধু শাসক। ক্যাম্পাসে পুলিশ ডেকে এনে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীনভাবে পেটানো, সাউন্ড গ্রেনেড, মামলা দেওয়া এই উপাচার্যকে কেন রক্ষা করতে চায় সরকার? উপাচার্যের ব্যর্থতার ভার কেন নিতে যাচ্ছে তারা? তার পদত্যাগকে কেন সরকারের পরাজয় হিসেবে দেখছে তারা? দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ, এজন্যেই কি? এই কালক্ষেপণ, কূটকৌশল অথবা জোর করে উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে টিকিয়ে রাখলে কি বিজয়ী হবে সরকার? ফরিদ উদ্দিনের টিকে যাওয়ার সঙ্গে তাদের সাফল্য-ব্যর্থতার কী সম্পর্ক? কেন শিক্ষার্থীদের জীবনের চাইতে মূল্যবান হয়ে ওঠবেন একজন উপাচার্য, একজন ফরিদ উদ্দিন আহমেদ?

সরকারি প্রভাবে উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদ টিকে আছেন। এই পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারানো ‘না-মানুষ’ রূপে কি তিনি নিজেকে উপস্থাপন করেননি? সরকার তাকে টিকিয়ে রেখেছে, অন্যের ব্যর্থতা নিজেদের ঘাড়ে নেওয়ার আত্মবিনাশী ধারাবাহিকতা অবলম্বনে। দিন শেষে এতে উপাচার্যের যেমন লাভ নেই, তেমনি লাভ নেই সরকারেরও। এরমাঝে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে যে সকল শিক্ষার্থীর সেগুলো অপূরণীয়।

দুঃখিত শাবিপ্রবি, চাইলেও কিছু করতে পারি না আমরা। ক্ষমা করো! আমরা শাসক নই, মানুষ এখনও; জীবনকে মূল্য দেওয়া একদল সংবেদনশীল।

কবির য়াহমদ: লেখক সাংবাদিক, ইমেইল: [email protected]

;

ভিসি উদ্ধারে শিক্ষার্থীর রক্ত ঝরানো অমানবিক  



প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মামুলি ঘটনার জেরে তুলকালাম কাণ্ড জাতির বিবেককে নাড়িয়ে তুলেছে। অভিযাগ এসেছিল ছাত্রীদের পক্ষ থেকে। তারা তাদের হলের প্রভোস্টের বিরুদ্ধে নানা কারণে পদত্যাগ দাবি করেছিলেন ভিসির কাছে। এরকম অভিযোগ ও সমস্যা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হরদম হয়ে থাকে। এর চেয়েও বড় সমস্যার প্রেক্ষিতে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান করার বহু নজির রয়েছে। ভালভাবে যুক্তি দিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে বুঝানো হলে তারা সব সময় শিক্ষকদের কথা মান্য করে। কারণ, শিক্ষার্থীরা তাদের বাবা-মায়ের পর শিক্ষকদেরকে পিতৃ-মাতৃতুল্য শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে থাকে।

শিক্ষার্থীরাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণ। তারা অনেক সময় ভুল করলেও নিজের ভুল বুঝতে পেরে নিজেরাই অনেক সমস্যার সমাধান করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু শাবিপ্রবি-র ঘটনা সামান্য আন্দোলন থেকে কেন এতবড় সমস্যা হয়ে মামলা মোকদ্দমার দিকে গড়িয়ে ভিসি পতনের আন্দোলনের দিকে গেল তা এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি করে তুলেছে জাতিকে।

দেশের স্বনামধন্য ও সুনামধারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিজস্ব গৌরব রয়েছে। যেখানে এই লেখকও বহুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন। তখনকার ছাত্র-শিক্ষক মধুর সম্পর্কের জন্য আজকের এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা সেই মধুর স্মৃতিকে যেন বার বার দুমড়ে মুচড়ে তুলছে। শিক্ষার্থীরা মনে হচ্ছে তাদের কর্তৃপক্ষের ওপর চরমভাবে নাখোশ। তারা ভিসির বাসভবনের সামনে জটলা করছে, স্লোগান দিচ্ছে, হাততালি দিয়ে নিজেদের দাবিগুলো জোর গলায় পেশ করছে। শিক্ষার্থীরা এ ধরনের দাবি দাওয়া মাঝে মধ্যে বড় -ছোট সব বিশ্ববিদ্যালয়েই করে থাকে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান পেয়ে যায় ও তাদের কণ্ঠস্বরও ঠান্ডা হয়ে পরিস্থিতি স্বাভবিক হয়ে উঠে। এটাই অলিখিত নিয়ম।

