আমরা ‘চাষাভুষা’,  চাষাভুষার সন্তান



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘চাষাভুষার সন্তান, আমরা সবাই সাস্টিয়ান’ শীর্ষক এক স্লোগান ওঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির একজন শিক্ষক কর্তৃক ‘আমরা কোনো চাষাভুষা নই যে আমাদের যা খুশি তাই বলবে’—এমন এক মন্তব্যের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এই প্রতিবাদী স্লোগান। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. লায়লা আশরাফুন গতকাল সকালে শ্রেণিবৈষম্যের যে মন্তব্য করেছেন তার জবাব শিক্ষার্থীর। শিক্ষক শেকড়কে অস্বীকার করলেও শিক্ষার্থীরা শেকড়ের টান উপেক্ষা করতে পারছে না। তাই তাদের সরব প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদে আমরাও শামিল। যদিও সাস্টিয়ান নই, তবু আমরাও এই মাটির সন্তান; চাষাভুষারা আমাদের পূর্বপুরুষ, যাদের উত্তরাধিকার আমরা বয়ে চলেছি সযত্নে।

আমি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নই। আমার শিক্ষাজীবনের সমাপন অন্য কোথাও। ড. লায়লা আশরাফুনের মত পিএইডি ডিগ্রিধারী না হলেও আমারও পাঠ সমাজবিজ্ঞানে। পাঠের যে বিশালতা তার বেশিরভাগই আমার বা আমাদের মত অনেকের আয়ত্বে না থাকলেও অন্তত সমাজ-পাঠের সাধারণ জ্ঞানটুকু অর্জন ও প্রতিপালনের চেষ্টা করি, যেখানে শ্রেণিবিভাজনের স্থান নেই; বরং অবারিত এখানে সাম্যের পাঠ। অধ্যয়নলব্ধ জ্ঞানের বিষয়ই কেবল নয় এটা, মানসিকতা ও প্রকাশের যা একান্তই ব্যক্তিক চিন্তার প্রতিফলন। তাই বিষয়কে কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে শুধু বলা যায় এ যে প্রকাশের অজ্ঞতা, পাঠান্তে লব্ধ জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। লায়লা আশরাফুন এখানে পিএইডিধারী যদিও, তবু এ সীমাবদ্ধতা কিংবা সংকীর্ণতা অতিক্রম করতে পারেননি।

ড. লায়লা আশরাফুন শিক্ষক। তার দাবি তারা ‘বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ধারণ করেন’, তারা ‘চাষাভুষা নন যে তাদেরকে যা খুশি তাই বলা যাবে’। তার শিক্ষা, তার অবস্থান তাকে হয়ত তার দাবির বুদ্ধিজীবী শ্রেণিতে স্থান দেয়, কিন্তু কেমন বুদ্ধিজীবী তিনি যিনি শেকড়কে অস্বীকার করেন। চাষাভুষা শব্দ উল্লেখে প্রান্তিক মানুষদের অবজ্ঞা করেন প্রকাশ্যে। কেউ কি অপমান করেছে তাকে? তাকে বা তাদেরকে উদ্দেশ করে কেউ কি ‘কুরুচিপূর্ণ’মন্তব্য করেছে? তিনি সম্মানের জন্যে শিক্ষকতা পেশায় এসেছেন, সম্মানের জন্যে কাজ করেন বলে জানাচ্ছেন। সম্মাননীয় পেশা যে শিক্ষকতা যা তার মুখ থেকে বেরিয়েছে তা সর্বাংশে সত্য, সম্মানের জন্যে মানুষ শিক্ষকতা পেশায় আসে, এটাও সত্য। তবে তিনি কি সেই সম্মাননীয় পেশার সম্মানকে ধরে রাখতে পেরেছেন? পারেননি। না পারার কারণ ওই উদ্ধত, অশালীন, অসংলগ্ন এবং শেকড়কে তাচ্ছিল্য করা মন্তব্য। এমন মন্তব্য একজন শিক্ষকের কাছ থেকে আসলে আদতে শিক্ষকের মহান পেশাকে কলঙ্কিত করা হয়। ড. লায়লা আশরাফুন সেটাই করেছেন।

দেশবাসী ইতোমধ্যেই জেনে গেছে, শাবিপ্রবির এই শিক্ষার্থী-আন্দোলন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের নয়। এটা একান্তই বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়। শুরুতে একটি হলের প্রভোস্টের অসদাচরণের প্রতিবাদে নির্দিষ্ট ওই হলের ছাত্রীদের বিক্ষোভ। কিন্তু ব্যর্থ প্রশাসন এটাকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যা এখন জাতীয় ইস্যু হয়ে ওঠার অপেক্ষায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী ছাত্রী হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক জাফরিন আহমেদ লিজার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে সত্য কিন্তু তার আগে নিপীড়নমূলক এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যেখানে বিনা উসকানিতে পুলিশ হামলা করেছে শিক্ষার্থীদের ওপর। এতে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পুলিশ এসে হামলা করবে তা শিক্ষার্থীরা মেনে নেবে—এমন করুণ অবস্থা এখনও হয়নি ছাত্রসমাজের। ফলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের জাগরণ ওঠেছে ক্যাম্পাসে। পূর্বের সব দাবি তাই এখন এক দাবিতে পরিণত হয়েছে, এবং তা উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ। এরআগে পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে, আইসিইউতেও। এই যে নির্যাতন, এই নির্যাতনে কি দমে যাবে শিক্ষার্থী-আন্দোলন? মনে হয় না। বরং তা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে দেশের অপরাপর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