ঘটনার প্রথমদিন আমরা টিভি ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দেলানের ভাষা ও গতি দেখে এটাই ভেবেছিলাম যে পরদিন সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে। কিন্তু না। পরের দিনের ঘটনাবলী দেখে মনে হলো শাবিপ্রবি-র পবিত্র অঙ্গন যেন একটি মিনি যুদ্ধক্ষেত্র। প্রথমে একদল মানুষ কর্তৃক ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কির পর লাঠির খটাখট বাড়ি পড়ার পর বৃষ্টির মত ইট-পাটকেলের নিক্ষেপ। এরপর শক্ত পেশাদারী লাঠির দমাদম পিটুনি, বন্দুকের রাবার গুলি, সাউন্ড গ্রেনেডের মুহুর্মুহু বিকট শব্দ, দৌড়াদৌড়ি, কান্নাকাটি ইত্যাদির দৃশ্য টিভিতে দেখে মনে হলো পরিস্থিতি আসলে ভয়ানক মোড় নিয়েছে। ফিলিস্তিনে যেমন বাচ্চাদের ইট-পাটকেলের বিরুদ্ধে ইসরাইলি সেনারা কামানের গোলা ছুঁড়ে চারদিকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে ক্যামেরার গ্লাস ঘোলা করে দেয় ঠিক তেমনি একটি দৃশ্যপট। মোটেও বেশি বললাম না। যারা খবর দেখেছেন তারা আমার কথা কিছুতেই অবিশ্বাস করতে পারবেন না।

দৈনিক পত্রিকায় দেখলাম শিক্ষার্থীদেরকে ভবনের দরজা থেকে তাড়ানোর জন্য লাঠিপেটা করার পাশাপাশি ২১টি গুলি ও ২৩টি সাউন্ড গ্রেনেড ছোঁড়া হয়েছে সেদিন। উদ্দেশ্য ভিসিকে ‘উদ্ধার’ করতে হবে। এই শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে। কই, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে তখনকার ভিসি শিক্ষার্থীদের দ্বারা সারাদিন তালাবদ্ধ থেকে পুলিশ ডেকে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি-গ্রেনেড ছুঁড়তে বলেননি। একজন ভিসিকে অনেক সময় ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে হয়। তিনি কেন অধৈর্য্য হবেন? শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছে আদরের নিজ সন্তানতুল্য। একথা যদি মনে ধারণ না করতে পারেন তাহলে তিনি ওই পদে দায়িত্ব নিতে যাবেন কেন? আজকাল অনেক ভিসি যথার্থ জ্ঞান ও যুক্তি দিয়ে মেধাবী বা বুদ্ধিমান ছাত্রদের সাথে কথাও বলতে অপারগ। সেটাই আজকাল অনেক ভিসির চরম দুর্বলতা।

আজকাল সবাই সব জায়গায় প্রশাসক হতে চান। একজন ভালো গবেষক হতে সবার দ্বিধা। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ শুধু শিক্ষক নন। তাঁরা একাধারে শিক্ষক ও বিশিষ্ট গবেষক। এটাই এই চাকরির বিশেষত্ব বা সবিশেষ নিয়ম। কিন্তু আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক গবেষক হতে চান না। তারা নিজেদেরকে প্রশাসক ভাবতে ভালবাসেন-অথচ সেকাজে অনেকে অযোগ্য বা অনেকেরই কোন প্রশিক্ষণ ও নৈতিক গুণাবলী থাকে না। আজকাল বেশিরভাগ শিক্ষক কোন না কোন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকেন। অনেকের রাজনৈতিক নেতাদের সাথে থাকে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। আবার অনেক শিক্ষক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকেন। একটি ক্লাস নিয়েই ব্যবসার তাগিদে দেন দৌড়। এদের অনেকেই নিয়ম অমান্য করে একটি প্রশাসনিক পদের জন্য সরকারি নানা দফতরে দৌড়াদৌড়ি করে নিজের মর্যাদাকে হেয় প্রতিপন্ন করে ভিসি নামক সোনার হরিণ লাভে তৎপর হন। কেউ কেউ এক মেয়াদ শেষ হলে আরও এক-দুই মেয়াদ বেশি থাকার জন্য তদবির শুরু করেন। দেখা গেছে, যারা দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার ভিসিপদ লাভ করেছেন তারা বেশি দুর্নীতি করতে তৎপর ছিলেন। তারা অনেকে বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে চলাফেরা ও বিভিন্ন একপেশে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিভিন্ন অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি করেছেন। এজন্য অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। অনেককে মেয়াদপূর্তির আগেই পদত্যাগ করতে হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শাবিপ্রবি-তে যা ঘটেছে তার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে উপাচার্য যে ব্যর্থ হয়েছেন, তা-ই নয় বরং শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নির্দেশ দিয়ে ফৌজদারি অপরাধ করেছেন তিনি। (প্রথম আলো ১৯.০১.২০২২)।