সপ্তাহ ধরে চলমান এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা আগ্রাসী হয়নি। পুলিশ গুলি চালিয়েছে, লাঠিপেটা করেছে, মামলা দিয়েছে। শুরুর মার খাওয়ার পর প্রতিরোধ করেছে শিক্ষার্থীরা। এরপর আন্দোলনের একটা পর্যায়ে এই শিক্ষার্থীরা আবার শান্তির বার্তা ছড়াতে পুলিশের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে গিয়ে বলেছে—‘পুলিশ তুমি ফুল নাও, আমার ক্যাম্পাস ছেড়ে দাও’! ক্যাম্পাসে পুলিশের আগ্রাসী ভূমিকা, অবস্থানে তারা সংক্ষুব্ধ, তবে আগ্রাসী হয়ে পুলিশকে ধাওয়া দিয়ে স্থায়ীভাবে ক্যাম্পাস-ছাড়া করতে যায়নি। এখানে তাদের প্রাপ্তমনস্কতার প্রশংসা করতে হয়। ফুল হাতে তাদের এই আহ্বানকে আন্দোলনের শিল্পিত প্রকাশ রূপেও বর্ণনা করা যায়। দেশের অন্যতম সেরা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মন-মনন-চিন্তা ও প্রকাশে যে উচ্চতর এরচেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে!

শিক্ষার্থীরা যেখানে উচ্চতর চিন্তায় সেখানে কিছু শিক্ষক কি সেটা ধারণ করতে পারছেন? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে কেউ কেউ পারছেন না। ড. লায়লা আশরাফুন তার বড় প্রমাণ। শিক্ষার্থীদের ‘কুরুচিপূর্ণ’ মন্তব্যের অভিযোগের বিরুদ্ধে মানববন্ধনের নামে বিতর্কিত ভিসির পক্ষ নিয়ে তিনি যে দাম্ভিক মন্তব্য করেছেন তা সুরুচির পরিচয় বহন করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তুঙ্গু পরিস্থিতিতে তার মত একজন শিক্ষক যেখানে স্থির-চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে পারতেন সেখানে তিনি আগুনে ঘি ঢেলেছেন। বিক্ষুব্ধ করছে শিক্ষার্থীদের, একই সঙ্গে আমরা যারা সরাসরি আন্দোলনে নেই সেই আমাদেরকেও সংক্ষুব্ধ করছেন। এটা শিক্ষক অবস্থানে থাকা কারও যথাযথ মন্তব্য হতে পারে না। কৃষক-মজুর সমাজের ঐতিহ্যিক উত্তরাধিকার হিসেবে আমরা এর প্রতিবাদ করি।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। শিক্ষার্থীদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে আমরা একাত্ম। শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে এখন পর্যন্ত অনড়। তারা কেবলই উপাচার্যের সংশ্লিষ্ট অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলছে। উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের ভাইরাল হওয়া এক কথোপকথন নিয়ে এখন পর্যন্ত তাদের মাথাব্যথা নেই, যদিও ওটা আরেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষত নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে চরম অপমানজনক মন্তব্য। আন্দোলনকে নানাভাবে ভাগ না করে কেবল একটা নির্দিষ্ট দাবিতে মনোনিবেশে তাদের এই দৃঢ়তা আশাব্যঞ্জক। এইধরনের মন্তব্যের বিরুদ্ধে উপর্যুক্ত কর্তৃপক্ষ তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেবেন আশা করি। অথবা সংক্ষুব্ধ কেউ এই অপমানের আইনি প্রতিবিধানের পথে গেলে যাক। তবে আমরা চাই নারী নিয়ে এইধরনের অপমানের বিচার হওয়া উচিত। 

শিক্ষক-শিক্ষার্থী পরস্পরবিরোধী সত্ত্বা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া আবশ্যক। সর্বোচ্চ পর্যায়ে শিক্ষা নিতে আসা শিক্ষার্থী আর সর্বোচ্চ পর্যায়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া শিক্ষকের মধ্যকার সম্পর্ক শিক্ষাস্তরের প্রাথমিক আর মাধ্যমিক পর্যায়ের মত হওয়ার কথা নয়। এই সম্পর্ক পরস্পরের মধ্যকার সম্মানের হতে হবে। তা না হলে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের শঙ্কা থাকবেই। এই পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী তাদের নিজেদের অবস্থান ভুলে গেলে সেটা হবে হতাশার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকশ’ শিক্ষক যে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এমন না, কয়েক হাজার শিক্ষার্থী যে শিক্ষকদের অপমান (যদিও অপমানের কোন প্রমাণ কেউ দেখায়নি) করছেন এমনও না। তবে যারাই অদ্যকার এই উত্তুঙ্গু পরিস্থিতিতে আগুনে ঘি ঢালবে তারা মোটেও শিক্ষাবান্ধব কেউ নয়। তাদের উচিত হবে সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়া।

শাবিপ্রবিতে এই যখন পরিস্থিতি তখন নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠান রীতিমত ‘গণঘুমে’। এই ঘুম ভাঙবে কবে তাদের? এত জল ঘোলা করে যদি সবশেষে নামা হয় তবে যা কিছু বাকি তা জল নয়, উচ্ছিষ্টই! দাবি করি ‘গণঘুম’ থেকে জাগুক তারা। আচার্য, সরকার কিংবা যারাই নিয়ন্ত্রক তারা শিক্ষা ও শিক্ষার্থীবান্ধব হয়ে বাঁচিয়ে দিক দেশের অন্যতম সেরা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে।

‘বাঁচাও শাবি, সরাও ভিসি’—শিক্ষার্থীদের এমনই দাবি। শিক্ষার্থীদের এই দাবিতে যুক্তি আছে। যুক্তি থাকায় গণভিত্তিও আছে!

কবির য়াহমদ, প্রধান সম্পাদক, সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর, মোবাইল- ০১৬১৪ ৩৪ ৮২ ৮২, ইমেইল- [email protected]

মহামারী ও যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ঝূঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের করণীয়



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

 

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম সম্প্রতি 'দ্য গ্লোবাল রিস্কস রিপোর্ট ২০২২' প্রকাশ করেছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে এই প্রতিবেদনটি সারা বিশ্বের ব্যবসায়িক নেতা, রাজনীতিবিদ, সরকার প্রধান, ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্বের সুশীল সমাজের নেতাদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। এ বছর সংস্থাটি অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, ভূ-রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রযুক্তিগত পাঁচটি বিভাগে ঝুঁকি পরীক্ষা করে। প্রতিবেদনের মূল অনুসন্ধানগুলি দেখায় যে কোভিড-১৯ মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে সামাজিক এবং পরিবেশগত ঝুঁকিগুলি সবচেয়ে  বেড়েছে। “জলবায়ুর চ্যালেজ্ঞ মোকাবিলায় ব্যর্থতা”, "সামাজিক সংহতি ক্ষয়" এবং "জীবিকার সংকট" ঝুঁকি তালিকার শীর্ষে রয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হিসাবে চিহ্নিত অন্যান্য ঝুঁকিগুলি হল "ঋণ সংকট", "সাইবার নিরাপত্তা ব্যর্থতা", "ডিজিটাল অসমতা" এবং "বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া"।

চরম আবহাওয়া, জীবিকা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ব্যর্থতা, সংক্রামক রোগ, সামাজিক সংহতির অবনতি, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, সাইবার নিরাপত্তায় ব্যর্থতা, ঋণ সংকট, ডিজিটাল অসমতা, মুদ্রার অবমূল্যায়নসহ অনিচ্ছাকৃত মাইগ্রেশনকেও স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সমীক্ষার উত্তরদাতাদের মধ্যে, মাত্র ১১ শতাংশ উল্লেখ করেছেন যে ২০২৪ সালের দিকে বিশ্ব একটি দ্রুত পুনরুদ্ধারের পথে চালিত হবে।  কিন্তু উত্তরদাতাদের একটি বৃহৎ অংশই (৮৯ শতাংশ)  মনে করেন যে সামনের দিনগুলো ক্রমশ অস্থির, ভঙ্গুর বা ক্রমবর্ধমান বিপর্যয়মূলক বলে তাদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে । অন্যদকে  ৮৪ শতাংশ উত্তরদাতা  দীর্ঘমেয়াদে  ভবিষ্যত সম্পর্কে নেতিবাচক অনুভূতি প্রকাশ করেছেন যার অর্থ বিশ্বের ভবিষ্যত নিয়ে তারা "উদ্বিগ্ন" বা "চিন্তিত" । তারা মনে করেন এই পরিস্থিতি ব্যাপক হতাশা ও মোহভঙ্গের একটি চক্র তৈরি করতে পারে যা কোভিড-১৯ এর ক্ষত পুনরুদ্ধার আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলতে পারে।

"সামাজিক সংহতির ক্ষতি", "জীবিকার সংকট" এবং "মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি" আগামী দুই বছরে বিশ্বের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক হুমকি হিসেবে দেখা দিবে বলে তারা মনে করেন। এই সামাজিক ক্ষতগুলো জাতীয় নীতি-নির্ধারণকে চ্যালেঞ্জ করে, রাজনৈতিক পুঁজিকে সীমিত করে, বৈশ্বিক নেতাদের উপর চাপ তৈরি করতে পারে বলে তারা উল্লেখ করেছেন। এক্ষেত্রে তারা মনে করেন বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জগুলোতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার জন্য জনসাধারণের সমর্থন প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু ঝুঁকি একটি বড় বৈশ্বিক উদ্বেগ। স্বল্পমেয়াদী উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে সামাজিক বিভাজন, জীবিকার সংকট এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি। করোনার কারণে এসব ঝুঁকি বেড়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার স্থিতিশীল হবে না এবং এই ধরনের অসম পুনরুদ্ধার আগামী তিন বছর অব্যাহত থাকতে পারে। দশ জনের মধ্যে একজন উত্তরদাতা মনে করেন অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। তবে, বেশিরভাগ উত্তরদাতা মনে করেন যে আগামী পাঁচ বছরের জন্য সামাজিক ও পরিবেশগত ঝুঁকিই প্রধান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ৩.১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে৷। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম অনুমান করেছে যে ২০২১ সালে, বিশ্বব্যাপী প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫.১ শতাংশ যা ২০২২ সালে ৪.৯ শতাংশে  নেমে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারী না ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতি যেখানে থাকত তার তুলনায় ২০২৪ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ২.৩ শতাংশ সংকুচিত হয়ে যাবে।