শাবিপ্রবি-র দুঃখজনক ঘটনার প্রতিবাদে ঢাবি, রাবি, জাহাঙ্গীরনগর, খুলনা ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ মিছিল ও পথসভা হয়েছে। ঢাবি ও রাবি-তে হয়েছে মশাল মিছিল। কুবিতে মানববন্ধন হয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে বাসা বাড়িতে থাকা ও মেসের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে এসে জমায়েত হয়ে আন্দেলানে যোগ দিয়েছে। অনেকেই ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছে ও কুশপুত্তলিকায় আগুন দিয়েছে। তারা এখন একটি দাবি তুলছে। তারা উপাচার্যের পদত্যাগ চায়। এজন্য গতকালই ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে । অন্যদিকে শাবিপ্রবি-র ঘটনায় ‘২০০-৩০০ জন অজ্ঞাতনামা লোককে আসামি করে’ জালালাবাদ থানায় মামলা করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদের খোলা চিঠি পাঠানো হয়েছে। উপাচার্যের অপসারণের দাবিত শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশনের ঘোষণা দিয়েছে (দৈনিক ইত্তেফাক ১৮.০১.২০২২)। এছাড়া বিষয়টির সুরাহা নিয়ে বিভিন্ন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপ চলছে।

গত মঙ্গলবার (১৮ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টায় শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগের জন্য বুধবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। অন্যথায় আমরণ অনশনের ঘোষণা দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী (২০ জানুয়ারি) বলেন, অনশনকারীদের কয়েকজন অসুস্থ পড়েছেন। তারপরও উপাচার্য গদি ছাড়ছেন না। এই ২৪ জনের কিছু হলে আরও ২৪ জন আসবে। এরপর আরও ২৪ জন। দেখি তিনি পদত্যাগ না করে কিভাবে থাকেন।

বুধবার সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে তার পদত্যাগের অপেক্ষায় ছিলেন। তবে উপাচার্য পদত্যাগ না করায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে আমরণ অনশন শুরুর সিদ্ধান্ত নেন। অনশনকারী একজন বলেন, উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা অনশন চালিয়ে যাবো। এতে যদি আমাদের মৃত্যু হয় তাহলে দায়ভার উপাচার্যের ওপরই বর্তাবে।

এদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রায় আড়াইশ শিক্ষকের সঙ্গে জুম মিটিং করেন উপাচার্য। মিটিং শেষে রাত ৮টার দিকে শতাধিক শিক্ষক আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে তাদের আন্দোলন স্থগিত করার অনুরোধ করেন। তবে আন্দোলন স্থগিতে রাজি হননি শিক্ষার্থীরা। (জাগো নিউজ ২০.০১.২০২২)।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। ফেডারেশন বলছে, কয়েকদিন ধরে শাবিতে শিক্ষার্থীরা কিছু ন্যায্য দাবি—দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করছেন। তাদের আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সর্বোচ্চ এ ফোরামের নেতাদের জোর দাবি, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক সব দাবি—দাওয়া মেনে নিয়ে দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক। (জাগো নিউজ ২১.০১.২০২২)।

তবে যাই হোক না কেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবিতে ছাত্রীদের আন্দোলন ভিসি পতনের আন্দেলনের মত এতদূর গড়াবে তা কারো কাম্য ছিল না। এখন সামনে আরও কী জটিলতা তৈরি হতে যাচ্ছে তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। করোনার জমজ ভ্যারিয়্যান্ট ডেলমিক্রনের ঊর্ধ্বগতির এই কালো সময়ে সামনে কী ঘটবে তার জন্য কেউ গভীরে চিন্তা করছেন না। করোনাভীতি ছাড়াও একটি মামুলি ঘটনার জেরে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নষ্ট হোক এটাও কারো কাম্য হতে পারে না।