কোভিড-১৯ মহামারীর শুরু থেকেই সরবরাহ সংকট একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছিল। ২০২০ সালের তুলনায়, পণ্যের দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি সংকট নিয়ে ইউরোপ, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে দ্বন্দ্ব পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে পারে। তবে সারা বিশ্বে এখন যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা যাচ্ছে তার প্রধান কারণ সরবরাহ সংকট। অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি চাহিদা-চালিত নয়, সরবরাহ-চালিত। অনেক দেশই পণ্য মজুদ শুরু করেছে এবং বৈশ্বিক রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালেও সরবরাহ সংকট অব্যাহত থাকবে। মহামারীর কারণে বেশিরভাগ দেশই রাজস্ব হারিয়েছে। উন্নত দেশগুলো অনেক প্রণোদনা দিয়েছে। ২০২২ সালে, বিভিন্ন দেশে সরকারি ঋণ ১৩ শতাংশ বেড়ে জিডিপির ৯৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ডলারের বিপরীতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রার অবমূল্যায়ন হতে পারে। এবং এইসব দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংকট ও মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রধান ঝুঁকি হল জীবিকা ও কর্মসংস্থান। প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক ঝুঁকির পাশাপাশি সামাজিক-রাজনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। কর্মসংস্থান ও জীবিকা ছাড়াও বাংলাদেশকে কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে চিহ্নিত অন্যান্য ঝুঁকিগুলি হল পরিবেশ, সাইবার দুর্বলতা, ডিজিটাল অসমতা ইত্যাদি।

অন্যদিকে, বিশ্বব্যাপী ঝুঁকি ও কৌশলগত উপদেষ্টা সংস্থা ভেরিস্ক ম্যাপলেক্রফট ১৩২টি দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আগামী ছয় মাসের জন্য নাগরিক অস্থিরতা সূচক প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। মধ্যম আয়ের দেশগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের সূচকে, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের দুই-তৃতীয়াংশকে নিম্ন-মধ্যম বা উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাংক তালিকাভুক্ত করেছে।

অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে জনরোষের মুখে প্রধানমন্ত্রীসহ শ্রীলঙ্কার মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্য পদত্যাগ করেছেন। পাকিস্তানে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। কাজাখস্তানে কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। এ বছর এমন অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশসহ ১০টি উদীয়মান অর্থনীতির  দেশ তালিকায় রয়েছে।  যে ১০টি দেশকে আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে সেগুলো হলো আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, মিশর, তিউনিসিয়া, লেবানন, সেনেগাল, কেনিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং ফিলিপাইন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারী চলাকালীন এই দেশগুলো তাদের জনগণকে সামাজিক নিরাপত্তা দিয়েছে। কিন্তু তারা চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এশিয়ার দেশগুলোর জন্য অস্থিতিশীলতার কারণ হতে পারে।

রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর থেকে বিশ্ব খাদ্যের দাম দ্রুত বেড়েছে। জ্বালানির দামও বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলো। ম্যাপেলক্রফ্ট উল্লেখ করেছে যে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সংকট ২০২৩ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, কারণ এই মুহূর্তে কোনও সমাধান নেই।

সংস্থাটির মতে, নাগরিক অস্থিরতা দেশগুলোর অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে এসব দেশে বিনিয়োগ করবে কিনা তাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় উদ্ভূত সামাজিক বিভাজন প্রকাশ পাচ্ছে। এটি উদ্বেগে বাড়াচ্ছে। কারণ করোনার প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য, বিশ্ব নেতাদের একসাথে কাজ করতে হবে এবং একটি বহুপাক্ষিক পদ্ধতির সন্ধান করতে হবে।

তবে প্রতিকূল ভবিষ্যদ্বাণী সত্ত্বেও কিছু ইতিবাচক ফলাফল আশা করার কারণ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯ মহামারী  মোকাবিলার শিক্ষা নিয়ে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবিলা, সাইবার অপরাধ দমন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নিরসনে বৃহত্তর সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা। সেইসাথে সরকারি উদ্যোগে অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

কোভিড-১৯ ও রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্দ্ধগতি, তেলসহ অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর অবৈধ মজুত, সড়ক দুর্ঘটনা, আমদানি ও রপ্তানিতে ঘাটতি, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, হাওড় অঞ্চলে ফসল হানি, অকাল বন্যা, ডেঙ্গুসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রার্দুভাব, বেকারত্ব, অবৈধ অভিবাসন সহ সামাজিক অস্থিরতাও অনেক বেড়ে গেছে। একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশকে বিঘ্নিত করতে এসব বিষয় মারাত্মক ঝুঁকি হিসেবে কাজ করতে পারে।

সুতরাং, একথা বলা যায়, এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সমাজে অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে। এমনকি রাজনৈতিক ব্যবস্থারও পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। যেমনটি আমরা আমাদের পাশ্ববর্তী দেশসহ বিভিন্ন দেশে দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং, এখনই এসব বিষয়ে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

;

‘রাতের ভোট’: আত্মসমালোচনা ইসির



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা আছে। ওই ভোট দিনের বেলার পাশাপাশি রাতেও হয়েছে বলে সরকারবিরোধী অংশের জোর প্রচার। বর্তমান সরকারকে ‘রাতের ভোটের অবৈধ সরকার’ বলে অভিযুক্ত করে আসছে বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলো। আওয়ামী লীগ বরাবরের মতো সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জনগণ তাদের সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে ফের ক্ষমতায় এনেছে এমনই দাবি তাদের। আওয়ামী লীগের দাবি বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে দেশবাসী প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে বিপুল বিজয় উপহার দিয়েছে।

ভোট নিয়ে নানা অভিযোগ মাথায় নিয়েই বিদায় নিয়েছে সাবেক ইসি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নুরুল হুদা বারবার রাতের বেলায় ভোটের অভিযোগ অস্বীকার করলেও আবার আকারে ইঙ্গিতে সেটা কবুলও করেছেন একাধিকবার। তবে এনিয়ে তার মধ্যে অনুশোচনা লক্ষ্য করা যায়নি, বরং নিজেকে সফল দাবিও করে গেছেন শেষ পর্যন্ত। যদিও তার নেতৃত্বাধীন কমিশনের অন্য কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন একাধিকবার এবং সিইসির সঙ্গে তার বিরোধ ছিল প্রকাশ্য। সিইসির সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধের কারণে হোক আবার অনুশোচনার কারণেই হোক ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে তিনি তার খেদের কথা বারবার বলেছেন। নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতার কথা বললেও ব্যর্থতা স্বীকার করে পদত্যাগ করার সাহস দেখাতে পারেননি। তিনিও অন্যদের মতো সাংবিধানিক সকল সুযোগসুবিধা গ্রহণ করে মেয়াদ পূরণ করেই বিদায় নিয়েছেন।

আগের নির্বাচন কমিশন (ইসি) ‘রাতের ভোট’ নিয়ে নানা কথা বলেছে, বর্তমান ইসিও। মঙ্গলবার (২৪ মে) রাজধানীর নির্বাচন ভবনে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, নির্বাচনকে প্রহসনে রূপান্তর করার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই। এটা আমরা অন্তর থেকে বলছি। সুন্দর নির্বাচন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সুস্থ ধারা অব্যাহত থাকুক। ভোট নিয়মানুযায়ী হবে, দিনের ভোট দিনেই হবে। ভোট রাতে হবে না—এটা স্পষ্ট করে বলতে চাই। সিইসির এই বক্তব্য চলমান নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের নানা আলোচনার বিপরীতে আস্থা ফেরানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে চাই।

আগের ভোট রাতে হয়েছে কি-না এনিয়ে প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি, কোন আদালতও এটা বলেনি। বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোসহ দেশের অনেকের ধারণা এমনই। এই ধারণার বাইরে যেতে পারেনি সাবেক ও বর্তমান নির্বাচন কমিশন। ভোট রাতে কি দিনে হয়েছে এটা এখন পর্যন্ত অমীমাংসিত বিষয়, এনিয়ে নির্বাচন কমিশন যখন কথা বলে তখন মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগে। তবে সন্দেহ ও অনাস্থা থেকে আস্থা ফেরানোর যে পদক্ষেপ সেটা বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিচ্ছে বলে ধারণা করা যায় ইঙ্গিতবহ স্বীকারোক্তি কিংবা আত্মসমালোচনা থেকে। এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে বরং আগ্রহী।

বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যর্থতা একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের অভিযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারেনি। গত নির্বাচনে বিপুল পরাজয়ের পর তারা সেই নির্বাচন নিয়ে কোন কাজ করেছে বলে দৃশ্যমান হয়নি। নির্বাচনের ফলাফলের বিপর্যয় কী কারণে ঘটল তা নিয়ে কিছু মেঠো-বক্তৃতা দেওয়া ছাড়া আর কোন কাজ করেনি তারা। নির্বাচনের পর আসনভিত্তিক ফলাফল নিয়ে আগের নির্বাচনগুলোর সঙ্গে সবশেষ নির্বাচনের ভোটের সংখ্যা নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে সেগুলো দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করলে ওখান থেকে তারা অনেক কিছু পেতে পারত। এর মাধ্যমে তারা নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণা করাতে পারত না ঠিক তবে মানুষের কাছাকাছি যেতে পারত। লড়াইটা হতে পারত বুদ্ধিবৃত্তিক, কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে শক্তিহীন বিএনপি যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রেও শক্তিহীন একটা দল সেটাই প্রমাণ করেছে তারা।