শিক্ষক হতে হবে শিক্ষাবান্ধব, গবেষণাবান্ধব ও শিক্ষার্থীবান্ধব। শিক্ষক-শিক্ষার্থী কেউই হঠাৎ বিগড়ে গেলে চলবে না। পারস্পরিক ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধের যথার্থ প্রকাশের মাধ্যমে শাবিপ্রবি-র মতো একটি পবিত্র শিক্ষাঙ্গন হয়ে উঠুক জ্ঞানার্জনের পবিত্র বাগান-এই প্রত্যাশা শাবিপ্রবি-র একজন সাবেক শিক্ষক হিসেবে আমার। আর শিক্ষার্থীদের একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বার্থে একই চাওয়া সবার হওয়া উচিত।

;

সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধান জরুরি



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

 

২০২০-২০২১ মেয়াদে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবাষির্কী ‘মুজিব শতবর্ষ’ পালিত হয়। গত বছর (২০২১) একই সাথে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবও উদযাপিত হয়েছে। মুজিব শতবর্ষ, স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে প্রায় দুই বছর ধরে বিরাজমান করোনা মহামারি সত্ত্বেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকার কারণে মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। ২০২১ এর ৬ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ করে, যা ওই বছর ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশেও উর্ত্তীণ হয়েছে।

২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অন্যান্য অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি বিভিন্ন মেগাপ্রকল্প গ্রহণ করে। যার অনেকগুলোই আজ দৃশ্যমান। বিশেষজ্ঞদের মতে, এইসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার পথে ধাবিত হবে। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা এ সরকারের ব্যর্থতার চেয়ে সাফল্য অনেক। স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় একটি স্বীকৃতি।

অন্যদিকে গত বছর দেশে করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে দেশব্যাপী সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ায় বছরের প্রায় অর্ধেক সময় জুড়ে ধারাবাহিক লকডাউনের কারণে জনজীবনে সঙ্কট নেমে আসে। করোনাকালীন এই সঙ্কটের মধ্যেও দেশে অনেকগুলো বৃহৎ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান হয়েছে। পদ্মা সেতু এখন আর কোন কল্পনা নয়, এটি দৃশ্যমান। এবছরেই পদ্মা সেতু চালু হচ্ছে এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই। পদ্মা সেতু এখন  বাংলাদেশের সম্মান এবং মর্যাদার প্রতীক। কর্ণফুলী টানেলের কাজও এগিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে। এবছর এই টানেলের উদ্বোধন করা হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। মেট্রোরেল ইতিমধ্যে ট্রায়াল দেওয়া শুরু করেছে। এই বছরেই মেট্রোরেলও চালু হবে। এছাড়াও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।

একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন সেক্টরে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। ২০০৮ এ প্রণীত নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিন বদলের সনদ’ এর ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেয়া ‘রূপকল্প ২০২১’, ‘রূপকল্প ২০৪১’, ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পনা’, বিভিন্ন পঞ্চ-বাষির্কী পরিকল্পনা গ্রহণ করে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। জাতিসংঘ ঘোষিত “সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা” সফলভাবে অর্জিত হয়েছে। “টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা”র বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে। উন্নয়নের প্রধান শক্তি বিদ্যুৎ  উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত দেশের নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা যেমন, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদনের ক্ষেত্রে গত একযুগে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিভিন্ন আন্তজার্তিক সংস্থার হিসেবেও বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক সূচকের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে।

খাদ্য ও টেকসই কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বিশেষ করে কৃষিখাতে ঘটেছে বিপ্লব। মৎস্য ও পশু সম্পদ উন্নয়নে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ইলিশ মাছ আহরণে বিশে^ প্রথম অবস্থানে আছে। জাতীয় মহাসড়কসহ গ্রামীণ অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় আয় বেড়েছে, দারিদ্য্রের হারও কমেছিল উল্লেখযোগ্যভাবে; যদিও করোনা মহামারিতে তা ফের বেড়েছে। বাংলাদেশ রপ্তানি বৃদ্ধি ও রেমিটেন্স অর্জনেও সাফল্য অর্জন করেছে।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে সমাজের দুর্গত মানুষের অভিগম্যতা বৃদ্ধি, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দূর্যোগ মোকাবেলা, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন, নারীর ক্ষমতায়ন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয় প্রদান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে গৃহহীনদের ঘর প্রদান, বস্তিবাসীদের জন্য স্বল্পভাড়ায় ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ফ্ল্যাট নির্মাণ, করোনা মহামারি মোকাবেলায় সরকারের সাফল্য অনেক। সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। এদেশের আপামর জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে ‘উন্নয়নের রোল মডেলে’পরিণত করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সরকার এত বেশি উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কিন্তু এই গর্বের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো যখন চলছে তখন কিছু অস্বস্তি এবং সামাজিক সমস্যা এই বড় বড় উন্নয়নগুলোকে ম্লান করে দিচ্ছে। এসবের মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। লাফিয়ে লাফিয়ে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। আয়ের সাথে ব্যয়ের সংকুলান করা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। ক্রমাগত বাড়ছে অসন্তোষ।