বিএনপির এই ব্যর্থতা রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক। এর সুযোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তারপরেও ‘রাতের ভোট’ নিয়ে আলোচনা আছে। সরকার দল আওয়ামী লীগ যতই এটা অস্বীকার করুক না কেন মানুষের মনে বিভ্রান্তি আছে, নানা মত আছে ইসিতেও। নির্বাচন কমিশন এনিয়ে কথা বলার মধ্যে আত্মসমালোচনার যে পথ দেখাচ্ছে এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। আগের ‘ভুল’ শুধরে নিয়মানুযায়ী ভোটগ্রহণের যে প্রত্যয় বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মধ্যে দেখা যাচ্ছে এটা দেখে আশাবাদী হতে পারে দেশের মানুষ, আশাবাদী হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো; নির্বাচন হতে পারে অংশগ্রহণমূলক। বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে অস্বীকার তত্ত্ব এই নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে আমাদের।

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি-না এনিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে, কারণ বর্তমান সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা আছে বিএনপির। আবার বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে না আওয়ামী লীগ সরকার। আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক কিংবা জাতীয় সরকারের দাবি আদায়ের মাঠের শক্তিও নেই বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোর। ফলে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের চ্যালেঞ্জ আছে নির্বাচন কমিশনের। তারা পারবে কি-না এটা সময়ই বলে দেবে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের যে অবস্থান তাতে অন্তত আশাবাদী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।

নিয়মানুযায়ী দিনের ভোট, অনিয়মের রাতের ভোট—এ আলোচনা চলতেই থাকবে। তবু মানুষকে আস্থা রাখতে হবে নির্বাচন কমিশনের ওপর। বর্তমান নির্বাচন কমিশন কতটুকু কী করতে পারবে এনিয়ে এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছার সময় হয়নি দেশবাসীর। তারা মানুষের আস্থা ফেরাতে কাজ করছে, আপাতত এটাই স্বস্তির। কাজের আগে কাজ নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়, তাদেরকে সমর্থনের পাশাপাশি দিতে হবে প্রয়োজনীয় সময়। দেশবাসীর সমর্থন পেলে তারা তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারবে বলে বিশ্বাস রাখতে চাই।

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

রবীন্দ্রনাথ কোনদিন আমাকে কল করেননি!



ডা. রাজীব দে সরকার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘুম ভাঙলো একা একাই।

একটু ঘেমে গিয়েছি।

চোখ খুলে একবার মনে হলো, নিজের ঘরটাকেও চিনতে পারছি না।

মোবাইলটা বাজছে। সম্ভবত: এ কারনেই ঘুম ভেঙেছে।

- হ্যালো, কে? (ঘুম এখনো কাটেনি আমার কন্ঠে)

- আমি শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জোড়াসাঁকোর। তুমি এক সময় আমার কবিতা পড়েছো।

- ও, কি চাই? আমি ভ্যাকসিন সংক্রান্ত কাজে জড়িত নই।

- আমার ভ্যাকসিন লাগবে না, বাবা।

("বাবা" বলায় একটু ঘুম কাটিয়ে কথা বলা চেষ্টা করলাম। কারন রোগীদেরকে 'বাবা' বলে সম্বোধন করতেন আমার সার্জারীর গুরু)

- ও, কেন ফোন দিয়েছেন, কেউ কি অসুস্থ?

- হ্যাঁ অসুস্থ। সেটা বলতেই ফোন দেওয়া।

- জ্বী, বলুন। আমি শুনছি।

- বৈদ্য রাজীব, তোমার সমাজের একদল পুরুষ খুব অসুস্থ।

- আচ্ছা কাল হসপিটালে পাঠিয়ে দেবেন, দেখে দেবো।

- পারবে তো দেখে দিতে? আচ্ছা, একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো। তোমরা কবিতা পড়া ছেড়ে দিলে কেন?

- কবিতা পড়া ছাড়িনি তো।

- মিথ্যা কথা। তোমরা এখন কবিতা পড়ো না। আগের পড়া কবিতাগুলো কোটেশন অভ্র দিয়ে লিখে ফেইসবুকে পোস্ট করো। শেয়ার করো। ব্লগে লেখো। কিন্তু কবিতা আর পড়ো না।

- ও, তাহলে বোধহয় ভালো লাগে না। আপনি লেখেন এখনো?

- না। লেখার প্রয়োজন পড়ে না। কবিতা-গল্প কিছুই লিখি না

- কেন?

- তোমাদের সমাজে নিরুপমা, কেটি, বিনোদিনী, গোড়া কিংবা হৈমন্তী এরা আজো কেউ ভালো নেই। অপু সেদিনও ওরা বাবার করা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে নি, আজো একজন মেয়ে লাঞ্ছিত হলে তোমরা প্রতিবাদ করো না। তোমাদের চোখের সামনে জলজ্যান্ত মেয়েদের সম্ভ্রমহানি হয়। তোমরা প্রতিবাদ করো না।

- নাহ। প্রতিবাদ তো করি।

- দৌড়ে গিয়ে ফেইসবুকে বসে টিপাটিপি শুরু করলে তাকে কি প্রতিবাদ বলে? প্রোফাইল পিকচার টা কালো রঙের করে দিলেই বুঝি প্রতিবাদ হয়? গান্ধী - মুজিবরা এই শিখিয়েছিলো তোমাদের?

- না, আমরা বীরের জাতি, আমরা অন্যায় সহ্য করি না।

- এজন্যই আমি গল্প-কবিতা লেখা ছেড়েছি।

- মানে?

- নিজেকে বীরের জাতি ভেবেই লেখালেখি করতাম। কিন্তু তোমাদের নির্বুদ্ধিতায় আমারই লেখা নারী চরিত্ররা আমাকে অপমান করে। আমারই লেখা ধর্মান্ধ চরিত্র গুলো আমাকে দেখে হাসে।

- পহেলা বৈশাখের কথা বলছেন? নাকি বাউলের চুল কেটে দেওয়া? নাকি মৌলবাদীদের ফতোয়া? আমি বুঝতে পারছি না।

- কুষ্টিয়ায় ছিলাম কিছুদিন। বাংলাদেশ গেছি বহুবার। এমন বাংলাদেশ আমরা রেখে আসিনি। হানাদার নেই যে দেশে, সে দেশে আমাদের কন্যাদের ধর্ষণ করে কারা? কেন আজো আমার দেশের বাতাস একজন অত্যাচারিত মেয়ের চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে, বলতে পারো?

- আপনি রাজনৈতিক কথা বলছেন।

- "মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে... পার হয়ে আসিলাম... আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়; রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়, আমার পুরানো নাম, ..ফিরিবার পথ নাহি"

- থামেন, মাঝরাতে কবিতা ভালো লাগছে না

- থামলাম, কিন্তু মানুষের চিকিৎসার পাশাপাশি সমাজের চিকিতসা শুরু করো বৈদ্য।

- সে দায় কি আমার একার নাকি?

- দায় আমাদের সবার। হৈমন্তীর গা থেকে কাপড় খুলে নেওয়া হলে, ওর আগে তোমার সমাজ ল্যাংটা হবে, তুমি ল্যাংটা হবে - সাদা পাঞ্জাবী পড়ে শরীরের কালো লুকানো যায়, মনের কালি না। তাই সমাজের চিকিৎসা করার দায় বৈদ্য-বণিক-শিক্ষক-ছাত্র-সাহিত্যিক-ব্লগার সবার!

- কি করবো?

- তোমার যতোটুকু করার আছে।

- যদি আমার ক্ষতি হয়?

- তোমার ঘরের সামনে তোমারই প্রেয়সীর কাপড় ধরে টানা হলো। এর থেকে আর কি ক্ষতিই বা হতে পারে। এটা তো ১৯৭১ না। নাকি তোমরা মনে করো, মরে যাওয়া পাকিস্তানি হানাদার গুলো, তোমাদের শরীরে আবার জন্ম নিয়েছে?

- ছিঃ ছিঃ এসব কি বলেন?

- আমার লেখা গানটাকে এবার ছেড়ে দাও। ওটা নিয়েও তোমাদের জাতের রশি ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এক মালাউন কবির গান দিয়ে কেন তোমরা দেশের সব শুভ কাজ শুরু করবে?

- আমার ঘুম পাচ্ছে, কাল সকালে হসপিটালে যাবো

- বেশ, বাঙ্গালী। জাতি হিসেবে তুমি ঘুমিয়ে যাও। ঘুমিয়ে থাকো। ঠিক যেমন করে আমার নোবেলটি চুরি গেলো, তোমার-তোমাদের প্রতিবাদ করার শক্তিটুকুও নিঃশব্দে চুরি গেছে তা তোমরা জানো না।

- আচ্ছা আপনি আমাকে এসব বলছেন কেন, হ্যালো... ... শুনছেন...

- টু... টু... ... টুট...টু

আমি ঘুমিয়ে গেলাম, অনেক গভীর সে ঘুম...

আমার সামনে আমার সমাজের মেয়েরা আক্রান্ত হলেও ভাঙে না সেই ঘুম...

আমার সামনে রেল স্টেশনে কয়েকজন মিলে একজন নারীর কাপড় ধরে টানলেও ভাঙে না সেই ঘুম। যে দেশে হানাদার নেই, চরিত্রহীন জমিদার নেই, তারপরো মেয়েদের সম্ভ্রম হানি হলে ভাঙে না সেই ঘুম... সেই ঘুম পাচ্ছে আমার...

পুনশ্চ:

আজ নারী দিবস না। এটা নারী দিবসের লেখা না। যে দেশে বাঁধাহীন ভাবে পথে ঘাটে একজন নারী কিংবা একজন পুরুষের সম্মান ক্ষুন্ন হতে পারে, এটা সেই 'প্রতিবাদ করতে ভুলে যাওয়া' মানুষের দেশের জন্য লেখা। ভাগ্যিস আমরা সেই দেশে থাকি না!

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক, সার্জারী বিভাগ (৩৩ বিসিএস), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

;

'স্টকহোম সিনড্রোম' নাকি আবহমান প্রতিবাদহীন নারী নির্যাতন?