গণপরিবহনে বিশৃংখলা সাধারণ মানুষের জন্য বিশাল এক দুভোর্গের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনার কারণে একটা দীর্ঘসময় গণপরিবহন বন্ধ ছিলো। তারপর যখন গণপরিবহন অর্ধেক আসন রেখে চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তখন এর ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছিল। তারপর এই ভাড়া আর কমানো হয়নি। এর মধ্যে ডিজেল এবং কেরোসিনের দাম বৃদ্ধি করার সাথে সাথে আবার গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ে এবং এই ভাড়া বাড়ার পর এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলেছে। গণপরিবহন নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা এবং অস্বস্তি ছিলো এবং এখনও রয়ে গেছে। গণপরিবহনকর্মীদের বিশেষ করে চালক ও সুপারভাইজারদের দুর্ব্যবহার, নারী যাত্রীদের হেনস্থা ও সম্ভ্রমহানির মত ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে যা সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছে।

নৌপরিবহনেও স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন সময়ে লঞ্চ ডুবি এবং সর্বশেষ লঞ্চে অগ্নিকা-ের ঘটনা সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। গত বছর ও এ বছরের শুরুতে স্থানীয় পরিষদ নির্বাচন, বিশেষ করে ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এই ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষকে এক ধরনের অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করেন। অসৎ কিছু নেতা. পাতি নেতা, কর্মীদের ক্ষমতার প্রর্দশন সাধারণ মানুষকে তটস্থ করে ফেলেছ্। ক্ষমতা প্রর্দশনের এই সংস্কৃতি সাধারণ জনগণ বাদে সবার মধ্যেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। ক্ষমতা প্রর্দশনের এই সংষ্কৃতি বিপদজনক বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কারণ সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে ক্ষমতা দেখালে তার পরিণতি অশুভ হতে পারে। কাজেই এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে করণীয় ঠিক করতে হবে।

এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের সামাজিক ব্যাধি এবং অন্যান্য সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়েছে যা জনগণকে কিছুটা হলেও আতঙ্কের মধ্যে ফেলেছে। বেকারত্ব, দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, অসমতা বৃদ্ধি, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, নারীর প্রতি সহিংসতা আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয়। বিশেষ করে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা, যৌন হয়রানি, পারিবারিক নির্যাতন এবং নারী পাচার এর মত ঘটনার ভয়াবহতা লক্ষ্য করা গেছে। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে অসন্তোষও দেখা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ক্ষোভ ও বিক্ষোভ দানা বাঁধছে। এসব সমস্যার সমাধানে মনোযোগ দেয়া দরকার বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং অগ্রযাত্রায় বৃহৎ প্রকল্প  যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সামাজিক জীবনে স্থিরতা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দারিদ্র দূরীকরণ, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি কমানো, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, কর্মসংস্থান, গণপরিবহণে শৃংখলা ফেরানো এবং বৈষম্য ও অসমতা দূর করা। সেই সাথে ক্ষমতা প্রদর্শনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। আর এইসব যদি বন্ধ করা সম্ভব না হয় তাহলে বড় বড় উন্নয়নগুলোর সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

সে কারণেই এসব সামাজিক সমস্যা ও সঙ্কটগুলোর দিকে সবার আগে নজর দেয়া উচিত। ছোট ছোট সমস্যাগুলো যদি জিইয়ে রাখা হয় তাহলে বড় বড় উন্নয়নগুলো ম্লান হয়ে যেতে পারে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করেন। এসব সামাজিক সমস্যা যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায় তাহলে ভবিষ্যতে জনগণ বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর দিকে মনোযোগ দেবে না বলে বিশেষজ্ঞরা বার বার সর্তক করে আসছেন। সুতরাং সরকারের এ বিষয়ে আশু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তা নিয়ে ‘সামাজিক শৃংখলা উন্নয়ন কর্মসূচি’ পরিচালনা করতে হবে।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন কর্মী

;