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৭৩ সালে সুইডেনে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিলো। সে বছর ২৩ শে আগস্টের সকালবেলা সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের স্পেরিকাস ক্রেডিট ব্যাংকে একটা ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময়ে ডাকাত দল অনেক জনকেই ব্যাংকের মধ্যে জিম্মী করে রাখেন এবং সেটা টানা ৬ দিন ধরে। তাদের মধ্যে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তো ছিলেনই।

ছয় দিন পর পুলিশ যখন ডাকাত দলের উপরে অ্যাকশনে যায়, তখন ব্যাংকে জিম্মী থাকা মানুষগুলো উলটো ডাকাতদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলো। এই ঘটনায় সবাই অবাক হয়ে পরেন।

যারা আটকে রাখলো, তাদের প্রতিই এই ভালোবাসা কিভাবে তৈরী হলো! এমনকি দেশের প্রেসিডেন্ট মহোদয় যখন অপহৃত ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, তখন ডাকাতদের প্রতি সহমর্মিতার ব্যাপারেও আবেদন জানিয়েছিলেন অপহৃত ব্যক্তিরা। এই ঘটনা তখন ঘটা করে রেডিওতে প্রচার পেয়েছিলো।

এই ঘটনা থেকেই "স্টকহোম সিনড্রোম" কথাটার জন্ম। আমাদের দেশেও এমন ঘটনা ঘটে।

দেখা যায়, একজন স্বামী তার স্ত্রীর উপর নির্যাতন করলেন, এমনকি নির্যাতনের এক পর্যায়ে হত্যা চেষ্টাও করলেন। পরবর্তীতে স্ত্রীর বাপ-ভাই যখন তার স্বামীর নামে মামলা করলো, স্ত্রী আদালতে গিয়ে স্বাক্ষ্য দিলেন যে, এই অত্যাচার তার স্বামী করেন নাই বা তার স্বামী একজন আপাদমস্তক ভালো মানুষ।

এটাকেও 'স্টকহোম সিনড্রোম' বলা যায়।

দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচারিত হতে হতে অত্যাচারকারীর প্রতি এক সময় একটি অসুস্থ আবেগ বা অস্বাভাবিক দুর্বলতার জন্ম হয়।

অত্যাচার সহ্য করে হলেও তাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না। এভাবেই একটি জনপদে শিশু নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতনগুলো আলো বা বিচারের মুখ দেখে না।

২০০২ সালে মাত্র স্টন হর্ণব্যাক নামের এক ব্যক্তিকে অপহরণ করা হয়। তাকে প্রায় ২ বছর পরে অপহরণকারীর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে অত্যাচারের চিহ্ণ ছিলো। তদন্তে দেখা যায়, অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে পালানোর কোনো চেষ্টা করেনি। এমনকি স্টন হর্ণব্যাকের কাছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পর্যন্ত ছিলো!

২০২২ সালে একটি জেলার একটি লোকারণ্য রেলস্টেশনে একজন নারী অন্য একজন নারীর উপরে আক্রমনাত্নক হয়ে ওঠেন। প্রথন নারীর অভিযোগ এই যে, দ্বিতীয় নারী একটি স্লিভলেস পোশাক পরিধান করেছেন যা মোটেও সেই দেশে কোন ফৌজদারী বা দেওয়ানী অপরাধ না।

কিন্তু সারা জীবন একটি মহলের দ্বারা শাসিত ও পদদলিত হয়ে থাকতে থাকতে প্রথম নারী তার ব্যক্তিসত্ত্বাকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছেন। পোশাকের মতো একটি সাধারণ নাগরিক 'অধিকার' তার কাছে অনৈতিক, বেমানান ও অসামাজিক মনে হচ্ছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটি অসুস্থ অংশের এই নোংরা শোষণের প্রতি তার গভীর আবেগ ও ভালোবাসা তৈরী হয়েছে। তাই সেই দিন একজন নারী হয়েও অন্য একজন নারীকে আক্রমণ করতে, শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিত করতে এবং দ্বিতীয় নারীর গায়ের পোশাক টেনে ছিঁড়ে ফেলতেও তার খারাপ লাগছিলো না। অথচ 'স্বল্প' পোশাক পরিধান নিয়েই তার অভিযোগ ছিলো। কিন্তু তিনি নিজেই আবার অন্য নারীটির পোশাক ছিঁড়ে ফেলছেন নির্দ্বিধায়। আবার এই কাজে তিনি সেই সমাজের গুটিকয়েক পুরুষের সাহায্য নিচ্ছেন!

সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থা একদিনে তৈরী হয় না। মানসিক দৈন্যতার এই স্তরে যেতে কয়েক মাস, কয়েক বছর এমনকি কয়েক প্রজন্ম লেগে যেতে পারে।

অত্যাচারকারীর প্রতি এই স্নেহ বা আবেগ অনেক সময় বিপদজনক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এমনকি এ সময় কেউ উদ্ধারে এগিয়ে এলে তাকেও আক্রমণ করে বসতে পারেন স্টকহোম সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি। অবশ্য ক্রিমিনোলজিস্টরা অনেকে স্টকহোম সিনড্রোমে বিশ্বাস করে না।

যাই হোক, চোখের সামনে প্রতিনিয়ত একটি অন্যায় দেখছেন, অথচ সেই অন্যায়ে আপনি কোন বাঁধা দিচ্ছেন না। বরং সেই অন্যায় আপনার ভালো লাগছে, মজা লাগছে। সেই অন্যায়কে আপনি যত্নে এবং খুব গর্বে লালন করছেন, পৃষ্ঠপোষকতা করছেন -

এরকম উদাহরণ এই দেশে কি খুব বেশি অপ্রতুল?

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, চিকিৎসক, সার্জারী বিভাগ (৩৩ বিসিএস), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

;